হিন্দুত্ববাদী ডানপন্থীদের কাছে ‘হিন্দু-প্রধান’ রাজনীতির ভারত ছিল অনেক দূরের স্বপ্ন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ধারণাই এখন বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে। ১৪০ কোটি জনসংখ্যার ভারতে এটাই এখন মূলধারার রাজনীতি। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর বিগত এক দশকের শাসনামলে ভারতের সেক্যুলার চেহারা অনেকটাই পালটে গেছে।
আর এই পরিবর্তনের নেপথ্যে সবচেয়ে বড় ভূমিকা ছিল যে সংগঠনের, তার নাম রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএস। ২০২৫ সালের ২রা অক্টোবর থেকে তারা নিজেদের বছরব্যাপী শতবর্ষ উদযাপন শুরু করেছে।
আরএসএস দলটির বেশ কিছু অঙ্গ সংগঠন আছে। এই সংগঠনগুলোই এত বছর ধরে আরএসএসের শক্তি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। এর মধ্যে রয়েছে ভারতের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টিও বা বিজেপি। রাজনীতি থেকে শুরু করে শিক্ষা-সংস্কৃতি সবখানেই এখন অবাধ বিচরণ এই আরএসএস আর তার অঙ্গ সংগঠনগুলোর।
১৯২৫: এক হিন্দু চিকিৎসকের স্বপ্ন
গত শতকের শুরুর দিকে যখন ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে ভারত স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হয়, তখন হিন্দু জাতীয়তাবাদী আদর্শের একটি গোষ্ঠী অন্য একটা বিষয়ে বেশি নজর দিতে শুরু করে। বিগত শতকগুলোতে মুসলিম শাসকদের আগ্রাসনের সামাজিক যে প্রভাব তৈরি হয়েছে সেটাই তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ভারতে স্বাধীনতা আন্দোলনে মহাত্মা গান্ধীর যে আদর্শ ছিল তা অনেকেরই পছন্দ ছিল না। তাদেরই একজন ছিলেন কেশভ বালিরাম হেড়গেওয়ার। পেশায় চিকিৎসক কেশভ এমন একটি সংগঠন তৈরি করতে চেয়েছেন যা উঁচু থেকে নিচু সব স্তরেই ‘হিন্দু সমাজ’ প্রতিষ্ঠা করবে। সেই লক্ষ্যেই মহারাষ্ট্রের নাগপুর শহরে শুরু করলেন আরএসএস। সেসময় থেকে এখন পর্যন্ত এই গোষ্ঠীর লক্ষ্য ও আদর্শ অপরিবর্তিত রয়েছে।
একই সুতায় বাঁধা এই সংগঠনের সদস্যরা প্রতিদিন সকালে একসঙ্গে ব্যায়াম করার পর হিন্দু ইতিহাস ও পুরাণ নিয়ে করেন পাঠচক্র। সারাজীবন তারা একই আদর্শে চলার প্রত্যয় ও প্রশিক্ষণ নেয়। অনেকটা স্কাউট আন্দোলনের আদলে আরএসএসকে গড়ে তোলেন কেশভ যিনি পরিচিত ছিলেন ‘ডাক্তারজি’ হিসেবে।
১৯৪৮: গান্ধী হত্যা
ব্রিটিশরা ক্ষমতা ছাড়ার সময় ভারতকে দুই ভাগ করে যায়; মুসলিমদের জন্য পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা করা হয়। তবে ডানপন্থী হিন্দুরা বিষয়টি সহজভাবে নেয়নি। তারা বেশ ক্ষুব্ধ ছিল। তারা মনে করতেন, তাদের ভূখণ্ড মুসলিমদের দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আর যেটুকু তাদের আছে সেটাও হিন্দুদের নয়, বরং সেকুল্যার বা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আর এই ক্ষোভের লক্ষ্যবস্তু হন গান্ধী। কারণ তিনি সে সময় হিন্দু-মুসলিম সম্প্রীতি গড়ার দিকে বেশি মনোযোগী ছিলেন। উগ্রপন্থী হিন্দুরা গান্ধীকে তাই ‘বিশ্বাসঘাতক’ আখ্যা দেয়। তারা বলতে থাকে, গান্ধী মুসলিমদের প্রতি বেশি উদার। শেষ পর্যন্ত এ কারণেই প্রাণ দিতে হয় তাকে। এক বৈঠকে প্রার্থনারত গান্ধীকে গুলি করে হত্যা করেন উগ্র হিন্দুত্ববাদী নাথুরাম বিনায়ক গডসে।
হত্যাকাণ্ডের পর আরএসএস অবশ্য দায় এড়িয়ে গেছে। তারা দাবি করেছে, হত্যাকাণ্ডের অনেক আগেই দল ছেড়েছেন গডসে। তবে ভারত সরকার ঠিকই আরএসএস-এর ওপর চড়াও হয়। এক বছর সংগঠনটি নিষিদ্ধ ছিল দেশটিতে।
১৯৭৫: দমন অভিযানই বুমেরাং
১৯৭৫ সালে যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধীর ক্ষমতাচ্যুত হওয়া প্রায় নিশ্চিত তখনই জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন তিনি। চলে গণহারে বিরোধীদের গ্রেপ্তার আর মিডিয়ার ওপর বিধিনিষেধ।
সেসময় আরএসএসের বহু শীর্ষ নেতাও হয়রানির শিকার হয়। তবে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের বৃহত্তর আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে সংগঠনটি গান্ধী হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে দীর্ঘদিনের যে সামাজিক কলঙ্ক বহন করছিল, তার অনেকটাই ঝেড়ে ফেলতে সক্ষম হয়।
গান্ধী সমর্থকরা যে নেতিবাচক ধারণা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন, সেখান থেকেই আরএসএস ধীরে ধীরে নিজেদের নতুনভাবে হাজির করে।
১৯৭৭ সালে ইন্দিরা গান্ধী ক্ষমতাচ্যুত হলে, আরএসএসের রাজনৈতিক শাখা - বিজেপি’র সদস্যরা গঠিত জোট সরকারের মন্ত্রিসভায় স্থান পান।
১৯৯২: মসজিদ থেকে মন্দিরে
১৯৮০ এর দশকের শুরুতে ভারতে বাবরি মসজিদ নিয়ে চরম বিতর্ক শুরু হয়। আরএসএস-এর রাজনৈতিক শাখা বিজেপিসহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠনও সেই মসজিদকে ঘিরে চলা বিতর্কে যোগ দেয়।
এই বিতর্ককে কাজে লাগিয়ে তারা হিন্দুদের দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও অসন্তোষকে রাজনৈতিক কার্ড হিসেবে ব্যবহার করে।
উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা দীর্ঘদিন ধরে দাবি করে আসছিল যে উত্তর ভারতের অযোধ্যা শহরের ষোড়শ শতকের বাবরি মসজিদটি হিন্দু দেবতা রামের একটি মন্দির ভেঙে তার জায়গায় নির্মাণ করা হয়েছিল। এই বিরোধ যখন বিচারিক প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে এগোচ্ছিল, তখন আরএসএস বিষয়টিকে একটি রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্মে রূপ দেয়। উদ্দেশ্য ছিল হিন্দুদের সংগঠিত করা এবং বিজেপির জন্য একটি একক ভোট ব্যাংক বানানো।
এই আন্দোলনের অংশ হিসেবে বিজেপির তৎকালীন সভাপতি এলকে আদভানি একটি ট্রাকে করে দেশজুড়ে সফর করেন। ট্রাকটি সাজানো হয়েছিল প্রাচীন রথের আদলে। এই সফরের মাধ্যমে তিনি বাবরি মসজিদ ভেঙে সেখানে একটি মন্দির নির্মাণের দাবিতে জনসমর্থন জোগাড় করেন।
১৯৯২ সালে উগ্রবাদী হিন্দুরা মসজিদের মিনারে ওঠে এটি মাটির সাথে মিশয়ে দেয়। তখনই ভারতের রাজনীতির নতুন যুগ শুরু হয়। সেই যুগে সংখ্যাগরিষ্ঠতাদের ইচ্ছাই মূল শক্তি। আর তখন থেকেই শক্তিশালী হতে থাকে আরএসএস। আর তার হাত ধরে বিজেপি।
২০১৪: নরেন্দ্র মোদীর নির্বাচনে জয়
২০১৪ সালে নরেন্দ্র মোদীর জয়ের পরই আসলে হিন্দুত্ববাদী ডানপন্থার চরম উত্থান ঘটে। তাদের অনেকদিনের ইচ্ছা পূরণ হয়।
এর আগে নব্বইয়ের দশকে যখন বিজেপি নেতা অটল বিহারি বাজপেয়ী প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, তখন আরএসএস ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাদের আদর্শের পূর্ণ প্রতিফলন হয়নি। কারণ বাজপেয়ী একটি জোট সরকারের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন যেটাতে একাধিক আদর্শের দল ছিল।
তবে নরেন্দ্র মোদী আরএসএস-এর সেই কাঙ্ক্ষিত নেতা হয়ে হাজির হয়েছেন। তিনি নিজের এমন একটি রাজনৈতিক ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছেন, যেখানে একদিকে একজম শক্তিমান হিন্দু নেতা আর অন্যদিকে আধুনিক রাষ্ট্রনায়ক।
তার এক দশকের শাসনামলে অযোধ্যায় হিন্দু দেবতা রামের নামে একটি জাঁকজমকপূর্ণ মন্দির নির্মাণ করা হয়। একই সঙ্গে তার সরকার আরএসএসের দীর্ঘদিনের আরেকটি লক্ষ্য বাস্তবায়ন করে - দেশটির একমাত্র মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ স্বায়ত্তশাসন বাতিল।
এ ছাড়া ক্ষমতাসীন দলটি ধীরে ধীরে ধর্মীয় মেরুকরণকে স্বাভাবিক করে তুলেছে। দেশটির ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ক্রমেই দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
(নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে)