যুদ্ধ চালাতে নিজ দেশেই হিমশিম খাচ্ছেন ট্রাম্প, কথাবার্তায় অস্পষ্টতা

ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধ কতদিন চলবে এবং এই যুদ্ধের আসল উদ্দেশ্য কী, তা নিয়ে বিভ্রান্তি বেড়েই চলেছে। আর এতে আরো রসদ ঢালছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প নিজেই। 

চলমান যুদ্ধ নিয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ও তার প্রশাসন পরিষ্কার বার্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছেন।  

যুদ্ধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের শেয়ারবাজারে ধস নেমেছে এবং তেলের দামে ঐতিহাসিক ঊর্ধ্বগতির রেকর্ড হয়েছে। 

ট্রাম্প এখন বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমে তার বক্তব্য প্রচারের চেষ্টা করছেন। তবে যেসব বার্তা তিনি দিচ্ছেন, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে অস্পষ্টতা। 

শেয়ারবাজার ধস ও তেলের দাম রেকর্ড ছোঁয়ার পর সোমবার কয়েকটি সংবাদমাধ্যমে ফোন করেন ডনাল্ড ট্রাম্প, বলে জানিয়েছে বিবিসি। 

তেলের দাম নিয়ে নিউ ইয়র্ক পোস্টের প্রতিনিধিকে তিনি বলেছেন, “সবকিছুর জন্যই আমার প্ল্যান আছে, ঠিক আছে? সবকিছুরই প্ল্যান আছে, আপনারা অনেক খুশি হবেন,” বলেন ট্রাম্প। 

ফোনে সিবিএস নিউজের প্রতিনিধিকে বলেন, “যুদ্ধ প্রায় শেষ, বলতে গেলে।” 

তাহলে সামরিক অভিযান শিগগিরই শেষ হবে কি না, সিবিএস নিউজের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেছেন, “জানি না, এটা নির্ভর করে। শেষ করার ব্যাপারটা শুধু আমার মাথায়ই আছে, আর কারো না।” 

তবে অস্পষ্ট বার্তা থাকলেও ট্রাম্পের এই ফোন কল আশ্বস্ত করেছে অর্থনৈতিক খাতকে। সাথেই সাথেই বেড়েছে স্টক মার্কেটের সূচক আর তেলের দাম ১২০ ডলার থেকে নেমে এসেছে ৯০ ডলারে। 

কয়েকদিন আগেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট বলেছিলেন যে ইরান “নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ না করা পর্যন্ত” যুদ্ধ চালিয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্র।

তবে সোমবারের ওইসব মন্তব্যের পর মনে করা হচ্ছিল, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া এই যুদ্ধ হয়ত দ্রুতই শেষ হবে। তবে সন্ধ্যার মধ্যেই আবার কথা ঘুরিয়ে ফেলেন ট্রাম্প। 

“আমরা এখনই এটিকে একটি মারাত্মক সাফল্য ঘোষণা করতে পারি, অথবা আমরা আরও এগিয়ে যেতে পারি। এবং আমরা আরও এগিয়ে যাব,” বলেন তিনি। 

ট্রাম্প একদিকে বলছেন, ইরান অভিযান ‘প্রায় শেষ’। আবার এও বলছেন, পারস্য উপসাগর থেকে বের হতে চাওয়া তেলবাহী জাহাজকে আটকালে ইরানের ওপর আক্রমণ বাড়ানো হবে।

“আমরা এমনভাবে আক্রমণ করব যে, তাদের এবং তাদের মিত্রদের পক্ষে পৃথিবীর এই অংশটিকে উদ্ধার করা অসম্ভব হয়ে যাবে।” 

ট্রাম্প আরো বলেন, ইরান যাতে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল এবং তাদের মিত্র দেশগুলোর ওপর আক্রমণ করার মতো কোনো অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করাই তার উদ্দেশ্য।

এসব মিশ্র মন্তব্যের কারণে, যুদ্ধ শেষ হবে কিনা, এই উত্তর যারা খুঁজছিলেন, তাদের মাথায় উত্তরের চেয়ে প্রশ্নের সংখ্যাই বেশি হয়ে গেছে। 

রবিবার এক সাক্ষাৎকারে যুক্তরাষ্ট্রের ডিফেন্স সেক্রেটারি পিট হেগসেথ বলেন, “আমাদের আরো গতানুগতিক অস্ত্র- গ্র্যাভিটি বোমা কিংবা ৫০০, ১০০০ ও ২০০০ পাউন্ডের বোমা দিয়ে তাদের সামরিক স্থাপনাগুলোয় আঘাত করার সক্ষমতা আছে। আমরা এখনো যুদ্ধের এই অংশ শুরুই করিনি।” 

তার মতে এটি ‘নতুন একটি দেশ গড়ার’ শুরু। তবে ইরাকের মতো “দেশ গড়ার” উদ্যোগও যুক্তরাষ্ট্র নিতে চায় না বলে এর আগে মন্তব্য করেছেন ট্রাম্প ও তার সহচরেরা। 

যুদ্ধের এই পর্যায়ে এসে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি হিমশিম খাচ্ছে। শুক্রবার দেশটির ব্যুরো অফ লেবার স্ট্যাটিস্টিক্স জানিয়েছে, ফেব্রুয়ারি পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে ৯২ হাজার মানুষ চাকরি হারিয়েছে। বেকারত্ব বেড়ে হয়েছে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ। 

বিভিন্ন জরিপের তথ্যমতে, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধের বিরুদ্ধেও বড় ধরনের বিরোধিতা আছে জনগণের মধ্যে। এছাড়া দ্রব্যমূল্য ও জীবনযাপনের খরচ নিয়েও বাড়ছে উদ্বেগ। 

ট্রাম্প প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি সাময়িক এবং নভেম্বরে নির্বাচনের আগে আগে আরও “ইতিবাচক পরিস্থিতি” দেখা যাবে। 

মঙ্গলবার নর্দার্ন জর্জিয়ার একটি স্থানীয় কংগ্রেশনাল নির্বাচনের ভোট হবে। সেখানেও ইরান যুদ্ধ ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বিষয়টি মাথায় আছে ভোটারদের। সেখানকার একজন ভোটার বিবিসিকে বলেন, জ্বালানির দাম বাড়তে থাকলে অর্থনৈতিক মন্দা দেখা দিতে পারে। 

“আমি এক সময় ট্রাম্পকে সমর্থন করেছিলাম, কিন্তু এসব বিষয়ের জন্য না,” বলেন ওই ভোটার। 

আরেকজন ভোটার, যার পেশা ছিল নার্সিং, তিনি মনে করছেন, জ্বালানির দাম বাড়ার কারণে তাকেও ভুগতে হবে। 

বিবিসিকে তিনি বলেন, “আমার এটা একদমই ভালো লাগছে না। আমি বুঝতে পারছি যে, তাদের (ইরানের মানুষের) সাহায্য দরকার। তবে আমরা কি সেটা অন্য উপায়ে করতে পারতাম না?”

দ্রব্যমূল্যের উর্দ্ধগতি কিংবা যুদ্ধ, কোনোটাই চাচ্ছেন না যুক্তরাষ্ট্রের বহু মানুষ। এই রকম পরিস্থিতিতে ইরান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। 

সোমবারের বক্তব্যে তিনি এই যুদ্ধকে আমেরিকার জন্য “ব্যাপক সফলতা” বলে উল্লেখ করেছেন। একইসঙ্গে তার দাবি, ইরানের নৌবাহিনী ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে, বিমান বাহিনী ধ্বংস করা হয়েছে, এবং রেইডার ও অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট সক্ষমতা নিষ্ক্রিয় করে ফেলা হয়েছে। 

তবে এই যুদ্ধের জন্য মোটা দাম দিতে হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রকে। আমেরিকা ও বিশ্বের অর্থনীতির কতটা ক্ষতি হয়েছে এবং হতে যাচ্ছে তা ধীরে ধীরে সামনে আসছে। 

বিবিসি’র বিশ্লেষণ অবলম্বনে