ইরানে নিখোঁজ কর্নেল মার্কিন অভিযানে ‘উদ্ধার’ নাকি ‘ব্যর্থ’

সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছিলো। একদিকে মার্কিন স্পেশাল ফোর্স তাকে খুঁজছে উদ্ধারের জন্য। আর ইরানের আইআরজিসি খুঁজছে বন্দি করার জন্য।

আটচল্লিশ ঘণ্টার রুদ্ধশ্বাস অভিযানের পর ট্রাম্প জানালেন, ‘‘আমরা তাকে খুঁজে পেয়েছি। গত কয়েক ঘণ্টা ধরে রুদ্ধশ্বাস অভিযান চালানো হয়েছে শত্রুপক্ষের মাটিতে।”

এই অভিযানকে সাম্প্রতিককালের সবচেয়ে সাহসী ‘সার্চ অ্যান্ড রেসকিউ’ মিশনগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে।

ঘটনার শুরু

যুক্তরাষ্ট্র একজন কর্নেল। যিনি ছিলেন বহুল আলোচিত এফ ফিফটিন-ই স্ট্রাইক ঈগলের একজন ক্রু। কাজ করছিলেন ওয়েপন সিস্টেম অফিসার হিসাবে।

শুক্রবার মার্কিন বাহিনীর এফ ফিফটিন-ই বিমানকে মধ্য ইরানের বোয়ার আহমাদ প্রদেশের কাছে গুলি করে নামানোর দাবি করে ইরান।

দ্য ওয়াশিংটন পোস্টও জানায়, ইরানের ভেতরে একটি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ঈগল যুদ্ধবিমান ভূপাতিত হয়। বিমানটিতে দুজন ক্রু ছিলেন। তারা ইজেক্ট করে আলাদা হয়ে পড়েন।

অল্প সময়ের মধ্যেই পাইলট উদ্ধার হয়। কিন্তু আরেক ক্রু ওয়েপন সিস্টেম অফিসার নিখোঁজ হয়ে যান।

শুরু হয় তল্লাশি অভিযান।

আকাশে ওড়ে হেলিকপ্টার-বিমান। মাঠে নামে বিশেষ বাহিনী। চলে স্যাটেলাইট নজরদারি।

সক্রিয় হয়ে ওঠে তেহরানও।

ইরান জানে, একজন মার্কিন ক্রু তাদের ভূখণ্ডের কোথাও আছে। সম্ভাব্য অঞ্চল ঘিরে ফেলতে শুরু করে ইরান রেভ্যুলেশনারি গার্ড কোর আইআরজিসি।

রাষ্ট্রীয় টিভিতে আলোচনা শুরু হয়। পাইলটের খোঁজে পুরস্কার ঘোষণা করে ইরান।

একই মানুষকে খুঁজছে দুই দেশ

আহত কর্নেল তখন হয়তো পালিয় বেড়াচ্ছেন শত্রুর হাত থেকে। মার্কিন গোয়েন্দারা তার অবস্থান আন্দাজ করতে পারছেন।

ইরানি বাহিনীও কাছাকাছি। সময়ই তখন হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় শত্রু।

মার্কিন কমান্ড দ্রুত সিদ্ধান্ত নেয় চিরুনি অভিযান চালানোর। গভীর রাতে আকাশে নড়ে ওঠে কয়েক ডজন আকাশযান।

এতে অংশ নেয় মার্কিন বিশেষ বাহিনী,  টমা হক আর পেইভ হক হেলিকপ্টার এবং সি-১৩০ পরিবহন বিমান।

হেলিকপ্টারগুলোকে পাহাড়ি ও প্রতিকূল ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে কম উচ্চতায় উড়তে হচ্ছিলো। ইরানি বাহিনীর সঙ্গে গোলাগুলির ঘটনাও ঘটে।

অন্তত দুটি মার্কিন হেলিকপ্টারে গুলি লাগে। কিছু সেনা আহত হন। পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে।

উদ্ধার অভিযানের সময় মার্কিন বাহিনীকে সরাসরি সংঘর্ষে জড়াতে হয়। উদ্ধার নিশ্চিত করতে যুক্তরাষ্ট্র আকাশে শক্তিশালী যুদ্ধবিমান মোতায়েন করে।

একটি এ-টেন যুদ্ধবিমানও ইরানের হামলার শিকার হয়। যদিও পাইলট নিরাপদে বের হতে সক্ষম হন।

দুই পক্ষ তখন একই দিকে আগাচ্ছে। কয়েক মিনিটের ব্যবধানই নির্ধারণ করবে, একজন পাইলট বন্দি হবেন, নাকি ফিরে যাবেন নিজের দেশে।

তাকে শনাক্ত করার পর রিপ ড্রোন দিয়ে তার আশেপাশে নজর রাখা হচ্ছিলো। দ্য গার্ডিয়ান জানিয়েছে, এ সময়ে তিন কিলোমিটারের মধ্যে থাকা ও হুমকি মনে হওয়া সামরিক বয়সী (মিলিটারি এইজড) পুরুষদের ওপর হামলা চালিয়ে ওই কর্মকর্তাকে সুরক্ষা দেওয়া হয়।

‘আমরা তাকে পেয়েছি’

শেষ পর্যন্ত নিখোঁজ ওই কর্নেলকে সফলভাবে উদ্ধার করা হয় বলে দাবি করে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি আহত হলেও বর্তমানে নিরাপদে আছেন বলে জানিয়েছে ওয়াশিংটন। তাকে ইরানের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।

নিউহয়র্ক পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন বাহিনী নিখোঁজ কর্মকর্তার অবস্থান শনাক্ত করতে টানা নজরদারি চালায়।

তিনি কয়েক ঘণ্টা থেকে কয়েক দিন পর্যন্ত ইরানি বাহিনীকে ফাঁকি দিয়ে অবস্থান পরিবর্তন করছিলেন বলে জানা গেছে।

একইসঙ্গে সিআইএ বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা চালায়। ইরানের ভেতরে ভুল তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয় যে, ওই কর্মকর্তাকে ইতোমধ্যে উদ্ধার করা হয়েছে। এতে ইরানি বাহিনীর অনুসন্ধান প্রচেষ্টা বিভ্রান্ত হয় বলে জানিয়েছে অ্যাক্সিওস।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই অভিযানকে ‘ইতিহাসের অন্যতম সাহসী উদ্ধার মিশন’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন একজন আমেরিকানও অভিযানে আহত হননি বলে দাবি করেন।

ট্রুথ স্যোশালে ট্রাম্প লিখেছেন, “আমার নির্দেশে মার্কিন সামরিক বাহিনী তাকে উদ্ধার করার জন্য বিশ্বের সবচেয়ে মারাত্মক অস্ত্রে সজ্জিত কয়েক ডজন বিমান পাঠিয়েছে। তিনি আহত হয়েছেন, কিন্তু তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবেন।”

অভিযান ‘ব্যর্থ’ দাবি ইরানের

সেনা উদ্ধার মার্কির দাবির পর অবশ্য ইরানের সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, ভূপাতিত যুদ্ধবিমানের ক্রুকে খুঁজে বের করার অভিযানে অংশ নেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি উড়োজাহাজ তারা ধ্বংস করেছে।

ইরানের সামরিক বাহিনীর কেন্দ্রীয় কমান্ড খাতাম আল আম্বিয়ার বিবৃতির বরাতে তেহরান থেকে এএফপি জানিয়েছে, ইসফাহানের দক্ষিণাঞ্চলে অনুপ্রবেশকারী দুটি ব্ল্যাক হক হেলিকপ্টার এবং একটি সি-১৩০ সামরিক পরিবহন বিমান আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বর্তমানে আগুনে জ্বলছে।

তারা দাবি করেছে, মার্কিন উদ্ধার অভিযানটি ‘ব্যর্থ’ হয়েছে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, মরুভূমি এলাকায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পুড়ে যাওয়া ধ্বংসাবশেষ থেকে এখনো ধোঁয়া উঠছে।

ইরানি গণমাধ্যম জানায়, এই উদ্ধার অভিযানের সময় চালানো হামলায় দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পাঁচজন নিহত হয়েছেন। তবে তারা বেসামরিক না সামরিক সদস্য, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।