যেভাবে পরিত্যক্ত ফোনবুক দেখে পাওয়া গেলো বাশার আল আসাদের শীর্ষ গোয়েন্দাকে

সিরিয়ায় বাশার আল আসাদের সরকারের পতনের কয়েকদিন পরের কথা। সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের একটি পরিত্যক্ত বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে সদ্য বিজয়ী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সৈন্যরা তল্লাশি চালাচ্ছিলো। ফ্ল্যাটের মেঝেতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলো একই ব্যক্তির অনেকগুলো ছবি। এর মধ্যে একটি ছবির বেশ কয়েকটি কপি ছিলো। ছবিতে চিকন গড়নের সেই ব্যক্তিটি বাসার আল আসাদের সাথে হাত মিলাচ্ছিলেন।

ছবিগুলোর আশেপাশে রাখা বিভিন্ন সার্টিফিকেটে লেখা ছিলো ব্যক্তিটির নাম, হুসাম লুকা। বাশার আল আসাদের গোয়েন্দা প্রধান, যার ওপর হত্যা ও অত্যাচারসহ বিভিন্ন মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আছে। এসব অভিযোগে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্য তার ওপর নিষেধাজ্ঞাও দিয়েছিলো।

বাশার আল আসাদের আরব সোশালিস্ট বা’আথ পার্টির আমলে হুসাম লুকা ছিলেন গোয়েন্দা সংস্থা সিরিয়ান জেনারেল সিকিউরিটি ডিরেক্টরেটের প্রধান। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সেসময় তিনি সিরিয়ার সবচেয়ে ভয়ঙ্কর ব্যক্তিদের একজন ছিলেন। তার বেশিরভাগ কাজ পরিচালনা হতো সবার চোখের আড়ালে।

আসাদের পতনের আগে গৃহযুদ্ধ চলাকালে সিরিয়ার হোমস শহরে হুসাম লুকার ফোন নম্বর খুঁজে পাওয়া কোনো কঠিন ব্যাপার ছিলো না। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হোমস শহরের দেওয়ালে দেওয়ালে নম্বরটি স্প্রে-পেইন্ট দিয়ে লেখা থাকতো। তখন হোমস শহর ছিলো বিদ্রোহীদের দখলে এবং চারিদিক দিয়ে শহর ঘিরে রেখেছিলো সরকারি বাহিনী। শহরবাসীদের মধ্যে দেখা দিচ্ছিলো খাবার ও পানির সংকট।

বিদ্রোহী গোষ্ঠীর যোদ্ধা মোতাজ আল-জায়দি বিবিসিকে বলেন, ওই সময় খাবারের অভাবে আল-জায়দিসহ অনেকে ইঁদুর খেতে শুরু করেছিলেন। আল-জায়দি বলেন, তখন জনশ্রুতি ছিলো, যে দেওয়ালে লেখা হুসাম লুকার নম্বরে ফোন করলে শহর থেকে নিরাপদে বের হওয়ার রাস্তা পাওয়া যাবে। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যারা এই নম্বরে ফোন করেছিলো, তাদের অনেকে পরে নিখোঁজ হয়ে যান।

সিরিয়ার অনেক নাগরিক বিবিসিকে বলেন, হুসাম লুকা সিরিয়ায় ‘দ্য স্পাইডার’ নামে পরিচিত ছিলেন। কেননা, তার গোয়েন্দার নেটওয়ার্ক ছিলো মাকড়সার জালের মতো জটিল ও বিস্তৃত। তারা বলেন, হুসাম লুকা যেন ‘চারিদিকেই উপস্থিত ছিলেন’।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী,  ‘দ্য স্পাইডার’ সবচেয়ে বেশি কুখ্যাতি অর্জন করেন একটি ঘটনার মাধ্যমে। এই ঘটনাটি সিরিয়ার মানুষের কাছে ‘ঈদ গণহত্যা’ বা ‘শিশু গণহত্যা’ নামে পরিচিত। হুসাম লুকার ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞায় এই ঘটনাটি আলাদাভাবে উল্লিখিত ছিলো।

এই ঘটনা নিয়ে বিবিসির সাথে কথা বলেন হোমস শহরের বাসিন্দা মোহাম্মেদ তোয়াকাতলি। তিনি বলেন, ২০১৫ সালের ঈদুল আযহার দিন তার ৭ বছর বয়সি সন্তান আল-ওয়াএল অন্য বাচ্চাদের সাথে একটি পার্কে খেলছিলো। তোয়াকাতলি বলেন, দুপুরের দিকে হঠাৎ একটি মিসাইল সেই পার্কে আঘাত করে।

“ছোট ছোট বাচ্চা ছিলো সবাই,” কাঁদো কাঁদো গলায় আল-ওয়াএল বিবিসিকে বলেন, “এখানকার মাটি তাদের রক্তে পুরোপুরি লাল হয়ে গিয়েছিলো।” হুসাম লুকা ও বাশার আল আসাদের সরকারের অন্যান্য কর্মকর্তাদের নিয়ে তিনি বলেন, “দেখতে মানুষের মতো হলেও তাদের মধ্যে এক বিন্দু মানবতা ছিল না।”

সিরিয়ান নেটওয়ার্ক ফর হিউম্যান রাইটসের তথ্য অনুযায়ী, সেদিনের এই হামলায় ১৭ জন শিশু ও ৪ জন নারীসহ মোট ২৮ জন নিহত হন। বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, এই হামলার টার্গেট বাছাই করেছিলেন হুসাম লুকা নিজেই এবং এই হামলার ফলেই তিনি গোয়েন্দা প্রধানের পদে উন্নীত হন।

বিবিসির বলছে, আসাদের শাসনামলে সরকারি নিরাপত্তা বাহিনী যে কাউকে টার্গেট করতো। বিদ্রোহী গোষ্ঠীর যোদ্ধা ও বিরোধী রাজনৈতিক নেতা-কর্মী থেকে শুরু করে সাংবাদিক, চিকিৎসক, মানবাধিকারকর্মী, কেউ নিরাপদ ছিলো না। এসব খুন-গুমের পেছনে বড় হাত ছিলো গোয়েন্দা প্রধান হুসাম লুকার।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রেপ্তার করা ব্যক্তিদের বিভিন্ন ‘রাজনৈতিক কারাগারে’ রাখা হতো। এগুলোর মধ্যে সবচেয়ে কুখ্যাত ছিলো দামাস্কের ‘সেদনায়া,’ যেটি ‘মানব কসাইখানা’ হিসেবে পরিচিত ছিলো সিরিয়ার মানুষের কাছে। সেখানে বন্দি হওয়া বেশিরভাগ ব্যক্তিকে আর কখনো দেখা যায়নি।

সিরিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল হাসান আল-তুর্বা বিবিসিকে জানান, নতুন সরকার হুসাম লুকার বিরুদ্ধে মানুষকে ‘পরিকল্পিতভাবে অত্যাচার ও হত্যার’ অভিযোগ এনেছে।

হুসাম লুকা পালিয়ে কোথায় গিয়ে থাকতে পারেন, দামেস্কের সেই ফ্ল্যাটে সদ্য বিজয়ী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সদস্যরা সেই সন্ধানই খুঁজছিলেন।

ফ্ল্যাটের এক কোনায় পড়ে ছিলো একটি নোটবই। নোটবইয়ে সাংবাদিকরা দেখতে পান বেশ কয়েকজনের নাম ও ফোন নম্বর। দোকানদার, ডাক্তার, সামরিক কর্মকর্তা ও হুসাম লুকার পরিবারের সদস্যদের নাম ও নম্বর লেখা ছিলো সেখানে। এখান থেকেই লুকার ফোন নম্বর খোঁজার চেষ্টা করতে থাকেন সাংবাদিকরা।

সেই নোটবইয়ের প্রতিটি পৃষ্ঠার ছবি তুলে নেন তারা। সেখানে মোট ১৫৫টি নাম ও নম্বর লেখা ছিলো। হুসাম লুকার খোঁজে একটা একটা করে সবগুলোতে ফোন করে দেখা হয়। এর মধ্যে ৫২টি নম্বর তখনও চালু ছিলো।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যারা ফোন ধরছিলেন, তাদের অনেকেই সাংবাদিকদের পরিচয় জানার সাথে সাথেই কল কেটে দিচ্ছিলেন। অনেকে দাবি করেন তারা হুসাম লুকা বা তার পরিবারের কোনো সদস্যকে চিনেন না। অনেকে নিজের পরিচয়ই অস্বীকার করে বসে দাবি করেন, ভুল নম্বরে ফোন করা হয়েছে।

বিবিসি তখন এমন একজন সাংবাদিককে কাজে লাগায়, যিনি নিজেই একসময় জেনারেল সিকিউরিটি ডিরেক্টরেটের ‘ওয়ান্টেড লিস্টে’ ছিলেন। তিনি নোটবইয়ে থাকা ব্যক্তিদের খোঁজা শুরু করেন সিরিয়ায়।

বিবিসির বলছে, তাদের মধ্যে অনেকে পেশায় ডাক্তার ছিলেন। বিবিসির সাংবাদিকরা তাদের নম্বরে ফোন দিয়ে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে তাদের সাথে দেখা করার চেষ্টা করেন। তাদের মধ্যে একজন ডাক্তার স্বীকার করেন যে তিনি একসময় লুকার চিকিৎসা করেছিলেন, তবে আর কোনো তথ্য না দিয়ে সাংবাদিকদের কন্সালটেশন ফি ফেরত দিয়ে তাদের বের হয়ে যেতে বলেন।

আরেকজন ডাক্তার স্বীকার করেন যে তিনি একবার হুসাম লুকার মায়ের সাথে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন। এর বেশি তথ্য দিতে সংকোচ করলেও তিনি একটি ফার্মেসির খোঁজ দেন, যেটির মালিক ছিলো হুসাম লুকার মেয়ে।

তবে স্থানীয়রা বিবিসিকে জানান, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হুসাম লুকার সাথে তার মেয়েও দেশত্যাগ করেছিলেন। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর পর কয়েক মাস ধরে লুকার আর কোনো সন্ধান পাননি সাংবাদিকরা। তবে হঠাৎ একদিন সেই নোটবইয়ের তালিকাভুক্তদের একজনকে ফোন করে পাওয়া যায়।

সেই ব্যক্তি জানান, তিনি লুকার সেই ফ্ল্যাটের নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। তার কাছ থেকে লুকার ব্যক্তিগত দেহরক্ষীদের একজনের নম্বর পান সাংবাদিকরা। বিবিসির প্রতিবেদনে এই দেহরক্ষীর জন্য ‘মাহমুদ’ ছদ্মনাম ব্যবহার করা হয়েছে।

কয়েক সপ্তাহ চেষ্টা করার পর মাহমুদের সাথে একটি হোটেলে দেখা করার সুযোগ পান সাংবাদিকরা। তিনি সাংবাদিকদের জানান, তাকে ফেলে রেখে দেশ ছেড়ে পালানোর কারণে তিনি হুসাম লুকার ওপর ক্রুদ্ধ ছিলেন।

মাহমুদ জানান, ২০২৪ সালে যখন বিদ্রোহীরা দামাস্কের দিকে অগ্রসর হতে থাকে, তখন হুসাম লুকা বলেছিলেন, তিনি পালাবেন না। দামাস্কে থেকে শেষ পর্যন্ত লড়ে যাওয়ার কথা বলেছিলেন তিনি। তবে একথা বলার পরের দিনই তিনি অফিসের সিন্দুক থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ নিয়ে পালিয়ে যান বলে সাংবাদিকদের জানান মাহমুদ।

মাহমুদ লুকা বা তার পরিবারকে নিয়ে এর চেয়ে বেশি তথ্য দিতে অসম্মতি জানান। তবে লুকার ড্রাইভারের ফোন নম্বর দেন সাংবাদিকদের। তিনি জানান, লুকা দামেস্ক ত্যাগ করার সময় এই ড্রাইভার তার সাথে ছিলেন। তবে ড্রাইভারও সাংবাদিকদের সাথে কথা বলতে বা দেখা করতে অসম্মতি জানান। আবারও লুকাকে পাওয়ার জন্য ভিন্ন পথ খুঁজতে হয় তাদের।

বিবিসির প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুসাম লুকা কোন পথে সিরিয়া থেকে পালিয়ে থাকতে পারেন তা খোঁজা শুরু করেন সাংবাদিকরা। প্রতিবেদনে বলা হয়, লেবাননের এক সরকারি সূত্র থেকে জানা গেছে হুসাম লুকা একটি নকল রাশিয়ান পাসপোর্ট ব্যবহার করে সিরিয়া থেকে লেবাননে প্রবেশ করেন, এবং সেখান থেকে বিমানে করে রাশিয়ায় চলে যান।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পর্যায়ে নোটবই থেকে তারা এমন এক ব্যক্তির নাম বের করেন, যিনি বর্তমানে লেবাননে থাকেন এবং সিরিয়ার বর্তমান সরকারের ওয়ান্টেড লিস্টে আছেন। এই ব্যক্তির নাম প্রকাশ না করে সেই প্রতিবেদনে লেখা হয়েছে, এই ব্যক্তির কাছ থেকে অবশেষে হুসাম লুকার ফোন নম্বর পাওয়া যায়।

নম্বরটির শুরুতে রাশিয়ার কান্ট্রি কোড লক্ষ্য করেন সাংবাদিকরা। সাংবাদিকদের সামনেই অজ্ঞাতনামা এই ব্যক্তি লুকাকে স্পিকারে রেখে ফোন করেন। অপর পাশ থেকে ভেসে আসে একটি কণ্ঠ। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অপর পাশের ব্যক্তিটিকে বিভ্রান্ত শোনাচ্ছিলো। সাংবাদিকদের কথা উল্লেখ না করে এই পর্যায়ে তাকে এমন কিছু প্রশ্ন করা হয়, যার উত্তর শুধু হুসাম লুকার পক্ষেই জানা সম্ভব। এবং তিনি সবগুলোর উত্তর দেন। এক পর্যায়ে সাংবাদিকদের কথা তাকে বলা হলে তিনি ফোন কেটে দেন।

কয়েকদিন পর তাকে আবার ফোন করেন সেই ব্যক্তি। এবার সাংবাদিকরা নিজেরাই তার সাথে কথা বলেন। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুসাম লুকাকে তার বিরুদ্ধে উঠে আসা হত্যা ও অত্যাচারের অভিযোগের ব্যাপারে জানতে চাওয়া হয়।

তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “আমার বর্তমান অবস্থায় আমি ফোনে কথা বলে ঝুঁকি বাড়াতে পারবো না।”

রাশিয়ার কর্তৃপক্ষ তাকে কথা বলতে বারণ করছে কিনা তা জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি কথা বলতে পারবো না। আমি ব্যাখ্যা করতে পারবো না। আপনাদের বুঝতে হবে।”

রাশিয়ার বাইরে কোথাও সাংবাদিকদের সাথে দেখা করা সম্ভব কিনা তা জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, “এটি খুবই কঠিন।” এরপর তিনি ফোন কেটে দেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিবিসির প্রতিবেদনে।

সাংবাদিকরা পরে হুসাম লুকার আরেকটি নম্বর খুঁজে পান, যা সিরিয়ারই নম্বর। এই নম্বর দিয়েই তার বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম ও মেসেজিং অ্যাপের অ্যাকাউন্ট খোলা হয় বলে জানা যায় বিবিসির প্রতিবেদন থেকে। সেখানে আরও লেখা হয়, তিনি এই অ্যাকাউন্টগুলি এখনো ব্যবহার করছেন।

এই নম্বর ব্যবহার করে বিবিসির সাংবাদিকরা রাশিয়ার রাজধানী মস্কোর বাইরের অঞ্চলে তার লোকেশন খুঁজে পান বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। এরপর লুকাকে একাধিকবার ফোন ও মেসেজ করেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিরিয়ায় যারা আসাদ ও তার সরকারের অপরাধগুলোর বিচারের অপেক্ষায় আছেন, তাদের জন্য হুসাম লুকার রাশিয়ায় থাকার ব্যাপারটি বেদনাদায়ক। কেননা, রাশিয়া লম্বা সময় ধরে আসাদ সরকারকে সমর্থন দিয়ে এসেছে। আসাদ সরকারের সদস্যদের বিচারের জন্য রাশিয়া থেকে বের করে আনা প্রায় অসম্ভব বলে উল্লেখ করা হয়েছে বিবিসির প্রতিবেদনে।