বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কেন বিক্ষোভ ইরানে?

ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভের পাল্টা জবাব হিসেবে সোমবার রাজপথে নেমে আসে হাজার হাজার সরকার সমর্থক। 

সর্বোচ্চ নেতা খামেনির সমর্থনে দেশটির বিভিন্ন শহরে বিপুল জনসমাগম হয়েছে। এই জনসমাগমের ছবি ভিডিও প্রচার করেছে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমগুলো। এই সমাবেশকে ‘আমেরিকান-জায়নবাদী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে গণজাগরণ’ হিসেবে অভিহিত করেছে তারা।

রাজধানী তেহরানের 'ইসলামিক রেভ্ল্যুশান স্কয়ার'-এ জড়ো হয়ে সরকার সমর্থকরা জাতীয় পতাকা উড়িয়ে বিদেশি হস্তক্ষেপের নিন্দা জানায়। সরকারি স্থাপনাতে হামলার ঘটনাগুলোকে ‘দাঙ্গাকারীদের কাজ’ হিসেবেও অভিহিত করে তারা।  

স্থানীয় সময় সোমবার সকাল থেকে ইরানের বিভিন্ন গণমাধ্যমে সরকারি সংস্থাগুলো সমাবেশের ডাক দেয়। সরকারের সমর্থনে মিছিলে জনতাকে আহ্বান জানিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট, স্পিকার এবং বিচার বিভাগের প্রধানসহ সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির নাতি হাসান খামেনি। আহ্বান জানিয়েছিলেন আরও অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। 

সর্বোচ্চ নেতা খামেনি বলেছেন এই সমাবেশ মার্কিন রাজনীতিবিদদের জন্য একটি "সতর্কবার্তা"।

তেহরান ছাড়াও বিরজান্দ, কেরমান ও জাহেদানসহ বিভিন্ন শহরে সর্বোচ্চ নেতার সমর্থনে জড়ো হয় মানুষ। তাদের হাতে দেখা যায় খামেনির ছবি, কোরআন ও জাতীয় পতাকা। 

কেরমানের রাস্তায় আন্দোলনকারীদের ‘আমেরিকার পতন’ চেয়ে স্লোগান দিতে দেখা যায়। 

“এই জাতি জেগে উঠেছে, আমরা দাঙ্গাবাজদের ঘৃণা করি” ও “আমরা বিপ্লবী সৈনিক, আমরা ফেতনাকারীদের ঘৃণা করি”- এমন স্লোগান শোনা যায় পূর্বাঞ্চলীয় শহর বিরজান্দের রাস্তায় রাস্তায়। 

স্থানীয় বার্তা সংস্থা ফার্স জানিয়েছে, মধ্য ইরানের শহর আরাক-এ জনতাকে উদ্দেশ করে একজন বক্তা বলেন, “সবারই সমস্যা আছে, কিন্তু তারা বিদেশিদের হাতে নিজের ভাগ্যের সিদ্ধান্ত তুলে দেয় না। তারা আমেরিকা ও ইসরায়েলের হাতে দাবার চাল তুলে দেয় না।”’ 

তবে সমানতালে ইরানজুড়ে সরকার বিরোধী বিক্ষোভ চলছে।

অর্থনৈতিক দুরাবস্থা ও রাজনৈতিক দমন পীড়নের বিরুদ্ধে গেল ডিসেম্বরের শেষের দিকে সরকারের রাস্তায় নেমেছে সাধারণ ইরানিরা। 

রিয়ালের পতনে নিত্যপণ্যের দাম আকাশচুম্বী আর সমাজের এক অংশের প্রকাশ্য বিলাসী জীবনে ক্ষুব্ধ জনতা রাস্তায় আগুন জ্বালিয়ে বিক্ষোভ করছে এবং সরাসরি "খামেনির মৃত্যু হোক" স্লোগান দিচ্ছে। 

আওয়াজ উঠেছে প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে বিতাড়িত শাহ রাজতন্ত্রকে ফিরিয়ে আনারও। 

ইরানের ৪৭ বছরের ইতিহাসে একে সবচেয়ে বড় সরকার বিরোধী আন্দোলন হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। 

বিক্ষোভের শুরুটা ব্যবসায়ীদের হাত ধরে, যারা কি না দীর্ঘদিন ধরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের সমর্থক হিসেবে পরিচিত। আর এই কারণে তাদের এই প্রতিবাদী অবস্থানকে একটি চরম পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। 

তবে ইরান সরকার এই বিক্ষোভকে বিদেশি উস্কানি হিসেবে দাবি করছে।  নিরাপত্তা বাহিনীকে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে বারণ করেছেন প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান। 

তবে ‘দাঙ্গাকারীদের’ কোন ছাড় না দেওয়ার ব্যাপারে একমত পেজেশকিয়ান ও ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ খামেনি। 

এদিকে বৃহস্পতিবার দেশজুড়ে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেয় ইরান সরকার। এমনকি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমেও বিক্ষোভের খবর প্রচার করা হচ্ছে না । 

তবে বিক্ষোভে সমর্থন জানিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প হুমকি দিয়েছেন যে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের ‘হত্যা’ করা হলে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করবে। 

ইরানের ওপর সামরিক হামলার মতো ‘শক্ত পদক্ষেপ’-এর কথা ভাবছে যুক্তরাষ্ট্র এই খবর আসার পর তেহরান আলোচনার প্রস্তাব দিয়েছে বলে ট্রাম্পের। 

রবিবার রাতে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প জানান, ইরানের সাথে একটি বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে আলোচনা চলছে। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, “বিক্ষোভকারীদের ওপর যে দমন-পীড়ন চলছে, তাতে বৈঠকের আগেই আমাদের হয়তো সামরিক পদক্ষেপ নিতে হতে পারে।” 

ফের হুমকির জবাবে ইরানের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ তেহরানের এক সমাবেশে ট্রাম্পকে উচিত শিক্ষা দেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, “এ অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সকল স্থাপনা ধ্বংস করে দেওয়া হবে।”  

ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেছেন, “আমরা যুদ্ধ চাই না, তবে আমরা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত আছি। সশস্ত্র বাহিনী প্রস্তুত।” 

বিদেশি কূটনীতিকদের ব্রিফ করতে তিনি বলেছেন, “আমরা আলোচনার জন্য প্রস্তুত, কিন্তু সেটি হতে হবে সমানাধিকার ও পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের ভিত্তিতে ন্যায্য আলোচনা।”  

এর মধ্যেই সোমবার ট্রাম্প ঘোষণা দিয়েছেন যে, যেসব দেশ ইরানের সাথে বাণিজ্য করবে তাদের ওপর ২৫% বাড়তি শুল্ক আরোপ করা হবে।

ইরানে চলমান বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা ৬০০ ছাড়িয়ে গেছে এবং আটক করা হয়েছে দশ হাজারেরও বেশি মানুষকে, মানবাধিকার সংস্থাগুলোর বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এপি জানিয়েছে। 

চিকিৎসকদের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থাটি জানিয়েছে, ইরানের হাসপাতালগুলোতে লাশের স্তুপ দেখা যাচ্ছে।