ওল্ড গার্ডদের হটিয়ে নেপালে ক্ষমতার পথে জেন-জি, এবার কি শান্ত হবে হিমালয়কন্যা

নেপালে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতায় থাকা ‘ওল্ড গার্ড’ বা পুরোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বকে সরিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব নিতে যাচ্ছেন নতুন প্রজন্মের নেতারা। 

এর মাধ্যমেই দেশটির রাজনীতিতে যুগান্তকারী পরিবর্তনের সূচনা হতে যাচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। 

গত বছরের সেপ্টেম্বরে জেন-জি নেতৃত্বাধীন আন্দোলনে সরকার পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নিয়ে ৫ই মার্চ নির্বাচনের ঘোষণা দেয়।

তখন থেকেই ধারণা করা হচ্ছিল, জনগণের রায় হয়ত তরুণদের পক্ষেই যাবে।

সেই পূর্বাভাসই সত্যি হতে যাচ্ছে বলে জেন-জি আন্দোলনের পর অনুষ্ঠিত প্রথম সাধারণ নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে ফুটে উঠেছে।  

ভোটের মাঠে পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলোকে প্রায় কোণঠাসা করে রাজধানী কাঠমান্ডুর ক্ষমতার পথে এগিয়ে যাচ্ছেন নতুনরা। 

র‍্যাপার থেকে রাজনীতিক হওয়া বলেন্দ্র শাহ-যিনি বালেন শাহ নামেই বেশি পরিচিত-তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠা নতুন রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রীয় স্বতন্ত্র পার্টি (আরএসপি) পেতে যাচ্ছে বড় ধরনের জয়।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ফলাফল নেপালের রাজনীতিতে দীর্ঘদিনের প্রভাবশালী ঐতিহ্যবাহী দলগুলোর শক্ত ঘাঁটি ভেঙে দিয়েছে। 

নির্বাচন কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত, ১৬৫টি আসনের মধ্যে ১৬১টির ফলাফলে আরএসপি ইতোমধ্যে ৩৪টি আসনে জয় পেয়েছে এবং আরও ৮৫টি আসনে এগিয়ে রয়েছে। 

অন্যদিকে নেপালি কংগ্রেস ৪টি আসনে জয় পেয়েছে এবং ১১টি আসনে এগিয়ে আছে। আর সদ্য ক্ষমতাচ্যুত সিপিএন–ইউএমএল ২টি আসনে জয়ী হয়েছে এবং এগিয়ে রয়েছে ৮টিতে। 

দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম রাজনৈতিক অস্থিরতার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত নেপালে প্রায় দুই শতাব্দী ধরে চলছে রাজনীতি টালমাটাল। 

দুই দশক আগে রাজতন্ত্রের অবসান হলেও স্থিতিশীলতা ফেরেনি। একের পর এক সরকার বদল, কোনো সরকারের মেয়াদ পূর্ণ করতে না পারা-এসবই যেন হয়ে উঠেছে নেপালের রাজনৈতিক বাস্তবতা।

কিন্তু প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে, তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় বালেন শাহ ক্ষমতার কেন্দ্রে আসার পর নেপালের রাজনীতিতে কি স্থায়ী পরিবর্তনের সূচনা ঘটবে?

কে এই বালেন শাহ, আরএসপির অগ্রযাত্রা যেভাবে   

পেশায় স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার হলেও বালেন শাহ তার প্রতিভা ছড়িয়েছেন নানা ক্ষেত্রে। র‍্যাপার হিসাবে তরুণদের মধ্যে ভীষণ নাড়া দেন বালেন শাহ। 

নেপালের আন্ডারগ্রাউন্ড হিপ-হপে সক্রিয় ছিলেন অনেকদিন। গানের মাধ্যমে দুর্নীতি ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। সেখান থেকেই তরুণদের আইকন হয়ে ওঠেন। 

২০২২ সালে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে কাঠমান্ডুর মেয়র নির্বাচিত হন। এর আগে স্বতন্ত্র কোনো প্রার্থী মেয়র হননি। তার বিজয়ের পেছনে ছিল তরুণরা।

আসল নাম বালেন্দ্র শাহ হলেও তুমুল জনপ্রিয় এই র‍্যাপার সংগীত ভুবনে প্রবেশের পর দ্রুত পরিচিত হয়ে ওঠেন বালেন শাহ নামে। 

আর অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবে নেপালের রাজনীতিতে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হয়ে উঠেছেন ৩৬ বছর বয়সি বালেন শাহ। 

ভোটের আগে তার দল আরএসপি ঘোষণা করে যে, ভোটে জিতলে তাকে বানানো হবে প্রধানমন্ত্রী।

আরএসপি গঠন করেছিলেন রবি লামিছানে। তিনিও নেপালের রাজনীতিতে একজন অত্যন্ত প্রভাবশালী এবং আলোচিত ব্যক্তিত্ব। 

রাজনীতিতে আসার আগে রবি জনপ্রিয় টেলিভিশন সাংবাদিক ছিলেন। তার শো "সিধা কুরা জনতা সাঙ্গ" বা জনতার সাথে সরাসরি কথা, তাকে ব্যাপক পরিচিতি এনে দেয়।

রবি লামিছানে ২০২২ সালে সাংবাদিকতা ছেড়ে শুরু করেন রাজনীতি। নতুন দল আরএসপি গঠন করেন রবি। 

দ্রুত সাড়া ফেলে নতুন দল। ২০টি আসনে জয়ী হয়ে ২০২২ সালের নির্বাচনে চতুর্থ বৃহত্তম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। 

রবি নিজেও বিপুল ভোটে নির্বাচিত হন। এরপর নেপালের উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে দুই দফায় দায়িত্ব পালন করেন। 

তবে নাগরিকত্ব বিতর্ক এবং আইনি জটিলতার কারণে তাকে একাধিকবার পদ ছাড়তে হয়েছে। সমবায় তহবিল তছরুপ, অর্থ পাচার এবং পাসপোর্ট জালিয়াতির মতো বেশকিছু অভিযোগ আনা হয় তার বিরুদ্ধে।

আরএসপির দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান, স্বচ্ছ প্রশাসনের প্রতিশ্রুতি এবং প্রচলিত রাজনীতির চেয়ে ভিন্ন কথা বলার কারণে তরুণদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে দলটি। 

জেন-জি আন্দোলন ও বালেন শাহ

জেন-জি আন্দোলনের পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়, সেটাকে কাজে লাগিয়ে বালেন শাহ নতুন রাজনৈতিক জোট ও দলকে জনপ্রিয় করে তোলেন।

জেনজিদের বিক্ষোভে ২০২৫ সালে কেঁপে ওঠে নেপাল। সেখানে নেতৃত্বের সারিতে ছিলেন বালেন শাহ। এরপরই তাকে আরএসপিতে নেওয়া হয় এবং দলটির জনপ্রিয়তা আরো বেড়ে যায়। 

কেপি শর্মা ওলির সরকারের পতনের কয়েকদিন আগে নেপালে ফেসবুক, ইউটিউব, হোয়াটসঅ্যাপসহ ২৬টি সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্ম নিষিদ্ধ করা হয়। 

তরুণদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। তবে এর মূলে ছিল দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক স্থবিরতা, উচ্চ বেকারত্ব এবং রাজনৈতিক অভিজাতদের বিলাসিতার বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের অসন্তোষ।

হাজার হাজার শিক্ষার্থী ও তরুণ কাঠমান্ডুর রাজপথে নেমে আসে। পুলিশের গুলিতে ২২ জন নিহত হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। বিক্ষোভকারীরা সংসদ ভবন ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেয়। প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে হামলা চালায়। প্রবল জনরোষের মুখে পদত্যাগে বাধ্য হন ওলি। 

বিশ্লেষকরা বলছেন, নেপালে জেন-জিদের ক্ষোভ আছড়ে পড়ার অন্যতম কারণ ছিল দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং বাক্‌স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ। 

বালেন শাহ ছিলেন জেন-জি আন্দোলনের সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মুখ ও সমর্থক। তিনি আন্দোলনের শক্তিকে জাতীয় রাজনীতির দিকে নিয়ে যান। 

জেন-জি আন্দোলনের শুরুতেই তিনি ঘোষণা করেন, তরুণদের দাবি শোনা জরুরি এবং কোনো রাজনৈতিক দল যেন আন্দোলনকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার না করে।

কাঠমান্ডুর মেয়র হিসেবে আগে থেকেই তরুণদের কাছে জনপ্রিয় ছিলেন বালেন। রাজনীতিবিরোধী ও দুর্নীতিবিরোধী বক্তব্য, এমনকি তার র‍্যাপ গানের মাধ্যমেও তিনি পুরোনো রাজনৈতিক ব্যবস্থার সমালোচনা করতেন। 

জেন-জি আন্দোলন শুরু হলে অনেক তরুণ তাকে ব্যবস্থাবিরোধী পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবে দেখেছিল।

কেপি শর্মা ওলির সরকারের পতনের পর নেপালের পরিস্থিতি অস্থির হয়ে ওঠে। তখনও বালেন শাহ এগিয়ে আসেন এবং আন্দোলনকারীদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান। নির্বাচনের মাধ্যমে নতুন ম্যান্ডেট নেওয়ার কথা বলেন তিনি। 

জেন-জি আন্দোলনের পর যে রাজনৈতিক শূন্যতা তৈরি হয়, সেটাকে কাজে লাগিয়ে বালেন শাহ নতুন রাজনৈতিক জোট ও দলকে জনপ্রিয় করে তোলেন। 

তিনি তরুণ প্রজন্ম, বিশেষ করে যারা জেন-জি আন্দোলনের পরিচিত হয়েছিলেন, তাদের মধ্যে অনেককে নিজের রাজনৈতিক জোটে নিয়ে আসেন, যা নেপালের রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের সাক্ষী হয়ে উঠেছে। 

অন্তর্বর্তী সরকার ও ভোট

প্রচণ্ড আন্দোলনের মুখে প্রধানমন্ত্রী ওলি যখন পালাচ্ছিলেন, তখন সুশীলা কারকি ছিলেন নেপালের প্রধান বিচারপতি। সংকটময় মুহূর্তে তাকেই নিতে হয় দেশের দায়িত্ব। 

সুশীলা কারকি-কে অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। নেপালের ইতিহাসে তিনিই প্রথম নারী, যিনি প্রধান বিচারপতি এবং পরে সরকারপ্রধান হন। 

দায়িত্ব গ্রহণের পরই তিনি নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করেন।  

নতুন ব্যবস্থায় ভোটে অংশ নেওয়ার জন্য নেপালে ১২০টি মতো রাজনৈতিক দল নিবন্ধিত হয়। এরমধ্যে এক-তৃতীয়াংশের বেশি দল গড়ে উঠেছে জেন-জিদের আন্দোলনের পর। 

২০০৬ সালে নেপালে গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর এবারই সবচেয়ে বেশিসংখ্যক দল ভোটে অংশ নেয়। 

বাংলাদেশের মতোই নেপালেও তরুণ ভোটার বেশি। সেখানে মোট ভোটার ১ কোটি ৮৯ লাখ। এদের ৫২ শতাংশ থেকে ৫৫ শতাংশ তরুণ প্রজন্মের। 

প্রায় ১০ লাখ নতুন ভোটার নিবন্ধিত হয়েছেন এবার, যাদের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ জেনজি। 

নেপালের হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভ বা প্রতিনিধিসভার আসন ২৭৫টি। এরমধ্যে ১৬৫টি আসনের প্রতিনিধি সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন সরাসরি।

আর ১১০ আসনে ভোট হয় পিআর পদ্ধতিতে। সেই ভোটে জেতার পর রাজনৈতিক দলগুলো প্রতিনিধি নির্বাচিত করেন। 

প্রতিনিধি সভায় দুই ধরনের পদ্ধতির মাধ্যমে ২৭৫ আসনের মধ্যে যে দল বা জোট বেশি আসন পায়, তারাই গঠন করে সরকার। 

নেপালে বালেন শাহের চ্যালেঞ্জ 

তরুণ নেতৃত্ব দেশ পরিচালনায় এসে নেপালের পুরোনো কাঠামো কতটা ভাঙতে পারবে এবং জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারবে কিনা, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে।

তরুণদের এই উত্থানের মধ্যে নেপালে আবারও রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার দাবি ওঠে। সাবেক রাজা জ্ঞানেন্দ্র শাহ দীর্ঘদিন নীরব থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তার বিভিন্ন বক্তব্য, ধর্মীয় ও সামাজিক অনুষ্ঠানে উপস্থিতি এবং জনগণের সঙ্গে যোগাযোগ রাজতন্ত্রপন্থীদের নতুন করে সক্রিয় করেছে। 

বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর ব্যর্থতা, দুর্নীতি এবং অর্থনৈতিক স্থবিরতার কারণে একাংশ জনগণ রাজতন্ত্রকে ‘স্থিতিশীলতার প্রতীক’ হিসেবে দেখতে শুরু করেছে। 

২০০৮ সালের ১১ই জুন নেপালের নতুন গণপরিষদে ২৩৯ বছরের পুরোনো হিন্দু রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করা হয়। নেপালকে ঘোষণা করা হয় প্রজাতন্ত্র। 

রাষ্ট্রীয় প্রজাতন্ত্র পার্টির চেয়ারম্যান রাজেন্দ্র প্রসাদ লিংডেন রাজতন্ত্রপন্থী দলের অন্যতম। ২০২৩ সালে তিনি উপপ্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। এছাড়া একাধিক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রীও ছিলেন। 

জেনজি আন্দোলনের সময় কৌশলী অবস্থান নেন লিংডেন। বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থা যে ব্যর্থ, বারবার সে বিষয়টি তুলে ধরে রাজতন্ত্রের পক্ষে জোর সওয়াল গাইছেন লিংডেন। 

ভোটের আগে কমল থাপা আর রাজেন্দ্র প্রসাদের সঙ্গে জোট বাঁধেন এবং দুজনেই রাজতন্ত্র ফিরিয়ে আনার পক্ষে সওয়াল করেন। যদিও তার দল তেমন কোনো প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেনি, তারপর রাজনীতির মাঠে তারা একেবারে অচ্ছুত হয়ে পড়েননি।   

এবারে ভোটে লড়েছেন নেপালের সাবেক চারজন প্রধানমন্ত্রী। এরা হলেন- কমিউনিস্ট পার্টি অব নেপালের চেয়ারম্যান কেপি শর্মা ওলি। নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির সমন্বয়ক পুষ্প কমল দোহাল প্রচাণ্ড। নেপাল কমিউনিস্ট পার্টির সহ-সমন্বয়ক মাধব কুমার নেপাল এবং প্রগতিশীল লোকতান্ত্রিক পার্টির ডা. বাবুরাম পট্টরাই। 

সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীরা রাজনীতির মাঠে এখনো প্রভাব বিস্তারের ক্ষমতা রাখেন বলে মনে করা হয়। বিশেষ করে সাবেক দুই প্রধানমন্ত্রী পুষ্প কমল দোহাল প্রচান্ড এবং কেপি শর্মা ওলি। 

রাজতন্ত্র উচ্ছেদে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন দুজনই। এরপর ২০০৮ সাল থেকে নেপালে সরকার বদল হয়েছে ১৪ বার। কোনো নির্বাচিত সরকারই মেয়াদ পূর্ণ করতে পারেনি। আর রাজনীতির এই সমীকরণে বড় ভূমিকা রেখেছেন ওলি ও প্রচান্ড। 

তাহলে তরুণ নেতৃত্ব কি নেপালকে স্থিতিশীলতার দিকে নিয়ে যেতে পারবেন? 

কাঠমান্ডুর ২৭ বছর বয়সী ব্যবসায়ের শিক্ষার্থী রাজেশ চন্দের জন্য কাছে এবারের ভোট শুধু নেতা নির্বাচন নয়, এই ভোট ছিল পুরোনো নেতৃত্ব পরিবর্তনের আকাঙ্খার প্রতিফলন। 

“আমি পুরনো বা নতুন দল নিয়ে খুব আগ্রহী নই। আমি আগ্রহী কীভাবে আমরা এই দেশকে সঠিক পথে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারি। আমরা অনেক বছর ধরে পুরোনো রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দেখেছি, কিন্তু কেউ কিছুই করেনি। দেশ ডুবে যাচ্ছে। আমাদের দুর্নীতি রোধ করতে হবে। সেটাই শুরু,” আল জাজিরাকে বলেছেন তিনি। 

নেপালের কমিউনিস্ট দলগুলোর শাসনের সময় তাদের বিরুদ্ধে ‘ক্রনি ক্যাপিটালিজম’ বা স্বজনপুষ্ট পুঁজিবাদের বিস্তার ঘটেছে বলে অভিযোগ করা হয়। সংসদে প্রবেশের সুযোগ পেয়েছেন একশ্রেণীর সুবিধাভোগী ব্যবসায়ী ও ঠিকাদার। আর রাজনৈতিক নেতারা ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তুলেছেন অভিজাত গোষ্ঠীর সঙ্গে।  

কাউন্সিল অন ফরেইন রিলেশনস হলো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাবশালী থিংক ট্যাংক। ভোটের আগে বাংলাদেশ ও নেপালের জেন-জি আন্দোলন নিয়ে একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করে তারা। 

সেখানে লেখা হয়, “বাংলাদেশ ও নেপাল- দুই দেশেই পুরোনো রাজনৈতিক শক্তিগুলো এখনো নির্বাচনের আসল খেলোয়াড়। যদিও যুব আন্দোলনে নতুন দল ও নেতৃত্বের উত্থান ঘটেছে। তবুও আসল প্রতিদ্বন্দ্বিতার মঞ্চে প্রতিষ্ঠিত দলগুলোর সংগঠন, অর্থবল ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক এখনো প্রভাবশালী।” 

দক্ষিণ এশিয়ার দুই দেশ বাংলাদেশ ও নেপালে সম্প্রতি জেন-জিদের আন্দোলনে সরকার পরিবর্তন হয়েছে। দুই দেশই পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলো সক্রিয়।

বাংলাদেশের ভোটে নতুন রাজনৈতিক দল এনপিসি সংসদে মোট আসনের দুই শতাংশে জিততে পেরেছে। সেই তুলনায় নেপাল এখন নতুন রাজনীতির ‘আশার আলো দেখাচ্ছে।’ 

নেপালের পুরোনো বড় বড় দলগুলোর হেরে যাওয়ার কারণ অনুসন্ধান করেছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক সুচেতা পিয়াকুরেল। 

“হতাশা এত বড় পর্যায়ে পৌঁছাতে পারাটার অর্থ হলো- মূলধারার দলগুলো বারবার জনমত উপেক্ষা করেছে এবং অসাংবিধানিক বা অদক্ষ সিদ্ধান্ত নিয়েছে “ আল জাজিরাকে বলেছেন তিনি। 

এই জয়ের ফলে দেশটির রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে বড় পরিবর্তন আসবে, তেমনটা এখনই ভাবছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষক পিয়াকুরেল। 

তিনি বলেন, “কিছু পুরোনো দল নিজেদের ভুল দেখছে। তারা হয়ত তাদের পুরোনো পথ পুনর্বিবেচনা করছে। কিন্তু অনেকগুলো ভিন্ন ভিন্ন উপাদান থাকায় এখনই কিছু অনুমান করা কঠিন।” 

বিশ্লেষকরা বলছেন, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ, নেপালসহ সাম্প্রতিককালে কয়েকটি দেশে তরুণদের নেতৃত্বে সংগঠিত হওয়া বিক্ষোভগুলোর মূলে রয়েছে একই ধরনের সমস্যা। আর তা হলো- স্থবির অর্থনীতি, উচ্চ বেকারত্ব এবং প্রভাবশালী অভিজাত শ্রেণির প্রতি পুঞ্জীভূত ক্ষোভ।

তরুণ নেতৃত্ব দেশ পরিচালনায় এসে নেপালের পুরোনো কাঠামো কতটা ভাঙতে পারবে এবং জগদ্দল পাথরের মতো চেপে বসা সমস্যাগুলোর সমাধান করতে পারবে কিনা, তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে।