যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কমায় দ্বিমুখী সংকটে নেতানিয়াহু

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে নিয়ে জনমত বদলাতে দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রে, এক সময়ের জনপ্রিয় এই ব্যক্তি এখন হচ্ছেন ‘ঘৃণা’র পাত্র। 

ডানপন্থা রাজনীতির সাথে ঘনিষ্ঠতা ও গাজা নীতির কারণে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক মহলে সমর্থন হারাচ্ছেন নেতানিয়াহু এবং আমেরিকার সাধারণ মানুষের কাছেও তিনি ‘যুদ্ধাপরাধী’ হিসেবে আখ্যা পাচ্ছেন বলে এক জরিপে উঠে এসেছে। 

ওই জরিপ বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় অর্ধেক মানুষ মনে করেন, যুদ্ধাপরাধের দায়ে গ্রেফতার করা উচিত ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে। 

কিন্তু এক দশক আগেও তার বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে এমন জনমত গড়ে ওঠা ছিলো একেবারেই অবিশ্বাস্য।

তবে বিগত কয়েক বছর ধরে নেতানিয়াহুকে নিয়ে জনমতের অবনতি ঘটেছে বলে আলজাজিরায় প্রকাশিত এক মতামত কলামে লেখা হয়েছে। 

একইসাথে গাজায় নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি নিয়েও দোটানায় পড়েছেন নেতানিয়াহু। 

যুক্তরাষ্ট্রের তত্ত্বাবধানে করা ওই চুক্তির পর, অস্ত্র সমর্পণে রাজি হয়েছে হামাস। আর শর্ত হিসেবে গাজা থেকে সৈন্য তুলে নিতে হবে ইসরায়েলকে এবং অঞ্চলটির প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তর করতে হবে প্যালেস্টাইনের কাছে। 

এই শর্তগুলো ইসরায়েলের রাজনৈতিক পরিবেশ ও গণমাধ্যমে এক শীতল পরিস্থিতি তৈরি করেছে বলে দাবি করা হয়েছে আলজাজিরার এক প্রতিবেদন।

আর এতেই বাগড়া বাধিয়েছেন নেতানিয়াহু।  

তবে চুক্তির শর্ত না মানলে ডনাল্ড ট্রাম্পের কুনজরে পড়তে হবে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে। আবার ইসরায়েলের জনমত উপেক্ষা করে জাতীয় নির্বাচনের কয়েক মাস আগে চুক্তি মানতে গেলেও দেশের অভ্যন্তরে জনপ্রিয়তা হারানোর শঙ্কা রয়েছে নেতানিয়াহুর। 

তাই ছয়বারের প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এখন পড়েছেন উভয় সংকটে।  

নেতানিয়াহুকে নিয়ে কী ভাবছে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ  

২০২৩ সালের ৭ই অক্টোবর হামাসের হামলার পর থেকে গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান চালাতে শুরু করে ইসরায়েল। অন্তহীন এই অভিযানে এ পর্যন্ত প্যালেস্টাইনের ৭৩ হাজার নাগরিক নিহত হয়েছে। হাসপাতাল, বিদ্যালয়, আবাসিক এলাকার মতো গাজার অধিকাংশ অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে। 

যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন, গাজায় ইসরায়েলের চলমান আগ্রাসন যুদ্ধাপরাধের শামিল। 

তবে ইসরায়েলি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরির পেছনে শুধু অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতি প্রধান কারণ নয়। 

সবচেয়ে বড় কারণ হলো- সামরিক অভিযান চালিয়ে হাজার হাজার নিরপরাধ মানুষকে হত্যা এবং কঠোর অবরোধে মানবিক সংকট ও খাদ্যাভাব সৃষ্টি করে বিশ্বজুড়ে তীব্র নিন্দার মুখে পড়া। 

আর এই অভিযোগ কেবল দেশটির প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে নয়, ইসরায়েলের জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীরাও দীর্ঘমেয়াদি সামরিক নিয়ন্ত্রণের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সমালোচনার পাত্র হয়েছেন। 

আন্তর্জাতিক আলোচনা যাই হোক না কেন, যুগের পর যুগ নিজেদেরকে ইসরায়েলের বন্ধু হিসেবে আখ্যা দিয়ে এসেছে যুক্তরাষ্ট্র। 

তবে এবার যে ভিন্ন চিত্র। সমালোচনার ঢেউয়ে অংশ নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকরাও। গাজাবাসীর উপর ইসরায়েলের ভয়াবহ আগ্রাসনকে তারাও এখন দেখছে যুদ্ধাপরাধ হিসাবে।  

নেতানিয়াহু কীভাবে যুক্তরাষ্ট্রে জনসমর্থন হারাচ্ছেন, তা নিয়ে আল জাজিরায় লিখেছেন ওয়াশিংটনের সাংবাদিক সাঈদ আরিকাত। 

তিনি বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের মত পরিবর্তনের কারণ শুধু গত তিন বছরে গাজার আগ্রাসনই নয়। তারও আগে থেকেই ধীরে ধীরে দেশটিতে জনসমর্থন হারাতে থাকে নেতানিয়াহু। 

ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মানুষ কী ভাবছে, এ নিয়ে গত ২৮ই জুলাই এক জরিপ প্রকাশ করেছে ইকোনমিস্ট/ইউগভ পোল।

জরিপে উঠে এসেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৪৯ শতাংশ জনগোষ্ঠী মনে করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের পরোয়ানা অনুযায়ী, নেতানিয়াহুকে গ্রেপ্তার করা উচিত। ৪৭ শতাংশ মানুষ মনে করেন, গাজায় ইসরায়েলের চলমান আগ্রাসন যুদ্ধাপরাধের শামিল। 

ওই জরিপে নেতানিয়াহুকে নিয়ে মার্কিন নাগরিকদের দৃষ্টিভঙ্গির গভীর পরিবর্তন উঠে এসেছে।

আর জরিপটি এমন সময় প্রকাশিত হয়েছে, যখন নেতানিয়াহু যুক্তরাষ্ট্রের নেতাদের সাথে বৈঠক করে দুই দেশের জোটকে আবারও শক্তিশালী করার চেষ্টা করছেন। 

অথচ দেশটির প্রায় অর্ধেক মানুষ আর তাকে বিশ্বাসযোগ্য মিত্র হিসেবে দেখছে না, তাকে দেখছে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে। এই পরিসংখ্যান ইঙ্গিত দেয়, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক কৌশল যুক্তরাষ্ট্রের জনজীবনে ইসরায়েলের অবস্থানকে মৌলিকভাবে বদলে দিয়েছে। 

কীভাবে কমছে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন

যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতায় রিপাবলিকান বা ডেমোক্রেট যেই থাকুক না কেন, দুটি দলই ইসরায়েলকে কৌশলগত অংশীদার হিসেবে দেখতো। যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এই দুই দেশের সম্পর্ককে কোনোভাবে প্রভাবিত করতো না। 

ইসরায়েলের নেতারাও এর আগে কখনও নিজেদের কোনো একটি রাজনৈতিক দলের সাথে ভিড়তে দেয়নি। দুই দলের সমর্থন থাকার কারণেই যুগ যুগ ধরে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত মিত্র ও গণতান্ত্রিক অংশীদার হিসেবে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পেরেছে ইসরায়েল।

কিন্তু নেতানিয়াহু ধীরে ধীরে ইসরায়েলকে রিপাবলিকান পার্টির সাথে বেশি ঘনিষ্ঠ করে তোলেন, ডেমোক্রেটদের নানা উদ্বেগ ও মতামতকেও উপেক্ষা করতে থাকেন। 

ডেমোক্রেট পার্টির নেতাদের মধ্যে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার একটি প্রবণতা চোখে পড়ছে।

সাঈদ আরিকাত মনে করেন, নেতানিয়াহুর সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিলো- কৌশলগত রাজনীতি। ইসরায়েলকে ক্রমশ যুক্তরাষ্ট্রের এক দলের সাথে বেঁধে ফেলায় দশকের পর দশক ধরে গড়ে ওঠা দ্বিদলীয় ঐকমত্য দুর্বল হয়ে পড়েছে। ইসরায়েল এখন যুক্তরাষ্ট্রের এক বিভাজনমূলক পররাষ্ট্রনীতিতে পরিণত হয়েছে। 

ডেমোক্রেটদের উপেক্ষা করছেন নেতানিয়াহু

রিপাবলিকান পার্টির সাথে ইসরায়েলের ঘনিষ্ঠতার অনেক বড় ইঙ্গিত পাওয়া যায় ২০১৫ সালে। ইরান পারমাণবিক চুক্তি নিয়ে বিতর্ক চলছিলো। এমন সময় ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীকে কংগ্রেসে আমন্ত্রণ জানান রিপাবলিকানরা। তখন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে অগ্রাহ্য করে কংগ্রেসের যৌথ অধিবেশনে ভাষণ দেন নেতানিয়াহু। এর আগে ইসরায়েলের কোনো প্রধানমন্ত্রী এভাবে ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেননি। 

এমনকি দলের বিরুদ্ধে গিয়ে ইসরায়েলকে সব ধরনের সহযোগিতা করার পরও ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রীর সমালোচনার শিকার হন ডেমোক্রেট প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। ৭ই অক্টোবরের হামলার পর ইসরায়েলকে অসাধারণ সামরিক, কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সমর্থন দেন তিনি।

কিন্তু নেতানিয়াহু বারবার প্রকাশ্যে বাইডেন প্রশাসনের বিরোধিতা করেন। যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অস্ত্র আটকে রাখার অভিযোগ তোলেন, যুদ্ধ-পরবর্তী পরিকল্পনায় মার্কিন প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন, মানবিক সহায়তায় বাধা দেন এবং কৌশলগত প্রশ্নে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিরোধে জড়ান। 

এ কারণে ডেমোক্রেট পার্টির নেতাদের মধ্যে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার একটি প্রবণতা চোখে পড়ছে। ইসরায়েলকে সহায়তা দেওয়ার পুরোপুরি বিরোধিতা না করলেও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন মানার শর্ত জুড়ে দেওয়ার কথা বলছেন অনেকেই। 

কংগ্রেসের সদস্যদের মধ্যেও নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সমালোচনা করার প্রবণতা দেখা দিচ্ছে। তরুণ ভোটারদের অনেকেই, বিশেষ করে ডেমোক্রেট দলের অনেক সমর্থকই গাজায় ইসরায়েলের সামরিক অভিযানকে আত্মরক্ষা হিসেবে দেখতে নারাজ।  

বরাবরই নেতানিয়াহুর পক্ষে ট্রাম্প

ক্ষমতায় এসে রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইসরায়েলের পক্ষে বেশ কিছু সিদ্ধান্ত নেন। তিনি জেরুজালেমকে ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দেন। 

দখলকৃত গোলান হাইটসে ইসরায়েলের সার্বভৌমত্ব স্বীকার করেন, ইরান চুক্তি থেকে সরে আসেন এবং প্যালেস্টাইনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়ে ইসরায়েলের ওপর চাপ কমিয়ে দেন ট্রাম্প।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের সমর্থনের কারণে, দ্বিদলীয় সমর্থনকে অপ্রয়োজনীয় ভাবতে শুরু করেন নেতানিয়াহু।

মার্কিন প্রেসিডেন্টের সমর্থনের কারণে, দ্বিদলীয় সমর্থনকে অপ্রয়োজনীয় ভাবতে শুরু করেন নেতানিয়াহু। কিন্তু এখানেই তার দুরদৃষ্টির অভাব ফুটে উঠেছে বলে মনে করেন সাঈদ আরিকাত। কারণ, কোনো একটি প্রশাসনের সাথে ভালো সম্পর্ক রেখে দুই দেশের জোট টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়। জোট টিকে থাকে প্রতিষ্ঠান, মূল্যবোধ ও বিস্তৃত জনসমর্থনের ওপর। 

এতদিন ট্রাম্প প্রশাসনের নিঃশর্ত সমর্থন থাকলেও, হামাসের নিরস্ত্রীকরণ চুক্তিকে ঘিরে তৈরি হচ্ছে নতুন উত্তেজনা। 

গাজা নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি ও নতুন সংকট

সাম্প্রতিক হামাসের নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি নিয়ে টানাপোড়েনে পড়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। 

শর্ত অনুযায়ী, হামাসের অস্ত্র সমর্পণের প্রেক্ষিতে গাজা থেকে সৈন্য সরাতে হবে ইসরায়েলকে এবং ধাপে ধাপে গাজার প্রশাসনিক ক্ষমতা ফিরিয়ে দিতে হবে প্যালেস্টাইনের সরকারকে। 

শর্তসাপেক্ষে অস্ত্র সমর্পণে রাজি হয়েছে হামাস। কিন্তু অস্থিরতা তৈরি হয়েছে ইসরায়েলকে দেওয়া শর্ত নিয়ে। গাজা থেকে সৈন্য প্রত্যাহার ও প্যালেস্টাইনের কাছে অঞ্চলটির ক্ষমতা হস্তান্তরের শর্ত সহজভাবে নিচ্ছে না ইসরায়েল। 

তবে নেতানিয়াহু যদি এই চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করেন, সেক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের সমর্থন হারানোর ঝুঁকিতে থাকবেন তিনি। এর ফলে শুধু যে দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে ফাটল ধরবে, তা না, বরং নেতানিয়াহুর আরেক দফায় ক্ষমতায় আসাতেও বাধা তৈরি হবে। 

ডনাল্ড ট্রাম্প বলছেন, এই চুক্তি নিয়ে ইসরায়েল “খুবই সন্তুষ্ট”। কিন্তু ইসরায়েলের ভেতরে প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন। সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু না বললেও, এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, হামাসের “প্রকৃত নিরস্ত্রীকরণ” না হওয়া পর্যন্ত গাজায় ইসরায়েলের অবস্থানের কোনো পরিবর্তন হবে না।

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নেতানিয়াহু এই চুক্তির শর্ত মেনে না নিলে ট্রাম্পের সমর্থন হারাবেন। সেক্ষেত্রে শুধু যে দুই দেশের সম্পর্কেই ফাটল ধরবে, তা না, নেতানিয়াহুর আবার ক্ষমতায় আসার পথেও বাধা সৃষ্টি হবে।  

চুক্তি নিয়ে কী ভাবছে ইসরায়েল

ইসরায়েলের ভেতরে জনমতও কঠোর অবস্থানের পক্ষে। এক জরিপে দেখা গেছে, ৮২ শতাংশ ইহুদি ইসরায়েলি গাজা থেকে প্যালেস্টাইনের নাগরিকদের জোরপূর্বক উচ্ছেদের পক্ষে। 

একই জরিপে দেখা যায়, ৫৬ শতাংশ ইসরায়েলের নাগরিক মনে করেন, তাদের নিজ নিজ ঘরবাড়ি থেকেও উচ্ছেদ করতে হবে। আরেক জরিপে ৬৪ শতাংশ উত্তরদাতা মনে করেন, গাজার ফিলিস্তিনিদের মধ্যে “কেউই নির্দোষ নয়”।

গাজা নিরস্ত্রীকরণ চুক্তির শর্তসাপেক্ষে অস্ত্র সমর্পণে রাজি হয়েছে হামাস।

ইসরায়েলের মন্ত্রীসহ অনেক রাজনীতিবিদ ভবিষ্যতে গাজায় ইহুদি বসতি স্থাপনের কথাও বলেছেন। ফলে ইসরায়েলের বেশিরভাগ রাজনীতিবিদ ও সাধারণ জনগণই এই চুক্তির শর্ত মেনে নেওয়ার পক্ষে না। 

দেশটির কট্টরপন্থী রাজনীতিবিদদের মতে, গাজায় হামলা বন্ধ করা মানে পালটা হামলার সুযোগ করে দেওয়া। 

ইসরায়েলের ডানপন্থি জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির বলেন, “গাজায় হামলা চালিয়ে যেতে হবে, অভিবাসনকে উৎসাহ দিতে হবে। ইসরায়েলকে জিততেই হবে।”

শুধু কট্টরপন্থীরা না, মধ্যপন্থী রাজনীতিবিদরাও এই চুক্তির শর্তগুলো নিয়ে সন্দিহান। আসন্ন নির্বাচনে নেতানিয়াহুর প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটও এই চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

তিনি বলেন, হামাসের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি ধ্বংস না হলে যেকোনো চুক্তি ব্যর্থ।

কোন পথে হাঁটবেন নেতানিয়াহু

হামাস নিরস্ত্রীকরণ চুক্তি নিয়ে জটিল সমীকরণের মধ্যে পড়েছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন, অন্যদিকে দেশের। চুক্তির শর্ত মেনে না নিলে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের কুদৃষ্টিতে পড়বেন, শর্ত মেনে নিলে আসছে নির্বাচনে নিজ দেশের মানুষের ভোট হারাবেন।

ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ডভ ওয়াক্সম্যান বলেন, “তিনি যদি চুক্তির সমালোচনা করেন, তাহলে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হতে পারেন। আবার সমর্থন দিলে নিজ দেশের রাজনীতিতে ঝুঁকি তৈরি হবে।” 

আর অক্টোবরের নির্বাচনে জয়ী না হলে দুর্নীতির মামলায় দোষী সাব্যস্ত হয়ে জেল খাটতে হতে পারে নেতানিয়াহুকে। তবে বর্তমানে বিরোধীরা জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছে। দেশের জনমতের বিপক্ষে সিদ্ধান্ত নিলে নির্বাচনে জেতার সম্ভাবনা অনেক কমে যাবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। 

“তিনি যদি চুক্তির সমালোচনা করেন, তাহলে ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হতে পারেন। আবার সমর্থন দিলে নিজ দেশের রাজনীতিতে ঝুঁকি তৈরি হবে।” 

মার্কিন-ইসরায়েলি জরিপ বিশ্লেষক ডালিয়া শেইন্ডলিনের মতে, নেতানিয়াহু মূলত তার জোটের ডানপন্থি অংশীদারদের সন্তুষ্ট রাখাকেই বেশি গুরুত্ব দেবেন। ফলে গাজা থেকে সম্পূর্ণ সৈন্য প্রত্যাহার প্রায় অসম্ভব বলেই মনে করা হচ্ছে। আবার সৈন্য প্রত্যাহার না করলে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক নষ্ট হবে। শেইন্ডলিন বলেন, নেতানিয়াহু হয়তো গাজায় সেনা মোতায়েনের কিছু প্রতীকী পরিবর্তন দেখাতে পারেন, যাতে চুক্তি বাস্তবায়নের অগ্রগতি দেখানো যায়।

এর আগেও নেতানিয়াহু গাজা ইস্যুতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক শর্ত পাশ কাটিয়ে নিজের অবস্থান ধরে রেখেছেন। তবে এবার তাকে সিদ্ধান্ত জানাতেই হবে।

অন্যদিকে ইসরায়েলি বিশ্লেষক নিমরোদ গোরেন মনে করেন, নেতানিয়াহু হয়তো আনুষ্ঠানিকতা বজায় রাখবেন, কিন্তু বাস্তবে গাজা থেকে সরে আসবেন না।

তবে শুধু নেতানিয়াহু নন, অন্য যে কেউ ক্ষমতায় আসলেও তাদের জন্য ট্রাম্পের প্রত্যাশা সামলানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়বে। 

আর ইসরায়েল যেহেতু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেমোক্রেটদের উপেক্ষা করে আসছে, তাই ভবিষ্যতে একসাথে রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট, উভয় দলের সমর্থন হারানোর ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।