ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের পর গ্রিনল্যান্ড ঘিরে ভূরাজনৈতিক আলোচনা নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
সামরিক অভিযান চালিয়ে ভেনেজুয়েলা থেকে প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটক করে আমেরিকায় নিয়ে যাওয়ার পর বিশ্লেষকরা প্রশ্ন তুলছেন, গ্রিনল্যান্ড কি যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী লক্ষ্য হতে যাচ্ছে?
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প সরাসরি বলেছেন, ‘গ্রিনল্যান্ড আমাদের প্রয়োজন। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে, এটি এখন অত্যন্ত কৌশলগত একটি বিষয়।’
ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সামরিক অভিযানে ক্ষমতাচ্যুত ও বন্দী করার দুইদিন পর গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে এই মন্তব্য করেন তিনি।
ট্রাম্প আরো বলেছেন, “গ্রিনল্যান্ডের আশেপাশে রুশ এবং চীনা জাহাজে ছেয়ে গেছে। জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে আমাদের গ্রিনল্যান্ড প্রয়োজন, আর ডেনমার্ক এটি (নিরাপত্তা নিশ্চিত) করতে সক্ষম হবে না।”
বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ গ্রিনল্যান্ড। আয়তনে বাংলাদেশের ১৫ গুণ বড়। ২১ লাখ ৬৬ হাজার বর্গকিলোমিটারের এই দ্বীপে বাস করেন মাত্র ৫৭ হাজার মানুষ।
ভৌগোলিকভাবে অবস্থান উত্তর আমেরিকায় হলেও রাজনৈতিকভাবে ইউরোপের দেশ ডেনমার্কের অধীনে একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল গ্রিনল্যান্ড। প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে খনিজ সম্পদে ভরপুর এই দ্বীপটির রাজনৈতিক পরিচিত নিয়ে ঝামেলা চলছে বেশ তিনশ বছর আগে থেকেই।
আর্কটিক অঞ্চলে কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ নৌবাণিজ্য পথগুলোর পাশেই গ্রিনল্যান্ডের অবস্থান। বর্তমানে দ্বীপটি ডেনমার্ক থেকে পূর্ণ স্বাধীনতা লাভের লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছে।
এর আগে ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন গ্রিনল্যান্ড নিয়ে ট্রাম্পের “হুমকি” দেওয়া বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
তবে চৌঠা জানুয়ারি সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যে নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছেন ট্রাম্প। আর এটা নিয়ে বিশ্বজুড়ে দেখা দিয়েছে নতুন উদ্বেগ।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে দ্বিতীয় মেয়াদে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন। ক্ষমতায় এসে গ্রিনল্যান্ডের ওপর নিয়ন্ত্রণ নেবার কথা বেশ কয়েক দফায় বলেছেন। গ্রিনল্যান্ড কিনে নিতে চান তিনি। প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার আগ্রহও রয়েছে তার।।
গ্রিনল্যান্ড নিয়ে নেবার দাবি এবারই প্রথম নয়। ২০১৭ সালে ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়ে ক্ষমতায় আসেন। প্রথম মেয়াদেই তিনি ডেনমার্কের কাছ থেকে গ্রিনল্যান্ড কিনে নেওয়ার বিষয়ে তার আগ্রহ প্রকাশ করেন।
দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতা নেওয়ার পর গ্রিনল্যান্ডের বিষয় আরও জোরালোভাবে সামনে আনেন ট্রাম্প। ২০২৫সালের ২২এ ডিসেম্বরে ট্রুথ সোশ্যালে একটি পোস্টে তিনি জানান, লুইজিয়ানা অঙ্গরাজ্যের গভর্নর জেফ ল্যান্ড্রিকে তিনি গ্রিনল্যান্ডের বিশেষ দূত হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন।
এমন নিয়োগ পেয়ে ল্যান্ড্রি এক্স-এ লিখেন, 'এটা অনেক সম্মানের।' গভর্নরের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে গ্রিনল্যান্ডকে যুক্তরাষ্ট্রের অংশ করার কাজ তিনি করে যাবেন। এ নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় ভিডিও বার্তায় নিজের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন জেফ।
ভেনেজুয়েলায় মার্কিন অভিযানের কয়েকঘন্টা পর সোশ্যাল মিডিয়ার একটি পোস্ট ঘিরেও বিতর্ক চলছে। এক্স হ্যান্ডেলে এই পোস্ট দিয়েছেন ডানপন্থী পডকাস্টার কেটি মিলার। তিনি ডনাল্ড ট্রাম্পের ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ স্টিফেন মিলারের স্ত্রী। মিলারের এই পোস্ট নিয়ে শুরু হয়েছে তুমুল বিতর্ক। তিনি এক্সে শেয়ার করেছেন, মার্কিন পতাকায় মোড়ানো গ্রিনল্যান্ডের একটি মানচিত্র, সাথে ক্যাপশনে লেখা SOON।
মিলারের এই হুমকির ফলে ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। ডেনমার্কের প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেন এক বিবৃতিতে বলেন যে, গ্রিনল্যান্ড দখল করার কোনো অধিকার নেই ট্রাম্পের।
গ্রিনল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেনস-ফ্রেডেরিক নিলসেন এই পোস্টটিকে “অসম্মানজনক” বলে অভিহিত করেছেন। তিনি এক্স-এ লিখেছেন, “জাতি ও জনগণের মধ্যে সম্পর্ক পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং আন্তর্জাতিক আইনের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। এমন কোনো প্রতীকী অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে গড়ে ওঠে না, যা আমাদের মর্যাদা ও অধিকারকে উপেক্ষা করে।”
তিনি আরও বলেছেন, “আমাদের দেশ বিক্রির জন্য নয়। এবং আমাদের ভবিষ্যৎ সোশ্যাল মিডিয়া পোস্টের মাধ্যমে নির্ধারিত হয় না।”
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট নেটোর সদস্য ডেনমার্ক। তাই তাকে কতটা উপেক্ষা করা যাবে এটা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ফ্রেডেরিকসেন বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রকে শক্তভাবে অনুরোধ করছি, তারা যেন ঐতিহাসিকভাবে মিত্র এবং ভিন্ন দেশ ও জাতিকে হুমকি দেওয়া বন্ধ করে।”