ইসরায়েলের তরুণরা কেন কট্টর ডানপন্থায় ঝুঁকছেন

রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের শুরুটা মোটেও মসৃণ ছিলো না তার। চরমপন্থি মতাদর্শের কারণে একসময় তাকে দেশটির সেনাবাহিনীতেই নেওয়া হয়নি। গত তিন দশকে তার ব্যক্তিগত রাজনৈতিক অবস্থানেও আসেনি পরিবর্তন। কিন্তু নাটকীয়ভাবে বদলে গেছে ইসরায়েল। এক সময়ের কোণঠাসা এই রাজনীতিক এখন দেশের প্রভাবশালী মন্ত্রীদের একজন। ইতামার বেন-গভির; যিনি এখন প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকারের গুরুত্বপূর্ণ সদস্য।

ইসরায়েলে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে তার পাশে ভিড়ছেন বিপুলসংখ্যক তরুণ সমর্থক। তাদের বিশ্বাস, বেন-গভির ইসরায়েলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন। তাদের কাছে বেন-গভির কেবল একজন রাজনীতিক নন, বরং শক্তিশালী ইসরায়েলের প্রতীক।

বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাসের হামলা, দীর্ঘদিনের সংঘাত এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব তরুণদের ডানপন্থি রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে।

আগামী ২৭এ অক্টোবরের নির্বাচনে পাঁচ লাখের বেশি মানুষ প্রথমবারের মতো ভোট দেবেন। নির্বাচনের ফলাফল নির্ধারণে নতুন এই ভোটারদের ভূমিকা বেশ গুরুত্বপূর্ণ।

ইসরায়েলের জনপ্রিয় সংবাদপত্র ইয়েদিওথ আহরোনোথের একটি জরিপে দেখা গেছে, প্রথমবারের ভোটারদের ১৬ শতাংশের বেশি উগ্র ডানপন্থি দলকে ভোট দিতে চান।

অন্যদিকে, টেলিভিশন চ্যানেল ১২-এর একটি জরিপ অনুযায়ী, তরুণ ভোটারদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নিজেদের ডানপন্থি বা মধ্য-ডানপন্থি হিসেবে পরিচয় দেন।

নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতিতে তরুণদের সমর্থন

ইসরায়েলের রামলে শহরের একটি বাজারে নির্বাচনী প্রচারে গিয়ে বেন-গভিরের চারপাশে একদল উচ্ছ্বসিত তরুণকে দেখা যায়। তাদের উদ্দেশে তার বার্তা, ভোটকেন্দ্রে গিয়ে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে হবে।

বেন-গভিরের ২০ বছর বয়সী সমর্থক মর্দেকাই মনে করেন, এই রাজনীতিক ইসরায়েলের মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবেন। বেন-গভিরের কিছু বক্তব্য বিতর্কিত হলেও, মর্দেকাইয়ের কাছে সেগুলো বড় বিষয় নয়। তার মতে, বেন-গভিরের বেশির ভাগ কথাই ভালো এবং সমর্থন করার মতো।

১৮ বছর বয়সী আরেক সমর্থক নাদাভ বলেন, সেনাবাহিনীতে যোগ দেওয়ার পর বেন-গভির তাদের পাশে থাকবেন বলে তিনি আশা করেন। তার মতে, এই রাজনীতিক ইসরায়েলকে শক্তিশালী দেশ হিসেবে তুলে ধরতে চান এবং মানুষের নিজের আদর্শ প্রকাশের সুযোগ তৈরি করছেন।

তরুণদের এমন সমর্থনের পেছনে রয়েছে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ, জাতীয় পরিচয় সম্পর্কে নিজস্ব ধারণা এবং সাম্প্রতিক সংঘাতের অভিজ্ঞতা।

২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাসের নেতৃত্বে ইসরায়েলে হামলার পর গাজায় যুদ্ধ শুরু হয়। ওই ঘটনা অনেক তরুণের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।

লন্ডনে বেড়ে ওঠা ২৩ বছর বয়সী ইহুদি তরুণ মেইর শ্রাইবারের রাজনৈতিক চিন্তাভাবনায়ও বড় পরিবর্তন এনেছে ২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবরের হামলা। তার মতে, ওই ঘটনার পর তরুণদের অনেকেই মনে করছেন, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করা সহজ নয়। হামলার অভিজ্ঞতা তাদের মধ্যে দুই পক্ষের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনা নিয়ে সংশয় তৈরি করছে।

তবে এই প্রবণতাকে শুধু একটি হামলার প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

জরিপে তরুণ ভোটারদের মনোভাব

ইসরায়েলের সংবাদপত্র ইয়েদিওথ আহরোনথের জন্য একটি জরিপ পরিচালিত হয়। জরিপে দেখা গেছে, প্রথমবার ভোট দিতে যাওয়া তরুণদের ১৬ শতাংশের বেশি কট্টর ডানপন্থি সমর্থক। তাদের পছন্দের মধ্যে রয়েছে বেন-গভিরের ‘জিউইশ পাওয়ার পার্টি’ এবং তার রাজনৈতিক মিত্র বেজালেল স্মোট্রিচের ‘রিলিজিয়াস জায়নিস্ট পার্টি’।

চ্যানেল ১২-এর আরেকটি জরিপে দেখা যায় তরুণ ভোটারদের প্রায় তিন-চতুর্থাংশ নিজেদের ডানপন্থি অথবা মধ্য-ডানপন্থি বলে পরিচয় দিয়েছেন। একই সঙ্গে জরিপে অংশ নেওয়া ৮০ শতাংশের বেশি তরুণ জানিয়েছেন, তাদের ভোট দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক ডালিয়া শেইন্ডলিনের মতে, তরুণ ইহুদি ইসরায়েলিরা প্রায় দুই দশক ধরেই বয়স্ক প্রজন্মের তুলনায় বেশি ডানপন্থি মনোভাব দেখাচ্ছেন। তার ব্যাখ্যা, এই প্রজন্ম যুদ্ধ ও সংঘাতের মধ্যে বড় হয়েছে। শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলনামূলকভাবে কম।

ফলে পশ্চিম তীরের ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্তি, ইহুদি বসতি সম্প্রসারণ কিংবা গাজা নিয়ে আরও কঠোর অবস্থানের মতো বিষয়ও তরুণদের রাজনৈতিক আলোচনায় জায়গা করে নিচ্ছে।

বেন-গভিরের রাজনীতি নিয়ে তীব্র বিতর্ক

তরুণদের একাংশের সমর্থন পেলেও বেন-গভিরের রাজনৈতিক অবস্থান ইসরায়েলের ভেতরে ও বাইরে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

অধিকৃত পশ্চিম তীরকে ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত করা, গাজায় ইহুদি বসতি স্থাপন এবং ফিলিস্তিনিদের ‘স্বেচ্ছায় দেশত্যাগে’ উৎসাহিত করার মতো অবস্থানের পক্ষে তিনি কথা বলেছেন। এসব অবস্থানের বিরোধিতা করেন অনেক উদারপন্থি ইসরায়েলি।

ইসরায়েলের রামলে শহরেই বেন-গভিরের প্রচার নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে।

বাজারের কিছু মানুষ তাকে স্বাগত জানালেও, অন্যরা অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এক দোকানির অভিযোগ, গভিরের বক্তব্য ইহুদি ও আরবদের মধ্যে বিভেদ বাড়াতে পারে।

ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে সহিংসতায় উসকানি দেওয়ার অভিযোগে যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি পশ্চিমা দেশ ২০২৫ সালে বেন-গভির ও স্মোট্রিচকে নিষেধাজ্ঞার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। তবে তাদের সমর্থকদের কাছে পশ্চিমা সমালোচনা রাজনৈতিক অবস্থান থেকে সরে আসার কারণ নয়। 

রাজনীতির নতুন লড়াই এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে

প্রথাগত সংবাদমাধ্যমের বদলে বর্তমান তরুণ সমাজ তাদের খবরের খোরাক পাচ্ছে টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো সামাজিক মাধ্যম থেকে। আর এই সুযোগটাই সবচেয়ে ভালো কাজে লাগিয়েছেন বেন-গভির।

আর এই ক্ষেত্রে বেন-গভির অন্য রাজনীতিকদের চেয়ে আগেই সুবিধা নিয়েছেন বলে মনে করেন বিরোধী দলের তরুণ প্রার্থী ইয়োনাতান শালেভ।

২৪ বছর বয়সী শালেভের মতে, উদারপন্থি রাজনীতিকেরা যখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেননি, তখন বেন-গভির এই মাধ্যমগুলো ব্যবহার করে নিজের রাজনৈতিক বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন।

বিরোধী দলগুলো অবশ্য বসে নেই। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাফতালি বেনেটের মধ্য-ডানপন্থি দল 'বিয়াহাদ'-এর মতো দলগুলোও এখন তরুণদের মন জয় করতে সোশ্যাল মিডিয়ায় জোর প্রচার চালাচ্ছেন। বেনেটের ইনস্টাগ্রাম পেইজে যেমন ওজন তোলার ভিডিও বা তরুণ প্রার্থীর সাথে আড্ডার ক্লিপ আপলোড করা হচ্ছে, তেমনি নেতানিয়াহুও নেমেছেন সামরিক আমেজের মারমুখী সব ভিডিও নিয়ে।

শালেভের ভাষ্য, ইসরায়েলের নতুন প্রজন্মের অনেকে সংবাদপত্র পড়েন না, নিয়মিত টেলিভিশনের খবরও দেখেন না। তাদের রাজনৈতিক তথ্যের বড় একটি অংশ আসে টিকটক ও ইনস্টাগ্রাম থেকে।

অর্থাৎ, নির্বাচনী প্রচারের লড়াই এখন শুধু জনসভা বা টেলিভিশন বিতর্কে সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কে বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছেন, কে তরুণদের ভাষায় কথা বলতে পারছেন, সেটিও হয়ে উঠছে গুরুত্বপূর্ণ।

তরুণেরা ডানপন্থি হচ্ছেন, কিন্তু সবাই একই পক্ষে নন

ইসরায়েলের তরুণ ভোটারদের মধ্যে ডানপন্থি রাজনীতির প্রভাব বাড়লেও তাদের সবাই বেন-গভিরের সমর্থক নন। মধ্য-ডানপন্থি বিরোধী দলগুলোর তরুণ প্রার্থীরাও সমর্থন পাচ্ছেন।

তেল আবিবে শিক্ষার্থীদের একটি অনুষ্ঠানে বেন-গভিরের বক্তব্যের সময় বিক্ষোভকারীরা ‘ফ্যাসিবাদ চলবে না’ স্লোগান দেন। একপর্যায়ে তাকে মঞ্চ ছেড়ে চলে যেতে হয়।

এই ঘটনায় ইসরায়েলের তরুণ সমাজের মধ্যে রাজনৈতিক বিভাজন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

তাই নির্বাচনের আগে মূল প্রশ্ন শুধু কে কত আসন পাবে, তা নয়। নতুন প্রজন্ম দেশের নিরাপত্তা, জাতীয় পরিচয় এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে কী ধরনের রাজনৈতিক ধারণা গ্রহণ করছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ইসরায়েলের নবীন ভোটারদের সমর্থন নির্বাচনের ফল নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে তারা কাকে সমর্থন করবেন, তা এখনও নিশ্চিত নয়। তাদের কেউ মনে করছেন, কঠোর অবস্থানই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিতে পারে। অন্যরা আশঙ্কা করছেন, এ ধরনের রাজনীতি সমাজের বিভাজন আরও বাড়াতে পারে।

শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচন ইসরায়েলের তরুণ ভোটারদের সামনে একটি মৌলিক প্রশ্নও তুলে ধরছে: দেশের নিরাপত্তা ও পরিচয় রক্ষার সর্বোত্তম পথ কোনটি?

 

(বিবিসি অবলম্বনে)