কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির সাবেক অধ্যাপক জেসন আরডের স্মরণে লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে আয়োজিত হয়েছে শোকসভা। ‘প্লেজিয়ারিজমে’র অভিযোগ নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে গণমাধ্যমের সমালোচনার মধ্যেই মারা যান জেসন আরডে।
৪১ বছর বয়সী এই শিক্ষক ছিলেন কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী কৃষ্ণাঙ্গ অধ্যাপক। শুক্রবার দক্ষিণ লন্ডনে নিজ বাড়িতে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায় তাকে।
সোমবারের শোকসভায় অংশ নেওয়া অনেকেই তার মৃত্যুর জন্য গণমাধ্যমের “বর্ণবাদী” প্রচারকে দায়ী করেন।
সোমবার শোকসভায় অংশ নেওয়া মানুষের হাতে থাকা প্ল্যাকার্ডে লেখা ছিলো, “প্রফেসর জেসন আরডে, শক্তিতে বিশ্রাম নিন”, “বর্ণবাদী সংবাদমাধ্যম এখনই বন্ধ করুন” এবং “মূলধারার সংবাদমাধ্যমের বর্ণবাদই জেসন আরডের মৃত্যুর জন্য দায়ী”।
শোকসভায় উপস্থিত একজন ব্যক্তি এটিকে “শোক ও ক্ষোভের সমাবেশ” হিসেবে তুলে ধরেন।
সমাজকর্মী পল ভিনসেন্ট আল জাজিরাকে বলেন, “প্রফেসর আরডে ও তার পরিবারের প্রতি সম্মান জানাতে আমরা সবাই এখানে এসেছি। একইসঙ্গে সংহতি প্রকাশ করতেও আমরা একত্রিত হয়েছি। বলতে চেয়েছি, আমরা বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন।”
‘বর্ণবাদী উন্মাদনা’
আরডে’র বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিলো ২০১৫ সালে ডক্টরাল থিসিসের কিছু অংশ তিনি অন্যের লেখা থেকে নিয়েছেন। একইসঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের কিছু তথ্য বাড়িয়েও বলেছেন।
৫ই অগাস্ট কেমব্রিজের অধ্যাপক পদ থেকে পদত্যাগ করেন আরডে। তখন তিনি বলেছিলেন, এমন ঢালাও অভিযোগ তার ও পরিবারের ওপর প্রভাব ফেলছে।
আরডে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন জন মুরস ইউনিভার্সিটি থেকে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, প্লেজিয়ারিজমের অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।
তবে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রথমে অভিযোগগুলোকে আমলে নেয়নি। বরং তারা আরডের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে ‘জঘন্য প্রচারণা’র অংশ হিসাবে ব্যাখ্যা করে। কিন্তু পরে বিতর্ক চলতে থাকলে নিয়োগ নিয়ে পুনতদন্ত শুরু করে কর্তৃপক্ষ।
এর দুই সপ্তাহ পর তাকে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
মেট্রোপলিটন পুলিশ তখন জানিয়েছিল, ঘটনাটি ‘অপ্রত্যাশিত’। তবে এতে কোনো সন্দেহজনক বিষয় আছে বলে তারা মনে করেনি। যদিও মৃত্যুর কোনো কারণ প্রকাশ করা হয়নি।
আরডের মৃত্যুর পর দেওয়া এক বিবৃতিতে কেমব্রিজ ইউনিভার্সিটির চ্যান্সেলর ক্রিস স্মিথ, লর্ড স্মিথ অব ফিন্সবারি, ঘটনাটিকে ‘বর্ণবাদী উন্মাদনা’ বলে নিন্দা করেন।
এদিকে ব্রিটিশ গণমাধ্যমের আচরণ নিয়ে জনসম্মুখে তদন্তের দাবিতে গুড ল প্রজেক্টের শুরু করা একটি পিটিশনে সোমবার পর্যন্ত ৯৬ হাজারের বেশি মানুষ স্বাক্ষর করেছেন।
পিটিশনে বলা হয়েছে, আরডের মর্মান্তিক মৃত্যু ছিলো সংবাদমাধ্যমের হয়রানির একটি দৃষ্টান্ত। একইসঙ্গে হয়রানির মূল কারণ হিসেবে বলা হয়েছে তার ‘গায়ের রং’।
পিটিশনে আরও কয়েকজন শিক্ষাবিদের উদাহরণ দেওয়া হয়েছে। যাদের বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ উঠলে তুলনামূলকভাবে কম অনুসন্ধান করা হয়েছিল বলেও দাবি করা হয়।
মিডিয়া বিশ্লেষণকারী সংস্থা নিউজকর্ডের তথ্য অনুযায়ী, আরডের মৃত্যুর আগের ২২ দিনে যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যমে ২৪৯টি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। এর মধ্যে ১৮৮টি প্রকাশিত হয় আরডের পদত্যাগের পর শেষ ৯ দিনে।
সোমবারের শোকসভার আয়োজকেরা সবাইকে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা না বলার অনুরোধ জানায়। পুরো সন্ধ্যায় সংবাদমাধ্যমের প্রতি মানুষের মনোভাব ভালো ছিলো না।
শোকসভায় অংশ নেওয়া প্যাট্রিসিয়া কোহেন আল জাজিরাকে বলেন, “কয়েক সপ্তাহ আগেই এ ঘটনা নিয়ে গণমাধ্যমের প্রতিবেদন পড়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম।” তিনি গণমাধ্যমের আচরণকেও পক্ষপাতদুষ্ট বলে ব্যাখ্যা করেন।
সাংবাদিকদের এই প্রতিবেদন নিয়ে কোনো পরিণতি ভোগ করতে হবে কি না, সে প্রশ্নও শোকসভা থেকে তোলা হয়।
“সাংবাদিকদের কি শাস্তি দেওয়া হবে? তাদের কি আরও ভালোভাবে নজরদারি করা হবে? কারণ তারা যেভাবে মানুষকে হেনস্তা করে, বিশেষ করে ভিন্ন বর্ণের মানুষকে—তা বোঝানো কঠিন।”
(আল জাজিরা অবলম্বনে)