ম্যান্ডেলা ইফেক্ট: অলৌকিক এক সম্মিলিত স্মৃতিভ্রম

আপনি কি কখনো দৃঢ়ভাবে এমন কিছু বিশ্বাস করেছেন, পরে দেখা গেছে সেটা আসলে কখনও ঘটেইনি? 

অথবা স্মৃতির ওপর আপনার শতভাগ আস্থা থাকা সত্ত্বেও দেখা গেছে সেই ঘটনা ছিল পুরোপুরি ভুল? 

ঠিক এমনই এক অবিশ্বাস্য ঘটনার নামই হলো 'ম্যান্ডেলা ইফেক্ট'।

নেলসন ম্যান্ডেলা—দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্যবিরোধী সংগ্রামের প্রতীক, অত্যাচারী 'অ্যাপার্টাইড' বা বিচ্ছিন্নতা নীতির বিরুদ্ধে সুদীর্ঘ তিন দশক লড়াই করা এক কিংবদন্তি।

জোহানেসবার্গের নিজ বাসায় ২০১৩ সালের পাঁচই ডিসেম্বর শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। কিন্তু পৃথিবীর নানা প্রান্তের হাজার হাজার মানুষ বহু বছর ধরে বিশ্বাস করত, ম্যান্ডেলা ১৯৮০’র দশকেই কারাগারে মারা গিয়েছিলেন!

অবাক করা বিষয় হলো, এরা শুধু গুজব শোনেনি; অনেকেই মনে করতেন, তারা সেই ‘মৃত্যুর খবর’ গণমাধ্যমে থেকে পেয়েছেন, এমনকি ‘শেষকৃত্যের দৃশ্য’ পর্যন্ত দেখেছেন। কিন্তু সবই ছিল ভুল স্মৃতি, তবে এ ঘটনা বিশ্বাস করা মানুষগুলোর কাছে তা ভীষণ বাস্তব—প্রায় স্পর্শযোগ্য।

এই অদ্ভুত ঘটনা প্রথম নজরে আনেন অলৌকিক ও অস্বাভাবিক বিষয় নিয়ে গবেষণা করা ফিওনা ব্রুম। তিনি দেখতে পান, একসাথে এত মানুষের একই ভুল স্মৃতিতে বসবাস করাটা শুধু ব্যক্তিগত নয়, বরং যেন এক সম্মিলিত স্মৃতিভ্রম।

পরে তিনি এই ঘটনার নাম দেন ‘ম্যান্ডেলা ইফেক্ট’।

কিন্তু কেন এমন হলো? ইতিহাস গড়া একজন নেতাকে নিয়ে এমন বিভ্রান্তি ছড়াল কীভাবে? আর মানুষই বা কেন ভুল স্মৃতিকে সত্যের মতো ধরে রাখে?

গবেষকরা বলছেন, ম্যান্ডেলা ইফেক্ট আসলে কেবল ভুল ইতিহাস নয় এটি মানব মস্তিষ্কের গঠন, স্মৃতির সীমাবদ্ধতা, বিশ্বাসের ভঙ্গুরতা এবং তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রক্রিয়া সবকিছু মিলিয়ে এক গভীর মনস্তাত্ত্বিক রহস্য। 

এই ঘটনাকে বোঝার জন্য সবার আগে জানতে হবে নেলসন ম্যান্ডেলা কে ছিলেন? কীভাবে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্যের ভয়াবহ অ্যাপার্টাইডের অবসান ঘটিয়েছিলেন এবং কেন তাকে বিশ্বজুড়ে স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের এক অনন্য প্রতীক মনে করা হতো।

ম্যান্ডেলার জীবনসংগ্রামই সেই পটভূমি, যা বুঝলে ম্যান্ডেলা ইফেক্ট টার্মটির গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

অ্যাপার্টাইড কী?

দক্ষিণ আফ্রিকায় ১৯৪৮ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত অ্যাপার্টাইড নামে একটি সরকারি নীতি চালু ছিল, যার মাধ্যমে বর্ণবিদ্বেষ সৃষ্টি করে মানুষকে শোষণ করা হতো। 

অ্যাপার্টাইড শব্দটি এসেছে আফ্রিকান ভাষা থেকে; ইংরেজিতে  অ্যাপার্টনেস, বাংলায় যা বিচ্ছিন্নতা।

কিন্তু এখানে বিচ্ছিন্নতা মানে আলাদা থাকা নয়। বরং শ্বেতাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর মধ্যে জোরপূর্বক বিভাজন। 

অ্যাপার্টাইড শাসনব্যবস্থায় দক্ষিণ আফ্রিকার মানুষকে কয়েকটি বর্ণ গোষ্ঠীতে ভাগ করা হয়েছিল; শ্বেতাঙ্গ, কৃষ্ণাঙ্গ, রঙিন বা মিশ্রজাত এবং ভারতীয় বা এশীয়। 

প্রতিটি গোষ্ঠীর অধিকার, সুযোগ-সুবিধা এবং সামাজিক মর্যাদা ছিল ভিন্ন। এই বিভাজনের মূল উদ্দেশ্য ছিল বৈষম্য প্রকট করে তোলা, তখনকার ন্যাশনাল পার্টিকে ক্ষমতায় রাখা—শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘুদের ক্ষমতা ও আধিপত্য জারি রাখা এবং কৃষ্ণাঙ্গ ও অশ্বেতাঙ্গদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে কোণঠাসা করে ফেলা।

অ্যাপার্টাইড নীতি দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর আলাদা উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক স্বাধীনতার কথা বলে। কিন্তু এটা শুধু কাগজেই সীমাবদ্ধ ছিল, বাস্তবে কার্যকর ছিল না কখনও। 

ইচ্ছাকৃতভাবেই অশ্বেতাঙ্গদের দারিদ্র্যের মধ্যে রাখা হতো। তাদের ভোটাধিকার ছিল সীমিত, পরিচয়পত্র বহন বাধ্যতামূলক করে চলাফেরা নিয়ন্ত্রণ করা হতো। সব জায়গায় তাদের প্রবেশাধিকারও ছিল না।

এমনকি এই নীতি শ্বেতাঙ্গ ও কৃষ্ণাঙ্গদের মধ্যে বিয়ে, বন্ধুত্ব বা একসাথে একই সামাজিক পরিধিতে মেলামেশা-চলাফেরাকেও সমর্থন করত না।

সেগ্রিগেশন বা বিভাজন হলো বর্ণের উপর ভিত্তি করে মানুষকে আলাদা করার অনুশীলন, যা আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক হতে পারে। কিন্তু অ্যাপার্টাইড হলো সেই সেগ্রিগেশনকে রাষ্ট্রের নীতি বানানো, যার মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গরা নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার ওপর।

দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্য নতুন কিছু নয়, কিন্তু অ্যাপার্টাইড সেটিকে সরকারি শক্তি ও আইনের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করেছিল। তাই এটি শুধু একটি নীতি নয়, এটি ছিল সংখ্যালঘুদের ক্ষমতা হরণের হাতিয়ার যা মানুষের মৌলিক স্বাধীনতা ও মর্যাদাকে বাধাগ্রস্ত করেছিল।

অ্যাপার্টাইডের বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ থেকে শুরু করে কখনো কখনো সহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে এই নীতির বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামেন তিনি। যে জন্য তাকে ২৭ বছর তাকে কারাগারে কাটাতে হয়।

অ্যাপার্টাইড অবসানে নেলসন ম্যান্ডেলা

সমগ্র জীবন সংগ্রামের সফলতা নেলসন ম্যান্ডেলা পেয়েছিলেন কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর। অথচ অনেক মানুষই তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর কোনো স্মৃতিই রাখেনি।

নেলসন ম্যান্ডেলা সক্রিয় রাজনীতিতে যোগ দেন ১৯৪০-এর দশকের শুরুর দিকে আফ্রিকান ন্যাশনাল কংগ্রেসে (এএনসি) যোগদানের মাধ্যমে। এরপর এএনসি ইয়ুথ লীগ প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন। ১৯৪৮ সালে ‘প্রোগ্রাম অফ অ্যাকশনস’ নামে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচি চালু করেন ম্যান্ডেলা, যা দেশব্যাপী গণপ্রতিবাদ, ধর্মঘট ও অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেয়। এর চার বছর পর ১৯৫২ আলে ‘ডিফায়্যান্স ক্যাম্পেইন’ এর মাধ্যমে শুরু হয় অ্যাপার্টাইডের বিরুদ্ধে অহিংস আন্দোলন।

কিন্তু দশক পার হওয়ার আগেই ১৯৬২ সালে এই কর্মসূচি সহিংস রূপ ধারণ করে। গঠিত হয় এএনসির সশস্ত্র শাখা 'উমখান্ত উই সিজওয়ে'। ওই বছরই গ্রেফতার করা হয় ম্যান্ডেলাকে। সংগঠনে ভূমিকার জন্য তাকে দোষী সাব্যস্ত করে ১৯৬৪ সালে ‘বিতর্কিত’ রিভোনিয়া ট্রায়ালের পর তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আর এই ঘটনাই ছিল অ্যাপার্টাইডবিরোধী সংগ্রামের অন্যতম ঐতিহাসিক মুহূর্ত।

ম্যান্ডেলাকে কারাবন্দী করা হয়। কিন্তু তাতে আন্দোলন না থেমে আরো গতি পায়। আশির দশকে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে প্রতিবাদী এই আন্দোলন, যেখানে ম্যান্ডেলার মুক্তি ও অ্যাপার্টাইড আইনের অবসান দাবি করা হয়। 

১৯৮৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ওপর অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে জাতিসংঘ। একইসঙ্গে সরকারের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপের আহ্বান জানায় বৈশ্বিক সংস্থাটি।

যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের আন্দোলনকারীরা দক্ষিণ আফ্রিকার পণ্য বয়কট শুরু করেন। যেসব কোম্পানি সরকারঘনিষ্ঠ ছিল, সেখান থেকে বিনিয়োগ প্রত্যাহার করেন ওই দুই দেশের বিনিয়োগকারীরা। দেশের ভেতরে আন্দোলন ও আন্তর্জাতিক অবস্থান, সবকিছু মিলিয়ে তখন চাপে পড়ে ম্যান্ডেলাকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার।

১৯৯০ সালে কারাগার থেকে মুক্তি পেয়ে নেলসন ম্যান্ডেলা দেখা করেন দক্ষিণ আফ্রিকার তখনকার প্রেসিডেন্ট এফডব্লিউডি ক্লার্কের সঙ্গে। উদ্দেশ্য ছিল একটাই অ্যাপার্টাইডের অবসান। তাদের বৈঠকের পর থেকেই দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবৈষম্য নীতি ধীরে ধীরে ভেঙে ফেলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। যা পরবর্তীতে নতুন সংবিধান প্রণয়নের পথ প্রশস্ত করে।

শেষ পর্যন্ত ১৯৯৪ সালের এপ্রিলে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বহুজাতিগত নির্বাচন। যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন নেলসন ম্যান্ডেলা। এটি ছিল অ্যাপার্টাইডের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি এবং দক্ষিণ আফ্রিকার ইতিহাসে এক নতুন যুগের সূচনা।

তবে রাষ্ট্রপতি হয়ে থেমে যাননি ম্যান্ডেলা। বর্ণবৈষম্য নিয়ে কাজ অব্যাহত রাখেন। অ্যাপার্টাইডের অবসানের পর ম্যান্ডেলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ ছিল 'ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশান কমিশন'।

বর্ণবৈষম্য নিরসনে ম্যান্ডেলার অবদান কতটা, এটা বোঝা যায় তার রাজনৈতিক কার্যক্রমগুলোর দিকে তাকালে। কারাগারে যাওয়ার আগে তিনি রাজনীতিতে যেমন সক্রিয় ছিলেন, কারাগার থেকে বের হওয়ার পরও একইভাবে অবদান রেখেছেন। তার চিন্তাভাবনা দ্বারা শুধু দেশের মানুষই না, বিশ্বের বহু মানুষের চিন্তাধারায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছিলেন।

সমগ্র জীবন সংগ্রামের সফলতা নেলসন ম্যান্ডেলা পেয়েছিলেন কারাগার থেকে মুক্ত হওয়ার পর। অথচ অনেক মানুষই তার জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তগুলোর কোনো স্মৃতিই রাখেনি। তাদের স্মৃতিতে ম্যান্ডেলা কখনোই কারামুক্ত হননি, সেখানেই মারা গেছেন।

কে এই ফিওনা ব্রুম?

লেখক ফিওনা ব্রুম।

ফিওনা ব্রুম তিন দশকের বেশি সময় ধরে অতিপ্রাকৃত ঘটনা অলৌকিক ও অস্বাভাবিক ঘটনা নিয়ে কাজ করছেন। ১৯৯৮ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন 'হলোহিল'—ভূত, প্রেত, আত্মা ও রহস্যময় ঘটনার অনুসন্ধান নিয়ে তৈরি বিশ্বের অন্যতম পুরোনো ও জনপ্রিয় ওয়েবসাইট।

অতিপ্রাকৃত বিষয়ে ব্রুমের রয়েছে বিস্তর লেখালেখি। ভূতপ্রেমীদের জন্য ভ্রমণ নির্দেশিকা থেকে শুরু করে গবেষকদের জন্য ব্যবহারিক পরামর্শ, সবই লিখেছেন তিনি। নিজে এককভাবে লেখার পাশাপাশি বেশ কিছু বইয়ের সহলেখিকা হিসেবেও কাজ করেছেন।

তার লেখা কয়েকটি বই হলো, 'ইস ইওর হাউজ হন্টেড', 'ঘোস্ট হান্টিং ইন হন্টেড সেমেটারিস', 'ঘোস্টস হোয়াট দে আর অ্যান্ড হোয়াট দে আরেন্ট'। এছাড়াও ম্যান্ডেলা ইফেক্ট নিয়ে রয়েছে কয়েকটি বই।

ফিওনা ব্রুম নিজেও বিশ্বাস করতেন যে নেলসন ম্যান্ডেলা কারাগারেই মারা গিয়েছিলেন। প্রতিবছর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জিয়ার আটলান্টায় 'ড্রাগনকন' নামে বিশাল এক পপ কালচার, সায়েন্স ফিকশন ও গেমিং কনভেনশন হয়। ২০০৯ সালে কনভেনশনের এক আলোচনায় ফিওনা প্রথম উপলব্ধি করেন, তিনি একা নন, আরও অনেকেই একইভাবে মনে করেন যে ম্যান্ডেলা কারাগারেই মৃত্যুবরণ করেছেন।

অদ্ভুত ব্যাপার হলো যারা এভাবে বিশ্বাস করতেন, তাদের কেউ কেউ ম্যান্ডেলার ‘মৃত্যু’ নিয়ে সংবাদ প্রতিবেদন, মানুষের প্রতিক্রিয়া, এমনকি শেষকৃত্যের ছবিও মনে করতে পারতেন। অথচ এসবের কোনো কিছুই বাস্তবে কখনও ঘটেনি।

সেই কনভেনশনের ঘটনাই ফিওনাকে প্রথমবারের মতো ‘ম্যান্ডেলা ইফেক্ট’ নিয়ে কথা বলতে অনুপ্রাণিত করে। পরে তিনি ম্যান্ডেলা ইফেক্ট ডটকম (MandelaEffect.com) নামের একটি ওয়েবসাইট চালু করেন, যেখানে মানুষ শুধু ম্যান্ডেলার মৃত্যু নয়, যেকোনো ঐতিহাসিক ঘটনা নিয়ে নিজেদের ভুল বা ভিন্ন স্মৃতি ভাগাভাগি করতে পারত।

আর ইন্টারনেটের প্রসারের সাথে সাথে এই শব্দ দুটি দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এবং বিশ্বজুড়ে পরিচিতি লাভ করে।

Image_3

ম্যান্ডেলা ইফেক্ট কী?

কোনো বিষয়ে আমাদের ভুল ধারণা তৈরি হলে সাধারণত তা একেকজনের ক্ষেত্রে একেক রকম হয়। একজনের ভুল আরেকজনের ভুলের সাথে হুবহু মিলবে এমনটা খুব কম ক্ষেত্রেই হয়। আর শত শত মানুষের ভুল ধারণা একই রকম হয় এটা অসম্ভবের মতো ঘটনা।

তাই যখন মানুষ ম্যান্ডেলা ইফেক্টের ওয়েবসাইটে গিয়ে নিজেদের ভিন্ন বা ভুল স্মৃতি শেয়ার করতে শুরু করল, তখন সবাই আরও বেশি অবাক হতে লাগল। কারণ একই ধরনের ভুল স্মৃতি বহু মানুষের মধ্যে মিল পাচ্ছিল। এই বিস্ময়ই ‘ম্যান্ডেলা ইফেক্ট’ টার্মকে দ্রুত জনপ্রিয় করে তোলে।

একসাথে এত মানুষের একই ধরনের ভুল ধারণা দেখা গেলে ধরে নিতে হবে এটা শুধু ব্যক্তিগত ভুল বোঝাবুঝি নয়, বরং এর পেছনে আরও কিছু কারণ কাজ করতে পারে। যেমন:

  • কোনো ভুল তথ্য যদি ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃতভাবে ছড়িয়ে পড়ে;
  • কোনো ঘটনা নিয়ে যদি ষড়যন্ত্র তত্ত্ব তৈরি হয়;
  • কোনো লেখক তার বইয়ে ভুল তথ্য লিখে ফেললে;
  • কোনো ওয়েবসাইট বা সংবাদমাধ্যমে ভুল তথ্য প্রকাশিত হয়ে তা অনেক মানুষের কাছে পৌঁছে গেলে;

উপরে ঘটনাগুলোর সবই অনেক মানুষের মনে একই ধরনের ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করতে পারে বলে গবেষকরা মনে করেন।

ম্যান্ডেলা ইফেক্ট নিয়ে ফিওনা ব্রুমের প্রথম বই ‘দ্যা ম্যান্ডেলা ইফেক্ট, আ হিস্ট্রি: দ্য ফার্স্ট ডিস্কভারিস অ্যান্ড হোয়াট পিপল সেইড’। ২০২০ সালে প্রকাশিত এই বইয়ে ম্যান্ডেলা ইফেক্টের ইতিহাস এবং এটি কীভাবে আমাদের বাস্তব উপলব্ধিতে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে, তা নিয়ে ব্যাপক অনুসন্ধান করা হয়েছে।

এটা ছাড়াও ম্যান্ডেলা ইফেক্ট নিয়ে ফিওনা ব্রুমের লেখা আরও অন্তত ১৬টি বইয়ের কথা জানা যায়।

ম্যান্ডেলা ইফেক্টের বিখ্যাত কিছু উদাহরণ

নিউজিল্যান্ডের অবস্থান অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে। কিন্তু, একটা কমিউনিটি দাবি করে যে, তারা নিশ্চিতভাবে মনে করতে পারে যে, নিউজিল্যান্ড ছিল অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব দিকে।

ম্যান্ডেলা ইফেক্টের বড় উদাহরণ হচ্ছে একটি চিত্রকর্ম। ইংল্যান্ডের রাজা অষ্টম হেনরির ছবি এটি। এটা নিয়ে মানুষের মধ্যে রয়েছে অনেক ভ্রান্ত ধারণা। অনেক মানুষ এই চিত্রকর্মটি মনে রেখেছিলেন এমনভাবে যে, এখানে রাজা হেনরি একটি টার্কির পা ধরে আছেন বা খাচ্ছেন। কিন্তু ছবিতে এমনটা নেই, কখনও ছিলো না।

তাহলে এ ধারণা কোথা থেকে এলো? এর পেছনের অন্যতম কারণ হলো কিছু কার্টুনচিত্র। এছাড়া রাজা অষ্টম হেনরি ছিলেন একজন স্থুলাকায় ব্যক্তি। এই দুই ঘটনা থেকে মানুষের মনে এমন ধারণা সৃষ্টি হতে পারে বলে মনে করা হয়।

আরও কিছু উদাহরণ আছে। আপনি হয়ত 'স্টার ওয়ার্স' এর নাম শুনেছেন। বিনোদন জগতের ইতিহাসে সবচেয়ে জনপ্রিয় মুভি ফ্র্যাঞ্চাইজগুলোর মধ্যে একটি। সাইন্স ফিকশন এই মুভি ফ্র্যাঞ্চাইজের একটি ১৯৮০ সালে মুক্তি পাওয়া ‘দ্য এম্পায়ার স্ট্রাইকস ব্যাক’। এই সিনেমার শেষের দিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যে ভিলেন ডার্থ ভেইডারের একটি বিখ্যাত সংলাপ আছে। অনেকেই বলতে শুনেছেন "ল্যুক, আই অ্যাম ইওর ফাদার", তবে ডায়ালগটি আসলে ছিল "নো, আই অ্যাম ইওর ফাদার।" 

পার্থক্য খুব কম মনে হলেও, এমন বিখ্যাত সিনেমা, বিশ্বজুড়ে যার অসংখ্য ভক্ত, সেখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃশ্যের ডায়ালগ এত মানুষের ভুলভাবে মনে রাখার ব্যাপারটা সত্যিকার অর্থেই আশ্চর্যজনক।

'স্নো হোয়াইট' সিনেমার একটি বিখ্যাত ডায়ালগ, "মিরর মিরর অন দ্যা ওয়াল, হু ইজ দ্য ফেয়ারেস্ট অফ দেম অল?" কম বেশি সবাই শুনেছি এই ডায়ালগ আমরা। কিন্তু আসলে তা ছিলো, "ম্যাজিক মিরর অন দ্য ওয়াল, হু ইজ দ্য ফেয়ারেস্ট ওয়ান অফ অল?"

এমনকি বিভিন্ন দেশের ভৌগোলিক অবস্থান নিয়েও এমন ভ্রান্ত ধারণা অনেকের মধ্যে দেখা যায়। যেমন আমরা যদি মানচিত্রের দিকে তাকাই তাহলে দেখবো নিউজিল্যান্ডের অবস্থান অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণ-পূর্ব দিকে। কিন্তু একটা কমিউনিটি দাবি করে যে তারা নিশ্চিতভাবে মনে করতে পারে যে, নিউজিল্যান্ড ছিল অস্ট্রেলিয়ার উত্তর-পূর্ব দিকে।

ম্যান্ডেলা ইফেক্টের আরেকটি ঘটনা। যেটাকে আশ্চর্যজনক উদাহরণগুলোর একটি বলে বিবেচনা করা হয়। অনেকেই মনে করেন যে, নব্বইয়ের দশকে 'শ্যাজাম' নামে একটি সিনেমা ছিল যেখানে অভিনয় করেছিলেন কমেডিয়ান সিনবাদ। কিন্তু বাস্তবে সেই সময় এমন কোনো চলচ্চিত্র মুক্তি পায়নি।

আসল ঘটনা হলো, একটা সিনেমা হয়েছিল যার নাম 'ক্যাজাম', যাতে অভিনয় করেছিলেন শাকিল ও’নিল। হয়ত এ কারণেই বা ভিন্ন কোনো কারণে মানুষ 'শ্যাজাম' নামে কল্পিত সিনেমার ধারণা নির্মাণ করেছিলেন। যদিও ডিসি কমিকস-এর একটি জনপ্রিয় চরিত্রের নাম শ্যাজাম, যার ওপর সিনেমা হয়েছে আর তার প্রথমটি মুক্তি পেয়েছে ২০১৯ সালে । সিনবাদ সেখানে অভিনয় করেননি, তবুও কিছু মানুষের স্মৃতিতে রয়েছে যে, 'শ্যাজাম'-এ ছিলেন তিনি।

আরও কয়েকটা উদাহরণ দেই। ডিজনি'র জনপ্রিয় চরিত্র মিকি মাউস! আমরা প্রায় সবাই চিনি। অনেকেই মনে করে যে মিকি মাউসের পরনে সাস্পেন্ডার কিন্তু আসলে নেই!

অথবা 'পিকাচু'? অনেকের মনেই করেন পিকাচুর লেজের শেষ অংশ কালো। কিন্তু আসলে তার লেজের সবটাই হলুদ। 

উইলমা বেইনব্রিজ: দেখা না, আশা করাটাই বেশি মনে রাখে মানুষ 

বেইনব্রিজ উল্লেখ করেন যে, মানুষ প্রায়শই যা আসলে দেখেছে তা মনে রাখে না, বরং যা তারা আশা করেছিল তা মনে রাখে।

মানুষ অনেক সময় আসল ঘটনা বা আসল ছবি মনে রাখে না। বরং তারা যা দেখার আশা করেছিল, সেটাই মনে থেকে যায়।

ম্যান্ডেলা ইফেক্ট নিয়ে বিশেষভাবে গবেষণা করেছেন উইলমা বেইনব্রিজ। শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের এই সহকারী অধ্যাপক কাজ করেন স্নায়ুবিজ্ঞান, ধারণা ও স্মৃতি নিয়ে।

বেইনব্রিজ দেখিয়েছেন, কেন কিছু জিনিস সবাই সহজে মনে রাখে, আবার কিছু জিনিস সারা বিশ্বের মানুষ প্রায় ভুলেই যায়। ছবির ক্ষেত্রেও একই, কিছু মুখ বা ফটোগ্রাফ সবাই মনে রাখে আর কিছু কিছু পুরোপুরি গুলিয়ে ফেলে।

ম্যান্ডেলা ইফেক্ট কেন এত জনপ্রিয় তা ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বেইনব্রিজ বলেন, “আমরা ভাবি যে আমাদের স্মৃতিকে আমরা খুব ভালোভাবে নিয়ন্ত্রণ করি। কিন্তু ম্যান্ডেলা ইফেক্ট দেখায় স্মৃতি কখনও কখনও অদ্ভুত এক ভৌতিক অনুভূতি তৈরি করে যা আমাদের প্রতারিত করতে পারে।”

বেইনব্রিজের মতে, ম্যান্ডেলা ইফেক্টের একটি বড় কারণ হলো মানুষ অনেক সময় আসল ঘটনা মনে রাখে না, বরং যা তারা আশা করেছিল, সেটাই মনে থাকে। যেমন, অনেকেই মনে করেন জনপ্রিয় বোর্ড গেইমের 'মনোপলি ম্যান'-এর চোখে একটি মনোকল (এক চোখে পরে যে চশমা) আছে। কিন্তু আসলে কখনই তা ছিল না।

বেইনব্রিজ ব্যাখ্যা করেছেন, মানুষের মনে ‘ধনী বয়স্ক লোক’ বলতে একটি নির্দিষ্ট চেহারার ধারণা থাকে। যেমন, টুপি, ছড়ি, চশমা। এই পূর্ব ধারণা থেকেই অনেকে ভুলভাবে মনোকলের স্মৃতি তৈরি করে।

আরেকটি কারণ হলো পরামর্শ বা প্রভাব। সোশ্যাল মিডিয়ায় মানুষ যখন ম্যান্ডেলা ইফেক্ট নিয়ে আলোচনা করে, তখন অনেকের মস্তিষ্কে নতুন করে ভুল স্মৃতি তৈরি হতে পারে। অন্যের কথা শুনেই তারা বিশ্বাস করতে শুরু করে যে, তারাও এমনটা মনে করেছে।

বেইনব্রিজ একটি পরীক্ষা করেন যেখানে অংশগ্রহণকারীদের প্রথমে কিছু ছবি দেখানো হয়। তারপর স্মৃতি থেকে সেই ছবিগুলো আঁকতে বলা হয়। ফলাফলে দেখা যায়,

  • কিছু ছবি সবাই সহজে মনে রাখতে পেরেছে;
  • কিছু ছবি অনেকে ভুলে গেছে;
  • কিছু ভুলভাবে মনে রেখে ভুল আঁকছে;

এভাবেই প্রমাণ পাওয়া যায়, একই ছবি দেখার পরও মানুষ ভিন্ন ভিন্ন ভুল স্মৃতি তৈরি করতে পারে।

ম্যান্ডেলা ইফেক্ট নিয়ে বহু গবেষক ও লেখক কাজ করেছেন। তাদের বেশিরভাগই একটা বিষয়ে একমত— একসঙ্গে অনেক মানুষের মনে একই ভুল স্মৃতি তৈরি হয় তখনই, যখন কোনো ভুল তথ্য বিশ্বাসযোগ্য সূত্রের মাধ্যমে অনেকের কাছে ছড়িয়ে পড়ে।

ইন্টারনেট আসার আগে মানুষ তথ্য পেত বই, সংবাদমাধ্যম এবং অন্যের কথার মাধ্যমে। যাচাই করার সুযোগ ছিল সীমিত। তাই স্বাভাবিকভাবেই তখন এমন যৌথ স্মৃতিভ্রম হওয়ার সম্ভাবনা ছিল বেশি।

তবে ইন্টারনেট আসার পর তা যে নেই হয়ে গেছে, এমনটা বলা যাবে না। নতুন ম্যান্ডেলা ইফেক্টের উদাহরণ কিছুটা কমেছে, তবে পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। বরং মানুষ এখন যখন অনলাইনে নিজেদের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে, সেখান থেকেও নতুন ভুল স্মৃতি জন্ম নিতে পারে।

বেইনব্রিজ যেমন বলেছেন, “আমরা প্রায়ই সেসব বিষয় মনে রাখি, যা আমরা আশা করি।” তবে সবাই এমন বাস্তব ব্যাখ্যা দেন না। ম্যান্ডেলা ইফেক্ট নিয়ে আরও অদ্ভুত তত্ত্ব আছে।

লেখক জেপি মস দাবি করেছেন, পৃথিবী ও সময়ের বাইরে আরও অনেক ডাইমেনশন বা মাত্রা আছে, যেখানে অন্য ধরনের মানবজাতির বসবাস। তার মতে, ম্যান্ডেলা ইফেক্ট সেই ভিন্ন মাত্রার পৃথিবী বা সময়ের এক ধরনের প্রমাণ, যেন আমরা ভুল করে অন্য বাস্তবতার স্মৃতি টেনে এনেছি।

যদিও এই ধারণা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত নয়, তবুও ম্যান্ডেলা ইফেক্ট ঘিরে রহস্য ও  মানুষের কৌতূহল আরও বাড়িয়ে তোলে।