লোহিত সাগরে নতুন সংঘাতের শংকা, স্থল ও সমুদ্র অভিযানের প্রস্তুতি সৌদি আরবের

মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনার নতুন ক্ষেত্র হয়ে উঠছে লোহিত সাগর। ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীর চলমান হামলা ও সমুদ্রপথে চাপের মুখে এবার সমুদ্রের পাশাপাশি স্থল অভিযানেরও প্রস্তুতি নিচ্ছে সৌদি আরব। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক সমর্থন নিয়ে একটি বহুজাতিক নৌ নিরাপত্তা জোট গঠনের উদ্যোগও জোরদার করেছে রিয়াদ। 

দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে ইয়েমেনি একটি সূত্র বলছে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে ইয়েমেন সংঘাত নতুন মাত্রা পেতে পারে এবং এর প্রভাব পড়তে পারে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যপথে।

ইয়েমেনি সূত্র আরও বলছে, সম্ভাব্য স্থল অভিযানের প্রস্তুতির অংশ হিসেবে সৌদি বাহিনীকে ইয়েমেনের পূর্বাঞ্চল থেকে প্রত্যাহার করা হচ্ছে। একই সময়ে লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখতে আন্তর্জাতিক নৌ জোট গঠনের কূটনৈতিক তৎপরতাও চালিয়ে যাচ্ছে রিয়াদ। 

সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, তুরস্ক, পাকিস্তান, মিশর, সুদান ও জিবুতিসহ ১৪টি দেশ বহুজাতিক সামুদ্রিক প্রতিরক্ষা জোটের প্রতি সমর্থন জানিয়েছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য ও ইতালিকেও এ উদ্যোগে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সৌদি আরব।

এদিকে ইয়েমেনের রাজধানী সানা এবং লোহিত সাগর উপকূলের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণকারী ইরান-সমর্থিত হুথিরা গত ২০এ জুলাই সৌদি জাহাজের বিরুদ্ধে অবরোধ কার্যকরের ঘোষণা দেয়। যদিও তারা দাবি করেছে, এটি সব জাহাজের বিরুদ্ধে নয়; সৌদি আরব ইয়েমেনের ওপর আরোপিত অবরোধ প্রত্যাহার করলে তারাও সমুদ্রপথের অবরোধ তুলে নেবে।

তেলের রুটকে ঘিরে বাড়ছে বিশেষ গুরুত্ব

ইরান-সংলগ্ন হরমুজ প্রণালিটি সংঘাতের কারণে পথটি দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। ফলে সৌদি আরব ধীরে ধীরে লোহিত সাগরকে ঘিরে গড়ে ওঠা রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল হয়ে উঠেছে।

ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে দেশটির অধিকাংশ অপরিশোধিত তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি হতো। বর্তমানে অর্ধেকের বেশি তেল স্থলপথে ইয়ানবু বন্দর হয়ে লোহিত সাগরে যায়। সেখান থেকেই পাঠানো হচ্ছে আন্তর্জাতিক বাজারে। ফলে এই রুটে বিঘ্ন ঘটলে সৌদি আরবের জ্বালানি রপ্তানি বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে।

গত ২৫এ জুলাই হুথিরা সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলের তেলক্ষেত্রকে লোহিত সাগরের রপ্তানি কেন্দ্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ তেল পরিবহন অবকাঠামোতে হামলার দাবি করে। এর আগে সৌদি আরবও হোদাইদা বন্দরের হুথি-নিয়ন্ত্রিত স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। একই সময়ে লোহিত সাগরে সৌদির আরেকটি বাণিজ্যিক জাহাজও হামলার শিকার হয়।

স্থল অভিযান কি সামনে

ইয়েমেনি সূত্রের বরাতে দ্য গার্ডিয়ান আরও জানাচ্ছে, সৌদি বাহিনী মধ্য-দক্ষিণ ইয়েমেনের আল-বেইডা গভর্নোরেট সেনা মোতায়েন জোরদার করছে। ২০২০-২১ সালে হুথিদের দখলে যাওয়া এই এলাকাকে সম্ভাব্য সামরিক অভিযানের লক্ষ্য হিসেবে দেখা হচ্ছে।

তবে একই সঙ্গে সৌদি নেতৃত্ব প্রকাশ্যে জানিয়েছে, তারা নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চাইলেও ইরানের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ আরও বিস্তৃত করতে আগ্রহী নয়। সৌদি প্রতিরক্ষামন্ত্রী প্রিন্স খালিদ বিন সালমান সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের সঙ্গে বৈঠক করে পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন।

আঞ্চলিক উত্তেজনা আরও বাড়ার আশংকা

পর্যবেক্ষকদের মতে, লোহিত সাগর ও হরমুজ, এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ একই সময়ে অস্থির হয়ে পড়লে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং শিপিং খাতেও এর প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত নতুন করে সামরিক রূপ নিতে পারে।

অন্যদিকে ওমানের মধ্যস্থতায় ইরানের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি ঘিরে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে। আলোচনায় অগ্রগতি হলে আঞ্চলিক উত্তেজনা কিছুটা কমতে পারে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে সামরিক প্রস্তুতি ও কূটনৈতিক তৎপরতা দুটিই সমানভাবে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও অনিশ্চিত করে তুলছে।

 

(দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে)