বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি তেলের ভান্ডার রয়েছে ভেনেজুয়েলার কাছে। যা বিশ্বের মোট প্রমাণিত মজুদের প্রায় পাঁচ ভাগের এক ভাগ।
দেশটির প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে আটককের পর সেইসব তেলের খনি কার্যত এখন আমেরিকার দখলে। যেখানে রয়েছে ৩০৩ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের ভান্ডার, যা ইরাকের থেকেও বেশি।
কেন আমেরিকার চোখ ভেনেজুয়েলার জ্বালানি তেলের দিকে? তবে কি আমেরিকার তেলের রিজার্ভ শেষের দিকে? নাকি এর পেছনে রয়েছে মহাশক্তিধর দেশটির ভিন্ন কোনো কৌশল, পুরনো কোনো হিসাব?
আমেরিকার তেল মজুত
বলা হচ্ছিল, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বেজে উঠবে দুর্ল্ভ খনিজ সম্পদ বা রেয়ার আর্থ এলিমেন্ট নিয়ে। কিন্তু ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক ঘটনার পর এটা প্রমাণিত যে তেলের যুদ্ধই এখনও শেষ হয়নি।
আর যেখানে নেতৃত্ব দিচ্ছে আমেরিকা। ভেনেজুয়েলা দখলের মধ্য দিয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় জ্বালানি তেলের মজুত থাকা দেশটি নিজেদের করে নিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
তাই বলে আমেরিকার কিন্তু জ্বালানি তেলের অভাব নেই। ইউএস এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের হিসেবে, ২০২৩ সালের শেষে আমেরিকার অপরিশোধিত তেলের মজুত ৪৬.৪ বিলিয়ন ব্যারেল ।
এছাড়াও জরুরি অবস্থার জন্য আমেরিকার মাটির নিচে বিশাল তেলের মজুত রাখা হয়েছে। যা বিশ্বের বৃহত্তম জরুরি তেলের ভান্ডার।
ইউএস ডিপার্টমেন্ট অব এনার্জি’র তথ্য অনুযায়ী, আমেরিকার এই কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ (এসপিআর) বিশ্বের সবচেয়ে বড় জরুরি অপরিশোধিত তেলের মজুত। যা দেশটিতে যেকোনো বড় ধরনের সংকটের সময়েও জ্বালানি তেলের সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারবে।
আমেরিকা উপসাগরীয় উপকূলরেখা বরাবর মাটির নিচে চারটি গুহায় রয়েছে এই তেল, যেখানে মজুত রাখা যায় ৭১৪ মিলিয়ন ব্যারেল।
এর বাইরেও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছে বিশ্বের বৃহত্তম অয়েল শেলের মজুত।
অয়েল শেল হচ্ছে এক ধরনের পাথর যা মাটির নিচে পাওয়া যায়, যাতে রয়েছে কেরোজেন। উচ্চতাপে কেরোজেন ভেঙে তরল অথবা গ্যাস তৈরি হয় যা পরে পেট্রোল, ডিজেলের মত জ্বালানি তেলে রূপান্তর করা যায়।
যুক্তরাষ্ট্রের ব্যুরো অব ল্যান্ড ম্যানেজমেন্টের ওয়েব সাইটে ’অয়েল শেল অ্যান্ড পলিসি’ শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৪.৩ ট্রিলিয়ন ব্যারেল তেল মজুদ রয়েছে এই অয়েল শেলে।
তেলের তেলেসমাতি
এতো এতো মজুত থাকার পরও আমেরিকা বরাবরই ভালো সম্পর্ক রেখে চলে বিশ্বের বড় বড় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর সঙ্গে। ভেনেজুয়েলার তেলের সঙ্গে আমেরিকার সম্পর্কটাও শত বছরেরও বেশি পুরানো।
দেশটিতে ১৯১৪ সালে বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য তেল পাওয়া যায়। এরপর ১৯২০-এর দশকে বড় ধরনের বিনিয়োগ করে স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি, এখন যা এক্সন মবিল কর্পোরেশন নামে পরিচিত।
১৯৫০ দশকের মধ্যে ভেনেজুয়েলা হয়ে ওঠে বিশ্বের বৃহত্তম তেল রপ্তানিকারক দেশ। যে তেলের প্রধান গন্তব্য ছিল যুক্তরাষ্ট্র।
তবে এই সম্পর্কে ফাটল ধরে ২০০৭ সালে, যখন প্রেসিডেন্ট উগো চ্যাভেজ বিদেশি কোম্পানিগুলোর কাছ তেল খাতকে জাতীয়করণ করে। যখন এক্সন মোবিল এবং কনোকোফিলিপস এর মতো মার্কিন কোম্পানিগুলোকে দেশটি ছেড়ে চলে যেতে হয়।
২০১৩ সালে চ্যাভেজের মৃত্যুর পর ক্ষমতায় আসে তারই নিয়োগ দেয়া ভাইস-প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো। অন্যদিকে, ২০১৭ সালে প্রথমবার প্রেসিডেন্ট হয়েই ভেনেজুয়েলার ওপর চাপ বাড়াতে শুরু করেন ডনাল্ড ট্রাম্প। ২০২৫ সালে ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর যা রূপ নেয় ট্রেড ব্লকেডে।
মাদকের আড়ালে তেল
ডিসেম্বরের মাঝামাঝি ট্রাম্প সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ঘোষণা করেন যে, ভেনেজুয়েলার অবৈধ শাসনব্যবস্থা ‘তেল চুরি’ করছে। যে অর্থ দিয়ে মাদক পাচার ও সন্ত্রাসবাদে মদত দিচ্ছে দেশটি।
দেশটিকে সরাসরি ‘নারকো-টেররিস্ট স্টেট’ হিসেবে অভিহিত করেন তিনি।
আর মাদুরোর দীর্ঘদিনের অভিযোগ, ট্রাম্প তাকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টা করছে, যাতে যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল দখল করতে পারে।
দিন যত এগুচ্ছে মাদুরোর কথার সত্যতাও মিলছে।
শনিবারের হামলার কয়েক সপ্তাহ আগে হোয়াইট হাউসের ডেপুটি চিফ অব স্টাফ স্টিভেন মিলারের সামাজিক মাধ্যমে দেওয়া পোস্টে দাবি করেন ভেনেজুয়েলার তেল আসলে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পদ এবং তেল ব্যবসা জাতীয়করণকে ‘চুরি’ হিসেবে আখ্যা দেন।
ভেনেজুয়েলা আক্রমণের আগে মাদক সম্পৃক্ততার কথা বলা হলেও মাদুরোকে গ্রেফতারের পর খোদ ট্রাম্পের বক্তব্যেই অনেক কিছু পরিস্কার হয়ে যায়।
মাদুরোকে নিউ ইয়র্কে নিয়ে আসার আগেই এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প বলেছেন, ভেনেজুয়েলার তেল ব্যবসা “একেবারেই ধ্বংস হয়ে গেছে” আর তা “অনেকদিন ধরেই”।
আর তাই ভেনেজুয়েলাকে রক্ষা করতে যুক্তরাষ্ট্রের বড় বড় তেল কোম্পানিগুলোকে সেদেশে পাঠাবেন বলেও ঘোষণা দেন তিনি।
ট্রাম্পের ভাষ্যমতে, “যারা কোটি কোটি ডলার বিনিয়োগ করবে, জরাজীর্ণ অবকাঠামো মেরামত করবে এবং দেশটির জন্য অর্থ উপার্জন শুরু করবে।”
আনুষ্ঠানিকভাবে ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ রদবদল না হওয়া পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রই ভেনেজুয়েলা ‘চালাবে’ বলেও জানিয়েছেন ট্রাম্প।
তেল খাতকে জাতীয়করণ করার পর মার্কিন কোম্পানিগুলোকে ভেনেজুয়েলা ছাড়তে হলেও রয়ে গিয়েছিল তাদের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের অবকাঠামো, যার ফলে রাতারাতি শূন্য হয়ে যায় তাদের বিনিয়োগ।
এই ক্ষোভ দীর্ঘদিন ধরেই বয়ে বেড়াচ্ছিল আমেরিকা। আর তারই ফলশ্রুতিতে ডনাল্ড ট্রাম্প তার ‘মেইক আমেরিকা গ্রেইট অ্যাাগেইন’ মিশন নিয়ে দখল নিলো ভেনেজুয়েলার তেলের ওপর।