অনেকদিন ধরেই ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ওপর নিবিড় নজর রাখছিল যুক্তরাষ্ট্রের গুপ্তচররা। একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত দক্ষ টিমকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল তার দৈনন্দিন গতিবিধি পর্যবেক্ষণের। কোথায় যাচ্ছেন, কার সঙ্গে দেখা করছেন, দিনের কোন সময় কী করছেন সবকিছুই ছিল সেই নজরদারির আওতায়।
এই নজরদারি টিমের অন্তত একজন ছিলেন ভেনেজুয়েলা সরকারেরই ভেতরের মানুষ। ৬৩ বছর বয়সী মাদুরো কখন ঘুমাতে যান, কী খাচ্ছেন, এমনকি কী পড়ছেন, এই ব্যক্তিই নিয়মিত সে তথ্য সরবরাহ করতেন, বলে এক উচ্চপদস্থ মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে বিবিসি।
দীর্ঘদিনের এই তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের পর, ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের প্রথম দিকে চূড়ান্ত হয় ‘অপারেশন অ্যাবসোলুট রিজল্ভ’। মাসের পর মাস ধরে চলা পরিকল্পনা ও মহড়ার চূড়ান্ত এক রূপ।
ইউএস আর্মির বিশেষায়িত বাহিনী ডেল্টা ফোর্স শুধু কাগজে-কলমে পরিকল্পনাই করেনি, বরং বাস্তবের মতো করেই অনুশীলন চালিয়েছে। ভেনেজুয়েলার রাজধানী কারাকাসে মাদুরোর সেফ হাউসের পূর্ণাঙ্গ রেপ্লিকা তৈরি করে বারবার মহড়া দেন, কোন পথে ঢুকতে হবে, কত সময় লাগবে, কীভাবে প্রেসিডেন্টকে জীবিত অবস্থায় আটক করে দ্রুত বের করে আনা যাবে।
প্রতিটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট মাথায় রেখে অনুশীলন চলে। কোথাও ভুলের সুযোগ রাখা হয়নি। কারণ এই অভিযানে ব্যর্থতার অর্থ– শুধু কূটনৈতিক সংকট নয়,বরং সরাসরি আন্তর্জাতিক সংঘাতের ঝুঁকি।
‘কোল্ড ওয়ার’-এর পর লাতিন আমেরিকায় যুক্তরাষ্ট্রের এমন অভিযান আর দেখা যায়নি। পুরো ব্যাপারটি ছিল অত্যন্ত গোপন। এমনকি মার্কিন কংগ্রেসও বিষয়টি আগে থেকে জানতো না। সবরকম পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তারা প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিলেন। অপেক্ষা ছিল ঠিক সময়ের।
শনিবার মার্কিন কর্মকর্তারা জানান, তারা সর্বোচ্চ গোপনীয়তা বজায় রেখেছিলেন এবং হঠাৎ করেই এই অভিযান পরিচালনা করতে চেয়েছিলেন যেন প্রতিপক্ষকে চমকে দিতে পারেন। ঘটনার চারদিন আগেও একবার অভিযানে অনুমতি দিয়েছিলেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প। তবে সেনা কর্মকর্তারা আরেকটু অপেক্ষা করে ঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করছিলেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সামরিক কর্মকর্তা জেনারেল ড্যান কেইন শনিবার সকালে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, “বড়দিন ও নতুন বছরের ছুটিতেও মার্কিন সেনাবাহিনীর সদস্যরা অভিযানের জন্য প্রস্তুত ছিল। তারা অপেক্ষা করছিল সঠিক সময়ের জন্য যখন প্রেসিডেন্টের অনুমতি নিয়ে অভিযান শুরু হবে।”
ট্রাম্পের নির্দেশনা
শুক্রবার স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে অভিযানের নির্দেশ দেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার ফক্স টিভিকে দেওয়া সাক্ষাতকারে ট্রাম্প নিজেই বলেন, “আমরা চারদিন আগে থেকেই কাজটা করার পরিকল্পনা করছিলাম, তারপর তিনদিন, দুইদিন, এরপর হঠাৎ করেই সব ঠিকঠাক মিলে গেল আর আমরা সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলাম।”
জেনারেল কেইন বলেন, “তিনি (প্রেসিডেন্ট) আমাদের বললেন এবং আমরা তাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছিলাম। তিনি আমাদের শুভকামনা জানিয়ে বললেন ‘গুডলাক অ্যান্ড গডস্পিড’।”
ট্রাম্পের সবুজ সংকেত যখন আসে তখনও কারাকাসে মধ্যরাত হয়নি। ফলে রাতের অন্ধকারে অভিযান চালানোর জন্য পর্যাপ্ত সময় পেয়েছিল ডেল্টা ফোর্স।
জল, স্থল ও আকাশপথে ২ ঘণ্টা ২০ মিনিটের ওই অভিযান ওয়াশিংটনসহ সারাবিশ্বকে চমকে দেয়। আর যে ধরনের হামলা চালানো হয়েছে তা কেউ ভাবতেও পারেনি। ঘটনার পরই নিন্দার ঝড় ওঠে।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলা দা সিলভা বলেছেন, ভেনেজুয়েলার নেতার এই আটকের ঘটনা “পুরো আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য আরেকটি ভয়ংকর বার্তা।”
সাধারণত এই ধরনের অভিযান মার্কিন প্রেসিডেন্টরা হোয়াইট হাউসের সিচুয়েশন রুম থেকে দেখেন। তবে ট্রাম্প তা করেননি। ফ্লোরিডায় নিজের মার-আ-লাগো ক্লাবে ছিলেন লাইভ স্ট্রিমে এই অভিযান দেখেন ট্রাম্প। সাথে সিআইএ পরিচালক জন র্যাটক্লিফ ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও ছাড়াও ছিল প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টারা।
ট্রাম্প বলেন, “দারুণ ব্যাপার ছিল। যদি আপনারা দেখতেন যে কী হচ্ছে, মানে আমি বলতে চাইছি যে যখন দেখছিলাম মনে হচ্ছিল কোনো টিভি শো দেখছি। সঙ্গে এর গতি, সহিংসতা … সব মিলে দেখার মতো একটা বিষয় ছিল। সবাই দারুণ কাজ করেছে।”
যেভাবে শুরু অভিযান
সম্প্রতি ওই অঞ্চলে হাজার হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়, ছিল বিমানবাহী রণতরী ও বেশ কয়েকটি যুদ্ধজাহাজও। বিগত দশকগুলোতে এত বড় সামরিক অবস্থান নেয়নি যুক্তরাষ্ট্র। মাদুরোর বিরুদ্ধে মাদক পাচারের অভিযোগ এনে তারা এই অভিযানকে বৈধতা দিতে চেয়েছে। এই অভিযোগ এনে একাধিক নৌযানে হামলাও চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
অপারেশন অ্যাবসোলুট রিজলভ-এর প্রথম লক্ষণ দেখা যায় আকাশে। দেড়শ’র বেশি বিমান—বোমারু আর ফাইটার জেট—এই অভিযানে অংশ নেয় বলে মার্কিন কর্মকর্তারা জানান।
ট্রাম্প বলেন, “এটা অত্যন্ত জটিল প্রক্রিয়া ছিল। এত এত বিমান। সম্ভাব্য সব পরিস্থিতির জন্য আমাদের ফাইটার জেট প্রস্তুত ছিল।”
স্থানীয় সময় রাত ২টায় বিস্ফোরণের বিকট আওয়াজ পাওয়া যায় কারাকাসে। শহরের বিভিন্ন স্থানে দেখা যায় ধোঁয়া।
সাংবাদিক অ্যানা ভেনেসা হেরেরো বিবিসিকে বলেন, “হঠাৎ আমি বিকট আওয়াজ শুনতে পাই। পুরো জানালা কেঁপে ওঠে। এরপরই দেখলাম বড় কালো ধোঁয়া উড়ছে। আমি কিছুই দেখতে পাচ্ছিলাম না।”
এরপর আকাশে অনেক বিমান ও হেলিকপ্টার দেখতে পান বলে জানান ভেনেসা।
কিছুক্ষণ পর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে। একটা ভিডিওতে দেখা যায় কারাকাসে কালো ধোঁয়া উড়ছে আর সেখান দিয়ে হেলিকপ্টারের বহর সামনে এগিয়ে যাচ্ছে।
ড্যানিয়েলা নামে একজন প্রত্যক্ষদর্শী জানায়, “রাতে বিস্ফোরণের বিকট শব্দে আমাদের ঘুম ভেঙে যায়, তখন ২টার মতো বাজে। বাইরে তাকিয়ে দেখতে পাই কাঁলো ধোয়া ও অনেক বিমান। সবকিছুই অন্ধকার ছিল, বিস্ফোরণের আওয়াজ আর আলোর ঝলকানি দেখতে পাচ্ছিলাম শুধু।”
প্রতিবেশীরা সবাই সবার খোঁজ নিচ্ছিল এবং কী ঘটছে তা বোঝার চেষ্টা করছিল।
হামলার ভিডিও বিশ্লেষণ করে বিবিসি জানিয়েছে কারাকাসের পাঁচটি এলাকা লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে জেনারেলিসিমো ফ্রান্সিসকো ডি মিরান্ডা বিমান ঘাঁটি, লা কার্লোটা বিমান ঘাঁটি, পোর্ট লা গুয়াইরা যা ক্যারিবিয়ান সাগরের সঙ্গে কারাকাসের প্রধান যোগাযোগমাধ্যম।
এ ছাড়া ভেনেজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও অন্যান্য সামরিক স্থাপনাতেও আঘাত হানে যুক্তরাষ্ট্র। হামলার আগে কারাকাসের বিদ্যুৎ সংযোগও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেছেন ট্রাম্প।
‘তারা জানতো যে আমরা আসছি’
শীর্ষ সামরিক সূত্রকে উদ্ধৃত করে বিবিসি জানায়, কারাকাসের চারপাশে হামলা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে, মার্কিন বাহিনী শহরে প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে ছিল মিশন ইউনিট ডেল্টা ফোর্সের সদস্যরা। তাদের কাছে ভারী অস্ত্র ছিল। মাদুরোর সেফ হাউসের ধাতব দরজা ভেঙে ফেলার জন্যও ‘ব্লোটর্চ’-ও ছিল তাদের কাছে।
জেনারেল কেইন বলেন, স্থানীয় সময় রাত ২টা ১ মিনিটে হামলা শুরু হওয়ার পরপরই সেনারা মাদুরোর যেখানে আছে, সেখানে পৌঁছায়।
মাদুরোর ওই সেফ হাউসকে ‘সামরিক দুর্গ’ বলে অভিহিত করে ট্রাম্প বলেন, “তারা আমাদের জন্য প্রস্তুত ছিল। তারা জানতো যে আমরা আসছি।”
জেনারেল কেইন বলেন, সৈন্যরা পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে তাদের ওপর গুলি চালানো হয়। গুলিতে তাদের একটি হেলিকপ্টার ক্ষতিগ্রস্ত হলেও তা উড়তে সক্ষম ছিল।
তিনি বলেন, “সেনা সদস্যরা সেইফ হাউসের কম্পাউন্ডে নামার সাথে সাথেই দ্রুত সকল বাধাই ভেঙে ফেলে।”
স্টিলের পুরু দরজাও তাদের সামনে কোনো বাধা হয় দাঁড়াতে পারেনি বলে জানিয়েছেন জেনারেল কেইন।
যখন অভিযান চলছিল, মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেজকে আটক করা হচ্ছিল, তখনই কংগ্রেসের আইনপ্রণেতাদের বিষয়টি জানাতে শুরু করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তবে আইনপ্রণেতারা বিষয়টি ভালোভাবে নেননি।
কংগ্রেসের শীর্ষ ডেমোক্রেট চাক শুমার বলেছেন, "আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই: নিকোলাস মাদুরো একজন অবৈধ স্বৈরশাসক। কিন্তু কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়া এবং পরবর্তী পদক্ষেপের কী হতে পারে তার একটি পরিকল্পনা ছাড়াই এমন সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া পুরোপুরি বেপরোয়া আচরণ।"
তবে রুবিওর দাবি, আগে থেকে কংগ্রেসকে জানালে এই অভিযান ঝুঁকির মধ্যে পড়ার সম্ভাবনা ছিল। আর ট্রাম্প অভিযোগ করেন, “কংগ্রেসের তথ্য ফাঁস করার প্রবণতা আছে। তাদের জানালে ভালো কিছু হতো না।”
ট্রাম্প বলেছেন, ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট সাম্প্রতিক সময়ে কিউবার দেহরক্ষীদের উপর নির্ভরতা বাড়িয়েছিলেন।
“তাদের ওপরই তারা ভরসা ছিল। যখন মার্কিন সেনারা মাদুরোরো বাড়িতে ঢুকে পড়ে ওই কিউবান দেহরক্ষীদের সহায়তায় মাদুরো নিরাপদ আশ্রয়ে পৌঁছাতে চেয়েছিলেন, কিন্তু তা সফল হয়নি।”
তিনি বলেন, “সে একটি নিরাপদ জায়গায় যেতে চাইছিল। কিন্তু সেটিও নিরাপদ ছিল না। কারণ আমরা মাত্র ৪৭ সেকেন্ডের মধ্যেই দরজাটি উড়িয়ে দিতে পারতাম।
“সে দরজার কাছ পর্যন্ত পৌঁছেছিল, কিন্তু সেটি বন্ধ করার সুযোগ পায়নি। এত দ্রুত তাকে ঘিরে ফেলা হয়েছিল যে সে ওই কক্ষে ঢুকতেই পারেনি।”
মাদুরো যদি গ্রেপ্তারের সময় প্রতিরোধ করতেন, তাহলে তাকে হত্যা করা হতো কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, “এটা ঘটতে পারত।” তবে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সেনা সদস্য নিহত হননি বলে জানান তিনি।
ট্রাম্প বলেন, “আমাদের পক্ষ থেকে দু-একজন আহত হয়েছে।”
ভেনেজুয়েলার কর্তৃপক্ষ এখনো কোনো হতাহতের তথ্য নিশ্চিত করেনি।
স্থানীয় সময় শনিবার ভোর ৪টা ২০ মিনিটে মাদুরো ও তার স্ত্রী নিয়ে ভেনেজুয়েলার আকাশসীমা ছাড়ে মার্কিন হেলিকপ্টার। তারা যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের হেফাজতে আছে। নিউইয়র্কে তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলার বিচার হবে পারে বলে জানিয়েছে বিবিসি।
মাদুরোকে আটকের ঘণ্টাখানেক পর ট্রাম্প নিজেই ঘোষণা দেন যে, “মাদুরো ও তার স্ত্রী খুব শিগগিরই মার্কিন বিচারের মুখোমুখি হবে।”
(বিবিসির তথ্য অবলম্বনে)