আমেরিকা বলে ‘আমি জিতেছি', ইরান বলে ‘আমি’, আসলে কে জিতেছে

সবার মনেই উৎকণ্ঠা ছিল, ট্রাম্পের বেঁধে দেওয়া সময়সীমা পেরিয়ে গেলে কী হবে? যদিও একাধিকবার এমন ‘ডেডলাইন’ পার করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তারপরও ৭ই এপ্রিল নিয়ে আলাদা শঙ্কা ছিল। বারবার ভয়ংকর হুমকি দিয়ে যাচ্ছিলেন ট্রাম্পও। সবশেষ মঙ্গলবার ইরানকে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন ট্রাম্প। কিন্তু নির্ধারিত সময়সীমার মাত্র ৯০ মিনিট আগে ট্রাম্প দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতির ঘোষণা দেন। ইরানের পক্ষ থেকেও নিশ্চিত করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত এই যুদ্ধে কে জিতল তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।

মঙ্গলবার রাতে দেওয়া পোস্টে ট্রাম্প বলেছিলেন, “আজ একটি সভ্যতা বিলীন হয়ে যাবে। আর ফিরে আসবে না। আমি এমনটা চাইনি। কিন্তু সম্ভবত এমন কিছুই হতে যাচ্ছে।”

নতুন প্রশাসন আসবে এবং সেখানে কম উগ্রপন্থী মানুষ থাকবে জানিয়ে ট্রাম্প আরও বলেন, “হয়তো দারুণ বিপ্লবী কিছু ঘটবে। কেউ জানে না। তবে আজ রাতে আমরা জানতে পারবো। পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম জটিল এক ঘটনা ঘটবে। ৪৭ বছরের নিপীড়ন, দুর্নীতি ও মৃত্যুর মিছিল থামবে। ইশ্বর ইরানি জনগণের প্রতি সহায় হোন।”

কিন্তু এরপর হঠাৎ ইরান নিয়ে তার যুদ্ধনীতি ঘুরিয়ে দিলেন ট্রাম্প। বুধবার পোস্ট করে বললেন, যুদ্ধবিরতি হচ্ছে। ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, এই স্থগিতাদেশ তখনই কার্যকর থাকবে যখন ইরান অবিলম্বে ‘সম্পূর্ণ এবং নিরাপদভাবে’ আন্তর্জাতিক নৌপথ হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেবে।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের দেওয়া ১১ ঘণ্টার বিশেষ প্রস্তাবের পরিপ্রেক্ষিতেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান ট্রাম্প।

ট্রুথ সোশ্যালে ট্রাম্প লেখেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ ও সেনাপ্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের বিশেষ অনুরোধে ইরানের ওপর পূর্বনির্ধারিত ‘বিধ্বংসী হামলা’ দুই সপ্তাহের জন্য তিনি স্থগিতে রাজি হয়েছেন।

ট্রাম্প লেখেন, দুই পক্ষের মধ্যে একটি ‘উভয়মুখী যুদ্ধবিরতি’ কার্যকর হতে যাচ্ছে। তবে এই স্থগিতাদেশের প্রধান শর্ত হচ্ছে, ইরানকে অবিলম্বে এবং সম্পূর্ণ নিরাপদভাবে হরমুজ প্রণালি জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে হবে।

পরে ইরানের পক্ষ থেকেও জানানো হয় ১৪ দিনের যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে দুইপক্ষ।

যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবের পর তেহরানে উৎসবে নেমে আসে ইরানিরা

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচির পোস্ট শেয়ার করেছেন ট্রাম্প। সেই পোস্টে বলা হয়েছে, পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের অনুরোধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১৫-পয়েন্ট প্রস্তাবের ভিত্তিতে আলোচনার অনুরোধ এবং ওয়াশিংটন কর্তৃক ইরানের ১০-পয়েন্ট প্রস্তাব  আলোচনার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণের ঘোষণা বিবেচনা করছেন তারা।

বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে ঘোষণা করছি: ইরানের ওপর আক্রমণ বন্ধ হলে, আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী তাদের প্রতিরক্ষা কার্যক্রমও বন্ধ করবে। দুই সপ্তাহের জন্য, হরমুজ প্রণালি নিরাপদে চলাচলযোগ্য হবে। তবে এটি সম্ভব হবে ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে।”

যুদ্ধের প্রেক্ষাপট

২৮এ ফেব্রুয়ারি পরমাণু আলোচনা চলার সময়েই ইরানে হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র। যুদ্ধের শুরুর দিকে, ইরানের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা আমেরিকা ও ইসরায়েলের হামলা থামাতে ব্যর্থ হয়েছিল। হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছিল তাদের, নিহত হন সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লাহ খামেইনি থেকে শুরু করে অনেক শীর্ষ কর্মকর্তা।

তবে হামলার জবাব সরাসরি না দিয়ে  কার্যকরী কৌশল নেয় ইরান।

মধ্যপ্রাচ্যের পশ্চিমা মিত্র দেশগুলোতে হামলা চালায় তারা। কাতার, সৌদি আরবের মতো দেশে মার্কিন ঘাঁটি লক্ষ্য করে হামলা চালাতে থাকে তেহরান। যুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। মধ্যপ্রাচ্যের এই মিত্রদের চাপে পড়ে  যুক্তরাষ্ট্র।

এ ছাড়া ইরানের হামলায় বিগত বছরগুলোর চেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ পরে ইসরায়েল। তাদের অত্যাধুনিক আয়রন ডোমকে ব্যর্থ করে একাধিকবার ইসরায়েলি ভূখণ্ডে আঘাত হানে ইরান।

সংখ্যার হিসেবে আপাতদৃষ্টিতে যুদ্ধে ইরানের ক্ষতি বেশি মনে হলেও ইসরায়েল ও আমেরিকাও প্রচণ্ড চাপে ছিল। আয়রন ডোমের ব্যর্থতায় ইসরায়েলের শক্তিশালী ভাবমূর্তি চরম ক্ষুন্ন হয়েছে। একইসঙ্গে বারবার ডনাল্ড ট্রাম্পের হুঁশিয়ারি উপেক্ষা করে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়ে ইরান বুঝিয়ে দিয়েছে যে বিশ্বের সবচেয়ে সামরিক শক্তিধর দেশের হাতেও আসলে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই।

এমন পরিস্থিতিতেই ট্রাম্পকে ‘ট্রাম্প কার্ড’ দেখায় ইরান। সেটা হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়ে। এটিই তাদের বড় কৌশলগত সুবিধা দেয় এবং যুদ্ধের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে এনে দেয়।

হরমুজ প্রণালি

বিশ্ব মানচিত্রের গুরুত্বপূর্ণ এই বাণিজ্যিক রুট বন্ধ করে দিয়ে আদতে পুরো পৃথিবীর অর্থনীতিকেই নাড়িয়ে দেয় ইরান। আর শেষ পর্যন্ত ট্রাম্পকে এই কৌশলের কাছেই হার মানতে হয়েছে।

একাধিকবার হরমুজ প্রণালি খোলার হুমকি দিলেও সফল হয়নি যুক্তরাষ্ট্র। উলটো অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক চাপে পড়েছেন ট্রাম্প।

তেলের দাম বেড়েছে, সংকট বেড়েছে, শেয়ারবাজারে প্রভাব পড়েছে। ট্রাম্পের বিরুদ্ধে উঠেছে অভিশংসন প্রস্তাবও।

শেষ পর্যন্ত নিজের বেঁধে দেওয়া সময়সীমার শেষ হওয়ার ৯০ মিনিট আগে ট্রাম্প জানিয়েছেন যুদ্ধবিরতি হয়েছে। 

কীভাবে হলো যুদ্ধবিরতি

ট্রাম্পের সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্ট অনুযায়ী, তিনি দুই সপ্তাহের জন্য ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি মেনে নিয়েছিলেন পাকিস্তানের অনুরোধে। পাকিস্তান দুই পক্ষের মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করছে।

ট্রাম্প জানিয়েছেন, ইরান থেকে প্রাপ্ত ১০-পয়েন্টের প্রস্তাব যথেষ্ট আলোচনার ভিত্তি হিসেবে তিনি যুদ্ধবিরতিতে রাজি। ইরানও সম্মত হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত মেনে ইরান হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে রাজি হয়েছে বলে জানিয়েছেন পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ। ফলে অবিলম্বেই যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে বলে জানান তিনি।

এক ‍টুইটে তিনি বলেন, “আমি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ঘোষণা করছি যে, ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তাদের মিত্ররা লেবাননসহ সর্বত্র যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে, যা অবিলম্বে কার্যকর হবে।”

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ‘বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য একটি চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে আরও আলোচনার জন্য' ১০ই এপ্রিল ইসলামাবাদে একটি বৈঠক ডেকেছে পাকিস্তান। সেখানে উভয়পক্ষের প্রতিনিধি দলকে অংশগ্রহণের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন শাহবাজ শরীফ।

ট্রাম্প বলেছেন, “পাকিস্তান সরকারের অনুরোধ এবং ইরানের পক্ষ থেকে দেওয়া দশ দফার একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে আমরা এই সিদ্ধান্ত নিয়েছি। আমরা বিশ্বাস করি, এই প্রস্তাব আলোচনার একটি কার্যকর ভিত্তি হতে পারে।”

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাঘচি এক পোস্টে বলেছেন, পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর অনুরোধ এবং যুক্তরাষ্ট্রের ১৫-পয়েন্ট প্রস্তাবের ভিত্তিতে আলোচনার অনুরোধ এবং ওয়াশিংটন কর্তৃক ইরানের ১০-পয়েন্ট প্রস্তাবের সাধারণ কাঠামো আলোচনার ভিত্তি হিসেবে গ্রহণের ঘোষণা বিবেচনা করছেন তারা।

বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, “আমি ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে ঘোষণা করছি: ইরানের ওপর আক্রমণ বন্ধ হলে, আমাদের শক্তিশালী সশস্ত্র বাহিনী তাদের প্রতিরক্ষা কার্যক্রমও বন্ধ করবে। দুই সপ্তাহের জন্য, হরমুজ প্রণালি নিরাপদে চলাচলযোগ্য হবে। তবে এটি সম্ভব হবে ইরানি সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে।”

বারবার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন ট্রাম্প

কী আছে ইরানের ১০ দফা প্রস্তাবে

ইসলামাবাদে শুরু হতে যাওয়া শান্তি আলোচনার ভিত্তি হিসেবে ইরান যে ১০ দফা প্রস্তাব দিয়েছে, তার বিস্তারিত প্রকাশ করেছে আল-জাজিরা। প্রস্তাবগুলোতে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, মধ্যপ্রাচ্য থেকে সেনাপ্রত্যাহার ও ইরানের মিত্রশক্তির ওপর হামলা বন্ধের দাবি উঠে এসেছে।

পারমণিক অস্ত্র: ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেবে।

হামলা বন্ধ: ইরানের ওপর সকল হামলা বন্ধ করতে হবে।

হরমুজ প্রণালিতে নিয়ন্ত্রণ: ইরান তার সশস্ত্র বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে হরমুজ প্রণালি দিয়ে ‘নিয়ন্ত্রিত যাতায়াতের’ প্রস্তাব দিয়েছে।

মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার: পুরো মধ্যপ্রাচ্য থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সব যুদ্ধকালীন ঘাঁটি এবং সেনা মোতায়েন কেন্দ্র থেকে মার্কিন সৈন্য সম্পূর্ণ প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে তেহরান।

মিত্রশক্তির নিরাপত্তা: ইরান স্পষ্ট করেছে যে তাদের মিত্র সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধের অবসান ঘটাতে হবে। এটি মূলত লেবাননভিত্তিক সশস্ত্র গোষ্ঠী হিজবুল্লাহ, ফিলিস্তিনভিত্তিক হামাস ও ইয়েমেনভিত্তিক হুতিদের ওপর হামলা বন্ধের দাবি।

নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার: ইরানের বিরুদ্ধে থাকা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক সব নিষেধাজ্ঞা বাতিলের আহ্বান জানানো হয়েছে প্রস্তাবে।

যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি: যুদ্ধ ও অবরোধের কারণে সৃষ্ট ক্ষয়ক্ষতির ‘পূর্ণাঙ্গ ক্ষতিপূরণ’ দাবি করা হয়েছে তেহরানের পক্ষ থেকে।

পরমাণু দ্রব্য মজুত:   যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পরমাণু দব্য সমৃদ্ধ করার অধিকার মেনে নিবে এবং কতটুকু সমৃদ্ধি সম্ভব তা নিয়ে আলোচনা হবে।

আন্তর্জাতিক চুুক্তি: ইরানকে তার প্রতিবেশী দেশগুলোর সাথে দ্বিপক্ষীয় এবং বহু-পক্ষীয় শান্তি চুক্তি করার অনুমতি দেওয়া হবে।

আইনি নিশ্চয়তা: ইরান দাবি করেছে যে ইসলামাবাদে সমঝোতা হওয়া প্রতিটি বিষয়কে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি ‘বাধ্যতামূলক রেজোল্যুশন’ হিসেবে পাস করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে কোনো পক্ষ এর থেকে সরে যেতে না পারে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প (বামে) ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা মোজতাবা খামেইনি

কে বিজয়ী হলো

যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরান, উভয়পক্ষ নিজেদের বিজয়ী বলে ঘোষণা করেছে।

ট্রাম্প দাবি করেছেন, এই যুদ্ধবিরতি যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ বিজয় নিশ্চিত করেছে।

বার্তাসংস্থা এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প, “হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়ার পাশাপাশি ইরানের সমৃদ্ধ পরমাণুর ঠিকমত দেখভাল করা হবে। সেটা নাহলে আমি মীমাংসা করতাম না।”

এক বার্তায় হোয়াইট হাউসের প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলাইন লেভিট বলেছেন, “এটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বিজয়, যা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং আমাদের অসাধারণ সামরিক বাহিনীর কারণে সম্ভব হয়েছে।”

ইরানে পরিচালিত মার্কিন সামরিক অভিযান 'অপারেশন এপিক ফিউরি' ছয় সপ্তাহ স্থায়ী হওয়ার কথা থাকলেও তার আগেই যুক্তরাষ্ট্র লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি।

অন্যদিকে, ইরান সরকারও এটিকে নিজেদের একটি ‘বড় বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরছে।

ইরানের সর্বোচ্চ জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদ (এসএনএসসিআই) এক বিবৃতিতে বলেছে, “ইরান এই যুদ্ধে তার প্রায় সব লক্ষ্যেই অর্জন করেছে এবং শত্রুপক্ষ একটি ঐতিহাসিক ব্যর্থতার সম্মুখীন হয়েছে।”

এদিকে, ইরানের সঙ্গে যুদ্ধবিরতি নিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে বিবৃতি প্রকাশ করেছে ইসরায়েল।

সেখানে বলা হয়েছে, অবিলম্বে হরমুজ প্রণালি খুলে দেবে এবং ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবকাঠামোর ওপর সব ধরনের হামলা বন্ধ করার শর্তে দুই সপ্তাহের জন্য ইরানের ওপর হামলা স্থগিত রাখার যে সিদ্ধান্ত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প নিয়েছেন, ইসরায়েল তা সমর্থন করে।

হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের ব্রিফ করছেন প্রেস সেক্রেটারি

তবে ইসরায়েলের বিরোধী দলের নেতা ইয়ার লাপিদ বলেছেন, ইরানে যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত ইসরায়েলের জন্য একটি ‘রাজনৈতিক বিপর্যয়’। এক্ষেত্রে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ব্যর্থ হয়েছেন।

বিশ্লেষকরা অবশ্য বলছেন, যুদ্ধে কে জয়ী হলো তা এখনই বলা সম্ভব নয়।

ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো রস হ্যারিসন বলেন, “আমাদের বুঝতে হবে যে, কয়েক ঘণ্টা আগে আমরা যে অবস্থানে ছিলাম, তা ছিল একটি খুবই বিপজ্জনক মোড়। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার হুমকি দিচ্ছিল এবং ইরান বেশ শক্ত অবস্থানে ছিল।”

তিনি আরও বলেন, “আমি মনে করি এটি বলাও জরুরি যে, যুক্তরাষ্ট্র দেখাতে চেয়েছে তারা যেকোনো সময় চূড়ান্ত পদক্ষেপ নিতে পারে।”

তবে ইরানেরও বিকল্প ছিল উল্লেখ করে এই বিশ্লেষক বলেন, আঘাতের পরিধি বিস্তৃত করা ও হরমুজ প্রণালী এবং উপসাগরীয় আরব দেশগুলোর দিকে যুদ্ধ ছড়িয়ে দিত পারতো ইরান।

অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক মনে করেন, রাশিয়ার পারমাণবিক নীতি “escalate to de-escalate” অর্থাৎ ‘শান্তির জন্যই অশান্তি’ ধারণার ওপর ভিত্তি করে এগোচ্ছিলেন ট্রাম্প। যার অর্থ যুদ্ধের শুরুতে রাশিয়া একটি সামরিক পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে প্রতিপক্ষকে ধাক্কা দিয়ে সাধারণ যুদ্ধ থেকে সরে আসতে বাধ্য করবে।

যদিও রাশিয়ার দাবি, তারা এমন কোনো কৌশল অবলম্বন করে না।

আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, মঙ্গলবার ট্রাম্পের পদক্ষেপও এ ধরনের কিছুটা কৌশলের মতো মনে হয়। তিনি সোশ্যাল মিডিয়ায় রণনীতি ও হুমকি এতটাই বাড়িয়ে দিলেন যে, মারাত্মক শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। এবং শেষ পর্যন্ত যুদ্ধবিরতিতে গড়ালো।

রাশিয়ান নীতিতে মূল উদ্দেশ্য হলো শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে সরে আসতে বাধ্য করা। ট্রাম্পের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষ কতটা মানে সরে এসেছে, তা এখনও অস্পষ্ট। পরে আরও বিস্তারিত রিপোর্টে দেখা যাবে ট্রাম্প কতদূর যেতে চেয়েছিলেন।

সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের ওয়ারফেয়ার, ইরেগুলার থ্রেট অ্যান্ড টেরোরিজম প্রোগ্রামের পরিচালক ড্যানিয়েল বাইম্যান বলেন, এটি বলা কঠিন যে, যুদ্ধের মধ্যে কোন পক্ষ জয়ী হচ্ছে, কারণ লড়াইয়ে অংশগ্রহণকারীদের লক্ষ্য এবং কৌশলগুলো খুবই আলাদা।

এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে যুদ্ধের চেয়ে সংঘাতের বাইরের খরচ এত বেশি যে তা হিসেবে একটা জটিলতা সৃষ্টি হয়। কারণ এটা যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক কারণ হয়ে দাঁড়ায় বলে মনে করেন এই বিশ্লেষক।

এখন কী হবে

ড্যানিয়েল বাইম্যান বলেন, অনেক দেশে অর্থনৈতিক সংকটের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের উপর দোষ চাপানো হতে পারে। ফলে মার্কিন বিরোধী মনোভাব বৃদ্ধি পাবে। 
যুক্তরাষ্ট্রকে রাজনৈতিকভাবে এর মূল্য দিতে হবে উল্লেখ করে এই বিশ্লেষক বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বী চীন ও রাশিয়ার বিরুদ্ধে যখন ওয়াশিংটন এই দেশগুলোর সহযোগিতা চাইবে, তখন প্রতিকূল পরিস্থিতে পড়তে হতে পারে।

প্রশাসনের কূটনৈতিক কৌশল এই পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। কারণ মিত্রদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই যুদ্ধ শুরু করে অ্যামেরিকা।

সিবিএস নিউজের সাংবাদিক মাইক ক্রলি বলেন, এই পরিস্থিতিতে ‘যুদ্ধবিরতি’কে পুঁজি করার চেষ্টা করবেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, অনেকদিন ধরেই ট্রাম্প এমন একটি উপায় খুঁজছেন যা তাকে যুদ্ধ শেষ করতে এবং তাকে সফল দেখাতে সাহায্য করে।

ইতোমধ্যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে তেমন কথাই বলেছেন ট্রাম্প। তিনি বলেন, “আমরা ইতিমধ্যে সমস্ত সামরিক লক্ষ্য পূরণ করেছি এবং পারমাণবিক অস্ত্রের সাথে সম্পর্কিত দীর্ঘমেয়াদী শান্তি চুক্তি নিয়ে একটি চূড়ান্ত চুক্তির দিকে অনেক এগিয়ে গেছি।”

তবে এর আগেও ট্রাম্প অনেকবার এমন দাবি করেছেন বলে উল্লেখ করেছেন এই বিশেষজ্ঞ।

ট্রাম্পের হুঁশিয়ারিতে চারটি লক্ষ্য সবচেয়ে বেশি উল্লেখ করা হয়েছে- ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ক্ষমতা নির্মূল করা, তার নৌবাহিনী ধ্বংস করা, দেশের বাইরে সন্ত্রাসবাদীদের সমর্থন শেষ করা, এবং নিশ্চিত করা যে ইরান কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না পারে।

কিন্তু ইরানের যে ১০টি দাবির ভিত্তিতে যুদ্ধবিরতি হয়েছে এবং শুক্রবার ওয়াশিংটন-তেহরান বৈঠক হবে সেগুলোতে এর প্রতিফলন নেই। বরং সবকিছু ইরানের অনুকূলেই রয়েছে।

আসলে কী হতে যাচ্ছে এবং কে জয়ী হলে তা জানার জন্য অন্তত পরবর্তী দুই সপ্তাহ অপেক্ষা করতে হবে বলে মনে করেন মাইক ক্রলি।

তাই এখন সবার চোখ ইসলামাবাদে, যেখানে এই যুদ্ধবিরতির পরবর্তী পর্যায়ের আলোচনা হবে। পরবর্তী দুই সপ্তাহের মধ্যে, হয়তো পৃথিবী দেখতে পাবে, কিভাবে এই শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি আরও এগিয়ে যাবে, অথবা শেষ পর্যন্ত নতুন কূটনৈতিক সমঝোতা প্রতিষ্ঠিত হবে।

(বিবিসি, সিবিএস, আলজাজিরা, ভক্স, সিএনএন, সিএসআইএস অবলম্বনে)