আমেরিকার পক্ষে খার্গ দখল কেন অসম্ভব, হামলা হলে মাশুল দিতে হবে পুরো বিশ্ববাসীকে

ইরানের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত খার্গ দ্বীপ দখল করে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। 

মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্নস্থানে বাড়ানো হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন ও এয়ারবোর্ন ডিভিশনের সেনা। 

অনেকেই ধারণা করছেন, নিজেকে বিজয়ী দেখানোর শেষ প্রচেষ্টা হিসেবে ট্রাম্প হয়ত খার্গ দ্বীপ দখলের যুদ্ধে নামবেন।  

কিন্তু পারস্য সাগরের ছোট্ট এই দ্বীপটির দখল আমেরিকা আদৌ নিতে পারবে কি না তা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছেন বিশ্লেষকরা। 

তাদের ভাষ্য, খার্গ দখল ‘সহজ’ তো নয়ই, বরং এটি হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী ও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের সূচনা।

দ্বীপটি ইরানের মূল ভূখণ্ডের এতটাই কাছে যে, দখল করলেও আমেরিকার পক্ষে সেটি ধরে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। 

আর খার্গে হামলা করলে তেলের দাম এতটাই বেড়ে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে যে, সেই প্রভাবে বিশ্ব অর্থনীতি টালমাটাল হয়ে উঠতে পারে। 

তাই খার্গ দখলের প্রচেষ্টা যেমন আমেরিকাকে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলবে, তেমনি পুরো বিশ্বকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে ঠেলে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা।

অর্থনীতি নিয়ে বিশ্লেষণ করে এমন সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস, খার্গে যুদ্ধ শুরু হলে জ্বালানি তেলের দাম এখনকার তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। আর এতে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক কাঠামোর ভারসাম্য ভেঙে পড়তে পারে। 

খার্গ দখল করা কেন অসম্ভব

যুদ্ধের প্রথম দুই সপ্তাহে ইরানের বিভিন্ন সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনায় আমেরিকা ও ইসরায়েল হামলা চালালেও খার্গ দ্বীপ ছিল অক্ষত। 

কিন্তু গত ১৩ই মার্চ সেখানে বিমান হামলা চালায় মার্কিন বাহিনী। সেই হামলার লক্ষ্য ছিল, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, রেইডার স্টেশন, বিমানবন্দর ও হোভারক্রাফট ঘাঁটি।

এরপর থেকেই ইরানের অর্থনীতির ধমনী হিসেবে পরিচিত এই ভূখণ্ড নিয়ে আলোচনা চলছে। খার্গ দখল করে নেওয়া হতে পারে বলে সরাসরি হুমকি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। 

এক মাসের বেশি সময় ধরে চলা ইরানের সংঘাত শেষ করার জন্য ট্রাম্পের ‍ওপর তুমুল চাপ সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের ঘাঁটি ও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মিত্র দেশগুলোর ওপর হামলা চালিয়ে যাওয়ায় এই চাপ আরো প্রবল হচ্ছে।  

ইরান আংশিকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে হরমুজ প্রণালি। সরু এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের ২০ শতাংশ জ্বালানি তেল পরিবহন করা হয়। 

গুরুত্বপূর্ণ নৌপথটির নিয়ন্ত্রণ রয়েছে ইরানের হাতে। তাদের মিত্র কয়েকটি দেশের তেলবাহী কিছু জাহাজই কেবল যুদ্ধকালীন সময়ে হরমুজ দিয়ে চলাচলের অনুমতি পাচ্ছে। 

এই প্রণালির বেশিরভাগ বন্ধ থাকায় এরই মধ্যে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সংকট দেখা দিয়েছে এবং দামও বেড়ে গেছে। ইতোমধ্যে বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতাও ষ্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। 

তাই হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে ট্রাম্পের হাতে যে কয়টি অস্ত্র রয়েছে, তার মধ্যে অন্যতম হলো ইরানের ওপর তীব্র আঘাত। এজন্যই খার্গ দ্বীপ দখল করে নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। 

সামাজিক মাধ্যমে ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে সামরিক অভিযান বন্ধের আলোচনায় বড় অগ্রগতি হচ্ছে। 

“দ্রুত কোনো সমঝোতা না হলে এবং প্রণালিটি দ্রুত খুলে না দিলে বিদ্যুৎকেন্দ্র, তেলক্ষেত্র, খার্গ আইল্যান্ড এমনকি পানি লবণমুক্ত করার প্ল্যান্টও ধ্বংস করে দিতে পারে যুক্তরাষ্ট্র।” 

ফাইন্যানশিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে, খার্গ দ্বীপ দখল করে নেওয়ার ইঙ্গিতে দিয়েছেন ট্রাম্প।

“হয়ত আমরা খার্গ দ্বীপ দখল করব, হয়ত করব না। আমাদের সামনে অনেক বিকল্প আছে। এতে এটাও বোঝায় যে, আমাদের (খার্গ দ্বীপে) কিছু সময় অবস্থান করতে হবে।”

ট্রাম্পের এসব কথাবার্তার মধ্যে খার্গে পারস্য উপসাগর ঘিরে ব্যাপকভাবে সেনা সমাবেশ ঘটানো হচ্ছে। 

মার্কিন নৌবাহিনীর একটি জাহাজে প্রায় আড়াই হাজার মেরিন সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছে। নৌপথ থেকে স্থলে ঝটিকা আক্রমণের জন্য মেরিন সেনাদের দক্ষ হিসেবে মনে করা হয়।  

এছাড়া ৮২তম এয়ারবোর্ন ডিভিশনের হাজার খানেক সেনাও শিগগিরই যুদ্ধে যোগ দেবে বলে এপির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এই সেনারা শত্রু বা সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে প্যারাশুটের মাধ্যমে নেমে গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও বিমানঘাঁটি দখলে নেওয়ার জন্য প্রশিক্ষিত। 

পাশাপাশি আরো আড়াই হাজার মেরিন সেনাকে ক্যালিফোর্নিয়া থেকে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন করা হচ্ছে। 

এসব দেখে মনে হচ্ছে, ইরানকে শায়েস্তা করতে খার্গ দ্বীপ দখল করতে পূর্ণমাত্রার প্রস্তুতি নিচ্ছে আমেরিকা। 

যদিও ইরানের পক্ষ থেকে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে যে, খার্গ দখল করতে গেলে আমেরিকার কোনো সৈন্য জীবিত ফিরতে পারবে না। 

বিশ্লেষকেরাও বলছেন, খার্গে সামরিক পদক্ষেপ নিলে মার্কিন সেনাদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়বে এবং যুদ্ধ শেষ করতে ব্যর্থ হতে পারেন ট্রাম্প। 

ওয়াশিংটন ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসির মিলিটারি অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজ প্রোগ্রামের পরিচালক মাইকেল আইজেনস্টাডট সামরিক বিশ্লেষণের জন্য পরিচিত।  

তিনি বলেছেন, “এটা ঠিক যে, স্থলবাহিনী মোতায়েন করে আঘাত হানলে মনস্তাত্ত্বিকভাবে শক্তিশালী বার্তা দিতে পারে আমেরিকা। তবে এতে নিজের সেনাদের বড় ঝুঁকির মুখে ফেলা হয়। 

“দ্বীপটি মূল ভূখণ্ড থেকে খুব দূরে নয়। তাই ইরান চাইলে, নিজেদের অবকাঠামোর ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও সেখানে ব্যাপক হামলা চালাতে পারে।”

খার্গ দখল করলে পরিণতি কী হতে পারে তা নিয়ে শঙ্কিত খোদ ইসরায়েলের বিশেষজ্ঞ। দেশটির ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইরান বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিকজ বলেছেন, খার্গ দ্বীপ দখল করলে সংঘাত আরও তীব্র হতে পারে।

“ইরান এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলো, যেমন ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা প্রতিশোধমূলক হামলা বাড়াতে পারে। হরমুজ প্রণালিতে মাইন পাতা এবং পারস্য উপসাগর থেকে লোহিত সাগর পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে ড্রোন হামলা হতে পারে।” 

সিট্রিনোভিকজ বলেছেন, “এই দ্বীপ দখল করা কঠিন হবে। ধরে রাখা হবে আরো কঠিন। এতে অর্থনীতিতে আঘাত লাগতে পারে। কিন্তু এমনটা হবে না যে, ইরান আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হবে।”

পারস্য উপসাগরে ইরানের অপরপ্রান্তে কুয়েত ও সৌদি আরবে রয়েছে মার্কিন ঘাঁটি। ঠিক তার বিপরীতে পাশেই খার্গ দ্বীপ হলো ইরানের তেল শিল্পের প্রাণকেন্দ্র।

মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র ২৫ কিলোমিটার দূরের এই দ্বীপ থেকেই ইরানের প্রায় ৯০ শতাংশ তেল রপ্তানি হয়।

ইরানের সমুদ্র উপকূলের বেশিরভাগ অংশই অগভীর হওয়ায়, সেখানে বড় তেলবাহী জাহাজ ভিড়তে পারে না। তাই খার্গের ওপরই নির্ভর করতে হয় দেশটির।  

খার্গ দ্বীপ দখলে কেন মার্কিন সেনারা বিপদে পড়বেন? এর প্রধান একটি কারণ হিসেবে মনে করা হচ্ছে যে, এটি ইরানের মূল ভূখণ্ডের খুব কাছাকাছি। সেখান থেকে ব্যাপকভাবে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং আর্টিলারি হামলা চালানো সম্ভব। 

এছাড়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার পরও ইসলামি প্রজাতন্ত্র এখনও পুরো মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে আক্রমণ চালিয়ে যাচ্ছে। 

শত শত মাইল দূরের সৌদি আরবের একটি বিমানঘাঁটিতে হামলা করেছে ইরান। যেখানে দুই ডজনেরও বেশি মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন।

মার্কিন সামরিক বিশ্লেষক মাইকেল আইজেনস্টাডট মনে করছেন, আমেরিকা যুদ্ধজাহাজ ও বিমান সহায়তা দিলেও ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে ছোড়া প্রতিটি ড্রোন বা ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করার জন্য সময় পাওয়া যাবে খুব অল্প। 

“উপকূলীয় এলাকা পাহাড়বেষ্টিত হওয়ায়, ড্রোনগুলো পাহাড়ি গিরিপথ দিয়ে আসতে পারে। আমাদের (মার্কিন) রেইডারের পক্ষে সেগুলো শনাক্ত করা কঠিন। আর আমাদের কাছে আগাম সতর্কতার সময়ও খুব কম।”

তাই খার্গ দখলের অভিপ্রায় থেকে সরে এসে যুক্তরাষ্ট্রকে ভিন্ন কৌশল নেওয়া উচিৎ বলে মনে করেন আইজেনস্টাডট। 

“তুলনামূলক নিরাপদ কৌশল হতে পারে, ইরানের তেলবাহী জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে সমুদ্রপথে অবরোধ আরোপ করা। এরফলে ইরানের তেল শিল্প নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্য অর্জন করতে পারবে আমেরিকা।”

খার্গে হামলা হলে কী হবে

ম্যাপে পারস্য উপসাগরে ছোট্ট একটি বিন্দুর মতো মনে হয় খার্গ দ্বীপকে। সমুদ্রের গভীর পানিতে অবস্থিত এই প্রবাল দ্বীপের রয়েছে দীর্ঘ বাণিজ্যিক ইতিহাস। 

দ্বীপটিতে প্রবেশাধিকার অত্যন্ত কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত করা হয়। এজন্য এটা ‘ফরবিডেন আইল্যান্ড’ নামেও পরিচিত। 

ছোট এই দ্বীপটিই ইরানের অর্থনীতির প্রাণভোমরা এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই এখানে কোনো সমস্যা মানে, তা পুরো বিশ্বেরই সমস্যা। 

ডেটা অ্যানালিটিক্স প্রতিষ্ঠান কেপলার এক বিশ্লেষণে বলছে, দ্বীপটি ইরানের তেল অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

“ইরান বহু দশক ধরে দেশের অভ্যন্তরের বড় বড় তেলক্ষেত্র থেকে পাইপলাইন তৈরি করে এই দ্বীপে নিয়ে এসেছে। ফলে এটি তেল সংগ্রহ, সংরক্ষণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পাঠানোর প্রধান কেন্দ্র হয়ে উঠেছে।”

ইরানের এই কেন্দ্রীভূত ব্যবস্থাই এখন দেশটির জন্য তৈরি করেছে অত্যন্ত ঝুঁকি। 

যুদ্ধের আগের বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালে ইরানের মোট তেল রপ্তানির ৯৪ শতাংশই খার্গ দ্বীপ থেকে ট্যাঙ্কারে করে পাঠানো হয়েছে।

এই দ্বীপ থেকে তেল পাঠাতে কোনো বিঘ্ন ঘটলে ইরানের রপ্তানি ক্ষমতার সিংগভাগই হুমকির মুখে পড়বে বলে সতর্কবার্তা দিয়েছে কেপলার। 

আর সেই সংকট ইরানের অর্থনীতির ওপর যেমন বিশাল প্রভাব ফেলবে, একইভাবে প্রভাবিত করবে অন্যান্য দেশকেও। 

ইউএস-চায়না ইকনোমিক অ্যান্ড সোশ্যাল সিকিউরিটি রিভিউ কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, ইরানের তেলের প্রায় ৯০ শতাংশই কেনে চীন। 

তাই খার্গ থেকে জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটা মানে, ইরান থেকে আর তেল পাঠানো যাবে না চীনে।

কারণ, খার্গ দখল হলে তা উদ্ধারে মরণপণ যুদ্ধে নামবে ইরান এবং হরমুজ প্রণালি তারা সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন। আর খার্গ দ্বীপের সব তেলই রপ্তানি হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। 

এর প্রভাব তখন শুধু স্থানীয় সীমানা ছাড়িয়ে পুরো বিশ্বকেই আচ্ছন্ন করে ফেলবে। 

ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তেল এমন একটি বৈশ্বিক পণ্য যে, কোনো জায়গায় বিঘ্ন ঘটলে, তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে সব জায়গার দামের ওপর। 

খার্গে হামলা বা দখল মানেই হলো- চীনকে বিকল্প উৎস থেকে তেল কিনতে হবে। আর এই ঘটনা বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম আরও বাড়িয়ে দেবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হচ্ছে। 

গত সোমবার আন্তর্জাতিক মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের প্রতি ব্যারেলের দাম সর্বোচ্চ উঠেছিল প্রায় ১১৫ মার্কিন ডলার। যুদ্ধ শুরুর পর দাম বেড়েছে ৬০ শতাংশের বেশি।

যদি খার্গ দ্বীপের তেল রপ্তানি ব্যাহত হয়, তাহলে ভোক্তাদের ওপর চাপ আরও বাড়বে।

রয়টার্সের এক জরিপে অংশ নেওয়া বিশ্লেষকরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে তেলের প্রতি ব্যারেলের দাম গড়ে ১৩৪ ডলার পর্যন্ত উঠতে পারে। 

আর যদি খার্গ দ্বীপের রপ্তানি স্থাপনায় বড় ধরনের ক্ষতি হয়, তাহলে গড় দাম ১৫৩ ডলার পর্যন্ত যেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে দাম ২০০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলেও আশঙ্কা করছেন কিছু বিশ্লেষক।

যুদ্ধের ফলে শুধু পরিবহন খরচ বৃদ্ধি না, খাদ্যসহ প্রায় সব পণ্যের দাম বাড়তে শুরু করেছে। বাড়ছে আকাশপথে পরিবহন ও ভ্রমণ খরচও। 

পরিবহন ও ভোক্তা পণ্যের পাশাপাশি মূলধনি পণ্যের দামও বেড়ে যাওয়ার পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। এতে সরবরাহ ব্যবস্থায় সমস্যা তৈরি হয়ে রাসায়নিক ও কৃষি খাত বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। 

পণ্যবাজার বিশ্লেষক ও বিনিয়োগ ব্যাংকগুলো সতর্ক করে বলেছে, বড় ধরনের প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ জ্বালানির দাম এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।

এসব কারণেই খার্গ দ্বীপের তেল অবকাঠামো ধ্বংস বা দ্বীপটি আমেরিকার দখল করার অভিপ্রায়ের বিরোধিতা করেছেন সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ক্লেটন সিগল। 

“পারস্য উপসাগর থেকে বের হওয়া ইরানি তেলবাহী জাহাজ জব্দ করার জন্য এক ধরনের কোয়ারেন্টাইন বা অবরোধ গড়ে তোলা যেতে পারে। এটি এমন দূরত্ব থেকে করা সম্ভব, যা ইরানের অধিকাংশ অস্ত্র ব্যবস্থার আওতার বাইরে থাকবে।”  

ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের ইরান বিশেষজ্ঞ ড্যানি সিট্রিনোভিচ বলেন, খার্গ একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হলেও, শুধু এই দ্বীপের জন্য তেহরান আত্মসমর্পণ করবে না। যুক্তরাষ্ট্র দ্বীপটি দখল করলেও ইরান কিছুটা তেল রপ্তানি চালিয়ে যেতে পারবে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, ট্রাম্পের জনসমর্থন কমে এসেছে এবং নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের কাছে চলে যেতে পারে।

খার্গে স্থলবাহিনী মোতায়েন এবং অভিযান চালাতে গিয়ে মার্কিন সৈন্যের ক্ষয়ক্ষতি হলে সেই দায় ট্রাম্পকেই নিতে হবে। পাশাপাশি, যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ ভোক্তাদের জন্যও বাড়তি খরচের চাপ তৈরি হবে। 

অথচ ট্রাম্পই আগে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধে জড়াবে না আমেরিকা।

কিন্তু ইরান এখন ট্রাম্পের জন্য মরণফাঁদ হয়ে গেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট না পারছেন পেছাতে, না পারছেন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে। এই অবস্থায় খার্গ দখল করতে গেলে কোন পরিণতি অপেক্ষা করছে তা সময়ই বলবে।