এক সপ্তাহে সৌদি আরবের একই বিমানবন্দরে তিনবার হামলা। শেষবার শনিবার বিকালে, রিয়াদের কিং খালিদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট মারা গেছেন অন্ততঃ ১২ জন, যাদের মধ্যে রয়েছেন দুই জন বাংলাদেশি নাগরিক, এবং আহত ৩০৯ জন। গেলো এক দশকের বেশি সময়ে মধ্যে সৌদি আরবে এটিই ছিল সবচেয়ে প্রাণঘাতী হামলা। আরেকটা তথ্য কিছুটা বিস্ময়ের, সৌদি আরবের অত্যাধুনিক মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম কোন ধরনের সতর্কবার্তা দিতে পারে নাই।
কয়েক ঘন্টা পরই হোয়াইট হাউসের সামনে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে জিজ্ঞেস করা হলো, হুথিদের বিরুদ্ধে সৌদি অভিযানে যুক্তরাষ্ট্র যোগ দেবে কি-না। ছোট্ট একটা উত্তর এলো: হতে পারে, তারা দেখছেন। সিদ্ধান্ত নেয়া হবে খুব তাড়াতাড়ি, তাও জানালেন। রিয়াদে সর্বশেষ হামলার নিহতের সংখ্যা তখনও নিশ্চিত হয়নি।
অক্টোবরের শুরু থেকেই সৌদি আরবের উপর একের পর এক হামলা চলছে। তেসরা অক্টোবর রাজধানী রিয়াদের দক্ষিণে আরামকো’র একটা স্থাপনার কাছে আগুন ও ধোঁয়া দেখা যায়। ইয়েমেনের হুথিরা দাবি করে, ব্যালিস্টিক মিসাইল ও ড্রোন দিয়ে তারা হামলাটি চালিয়েছে। তবে সৌদিরা কোন ক্ষয়-ক্ষতির কথা নিশ্চিত করেনি।
তার কয়েকদিন পর টার্গেট হলো বিমানবন্দর। রিয়াদের কিং খালিদ এয়ারপোর্টে ড্রোন হামলায় মারা যান এক সুদানি নাগরিক, আহত হন আট জন। ইয়েমেন সীমান্তের কাছাকাছি আভা বিমানবন্দরে মারা যান দুই জন। বৃহস্পতিবার দুইটি হামলার একটির লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী সাউদিয়া এয়ারলাইনসের একটি যাত্রীবাহী বিমান, মারা যান তিনজন বেসামরিক নাগরিক। লুফথানসা ও এয়ার ইন্ডিয়া রিয়াদের ফ্লাইট স্থগিত করে দেয়।
প্রাথমিক মূল্যায়নে বের হয়ে এসেছে রিয়াদ বিমানবন্দরের সর্বশেষ হামলায় ব্যালিস্টিক মিসাইল ব্যবহার করা হয়েছে। তারপর অন্ততঃ ৬২৭টা ফ্লাইট বাতিল হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডা, স্পেনসহ বেশ কিছু দেশ তাদের নাগরিকদের বিমানবন্দর এড়িয়ে চলতে বলেছে। হুথিদের মিডিয়া উইংয়ের প্রধান বলেছেন, তারা রিয়াদ বিমানবন্দর “বন্ধ করে দিয়েছে” এবং সৌদি আকাশসীমাকে তাদের সামরিক অভিযানের আওতাভুক্ত করেছে।
হুথিরা বলছে এটা প্রতিশোধ। ইয়েমেনের রাজধানী সানাতে কর্মরত এক সাংবাদিক আল-জাজিরাকে বলেছেন, হুথিদের হিসাব হলো বিমানবন্দরের বদলে বিমানবন্দর। সৌদিরা সানা এবং হোদেইদার বিমানবন্দরে হামলা করেছে, তাই তারা সব সৌদি বিমানবন্দর অচল করে দেবে। এই বিরোধের শুরুটা জুলাই মাসে যখন ইরানের একটি বিমান সানাতে অবতরণ করার পর সৌদিরা সেখানে হামলা করে। জবাবে হুথি ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোনের লক্ষ্যবস্তু হয় সৌদি আরবের আভা বিমানবন্দর।
এসব হামলার সময়টাও খেয়াল করার মতো। পাঁচই অক্টোবর সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেন সরকার স্থল অভিযান শুরু করে এবং বাব আল-মান্দেব প্রণালীর কাছে সংঘাতের তীব্রতাও বেড়েছে। সৌদি আরবের জন্য এই প্রণালী খুব গুরুত্বপূর্ণ। ইরান হরমুজ প্রণালী অবরোধ করে রাখায় সৌদি তেলের একটা বড় অংশ এখন যায় ইয়ানবু বন্দর দিয়ে এবং বাব আল-মান্দেবের দিকে হুথিদের এগিয়ে আসা সেই পথকেও ঝুঁকিতে ফেলে দিচ্ছে। রিয়াদে আক্রমণ করে হুথিরা সম্ভবত এই সামরিক অভিযানের রাজনৈতিক মূল্য বাড়াতে চাইছে। এটি অবশ্য বিশ্লেষণ, প্রমাণিত কিছু নয়।
হুথিদের এই সংঘাতকে শুধুমাত্র ইরানের 'প্রক্সি ওয়ার' বলাটা অতি সরলীকরণ হয়ে যাবে। ইরানের নিরাপত্তা নীতিনির্ধারণী সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সেক্রেটারি মোহসিন রেজাই আল-জাজিরাকে বলেছেন, তেহরান চায় সৌদি-হুথি সংঘাত বন্ধ হোক। হুথিদের নিজেদেরও চাওয়া রয়েছে: লোহিত সাগরের উপকূল এবং যাকে তারা বলে সৌদি অবরোধ তার অবসান।
সৌদি আরবের জন্য বিমানবন্দর শুধুমাত্র অবকাঠামো না, বরং তার অর্থনৈতিক পরিকল্পনার অংশ। একটি বিশ্লেষণ বলছে, দেশটির ভিশন ২০৩০ অনুযায়ী কানেক্টিভিটি অর্থাৎ যোগযোগ তাদের অর্থনীতির একটি মূল উপাদান। সৌদিরা চালু করেছে তাদের দ্বিতীয় রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী রিয়াদ এয়ার, যার হাব কিং খালিদ বিমানবন্দর। ২০৩০ সালের মধ্যে প্যাসেঞ্জার হ্যান্ডলিং ৩৩ কোটিতে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য সৌদিদের। কিন্তু এই পরিকল্পনা টিকবে না যদি বিদেশি এয়ারলাইন্স, প্রবাসী কর্মী আর পর্যটকরা নিরাপত্তা নিয়ে শংকায় থাকে। ইউরোপীয়ান ইউনিয়নের বিমান নিরাপত্তা সংস্থা, ইএএসএ এরই মধ্যে সৌদি আকাশসীমা নিয়ে নতুন নির্দেশনা দিয়েছে। কারণ হিসেবে বলছে, হুথিরা এখন সৌদি আরবের অনেক ভেতর পর্যন্ত হামলা চালাতে পারছে এবং তাদের নজর এখন বিমানবন্দরের দিকে।
এবার মূল প্রশ্নে আসা যাক। একটা মিসাইল দেশের অন্যতম ব্যস্ত বিমানবন্দর পর্যন্ত পৌঁছাতে পারলো, আর সৌদি মিসাইল ডিফেন্স সিস্টেম কোনো ধরনের অ্যালার্ট বা সতর্কবার্তা দিতে পারলো না? সৌদি কর্তৃপক্ষ এই নিয়ে এখনো কিছু বলেনি।
এখন পর্যন্ত যা জানা যাচ্ছে, তাতে মনে হচ্ছে সমস্যাটা এক জায়গায় নয়, বহুমুখি। সৌদি আরব বলছে তায়েফ এবং ইয়ানবুর দিকে আসা ছয়টি ব্যালিস্টিক মিসাইল এবং রিয়াদমুখি ড্রোন ঠেকিয়েছে তারা। কিন্ত আঞ্চলিক নিরাপত্তা কর্মকতাদের বরাতে বার্তা সংস্থা এপি গত মাসে জানিয়েছে, সৌদি আরবের ইন্টারসেপ্টরের মজুত কমে এসেছে। তারা ফ্রান্স, ব্রিটেন, পাকিস্তান এবং মিসরের কাছ থেকে এয়ার ডিফেন্স সহায়তা চেয়েছে। সৌদি আরব নিজেই জানিয়েছে, রিয়াদের উপর আসা একটি মিসাইল আটকাতে একটি বাচ্চাদের স্কুল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল।
আরও কিছু প্রশ্ন উঠে এসেছে, মিসাইলটা কি সিস্টেমে ধরা পড়েছিল? আটকানোর চেষ্টা করা হয়েছিল? দুইবার হামলার পর কি টার্মিনালের নিরাপত্তা বাড়ানো হয়েছিল? কোন ধরনের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা কাজ করেছে আর কোনটা কাজ করেনি তাও প্রকাশ্যে আসেনি।
সৌদি আরবের কৌশলগত ভুলের কথাও আসছে। বিশ্লেষকদের বরাত দিয়ে সিএনএন বলেছে, রিয়াদ বেশ কয়েকটি ভুল হিসাব করেছে। ইয়েমেনে প্রতিদ্বন্দ্বী গোষ্ঠীকে সমর্থন দেওয়ায় সংযুক্ত আরব আমিরাতে সাথে সম্পর্কের ইতি ঘটেছে, ট্রাম্প কতটা পাশে দাঁড়াবেন তা ভুল আঁচ করেছে এবং হুথিবিরোধী ছত্রভঙ্গ গোষ্ঠীগুলোকেও এক করতে পারেনি।
মিত্রদের ভরসাও শুধুমাত্র কাগজে-কলমে। অগাস্টে মক্কা প্যাক্ট হয়েছে, কিন্তু পাকিস্তান হামলার কথা সোজাসুজি স্বীকার করছে না এবং তুরস্ক জানিয়েছে তারা আক্রমণাত্মক ভূমিকায় যাবে না। ফ্রান্স ইয়ানবু পাহারা দিতে সেনা পাঠাচ্ছে।
এবার ওয়াশিংটনের কথায় আসা যাক। ডনাল্ড ট্রাম্পের ‘হতে পারে’ কথাটা এই প্রথম না। সেপ্টেম্বরে যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান হামলার অনুরোধ করলে ট্রাম্প মানা করে দেন, শুধুমাত্র গোয়েন্দা ও লক্ষ্যবস্তুর ব্যাপারে তথ্য দিতে রাজি হন। তারপর নিউ ইয়র্ক টাইমসের খবর অনুযায়ী, লক্ষ্যের তালিকা অনুমোদন হয়ে গিয়েছিল, ফাইটার জেটে বোমাও লোড করা হয়ে গিয়েছিল, তখনই ট্রাম্প পিছিয়ে যান।
পিছিয়ে যাওয়ার একটা সামরিক দিকও ছিল। ইউএস জেনারেলরা সতর্ক করেছিলেন হুথিরা মার্কিন জাহাজে হামলা না করার একটা বোঝাপড়া মেনে চলছে, হামলা হলে সেটা ভেঙে বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে থাকা মার্কিন জাহাজগুলোতে আঘাত আসতে পারে।
তবে ট্রাম্পের শনিবারের বক্তব্যে কিছুটা অসংগতি ছিল। সৌদি আরব নিজেদের রক্ষা করতে পারবে কি না, জিজ্ঞেস করা হলে বলেন, পারবে। আবার হামলাটকে ভয়ংকর হিসেবেও বর্ণনা করেছেন। বিশ্লেষকরা এর তিনটা ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। এক, ইরানের ওপর চাপ রাখতে ইচ্ছা করেই অস্পষ্টতা রাখা। দুই, এতগুলো মানুষ মারা যাওয়ার পর সত্যিই হস্তক্ষেপের কথা ভাবা। তিন, মিত্রকে আশ্বাস দেওয়া, কিন্তু কোনো প্রতিশ্রুতি না দিয়ে।
এখন এসব ঘটনার কারণে নানা ধরনের অনুমান আর ধারণা করা হচ্ছে, যেগুলো আবার ষড়যন্ত্র তত্ত্বের দিকেও মোড় নিচ্ছে। যেমন, যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে টানতে ইচ্ছে করেই প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ঢিল দেওয়া হয়েছে, সাইবার হামলা বা জিপিএস জ্যামিংয়ে আগাম সতর্কতা অচল করা হয়েছে, কিংবা অস্ত্র কেনার সুযোগ বাড়াতে ফাঁক রাখা হয়েছে ইত্যাদি।
কোন “অ্যালার্ট বা সতর্কবাতা আসে নাই” এই কথাটা এসব তত্ত্বের পক্ষে ব্যবহার হবে, কিন্তু ইন্টারসেপ্টরের মজুত কমে আসা বা মিসাইল দ্রুত উড়ে আসার মতো সাধারণ ব্যাখ্যাও এই তথ্যের সাথে মেলে। তবে একই সাথে ইলেক্ট্রনিক ইন্টারফিয়ারেন্সের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না, তাই সৌদিদেরও পক্ষ থেকেও ব্যাখ্যা আসা উচিৎ, যা এখনো পাওয়া যায়নি। সরকার চুপ থাকলে গুজব ছড়ায়, প্রমাণ লাগে না।
এখন দেখার বিষয় বেশ কয়েকটি। যুক্তরাষ্ট্র কী সিদ্ধান্ত নেয়; যোগ দিলে সংঘাত আরও ছড়াবে আর না দিলে মিত্রতা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। দ্বিতীয়ত, জোটের জবাব। জোট প্রতিশোধের হুঁশিয়ারি দিয়েছে, আর সৌদিরা সানা ছাড়াও অন্যান্য হুথি অধিকৃত এলাকায় শত শত হামলা চালানোর দাবি করেছে, তবে হুথিদের দমাতে পারেনি। তৃতীয়ত, এয়ারলাইন্সগুলো রিয়াদে ফেরে কি না। সেটাই হবে সৌদি নিরাপত্তা নিয়ে বাইরের পৃথিবীর আসল রায়। আর সবশেষে, শনিবার কী হয়েছিল তার খোলাখুলি বিবরণ সৌদিরা দেয় কি-না। সমস্যাটা ডিফেন্স সিস্টেমের না স্ট্র্যাটেজির সেটা তখনই বোঝা যাবে।