যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০ বছর: বিরূপ আবহাওয়ায় জমকালো আয়োজন

আকাশজুড়ে রঙিন আতশবাজি, যুদ্ধবিমানের পাহাড়ায় এয়ারফোর্স ওয়ানের মহড়া, নাগরিকত্ব দেওয়ার অনুষ্ঠান আরো কত কী। দেশজুড়ে উৎসবের আবহে যুক্তরাষ্ট্র উদযাপন করলো স্বাধীনতার ২৫০ বছর।

তীব্র তাপপ্রবাহ, বজ্রঝড়, বিদ্যুৎ বিভ্রাট আর প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক, কোনো কিছুতেই ফিকে হয়নি চোখ ধাঁধানো উৎসব।

১৭৭৬ সালের ৪ঠা জুলাই ফিলাডেলফিয়ার ইন্ডিপেনডেন্স হলে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র গৃহীত হওয়ার মধ্য দিয়ে ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসনের অবসানের সূচনা হয়। স্বাধীনতার ২৫০ বছর পূর্তিতেই দেশজুড়ে আয়োজন করা হয় ‘সেমিকুইনসেন্টেনিয়াল’ উৎসব।

ঝড়ের পর উৎসব

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসির ন্যাশনাল মলে ছিল মূল আয়োজন। যদিও সন্ধ্যার দিকে বজ্রঝড়ের শঙ্কায় পুরো এলাকা সাময়িকভাবে খালি করে দেওয়া হয়।

‘স্যালুট টু আমেরিকা’, ‘গ্রেট আমেরিকান স্টেট ফেয়ার’ এবং ফিফা ফ্যান জোনে থাকা দর্শনার্থীদের নিরাপদ আশ্রয়ে চলে যেতে বলা হয়।

ঝড় থেমে গেলে ফের শুরু হয় অনুষ্ঠান। নতুন এয়ার ফোর্স ওয়ানকে ঘিরে ‘এফ টোয়েন্টি টু র‌্যাপ্টর’ যুদ্ধবিমানের ফ্লাইওভার, কনসার্ট আর মধ্যরাত পেরুলে আকাশজুড়ে আতশবাজির ঝলকানি।

দক্ষিণ ক্যারোলাইনা থেকে আসা এক দর্শনার্থী বলছিলেন, এই দিনটি উদযাপনের জন্য তিনি গত বছরের নভেম্বর থেকেই পরিকল্পনা করেছিলেন। তার ভাষায়, "এটাই পৃথিবীর সেরা দেশ, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে নিজের মতো করে বাঁচতে পারে।"

‘আমেরিকান ড্রিম ইজ ব্যাক’

আয়োজনের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। বজ্রঝড়ের কারণে দেরিতে সমাবেশে আসেসন। বক্তব্যে তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে ‘নতুন স্বর্ণযুগের সূচনায়’ আছে বলে দাবি করেন। বলেন, ‘‘আমেরিকান ড্রিম ইজ ব্যাক”। অর্থাৎ আমেরিকার স্বপ্ন ফিরে এসেছে।

ভাষণে তিনি কমিউনিজমের বিরোধিতা, অস্ত্র বহনের সাংবিধানিক অধিকার এবং তার প্রশাসনের বিভিন্ন নীতির পক্ষে বক্তব্য তুলে ধরেন।

তার দাবি, যুক্তরাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ ‘ঈশ্বরের হাতে লেখা’ এবং দেশটি বিশ্বে এর নেতৃত্ব ধরে রাখবে।

তবে সমালোচকদের বলছেন, যে অনুষ্ঠান জাতীয় ঐক্যের প্রতীক হতে পারতো, ট্রাম্প সেখানে রাজনৈতিক বার্তাকে প্রাধান্য দিয়েছেন।

বিশেষ করে তার ব্যক্তিগত উদ্যোগে গঠিত ‘ফ্রিডম টু ফিফটি’ কমিটিকে ঘিরে বিতর্ক তীব্র হয়েছে।

সমালোচকদের অভিযোগ, কংগ্রেস সমর্থিত দ্বিদলীয় ‘আমেরিকা টু ফিফটি কমিশন’-এর পাশাপাশি আলাদা উদ্যোগ নিয়ে ট্রাম্প জাতীয় এই আয়োজনকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক করে ফেলেছেন।

অন্যদিকে ট্রাম্পসমর্থকদের যুক্তি, তিনি কেবল স্বাধীনতার মূল্যবোধ ও জাতীয় গর্বকে নতুন করে তুলে ধরেছেন।

চার সাবেক প্রেসিডেন্টের চার বার্তা

এবারের স্বাধীনতা দিবসে জীবিত চার সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্টও আলাদা বার্তা দিয়েছেন।

জো বাইডেন স্মরণ করিয়ে দেন, স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে ‘সব মানুষ সমান’, এই নীতির কথা বলা হলেও সেই আদর্শ বাস্তবায়নের কাজ এখনো শেষ হয়নি।

বারাক ওবামা বলেছেন, প্রতিটি প্রজন্মের দায়িত্ব আগের প্রজন্মের অসমাপ্ত কাজকে এগিয়ে নেওয়া।

জর্জ ডব্লিউ বুশ বলেছেন ‘দর্শক নয়, সক্রিয় নাগরিক’ হতে হবে।

অন্যদিকে বিল ক্লিনটন বলেন, ২৫০ বছর পূর্তির এই মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রে গভীর রাজনৈতিক বিভাজন, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান নিয়ে উদ্বেগ এবং বিশ্বে দেশের ভবিষ্যৎ ভূমিকা নিয়ে নতুন প্রশ্নের মুখোমুখি।

চারজন সাবেক প্রেসিডেন্টই মত দিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্রে গণতন্ত্র টিকিয়ে রাখতে নাগরিক অংশগ্রহণ ও জাতীয় ঐক্য আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজন।

উৎসবেও আছে বিতর্ক

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনের রাস্তায় চারশরও বেশি সদস্যের শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী সংগঠন ‘প্যাট্রিওট ফ্রন্ট’-এর মিছিল বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মুখোশ পরা সদস্যরা মার্কিন পতাকা হাতে সমবেতভাবে রাজধানীর বিভিন্ন সড়কে ঘুরে বেড়ায়।

সরকারি অনুষ্ঠানের সাথে এর কোনো সম্পর্ক না থাকলেও, স্বাধীনতার মতো জাতীয় দিবসে এমন একটি সংগঠনের প্রকাশ্য উপস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রে উগ্র জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক মেরুকরণ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

দেশজুড়ে উৎসব

শুধু ওয়াশিংটন নয়, নিউইয়র্ক, ফিলাডেলফিয়া, শিকাগো, বোস্টন ও অন্যান্য শহরেও ছিল উৎসবের আমেজ।

নিউইয়র্কের ব্রুকলিন ব্রিজের আকাশ আলোকিত করে আতশবাজির আয়োজন করা হয়। ভার্জিনিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটনের বাসভবন মাউন্ট ভার্ননে ৫০টি দেশের ১৫০ জন অভিবাসীকে মার্কিন নাগরিকত্ব দেওয়া হয়।

এই অনুষ্ঠানকে স্বাধীনতার আদর্শকে নতুন নাগরিকদের সঙ্গে যুক্ত করার প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।

অন্যদিকে নিউইয়র্কের কোনি আইল্যান্ডে ছিলো ঐতিহ্যবাহী হটডগ খাওয়ার প্রতিযোগিতা। মাত্র ১০ মিনিটে ৬৬টি হটডগ খেয়ে ১৮তমবারের মতো শিরোপা জেতেন জোয়ি চেস্টনাট। নারী বিভাগে ১২তমবারের মতো শিরোপা শিরোপা জেতেন মিকি সুডো।

এছাড়া ‘আমেরিকা টু ফিফটি’ আয়োজকরা ২০০ বছর পর খোলার জন্য একটি টাইম ক্যাপসুল মাটিতে পুঁতে রেখেছেন। এতে সংরক্ষণ করা হয়েছে সংবিধানের স্বাক্ষরিত অনুলিপি, কোকাকোলার একটি বোতল এবং ৫০টি অঙ্গরাজ্য ও বিভিন্ন মার্কিন ভূখণ্ডের প্রতিনিধিত্বকারী নিদর্শন।

এবারের উদযাপনে সবচেয়ে বড় বাস্তব চ্যালেঞ্জ ছিল আবহাওয়া। পূর্ব উপকূলজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহে কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছে যায়।

ওয়াশিংটন, নিউ জার্সি, পেনসিলভানিয়া, মেরিল্যান্ড ও কলোরাডোসহ বিভিন্ন স্থানে নির্ধারিত অনুষ্ঠান বাতিল, কোথাও সংক্ষিপ্ত করা হয়।

ঝোড়ো হাওয়ার কারণে উইসকনসিন, মিশিগান, ইলিনয়, ওহাইও, নিউইয়র্ক ও নিউ জার্সিতে প্রায় সাড়ে সাত লাখ মানুষ বিদ্যুৎহীন হয়ে পড়েন। শুধু মিশিগানেই সাড়ে ৩ লাখের বেশি বাড়িতে বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়।