খামেইনির শেষকৃত্যকে যেভাবে বিশ্বজুড়ে এক বার্তায় রূপান্তর করলো ইরান

ইরানের দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেইনির দাফন ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির ইতিহাসের অন্যতম জমকালো এবং বিশদ রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যের সমাপ্তি টেনেছে। সপ্তাহব্যাপী চলা এই শোকের আয়োজন কেবল একজন নেতার প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিলো না। বরং, এটি ছিলো এক বিশাল রাজনৈতিক মহড়া।

ধর্মীয় প্রতীক, জাতীয়তাবাদী আবেগ এবং কৌশলগত বার্তার মিশ্রণ ঘটিয়ে ইরান বিশ্ববাসীকে যে বার্তা দিতে চেয়েছে তা হলো, রাষ্ট্রনেতা মারা যেতে পারেন কিন্তু রাষ্ট্র ও তার আদর্শ অমর।

ফেব্রুয়ারি মাসে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলায় খামেইনির হত্যাকাণ্ডের পর দেশটির অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতি ছিলো উত্তাল। এক নাজুক মুহূর্তে এই শেষকৃত্য আয়োজন করা হয়েছে, যার লক্ষ্য ছিলো পরিষ্কার— মিত্রদের আশ্বস্ত করা যে রাষ্ট্রের ভিত এখনো অটুট এবং আঞ্চলিক প্রতিপক্ষ ও ওয়াশিংটনকে বুঝিয়ে দেওয়া যে, ইরানের ‘প্রতিরোধের নীতি’ মোটেও নড়চড় হয়নি।

শোকের প্রতীক হিসেবে কালো রং আর ইমাম হোসেনের শাহাদাতের স্মৃতি মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য লাল পতাকার ছড়াছড়ি ছিলো সবখানে।

চ্যাথাম হাউসের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক বিশেষজ্ঞ সানাম ভাকিল যেমনটি বলেছেন, এই পুরো আয়োজনটি ছিলো একটি ‘কৌশলগত সিগন্যালিং।’ এটি একই সঙ্গে ইরানের অভ্যন্তরীণ জনমত, আঞ্চলিক মিত্র এবং আন্তর্জাতিক শত্রুদের লক্ষ্য করে চালানো এক সুনিপুণ কূটনৈতিক চাল।

মাশহাদের ইমাম রেজা মাজারে খামেইনির দাফনের মধ্য দিয়ে শেষ হয়েছে কয়েকদিনের রাষ্ট্রীয় শোকপর্ব। রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির মৃত্যুর পর এত বড় গণজমায়েত ইরান আগে কখনো দেখেনি।

সুপরিকল্পিত আবেগ ও প্রতীকবাদ

ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম এই শেষকৃত্যকে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত আবেগ হিসেবে তুলে ধরলেও, এর নেপথ্যে ছিলো এক সূক্ষ্ম পরিচালনা। তেহরানের রাস্তায় কালো পোশাক পরিহিত লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড়, পতাকা মোড়ানো পাঁচটি কফিন নিয়ে ধীরগতিতে এগোতে থাকা মিছিল, সবই ছিলো আবেগের বহিঃপ্রকাশ।

তবে সেই আবেগের পেছনে ছিলো এক কঠোর ব্যবস্থাপনা। মিছিলের রুট, মঞ্চের নকশা, এমনকি বিদেশি প্রতিনিধিদলের সাথে যোগাযোগের ধরণ, সবকিছুই ছিলো ইরানের সরকারি বয়ানকে শক্তিশালী করার লক্ষ্যে তৈরি।

তেহরান খামেইনিকে কেবল একজন রাষ্ট্রনেতা হিসেবে নয়, বরং একজন ‘শহীদ’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছে। শহরের বিলবোর্ডে বড় বড় অক্ষরে লেখা ছিলো ‘উই মাস্ট রাইজ’ (আমাদের জেগে উঠতে হবে)। তবে আরবি ভাষায় এর অনুবাদ করা হয়েছিলো ‘রাইজ ফর গড’ বা ‘সৃষ্টিকর্তার জন্য জেগে ওঠো’, যা সরাসরি কুরাআনের বাণীর প্রতিধ্বনি। এর মাধ্যমে তারা ধর্মীয় ভক্তিকে রাজনৈতিক সংহতির সঙ্গে জুড়ে দিয়েছে।

পুরো আয়োজনে শিয়া ইসলামের ঐতিহ্যের ব্যবহার দেখা গেছে। শোকের প্রতীক হিসেবে কালো রং আর ইমাম হোসেনের শাহাদাতের স্মৃতি মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য লাল পতাকার ছড়াছড়ি ছিলো সবখানে। তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লা মসজিদে উড়ন্ত সেই বিশাল লাল পতাকা, যেখানে লেখা ছিলো ‘হে হোসেনের প্রতিশোধ গ্রহণকারীরা’, তা উপস্থিত জনতার মনে খামেইনির মৃত্যুকে কেবল একটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে নয়, বরং ইসলামের ইতিহাসে অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের নতুন একটি অধ্যায় হিসেবে গেঁথে দিয়েছে।

খামেইনির শেষ মুহূর্তের সেই মুষ্টিবদ্ধ হাতের ছবিটিকে তারা বিপ্লবের অবিনশ্বর প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছে। বার্তাটি ছিলো স্পষ্ট—নেতা চলে গেছেন, কিন্তু বিপ্লব হার মানেনি।

রাজনৈতিক শেষকৃত্য ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির ইতিহাসে দীর্ঘকাল ধরেই একটি নির্ধারক ভূমিকা পালন করে আসছে।

কূটনীতিতে কুরআনের ব্যবহার: এক নতুন ভাষা

এই শেষকৃত্যের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক ছিলো বিদেশি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কুরাআনের আয়াত নির্বাচন। ইরান প্রথাগত কূটনীতির বদলে বেছে নিয়েছিলো ধর্মীয় বার্তা। যেমন, হেজবুল্লাহ বা হামাসের মতো মিত্রদের তারা দিয়েছিলো দৃঢ়তা ও ত্যাগের বাণী। পাকিস্তানকে দেওয়া হয়েছিলো ভ্রাতৃত্বের বার্তা। কিন্তু অন্যদের ক্ষেত্রে সুর ছিলো ভিন্ন। 

সৌদি প্রতিনিধিদলকে শোনানো হয়েছে বদরের যুদ্ধের ঘটনা, যেখানে একটি ছোট্ট বাহিনী আল্লাহর সাহায্যে বিশাল সেনাবাহিনীকে পরাজিত করেছিলো। এটি ছিলো একটি পরোক্ষ হুঁশিয়ারি যে, সামরিক শক্তির চেয়ে বিশ্বাস বড়। 

তুরস্ককেও বাদ দেওয়া হয়নি। যারা এই যুদ্ধে নিরপেক্ষ ছিলো, তাদের পরোক্ষভাবে ‘মাঠের বাইরের দর্শক’ হিসেবে ছোট করে দেখানো হয়েছে। এভাবে ধর্মের মোড়কে ইরান তার মিত্রদের পুরস্কৃত করেছে এবং শত্রুদের দিয়েছে সূক্ষ্ম বার্তা।

ছবি আলাপ (45)

সানাম ভকিল এই আয়াত নির্বাচনকে ধর্মের মাধ্যমে ‘কৌশলগত সিগন্যালিং’ বলে অভিহিত করেছেন, যা সরাসরি কূটনৈতিক সংঘাত এড়িয়ে আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের সতর্ক করার একটি কার্যকর উপায় ছিলো।

‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্টেন্স’ ও আঞ্চলিক সমীকরণ

হেজবুল্লাহ, হামাস, ফিলিস্তিনি ইসলামিক জিহাদ এবং ইয়েমেনের হুথি আন্দোলনের প্রতিনিধিদের সরব উপস্থিতি প্রমাণ করেছে যে, খামেইনির মৃত্যুর পরও ইরান তার আঞ্চলিক ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্টেন্স’ বা প্রতিরোধের অক্ষ বজায় রাখতে বদ্ধপরিকর। এই আয়োজন দিয়ে তারা মিত্রদের নিশ্চিত করতে চেয়েছে যে, সাম্প্রতিক সামরিক ধাক্কাগুলোর পরও তেহরানের নেটওয়ার্ক এখনো অক্ষত।

তবে এই বাহ্যিক দৃঢ়তার আড়ালে ইরানের ভেতরে রয়ে গেছে গভীর সংকট। একদিকে জনসমক্ষে প্রতিশোধের তীব্র হুংকার, স্লোগান দিচ্ছে ‘আমেরিকা নিপাত যাক’, ‘প্রতিশোধ অনিবার্য’। অন্যদিকে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে নিষেধাজ্ঞা শিথিল ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। এই দ্বিমুখী নীতিই বর্তমান ইরানি নেতৃত্বের বড় চ্যালেঞ্জ।

এই জনসমাবেশের চিত্র কি আসলেই গোটা জাতির প্রতিচ্ছবি? রাষ্ট্রীয় টিভিতে লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড় দেখালেও, তেহরানের অনেক সাধারণ মানুষ এই আয়োজন থেকে নিজেদের দূরে সরিয়ে রেখেছে। অর্থনৈতিক মন্দা, মুদ্রাস্ফীতি আর বছরের পর বছর ধরে চলে আসা রাজনৈতিক কঠোরতায় অতিষ্ঠ মানুষ।

বিবিসির প্রতিবেদন বলছে, অনেকেই বলছেন তাদের কাছে শোকের চেয়েও বড় সমস্যা হলো বেঁচে থাকা। সরকারের কট্টর দমন-পীড়নের শিকার হয়ে যে হাজার হাজার মানুষ কারাগারে বা মৃত, তাদের পরিবারগুলো এই রাষ্ট্রীয় শোককে মেনে নিতে পারেনি।

তারা বলেছে, আসল বিপ্লবের কণ্ঠস্বর এই মিছিলে নেই, বরং গত কয়েক মাসের সরকারবিরোধী আন্দোলনে যে সুর শোনা গিয়েছিলো, সেটাই ছিলো প্রকৃত জনমতের প্রতিফলন।

ছবি আলাপ (44)

মোজতবার অনুপস্থিতি ও নেতৃত্বের শূন্যতা

সবচেয়ে রহস্যময় ব্যাপার ছিলো খামেইনির উত্তরাধিকারী মোজতবা খামেইনির অনুপস্থিতি। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে নতুন নেতার দেখা না পাওয়াটা রাজনৈতিক অঙ্গনে বেশ প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। সরকারিভাবে নিরাপত্তা উদ্বেগের কথা বলা হলেও, বিশ্লেষকরা মনে করছেন এই অনুপস্থিতি তার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় এক বিশাল চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। আলী খামেইনি চার দশকের দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় যে ক্ষমতার জাল বুনেছিলেন, তা হুট করে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া সহজ নয়।

‘কার্নেগি এন্ডোমেন্ট ফর ইন্টারন্যাশনাল পিস’-এর করিম সাজাদপুরের মতে, ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির ইতিহাসে এমন বাবা থেকে সরাসরি ছেলেতে ক্ষমতা হস্তান্তরের ঘটনা আগে ঘটেনি। আলী খামেইনির কর্তৃত্ব কেবল সাংবিধানিক ক্ষমতার ওপর ছিলো না, বরং চার দশকের ব্যক্তিগত প্রভাব ছিলো তার ভিত্তি। নতুন সর্বোচ্চ নেতা হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া আর সেই শক্তিশালী নেটওয়ার্ক নিয়ন্ত্রণ করা; এই দুইয়ের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য রয়েছে।

আঞ্চলিক কূটনীতির নতুন সমীকরণ

২০২৪ সালে প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির জানাজায় উপসাগরীয় দেশগুলোর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের উপস্থিতি ছিলো, কিন্তু এবার সৌদি আরব, কাতারসহ অন্যান্য দেশ তুলনামূলক নিম্নপর্যায়ের প্রতিনিধি পাঠিয়ে নিজেদের কৌশলী অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে। এটি স্পষ্ট করে দেয় যে, খামেইনির মৃত্যুর পর মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে দেশগুলো এখন নতুন করে নিজেদের অবস্থান যাচাই করছে। কাতার তাদের সংসদের স্পিকারকে পাঠিয়েছিলো এবং সৌদি আরব তাদের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে পাঠায়। এমনকি সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং কুয়েত কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিনিধিদলই পাঠায়নি। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, কূটনৈতিক চ্যানেল খোলা থাকলেও যুদ্ধের পর উপসাগরীয় দেশগুলো ইরানের সাথে সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস করছে।

রাজনৈতিক ভাষা হিসেবে ধর্ম

এই শেষকৃত্যের সবচেয়ে বড় শিক্ষা হয়তো এটিই যে, ইরান রাষ্ট্র পরিচালনার হাতিয়ার হিসেবে ধর্মকে কত কার্যকরভাবে ব্যবহার করেছে। ইমাম হোসেনের ডাক দেওয়া বিশাল লাল পতাকা থেকে শুরু করে তেহরান থেকে কোম ও মাশহাদের পবিত্র শহরগুলোকে যুক্ত করার পরিকল্পনা, সবই ছিলো ইসলামি প্রজাতন্ত্রের এই দাবিকে শক্তিশালী করার জন্য যে, তাদের রাজনৈতিক ক্ষমতা শিয়া ইসলাম থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।

সরাসরি রাজনৈতিক বিবৃতি দেওয়ার চেয়ে, সরকার তাদের বার্তাগুলোকে শতাব্দীর পুরনো ধর্মীয় বর্ণনার মধ্যে ঢুকিয়ে দিয়েছে, যা মুসলিম বিশ্বের মানুষের কাছে পরিচিত। ইরান ইচ্ছাকৃতভাবেই সমসাময়িক ভূ-রাজনৈতিক সংঘাতগুলোকে ইসলামি ইতিহাসের লেন্স দিয়ে দেখার চেষ্টা করেছে।

এই কৌশল তেহরানের প্রতিরোধের বয়ানকে আরও শক্তিশালী করেছে। কারবালায় ইমাম হোসেনের শাহাদাতের কথা বারবার উল্লেখ করে তারা খামেইনির হত্যাকাণ্ডকে কেবল একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি হিসেবে নয়, বরং অন্যায়ের বিরুদ্ধে এক ঐতিহাসিক লড়াইয়ের অংশ হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছে।

শোকের পেছনের বার্তা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ

রাজনৈতিক শেষকৃত্য ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির ইতিহাসে দীর্ঘকাল ধরেই একটি নির্ধারক ভূমিকা পালন করে আসছে। ১৯৮৯ সালে আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির জানাজা আলী খামেইনির নেতৃত্বের সূচনা করেছিলো।

সাঁইত্রিশ বছর পর খামেইনির নিজের শেষকৃত্য সাজানো হয়েছিলো অন্য একটি ট্রানজিশনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য, যাতে সমর্থকদের আশ্বস্ত করা যায় যে তিনি যে প্রতিষ্ঠানগুলো তৈরি করেছিলেন, তারা এই অভাবনীয় ক্ষতির পরেও অক্ষত।

এই লক্ষ্য অর্জন হয়েছে কি না, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকেলেও, অনুষ্ঠানটি নিঃসন্দেহে সাম্প্রতিক ইরানি ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম গণজমায়েত আয়োজনের সক্ষমতা দেখিয়েছে এবং প্রতিরোধের একটি সুশৃঙ্খল বয়ান তৈরি করে লাখ লাখ সমর্থককে এক ছাতার নিচে আনতে পেরেছে।

বিশ্বজুড়ে সম্প্রচারিত ছবিগুলো অনিশ্চয়তার সময়েও শৃঙ্খলা ও দৃঢ়তার বার্তা দিয়েছে। তবে এই শেষকৃত্য একই সঙ্গে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির ওপর চেপে বসা চাপগুলোকেও উন্মোচিত করেছে। 

ইরান এখনো মুদ্রাস্ফীতি, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা এবং জীবনযাত্রার মান কমে যাওয়ার মতো মারাত্মক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে। যুদ্ধের কারণে সামরিক অবকাঠামোর ক্ষতি হয়েছে এবং আঞ্চলিক উত্তেজনা বেড়েছে।

ইরানের নেতৃত্বকে এখন একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে। একদিকে খামেইনির হত্যাকাণ্ডের প্রতিশোধের জন্য কট্টরপন্থীদের দাবি মেটাতে হবে, অন্যদিকে অর্থনৈতিক চাপ কমাতে ও যুদ্ধের ভয়াবহতা এড়াতে যুক্তরাষ্ট্র এবং আঞ্চলিক শক্তির সাথে কূটনৈতিক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।

এই বৈপরীত্যই হয়তো মোজতবা খামেইনির নেতৃত্বের শুরুর বছরগুলোকে সংজ্ঞায়িত করবে। 

তিনি উত্তরাধিকার সূত্রে এমন একটি দেশ পেয়েছেন যা অর্থনৈতিক চাপে আছে, একটি অস্থির আঞ্চলিক পরিবেশ এবং এমন একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থা যা উত্তরাধিকার, বৈধতা এবং ভবিষ্যতের দিকনির্দেশনা নিয়ে প্রশ্নের মুখে রয়েছে।

শেষ পর্যন্ত, সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানটি একজন নেতার শোক পালনের চেয়েও অনেক বেশি কিছু ছিলো। ইরান বোঝাতে চেয়েছে যে, তাদের সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতাকে হারানোর পরেও তার স্থিতিশীল।

দেশের জনগণের জন্য, এই শেষকৃত্য পুনর্ব্যক্ত করেছে যে ১৯৭৯ সালের বিপ্লবী আদর্শ এখনো আনুগত্য পাওয়ার যোগ্য। 

অ্যাক্সিস অব রেজিস্টেন্স-এর সদস্যদের ইঙ্গিত দিয়েছে যে সাম্প্রতিক সামরিক ধাক্কা সত্ত্বেও তেহরানের আঞ্চলিক জোট এখনো অক্ষত। আর আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী এবং পশ্চিমা সরকারগুলোকে বার্তা দেওয়া হয়েছে যে ইরান তাদের কৌশলগত অবস্থান ছেড়ে দিতে বা বাইরের চাপে তাদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে দিতে মোটেও রাজি নয়।

মাশহাদের ইমাম রেজা মাজারে যখন শেষ প্রার্থনা শেষ হলো এবং আয়াতুল্লাহ আলি খামেইনিকে সমাহিত করা হলো, তখন সেই শেষকৃত্য বিশ্বের কাছে একটি পরিষ্কার বার্তা পৌঁছে দিয়েছে। ইরান চায় তাদের মিত্র এবং প্রতিপক্ষ বিশ্বাস করুক যে, প্রায় চার দশক ধরে ইসলামি প্রজাতন্ত্রটির মূর্ত প্রতীক হিসেবে যিনি ছিলেন, তিনি চলে গেলেও তার গড়া রাজনৈতিক ব্যবস্থা, ধর্মীয় আদর্শ এবং আঞ্চলিক উচ্চাকাঙ্ক্ষা এখনো দৃঢ়ভাবে টিকে আছে। এই বার্তা কি চিরস্থায়ী শক্তির প্রতিফলন, নাকি কেবল প্রতীকী, তা সামনের দিনগুলোতে আরও স্পষ্ট হবে।

ইরান তার বিপ্লবী পরবর্তী ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে প্রবেশ করছে। এটি এমন এক যাত্রা, যা কেবল তেহরানের অলিগলিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক ভূ-রাজনীতিকে আগামী কয়েক দশক ধরে প্রভাবিত করবে। খামেইনির শেষকৃত্য হয়তো শেষ হয়েছে, কিন্তু তার প্রস্থান পরবর্তী ইরানের আসল লড়াই কেবল শুরু হলো।