প্রকৃতির সাথে অসম এক যুদ্ধে নেপাল। ভূমিধস, পাহাড়ে ভাঙন ও বন্যায় জর্জরিত দেশটিতে যানবাহন ও মানুষের ঘরবাড়ি নিমিষেই ভেসে যেতে দেখা গেছে বিভিন্ন ছবি ও ভিডিওতে। সামাজিক মাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এই ছবি ও ভিডিওগুলো যেন হলিউড চলচ্চিত্রের ভিএফএক্সকেও হার মানায়।
বুধবার ২৬এ অগাস্ট ঘটে যাওয়া বন্যায় নিহতের সংখ্যা এখন ৬২৬ জনে দাঁড়িয়েছে, জানিয়েছে দেশটির পুলিশ। এছাড়া তিব্বতে ৭জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম।
নেপালের ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি (এনডিআরআরএমএ) বলছে, দুর্যোগ শুরু হওয়ার পর থেকে এখনো প্রায় আড়াই হাজার মানুষ সেখানে নিখোঁজ। নিখোঁজদের মধ্যে পর্যটকসহ ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক আছে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি। দেশটির নিরাপত্তা বাহিনীর ১৫ হাজার সদস্য আহত ও নিখোঁজদের উদ্ধারের কাজ করছেন বলে জানিয়েছে এনডিআরআরএমএ।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও বিভিন্ন গণমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, চীন-নেপাল সীমান্তের এক এলাকা পুরোপুরি ধুলো, পাথর আর মাটিতে ছেয়ে যাচ্ছে। সিএনএন এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই পাহাড়ধসের শক্তি ছিলো ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমান। এর কিছু পরেই নেপাল থেকে হড়পা বানের স্রোতে গাড়ি, ঘরবাড়ি ও দালান ভেসে যাওয়ার চিত্র আসতে থাকে। তবে নেপালে হঠাৎ এত তীব্র দুর্যোগের পেছনে কারণ কী, এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বিভিন্ন মহলে।
‘হড়পা বান’
একটি ফ্ল্যাশ ফ্লাড এই হঠাৎ দুর্যোগের কারণ। ফ্লাশ ফ্লাড এক ধরণের আকস্মিক বন্যা বাংলায় যাকে বলে ‘হড়পা বান’। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওয়েদার সার্ভিসের তথ্য অনুযায়ী, সাধারণত ভারী বৃষ্টিপাত, তীব্র ঝড়, বড় আকারের ভূমিধস বা অন্য কোনো ঘটনার প্রভাবে এই ধরনের বন্যা তিন থেকে ছয় ঘণ্টার মধ্যে ঘটে যায়।
অনেক সময় মানবসৃষ্ট বাধ ভেঙে যাওয়ার ফলে উঁচু অঞ্চল থেকে নিচু অঞ্চলে পানি দ্রুত গতিতে বয়ে যায়। যেই গতিতে পানি জমে সেই গতিতে বেরিয়ে যেতে না পারলেই বন্যা হয়। নেপালে ফ্লাশ ফ্লাডের কারণ হিসেবে অনেকে জলবায়ু পরিবর্তন বা ক্লাইমেট চেঞ্জকে দায়ী করছেন।
সিএনএন এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নেপালের মতো ঠান্ডা অঞ্চলে বরফ গলে সেই পানি উঁচু পাহাড়ি এলাকাগুলোতে জমে যাচ্ছে। অনেক সময় পাহাড়ের ওপর বরফগলা পানির হ্রদ তৈরি হচ্ছে। গ্রীষ্মের সময় এই পানি আরও গলে এই জমা পানিগুলো উঁচু এলাকা থেকে নিচে নেমে এলে বা নদীতে এসে পড়লে তখন ফ্লাশ ফ্লাড হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে। অনেক সময় পাহাড়ধসের কারণেও ওপরে জমে থাকা পানি নিচে নেমে এসে ফ্লাশ ফ্লাড হয়।
বুধবার সকালে চীন-নেপাল সীমান্ত এলাকায় পাহাড়ধসের কাছাকাছি সময় পাহাড় থেকে বরফ ও পাথরের ঢল নেমে এসে লেন্দে-খোলা নদীতে পড়ে। বিজ্ঞানীদের বরাত দিয়ে সিএনএন এর প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, এই বরফ ও পাথরের ঢল নদীতে পড়ার কারণে নদীর পানি থেকে ফ্লাশ ফ্লাড হয়।
নেপালের পরিস্থিতির কারণ কী ছিলো, তার কিছু ইঙ্গিত পাওয়া যায় স্যাটেলাইটে ধারণ করা ছবি থেকে। ছবিগুলো বিশ্লেষণ করে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালগারির বিজ্ঞানী জানিয়েছেন, হিমবাহের বিশাল একটি অংশ হঠাৎ ধসে পড়ার কারণে প্রচণ্ড শক্তিতে পানি, বরফ ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত সৃষ্টি হয়। ছবিতে দেখা গেছে, হিমবাহের প্রায় ২,০০০ ফুট প্রশস্ত একটি অংশ ভেঙে আলাদা হয়ে প্রায় ১৭,০০০ ফুট উচ্চতা থেকে নিচে পড়েছে। গ্লেসিয়ার বা হিমবাহ ধসে ধসে পড়ার কারণেই ফ্লাশ ফ্লাড হয়েছে বলে বিবিসিকে জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা।
ইউএস জিওলজিকাল সার্ভে (ইউএসজিএস) একই কথা জানায় বিবিসিকে। এই প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, হিমালয় পর্বতশৃঙ্গের লাংতাং লিরুং পাহাড়ের কাছাকাছি একটি হিমবাহ ধসে পড়ে। উত্তরপশ্চিমাঞ্চলে ধসে পড়ার পর বরফ ও পাথর পানির সাথে মিলে পশ্চিম দিকে নিচু অঞ্চলের দিকে বয়ে যায় বলে উল্লেখ করা হয়েছে এই প্রতিবেদনে।
নতুন দুর্যোগের আশঙ্কা
বরফ, পানি, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের স্রোতে ভেসে যাওয়া মানুষদের খোঁজার ও উদ্ধার করার চেষ্টা চলছে নেপালে। দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের তেরাই অঞ্চলে চিতওয়ান এলাকায় সবচেয়ে বেশি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, সেই অঞ্চলে ২৩৩টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা মরদেহগুলোর মধ্যে মাত্র ৪ জনের পরিচয় শণাক্ত করা গেছে, কেননা বেশিরভাগ মরদেহই শণাক্ত করার মতো অবস্থায় নেই, সিএনএনকে জানিয়েছে অঞ্চলটির প্রশাসন।
বিদেশি নাগরিকদের ব্যাপারে তথ্য সংগ্রহ ও যাচাই এবং উদ্ধারকারী দলগুলো সমন্বয় করতে নেপালের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি ইমার্জেন্সি রেস্পন্স টিম গঠন করেছে। এই দল নিখোঁজদের পরিবার ও সংশ্লিষ্ট দেশের কূটনৈতিক মিশনগুলোর কাছে যাচাই করা তথ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজও করবে বলে জানিয়েছে দেশটর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
জাতিসংঘের একজন মুখপাত্র সিএনএনকে জানিয়েছেন, নেপালে হাজার হাজার পরিবার এখন খাদ্য ও সুপেয় পানির সংকটে আছে। ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে ত্রাণ ও আর্থিক সাহায্য পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছে।
চীন ও নেপালের উদ্ধারকর্মীরা নিহত, আহত ও নিখোঁজ ব্যক্তিদের উদ্ধারের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ইউএসজিএস-এর ভূতত্ত্ববিদ ড. অ্যালেনা গিশ সিএনএনকে বলেন, উদ্ধারকারীরা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কাজ করছে, এবং পাহাড় থেকে ধসে পড়া বরফ, পাথর ও কাদার কারণে তাদের ঝুঁকি বাড়ছে।
ইতিমধ্যেই নতুন দুর্যোগের ঝুঁকি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে নেপালের গণমাধ্যম দ্য হিমালয়ান টাইমস জানিয়েছে, বন্যার ঝুঁকি এখনো শেষ হয়নি। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, লেন্দে খোলা গিরিপথের পাথুরে অংশ ও পাহাড়ি ঢালের নিচের মাটি ব্যাপকভাবে ক্ষয়ে গেছে। এর ফলে বড় ধরনের পাথরধস বা ভূমিধস হয়ে নদীর গতিপথ আবারও আটকে যেতে পারে।
চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিব্বতে আবারও হ্রদের পানির উচ্চতা বাড়ছে, এবং নতুন করে ভূমিধস বা পাহাড়ধস হওয়ার ঝুঁকি আছে অঞ্চলটিতে। আল জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ফ্লাশ ফ্লাড ও ভূমিধসের কারণে নেপালে দু’টি নতুন হ্রদ তৈরি হয়েছে। নেপালের ডিজাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি বলছে, লেন্দে নদীতে ধ্বংসাবশেষ পড়ে তৈরি হওয়া হ্রদটির পানির উচ্চতা বাড়ছে, যার কারণে হঠাত করেই তা উপচে পড়ে আবার ফ্ল্যাশ ফ্লাডিং হতে পারে।
প্রকৃতির একটি আঘাত সামলাতে যখন নেপাল হিমশিম খাচ্ছে, তখন এত অল্প সময়ের মধ্যে আবারও দুর্যোগ এলে তা কীভাবে সামলে উঠবে দেশটি, তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করছেন বিশেষজ্ঞরা।