ইরান-যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি: তেলের দাম কমলেও রয়ে গেছে শঙ্কা 

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নতুন চুক্তি স্বাক্ষরের পর বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বড় পতন হয়েছে তেলের দামের। তবে এর স্থায়িত্ব ও সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি স্বাভাবিক হওয়া নিয়ে এখনো প্রশ্ন রয়েছে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল পুরোপুরি স্বাভাবিক হলে তেলের দাম স্থায়ীভাবে কমতে পারে। 

চুক্তির শর্ত অনুযায়ী ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও হরমুজ প্রণালি খোলার সিদ্ধান্ত হলেও লজিস্টিকস এবং জাহাজ বীমা জটিলতার কারণে বাজারে তেল সরবরাহ স্বাভাবিক হতে কিছুটা সময় লাগবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

তবে বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও খোদ যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান তেল সংরক্ষণাগারগুলোর মজুত আশঙ্কাজনকভাবে কমে এসেছে। জ্বালানি খরচ হ্রাস পাওয়ায় বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি সাময়িকভাবে কমলেও পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি অনিশ্চিত।

ফলে বিশ্ববাজারের এই দ্বৈত বাস্তবতার মুখে মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ, ব্যাংক অব ইংল্যান্ড ও রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়ার মতো শীর্ষ কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সুদের হার উচ্চ রেখে এখনও সতর্ক অবস্থান বজায় রেখেছে।

আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামে বড় পতন

যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান অয়েল প্রাইস ডট কম-এর তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার এশিয়ার বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ২ দশমিক ৪০ শতাংশ কমে ৭৭ দশমিক ৬৪ ডলারে নেমে আসে। ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ২ দশমিক ৮৮ শতাংশ কমে দাঁড়ায় ৭৪ দশমিক ৫৮ ডলারে।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চুক্তি স্বাক্ষর

সংঘাত চলাকালীন সময়ে বিশ্লেষকরা তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ২০০ ডলারে পৌঁছানোর আশঙ্কা প্রকাশ করলেও বাস্তবে গত এক মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ৩৫ শতাংশের বেশি কমেছে বলে জানিয়েছে অয়েল প্রাইস ডট কম। 

চুক্তির শর্ত ও বাজারে নতুন তেলের প্রবেশের সম্ভাবনা

প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের মধ্যকার এই চুক্তির মূল শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া, ইরানের ওপর থেকে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা ইরানি সম্পদ ফেরত এবং তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচি থেকে সরে আসা।

জ্বালানি বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে রপ্তানির অপেক্ষায় রয়েছে ১৬ কোটি ব্যারেল অপরিশোধিত তেল। এর মধ্যে ৭ কোটি ব্যারেল তেল ইরানে উৎপাদিত।

ধারণা করা হচ্ছে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের ফলে এসব তেল দ্রুত বাজারে প্রবেশ করতে পারে।

যা বাজারে তেলের দাম আরও কমাতে ভূমিকা রাখবে।

তবে জি-৭ সম্মেলনে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প সতর্ক করেছেন, ইরান চুক্তি লঙ্ঘন করলে ওয়াশিংটন আবারও সামরিক পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত। 

হরমুজ প্রণালি ও সরবরাহ ব্যবস্থা নিয়ে ‘দ্বৈত বাস্তবতা’

বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারে তেলের দাম নিয়ে বিশ্লেষকদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মতভেদ। একদল বিশ্লেষক মনে করছেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ধারণার চেয়ে বেশি স্থিতিশীল এবং রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সময়ের মতোই ধাক্কা সামলে নিতে সক্ষম।

মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সের দাবি করেছেন, বুধবার রাতেই হরমুজ প্রণালি দিয়ে ১ কোটি ২৫ লাখ ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিবাহিত হয়েছে।

তবে স্যাটেলাইট ও শিপিং ট্র্যাকিং ডেটা সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’ বলছে পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়, জাহাজ চলাচল এখনও বেশ কম।

কেপলারের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৭ই জুন এই প্রণালি দিয়ে পার হয়েছে মাত্র ৬টি জাহাজ।

অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করছেন, বর্তমান চুক্তির স্থায়িত্ব নিয়ে বাজার হয়তো অতিরিক্ত আশাবাদী হয়ে উঠেছে।

তাদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের হরমুজ প্রণালি খুলে গেলেও  ওই অঞ্চলের তেল উৎপাদন রাতারাতি আগের অবস্থায় ফিরবে না।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের যুদ্ধবিরতি

ফিলিপ নোভার বিশ্লেষক প্রিয়াঙ্কা সাচদেবা সংবাদ মাধ্যম ব্লুমবার্গকে জানান, “যুদ্ধ শেষ হতে পারে এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল চলাচল ধীরে ধীরে স্বাভাবিক হতে পারে, কিন্তু এতদিনে যে ক্ষতি হয়েছে তা রাতারাতি পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।”

তিনি আরও বলেন, “শুধু তেল সরবরাহের সংকটই নয়, বরং মাসের পর মাস উচ্চ জ্বালানি খরচের কারণে আমদানিকারক দেশগুলোর ওপর যে অর্থনৈতিক চাপ পড়েছে, তাও দ্রুত ঠিক হবে না।”

একই সুরে কথা বলেছেন  ভরটেক্সা-এর সিনিয়র মার্কেট অ্যানালিস্ট জাভিয়ের ট্যাং। তিনি অয়েল প্রাইস ডট কম-কে বলেন, “চুক্তিটি চূড়ান্ত হলে জাহাজগুলো চাইবে বীমা করতে। তখন বীমা কোম্পানিগুলো রাজি হওয়ার পর খালি ট্যাংকার চলাচল বাড়বে। এরপর শুরু হবে অপরিশোধিত তেল উৎপাদন। তারপরই  সবশেষে শোধনাগারগুলো সচল হবে।”

অর্থাৎ, শিগগিরই বাজারে তেলের চাহিদা সম্পূর্ণভাবে মেটানো সম্ভব হচ্ছে না। 

মার্কিন তেল মজুতে টান ও আইইএ-র সতর্কতা 

অয়েল প্রাইস ডট কমের প্রতিবেদন অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি পুনরায় খোলার বিষয়ে তেল ব্যবসায়ী ছাড়া আর কেউ খুব একটা উৎসাহ দেখাচ্ছে না।

বীমা কোম্পানিগুলো স্বাভাবিকভাবেই পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে। জাহাজ মালিকরাও এখনই ঝুঁকি নিতে নারাজ।

বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে সতর্কতা জানিয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা আইইএ। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বুধবার আইইএ জানিয়েছে চাহিদার তুলনায় তেলের উৎপাদন বৃদ্ধি পেলে ২০২৭ সালের মধ্যে বাজারে অপরিশোধিত তেলের সরবরাহ বেড়ে যাবে।

তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের অপরিশোধিত তেলের মজুত ক্রমাগত কমছে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওকলাহোমার কাশিং-এ অবস্থিত দেশের প্রধান তেল সংরক্ষণাগারের রিজার্ভ কমে বর্তমানে প্রায় ২ কোটি ১০ লাখ ব্যারেলে নেমে এসেছে।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মজুত ২ কোটি ব্যারেলের কাছাকাছি বা তার নিচে নেমে আসলেই ট্যাংক অপারেটরদের জন্য বড় বিপদ সংকেত। কারণ তেল সংরক্ষণের বিশাল ট্যাংক ও পাইপলাইনগুলো সচল রাখতে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ তেল সবসময় জমা রাখতে হয়। মজুত এর চেয়ে কমে গেলে পুরো সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

এর আগে ২০২২ সালেও মার্কিন জ্বালানি খাতে এমন জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। সেসময় উক্রেইন  আক্রমণের জেরে রাশিয়ার ওপর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম বৃদ্ধি পায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তৎকালীন মার্কিন  প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন 'স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ' (এসপিআর) থেকে রেকর্ড ১৮ কোটি ব্যারেল তেল বাজারে ছেড়েছিল।

বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সতর্ক অবস্থান

জ্বালানি খরচ কমে আসায় বিশ্ব বাজারে মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি অনেকটাই কমবে বলে আশা করছে বিশ্লেষকরা। তবে চাপ কিছুটা কমলেও পরিস্থিতি এখনো অনিশ্চিত।

ফলে বিশ্বের প্রধান কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো এখনও সতর্ক অবস্থান বজায় রেখে প্রয়োজনে নীতি কঠোর করার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে।

বিশেষ করে উন্নত অর্থনীতির দেশ বা ‘জি-১০’ মূল্যস্ফীতি দীর্ঘস্থায়ী হলে তারা আরও কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করবে বলে জানিয়েছে।

জি-১০ দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে সর্বোচ্চ সুদের হার অস্ট্রেলিয়ায়। ৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ। বিশ্ববাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে তৈরি হওয়া মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় ‘রিজার্ভ ব্যাংক অব অস্ট্রেলিয়া’ এ বছর তিন দফায় সুদের হার বাড়িয়েছে। চলতি সপ্তাহে সুদের হার বৃদ্ধি স্থগিত রাখলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংক জানিয়েছে, প্রয়োজন হলে বছরের শেষ নাগাদ তারা আবারও সুদের হার বাড়াতে পারে।

সুদের হারে অস্ট্রেলিয়ার পরেই রয়েছে নরওয়ে। ৪ দশমিক ২৫ শতাংশ। গত মে মাসে দেশটির মূল্যস্ফীতি অপ্রত্যাশিতভাবে বেড়ে যাওয়ার পর ‘নরজেস ব্যাংক’ ‘হকিশ স্ট্যান্স’ বজায় রেখেছে। অর্থাৎ এমন একটি কঠোর মুদ্রানীতি, যা মূলত মূল্যস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নেওয়া হয়।

চলতি সপ্তাহে সুদের হার অপরিবর্তিত রাখলেও ব্যাংকটি জানিয়েছে যে, মূল্যস্ফীতি লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি থাকায় এ বছরের শেষের দিকে ঋণের খরচ আরও বাড়তে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকেই ‘ব্যাংক অব ইংল্যান্ড’ তাদের মূল সুদের হার ৩ দশমিক ৭৫ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। আগামী মাসগুলোতে মূল্যস্ফীতি কিছুটা বাড়লেও তা আগে থেকে দেওয়া পূর্বাভাসের চেয়ে কম হতে পারে বলে ধারণা নীতিনির্ধারকদের। তবে বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বছরের শেষ নাগাদ যুক্তরাজ্যে আরও অন্তত একবার সুদের হার বাড়তে পারে।

ডনাল্ড ট্রাম্প

যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভও চলতি সপ্তাহে সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছে। ফেড চেয়ারম্যান জেরোম পাওয়েল মন্তব্য করেছেন ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ সুদের হার আরও বাড়তে পারে। ফেডারেল রিজার্ভের ৯ জন কর্মকর্তা সুদের হার বাড়ানোর পক্ষে মত দেওয়ায় আগামী সেপ্টেম্বরের শুরুতেই সুদের হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা দেখছেন ব্যবসায়ীরা।

ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় তিন বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো সুদহার বাড়িয়ে ২ দশমিক ২৫ শতাংশে উন্নীত করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতজনিত জ্বালানি সংকট যাতে ইউরোজোনে মূল্যস্ফীতি না বাড়ায়, সে লক্ষ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আরও এক দফা হার বৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

জাপানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক সুদহার ১ শতাংশে উন্নীত করেছে, যা তিন দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ। দীর্ঘদিনের শিথিল মুদ্রানীতি থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে আরও কঠোর নীতির ইঙ্গিতও দিয়েছে ব্যাংক অব জাপান।

অন্যদিকে সুইজারল্যান্ডে নীতিগত সুদের হার ০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। সুইস ন্যাশনাল ব্যাংক জানিয়েছে, মূল্যস্ফীতি তুলনামূলক স্থিতিশীল থাকলেও তারা মুদ্রাবাজার ও সুইস ফ্রাঁর শক্ত অবস্থান নিয়ন্ত্রণে নজর রাখছে।

বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক চুক্তির ফলে ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি অনেকটা কমলেও মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি এখনও পুরোপুরি স্থিতিশীল নয়। যুদ্ধবিরতি কতটা কার্যকর হয় এবং কত দ্রুত তেল সরবরাহ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে, তার ওপরই নির্ভর করবে আগামী দিনে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারের গতিপ্রবাহ। 

(রয়টার্স, দ্য ইকোনোমিক টাইমস, আলজাজিরা, অয়েল প্রাইস ডট কম অবলম্বনে)