খামেইনি মারা গেলেও বদলাবে না ইরান

ইসরায়েল ও আমেরিকার যৌথ হামলায় নিহত হয়েছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লার খামেইনি। মৃত্যুর আগে ইরানকে এমন এক রাষ্ট্রে পরিণত করে গেছেন যেখানে সর্বোচ্চ নেতাই সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী থাকেন এবং যেকোনো একক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারেন। তার রেখে যাওয়া রাষ্ট্রকাঠামো হয়তো আরও ‘খামেইনি’ তৈরি করবে। 

ক্ষমতা পোক্ত রাখতে বিপ্লবী গার্ড বাহিনীকে সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী করেছেন। নিজের অবস্থান বৈধ করতে ‘গার্ডিয়ান কাউন্সিল’ ও ‘অ্যাসেম্বলি অব এক্সপার্টস’ এর একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন। 

খামেইনির মৃত্যুর পর উদযাপনে নেমে আসে অনেক ইরানি। কয়েক দশকের দমন-পীড়নে জমে ওঠা ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ দেখা যায় এদিন।

সবশেষ ২০২৬ এর  জানুয়ারিতেই ইরানের জনগণ ফুঁসে উঠেছিল আন্দোলনে, তাদের দমন করতে হাজার হাজার বিক্ষোভকারীকে গ্রেপ্তার ও হত্যা করে খামেইনির সরকার। 

তবে খামেইনি নিহত হয়েছেন বলেই তার চার দশক ধরে তৈরি করা রাজনৈতিক ও সামরিক প্রতিষ্ঠান ভেঙে পড়বে, এমনটা না। তার ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের কাঠামোই হয়তো আরও ‘খামেইনি’ তৈরি করবে।

১৯৮৯ সালে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা, আয়াতোল্লা রুহুল্লাহ খোমেইনির মৃত্যুর পর ইরানের রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মধ্যেই হয়তো কেউই আলি খামেইনিকে একজন প্রভাবশালী উত্তরসূরি হিসেবে কল্পনা করেননি।

ইরানের সংবিধানের অনুচ্ছেদ-১০৯ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার জন্য একজনকে হতো সর্বোচ্চ পদের শিয়া শর্মযাজক বা গ্র্যান্ড আয়াতোল্লা - যা আলি খামেইনি ছিলেন না। 

তবে খোমেইনির মৃত্যুর কয়েক মাসের মধ্যেই অনুচ্ছেদটি সংশোধন করা হয়, এবং সর্বোচ্চ নেতা হওয়ার প্রয়োজনীয় যোগ্যতা গ্র্যান্ড আয়াতোল্লা থেকে কমিয়ে কিছু সাধারণ ধর্মীয় ও রাজনৈতিক যোগ্যতায় আনা হয়। 

একইসঙ্গে সর্বোচ্চ নেতা পদের ক্ষমতাও বাড়ানো হয়। এই পর্যায়ে ইরানের প্রভাবশালী বিপ্লবী নেতারাসহ অনেকেই অনুমান করেছিলেন খামেইনির ভূমিকা হবে প্রতীকী, এবং প্রশাসনিক ক্ষমতা থাকবে প্রেসিডেন্টের মতো নির্বাচিত কর্মকর্তাদের হাতে। তবে তাদের অনুমান বাস্তবতা থেকে বহুদূরে। 

ক্ষমতায় এসে খামেইনি ধীরে ধীরে সর্বোচ্চ নেতার পদকে একটি তদারকিমূলক পদ থেকে ইসলামিক প্রজাতন্ত্রের কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় রূপান্তর করেন। তার সবচেয়ে প্রভাবশালী রাজনৈতিক উদ্ভাবন ছিল ইসলামিক রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)-র কাঠামো বদল। যেখানে খোমেইনির নীতি ছিল রাজনৈতিক বিষয়ে সামরিক বাহিনীকে জড়িত না করা, সেখানে খামেইনি একটি ভয়ংকর পর্যায়ের অনুগত সামরিক বাহিনী তৈরি করেছিলেন অনুচ্ছেদ ১১০-এর পূর্ণাঙ্গ ব্যবহার করে, যা দেশের সর্বোচ্চ নেতাকে সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়কের ক্ষমতা দেয়। 

খামেইনির নেতৃত্বে আইআরজিসি শুধু সামরিক বাহিনীতে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং একটি রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সত্ত্বায় পরিণত হয়, ওতপ্রোতভাবে জড়িত হয়ে পড়ে অবকাঠামো, টেলিযোগাযোগ, এনার্জি প্রকল্প ও তেল ব্যবসাসহ ইরানের অর্থনীতির প্রধান প্রধান খাতে। 

এছাড়া, খামেইনি তার ক্ষমতাকে আরও শক্ত করতে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেন গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ওপর। ১২-সদস্য বিশিষ্ট গার্ডিয়ান কাউন্সিলের ছয়জন ইসলামিক আইনজ্ঞ সদস্য সরাসরি নিয়োগ পান সর্বোচ্চ নেতার কাছ থেকে, আর বাকি ছয়জন আইনি বিশেষজ্ঞ সংসদের অনুমোদন নিয়ে মনোনীত করেন বিচার বিভাগের প্রধান। তবে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১৫৭ অনুযায়ী বিচার বিভাগের প্রধান সর্বোচ্চ নেতা দ্বারাই মনোনীত হন, যার ফলে দিনশেষে গার্ডিয়ান কাউন্সিলের সকল সদস্যের মনোনয়নেই সর্বোচ্চ নেতার হাত থাকে। 

এই গার্ডিয়ান কাউন্সিলের কাছে ক্ষমতা আছে সংসদ নির্বাচনে প্রার্থীতা বাতিল করার, যার ফলে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক মাঠে শুধু তারাই টিকে থাকেন যাদের খামেইনি সরকার গ্রহণযোগ্য মনে করে।

একইরকম অবস্থা হয় অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস-এর। সংবিধানের অনুচ্ছেদ ১০৭ ও ১১১ অনুযায়ী, অ্যাসেম্বলি অফ এক্সপার্টস কিংবা বিশেষজ্ঞ পরিষদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে সর্বোচ্চ নেতার তদারকি করা এবং তার উত্তরসূরি নির্ধারণ করা।

সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণের অল্পকিছু সংবিধানগত ব্যবস্থার একটি ছিল এই পরিষদ, তবে এর সদস্যরাও মনোনীত হয় সেই গার্ডিয়ান কাউন্সিল দ্বারা। 

অর্থাৎ যেই প্রতিষ্ঠানটির সর্বোচ্চ নেতার ওপর তদারকি করার কথা, তার ওপরও তার প্রভাব বিস্তার হয়ে যায়। 

সুতরাং, খামেইনি যেই রাষ্ট্রব্যবস্থা তৈরি করেছেন, সেই ব্যবস্থার আয়ু তার চেয়েও বেশি। ইরানের আইনব্যবস্থা, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলো এখন ওতপ্রোতভাবে একে অপরের সাথে জড়িত। 

খামেইনির শাসনামলে সর্বোচ্চ নেতার ক্ষমতার ভিত্তি ছিল ধর্মীয় বৈধতা, সামরিক আনুগত্য ও অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণের মিশেল। খামেইনির উত্তরসূরি শুধু একটি রাজনৈতিক অফিসে ঢুকবেন না, বরং এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে ঢুকবেন যা তৈরি হয়েছে কেন্দ্রীভূত ক্ষমতা পুনরায় উৎপাদন করার জন্য। 

এখন ইরান এক অনিশ্চয়তার সম্মুখীন, কেন না বর্তমান সরকারের পতনের সম্ভাবনা কম, আবার আরেক দিকে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তরের সম্ভাবনাও কম। 

নতুন কেউ দায়িত্ব নিলেও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানগুলো অক্ষতই থাকবে। কারণ কাঠামোগত পরিবর্তন না আসলে নতুন সর্বোচ্চ নেতার হাতে সেই একইভাবে ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত থাকবে। ফলে কোনো রাজনৈতিক পরিবর্তন আসার সম্ভাবনা খুব কম।

ইরানে রাজনৈতিক পরিবর্তন আসবে কি না তা পরবর্তী সর্বোচ্চ নেতা কে হচ্ছেন তার ওপর যতটুকু নির্ভর করছে, তার চেয়ে বেশি করছে খামেইনির তৈরি করা রাজনৈতিক কাঠামো ভাঙা হবে কি না তার ওপর।

নতুন কাঠামো আসলেও, পুরনো ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরা নীরবে তা মেনে নেবে না। নির্বাহী ক্ষমতা, আইআরজিসির অর্থনৈতিক আধিপত্য এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ন্ত্রণ করা কাঠামোগুলো যদি ঢেলে সাজানো না হয়, তাহলে ইরানের কর্তৃত্ববাদী শাসনব্যবস্থারই পুনরাবৃত্তি হতে থাকবে। 

(প্রজেক্ট সিন্ডিকেট অবলম্বনে)