রাশিয়া থেকে তেল কেনা বন্ধ না করলে ভারতের ওপর ৫০০ শতাংশ শুল্ক আরোপের হুমকি দিয়েছে রেখেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। কিন্তু সেসবে পাত্তা দিচ্ছে না দুই দেশ।
উল্টো দুই দেশ নিজেদের বাণিজ্য নিয়ে যেতে চাইছে ১০ হাজার কোটি বা ১০০ বিলিয়ন ডলারে। গত বছর এ নিয়ে চুক্তি হলেও সম্প্রতি খবরটি জানা গেছে।
ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষ্যে দেশটির বার্তা সংস্থা পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানিয়েছেন রাশিয়ায় নিযুক্ত ভারতের রাষ্ট্রদূত বিনয় কুমার।
তিনি বলেছেন, “২০৩০ সালের মধ্যে ভারত-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যকে ১০ হাজার কোটি ডলারের উন্নীত করা বিষয়ক একটি বাণিজ্য চুক্তিতে দুই দেশের কর্মকর্তারা স্বাক্ষর করেছেন।”
২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৬ হাজার ৮৭০ কোটি ডলারের দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য করেছে ভারত ও রাশিয়া। যদিও এর বড় অংশজুড়ে রাশিয়ার অপরিশোধিত তেল।
রপ্তানি বাড়িয়ে ভারত বাণিজ্য ঘাটতি কমাতে চায়। আর তাতে সায়ও আছে মস্কোর। বাণিজ্যের আকার বাড়াতে রূপি-রুবল বিনিময় আরো বাড়াবে দুই দেশ।
ইউরোপমুখী ভারত
গ্রিনল্যান্ড, ইউক্রেনসহ নানা ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ভালো যাচ্ছে না ইউরোপের। এই বাস্তবতাতেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে ফ্রি ট্রেড এগ্রিমেন্ট (এফটিএ) বা মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি চূড়ান্ত করেছে ভারত।
এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিলো প্রায় দুই দশক। এই চুক্তির আওতায় ইউরোপের ২৭টি দেশের সঙ্গে ভারতের পণ্যের মুক্ত বাণিজ্য শুরু হবে। ইইউ এবং ভারত বিশ্বের মোট জিডিপি’র ২৫ শতাংশ দখলে রেখেছে। যার বাজার প্রায় দুইশো ক্রেতার।
দিল্লিতে হওয়া এক বৈঠকে এই চুক্তি চূড়ান্ত করেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট এন্তোনিয়ো লুই সান্তোস দ্য কোস্টা, ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উর্সুলা ভন ডের লেয়নের এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
ইউরোপীয় পার্লামেন্ট এবং ইইউ’র সদস্য রাষ্ট্রগুলো চুক্তিতে সায় দিলে এবছরই চুক্তি সই হতে পারে। এই চুক্তির ফলে বিভিন্ন পণ্য ও সেবায় শুল্ক কমবে উল্লেখযোগ হারে। বাড়বে সামরিক সহযোগিতাও।
ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে ভারতের মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি এমন একটা সময়ে চূড়ান্ত হল যখন যুক্তরাষ্ট্র থেকে দুই পক্ষই অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক চাপের মুখে আছে।
'মাদার অফ অল ডিলস'
এই চুক্তির ফলে রপ্তানিতে ব্যাপক সুবিধা পাবে ভারত। ইউরোপের দেশগুলিতে বস্ত্র, রাসায়নিক, রত্ন ও গয়না, বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি, চামড়ার সামগ্রী, জুতা ইত্যাদি কম শুল্কে বিক্রি করতে পারবেন ভারতীয় ব্যবসায়ীরা।
বর্তমানে ভারতীয় পণ্যে গড়ে ৩ দশমিক ৮ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। কিছু ক্ষেত্রে তা ১০ শতাংশ। সেখানে ইউরোপের পণ্যে ভারতে রপ্তানিতে গড়ে ৯.৩ শতাংশ দিতে হয়। কিন্তু এফটিএ বাস্তবায়িত হলে দুই পক্ষেরই ৯০ শতাংশের বেশি পণ্যে হয় শুল্ক কমবে বা পুরোপুরি তুলে নেওয়া হবে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন জানিয়েছে যে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়িত হলে বেশিরভাগ যন্ত্র, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, বিমান, মহাকাশযান, রাসায়নিক ইত্যাদি রপ্তানিতে শুল্ক কমিয়ে শূন্যের কোঠায় আনা হবে।
ইউরোপে তৈরি গাড়ি রপ্তানি করতে ১১০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয় ভারতে। আড়াই লাখ গাড়ির জন্য সেই শুল্ক নেমে আসবে মাত্র ১০ শতাংশে।
ইইউ থেকে অ্যালকোহল, অলিভ অয়েল আমদানির ক্ষেত্রেও শুল্ক ছাড় দেবে ভারত। আবার ভারত থেকে রপ্তানি হওয়া বেশিরভাগ পণ্য ইইউতে প্রবেশের ক্ষেত্রে বিশেষ সুবিধা পাবে। কাপড়, চামড়াজাত পণ্য, হস্তশিল্প, গয়না ও রত্ন রপ্তানির ক্ষেত্রে শুল্ক প্রায় শূন্য করা হবে।
চা, কফি, মশলা, প্রক্রিয়াজাত খাবারের ক্ষেত্রেও মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি সুবিধা পাবে ভারত। পেশাজীবীদের স্বল্পমেয়াদি ভ্রমণের ক্ষেত্রে যাতায়াত সহজ করার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে বৈঠকে।
এই চুক্তি চূড়ান্তের পর ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বলেছেন, “ভারত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে একটা বড় চুক্তি সই হয়েছে। মানুষজন এটাকে মাদার অফ অল ডিলস বলে উল্লেখ করছে। এই চুক্তি গোটা বিশ্বের জিডিপির ২৫ শতাংশ এবং বিশ্ব বাণিজ্যের এক তৃতীয়াংশের সমান।”
এই চুক্তির আওতায় সামরিকখাতেও সহযোগিতা বাড়বে ভারত ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবর অনুযায়ী সমুদ্র সুরক্ষা, সাইবার অ্যাটাকসহ বিভিন্ন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে দুই পক্ষ একে অন্যকে সহযোগিতা করবে।
প্রতিরক্ষা ও সামরিক ক্ষেত্র নিয়ে ইউরোপীয় কমিশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট কাজা কালাসের সঙ্গে বিস্তারিত আলাপর হয়েছে বলে জানিয়েছেন ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী রাজনাথ সিং।
সংবাদ সংস্থা রয়টার্সর খবর অনুযায়ী আলোচনায় আছে সমুদ্র সুরক্ষা, সাইবার হামলার হুমকি এবং প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
ভারতের মোট রপ্তানি পণ্যের ১৭ শতাংশের গন্তব্য ইউরোপ। আমদানি কমবেশি ৯ শতাংশ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ছিল ১৩৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি।
এর মধ্যে ৭৫ বিলিয়ন ডলারের পণ্য রপ্তানি করেছেন ব্যবসায়ীরা। এতে ছিল পেট্রোলিয়াম পণ্য, ইলেকট্রনিক্স, বস্ত্র ও পোশাক, যন্ত্রপাতি, রাসায়নিক, ওষুধ, রত্ন ও গয়না, গাড়ির যন্ত্রাংশ, জুতা এবং কফি।
আর আমদানি করা ৬০ বিলিয়ন ডলার পণ্যের মধ্যে ছিল বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিক্স, বিমান, চিকিৎসা সরঞ্জাম, রাসায়নিক এবং প্লাস্টিক।
ট্রাম্পের ট্যারিফের কারণে বাণিজ্যে যে ধাক্কা লেগেছে, ইউরোপের সঙ্গে বাণিজ্য করে তা সামাল দিতে চাইছে নয়াদিল্লি।
যা বলছে যুক্তরাষ্ট্র
ভারতীয় পণ্যে এরই মধ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক চাপিয়েছে ওয়াশিংটন। দফায় দফায় আলোচনার পরেও তা কমেনি। আছে ৫০০ শতাংশ শুল্কের হুমকি। এই নিয়ে টানাপোড়েন যখন তুঙ্গে, তখনই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তির খবর এলো।
এই চুক্তি নিয়ে বেজায় চটেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট। ইউরোপের নেতাদের উপর ক্ষোভ উগড়ে বলেছেন, “আপনারা বুঝতে পারছেন না, কীভাবে নিজেরাই নিজেদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অর্থ জোগাচ্ছেন।”
ট্রাম্পের শুল্ক যুদ্ধ ঘোষণার পর ভারতের ওপরও অতিরিক্ত শুল্কের খগড় নেমেছে। অবশ্য দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য চুক্তির আলোচনায় চলছিলো।
কিন্তু কৃষি এবং দুগ্ধজাত পণ্যের বাজার মার্কিন ব্যবসায়ীদের জন্য খুলে দিতে রাজি নয় দিল্লি। সেখানেই আটকে গেছে আলোচনা।
তবে কয়েকজন বিশ্লেষক বলছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের কড়া নিয়মকানুন আর মানের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে সমস্যাও হতে পারে ভারতের।
অর্থনীতিবিদ মিতালি নিকোরের মতে, “পরিবেশের মতো বিষয়ে ইইউ’র নিয়মকানুন কড়া। কার্বন নিঃসরণের ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থাপনার ব্যাপারে ইউরোপীয় ইউনিয়ন সবথেক এগিয়ে আছে। ভারতের উৎপাদানকারীরা হয়তো এর জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত নন। তাই এই দিকটা সামাল দেওয়ার জন্য পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।"
তবে এই চুক্তি যে কিছুটা নিশ্চয়তার পরিবেশ তৈরি করবে তাও মানছেন তারা। বিশেষ করে এমন একটা সময়ে, যখন বিশ্বে একটা টালমাটাল অবস্থা চলছে এবং অর্থনৈতিক জোর খাটানো হচ্ছে।
এই চুক্তিকে ‘উচ্চাকাঙ্খী’ বাণিজ্যচুক্তি বলা হচ্ছিল। তবে সেই পর্যায়ে চুক্তিটি পৌঁছাতে পারেনি বলে মনে করেন ইউরোপীয় কাউন্সিলের এশিয়া বিভাগের পরিচালক অ্যান্ড্রু স্মল।
তবে তিনি মানছেন, ইইউ যে বিস্তৃত এবং ক্রমবর্ধমান বাজার ধরার প্রচেষ্টা শুরু করেছে, তারই একটা ধাপ এই চুক্তি।
এর আগে ওমান এবং নিউজিল্যান্ডের এর সঙ্গেও বাণিজ্য চুক্তি করেছে ভারত। ২০২৪ সালে ইউরোপের চারদেশীয় মুক্ত বাণিজ্য সংগঠনের সঙ্গেও চুক্তি করেছে দিল্লি। আর অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে ভারতের বাণিজ্য চুক্তি হয়েছে ২০২২ সালে।