ভারতের প্রধান বিচারপতির এক মন্তব্যই যেন দেশটির রাজনীতির জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনলাইন দুনিয়ায় তীব্র সাড়া ফেলা ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) এবার নেমে এসেছে রাস্তায়। শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবি নিয়ে শনিবার নয়াদিল্লিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করে অসংখ্য তরুণ ও শিক্ষার্থীরা।
গত এক মাস ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি তুলে আসছে ককরোচ জনতা পার্টি। পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস ও দ্বাদশ শ্রেণির চূড়ান্ত পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে অনিয়মের অভিযোগ তুলে পদত্যাগের দাবি জানানো হয়। এ দাবি নিয়ে শনিবার রাজধানী দিল্লির জন্তর মন্তর এলাকায় আন্দোলনের ডাক দেয় সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিত দিপকে।
এই আন্দোলনে যোগ দিতে ঘোষণা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে ফেরেন বস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে সদ্য স্নাতকোত্তর শেষ করা দিপকে। বিক্ষোভ কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে সমর্থকদের উদ্দেশে ভাষণও দেন তিনি। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে নয়া দিল্লির জন্তর মন্তর এলাকায় শত শত বিক্ষোভকারীদের সজোরে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান তুলতে দেখা যায়।
কেন উঠছে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি
দ্বাদশ শ্রেণির চূড়ান্ত পরীক্ষার উত্তরপত্রের ডিজিটাল মূল্যায়নসহ নানা অনিয়মের কারণে পরীক্ষা প্রক্রিয়াটি বিতর্কে ঘেরা ছিল। স্কুল বোর্ডের এই নজিরবিহীন কেলেঙ্কারির মাত্র এক সপ্তাহ আগেই প্রশ্ন ফাঁসের কারণে স্নাতকদের সবচেয়ে বড় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা বাতিল করা হয়।
হতাশ শিক্ষার্থীরা অভিযোগ তুলছেন এই ধরনের ঘটনা প্রতিবছর ঘটলেও এর কোনো রাজনৈতিক জবাবদিহিতা নেই।
তরুণ শিক্ষার্থীদের এই ক্ষোভ ককরোচ পার্টির সমর্থন বাড়াতে কাজে আসে বলে মনে করেন অনেকেই। প্রশ্ন ফাঁসসহ নানা ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির অভিযোগ তুলে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে রাজধানীতে “সব তেলাপোকাকে এক হওয়ার” ডাক দিয়েছিল দলটি।
ককরোচ পার্টির উত্থান
ভারতের প্রধান বিচারপতি সুরিয়া কান্ত ১৫ই মে এক বক্তব্যে দেশটির বেকার জনগোষ্ঠীকে “পরজীবী” ও “তেলাপোকা” বলে সম্বোধন করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ‘এক্স’-এ অভিজিৎ দিপকে প্রশ্ন তোলেন, “তাহলে সব ককরোচ একত্রিত হলে কেমন হয়?”
প্রধান বিচারপতির সেই বক্তব্যের এক দিন পরেই আবির্ভূত হয় ককরোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি।
এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লাখ লাখ ফলোয়ার হয়ে গেছে ককরোচ পার্টির। সিজেপি’র গুগল ফর্মের মাধ্যমে হাজার হাজার সদস্য যুক্ত হতে শুরু করে। হ্যাশট্যাগে জনপ্রিয় হয়ে ওঠে ম্যায়ভিককরোচ।
সিজেপি’র সদস্য হতে কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়। সদস্য হতে হলে হতে হবে বেকার, অলস ও সক্রিয় থাকতে হবে অনলাইনে, থাকতে হবে অভাব অভিযোগের কথা তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করার ক্ষমতা; যাকে তারা বলছে পেশাগতভাবে “র্যান্ট” করতে পারা।
সদস্য সংখ্যার দিক থেকে বিশ্বের বৃহত্তম রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত বিজেপি’র অফিশিয়াল অ্যাকাউন্টকে কিছুদিনের মধ্যেই ছাড়িয়ে যায় সিজেপি। এক মাসেরও কম সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইন্সটাগ্রামে সিজেপির ফলোয়ার হয়েছে ২ কোটি ২৭ লাখ, যা বিজেপির ফলোয়ার সংখ্যার চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ।
নানা রাজনৈতিক ব্যাঙ্গাত্মক ছবি, ভিডিও শেয়ার করে সোশ্যাল মিডিয়ায় আন্দোলন টিকিয়ে রেখেছিল ককরোচ পার্টি। তবে এবার মাঠ পর্যায়ে বিক্ষোভে নেমেছে তারা।
কে এই অভিজিত দিপকে
এই অসহনীয় গরমের মধ্যে হুডি পরে ভারতে পা রাখেন অভিজিত দিপকে। শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ পার্টির নেতৃত্বে বিক্ষোভ সমাবেশে যোগ দিতেই তার ভারতে আসা।
বস্টন ইউনিভার্সিটির সদ্য স্নাতক অভিজিত দিপকে একজন পলিটিক্যাল কমিউনিকেশন স্ট্র্যাটেজিস্ট। তার কাজের মূল জায়গা হলো ন্যারেটিভ বা বয়ান তৈরি করা, জনসংযোগ ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রাজনৈতিক মতামত তৈরি করা।
ভারতের পুনেতে সাংবাদিকতা নিয়ে পড়াশোনা করেন তিনি। পরে উচ্চশিক্ষার জন্য পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে। সেখানে বস্টন ইউনিভার্সিটি থেকে জনসংযোগের ওপর স্নাতকোত্তর ডিগ্রি সম্পন্ন করেন।
যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার আগে ৩০ বছর বয়সী অভিজিত আম আদমি পার্টির সোশ্যাল মিডিয়া টিমের সাথে কাজ করতেন। ২০২০ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মিম-ভিত্তিক ডিজিটাল প্রচারণায় যুক্ত ছিলেন তিনি। সেই নির্বাচনে অরবিন্দ কেজরিওয়ালের নেতৃত্বে জয়লাভ করেছিল আম আদমি পার্টি।
প্রধান বিচারপতি সুরিয়া কান্ত বেকারদের “তেলাপোকা” বলার পরই অভিজিত দিপকে প্রতিষ্ঠা করে ককরোচ জনতা পার্টি। নরেন্দ্র মোদীর দল ভারতীয় জনতা পার্টি বা বিজেপি’র আদলে গড়ে তোলেন সিজেপি। রসিকতা বা ব্যঙ্গাত্মক রূপ নিয়ে শুরু হলেও, ককরোচ পার্টি দ্রুত অনলাইনে সাড়া ফেলতে শুরু করে।
শনিবারের বিক্ষোভ
শনিবার সকালে দিল্লি পুলিশ থেকে অনুমতি নিয়েই ঐতিহাসিক জন্তর মন্তর এলাকায় জড় হন শত শত তরুণ। যদিও দিল্লি পুলিশ জানিয়েছিল, আগে থেকে আন্দোলনের অনুমতি চেয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক আবেদন পাওয়া যায়নি। তবে সুষ্ঠুভাবে জনসমাবেশ পর্যবেক্ষণ করা হয়।
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে শনিবার দিল্লিতে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। বিমানবন্দর, গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও জনবহুল এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয় এবং এক হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়।
আন্দোলনে যোগ দিয়ে পরিবারের আতঙ্কের কথা দিয়ে তরুণদের উদ্দেশে বক্তব্য শুরু করেন অভিজিত দিপকে। অভিজিতের পরিবারের ভয় ছিল, ভারতে পা ফেলার সাথে সাথেই তাকে গ্রেফতার করা হবে। তিনি আরও বলেন, “এ ভয় শুধু আমার মায়ের একার নয়।…এই দেশের প্রতিটি মা আজ এই আতঙ্কে থাকেন যে, তার সন্তান যদি রাজনীতি নিয়ে কথা বলে কিংবা সরকারের বিরুদ্ধে মুখ খোলে, তবে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে।”
শনিবারের আন্দোলনের ডাক অভিজিত আগেই দিয়েছিলেন। বিমানবন্দরে নামার পর তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক বার্তায় শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের আহ্বান জানান এবং সমর্থকদের বই ও জাতীয় পতাকা সঙ্গে আনার জন্য অনুরোধ করেন।
পরে ভারতীয় ক্রিকেট দলের নীল জার্সি গায়ে জড়িয়ে দিপকে বলেন, “যারা মনে করেন ভারতের তরুণ প্রজন্ম শুধু সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্টই দিতে পারে, তারা এখানে এসে নিজের চোখে দেখে যান। আর যারা ভাবছেন আমরা শুধু স্লোগান দিয়েই চলে যাবো, তাদের উদ্দেশ্যে বলতে চাই, আমরা তেলাপোকা, মন্ত্রী পদত্যাগ না করা পর্যন্ত আমরা এখানেই থাকবো।”
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সিজেপি’র দেওয়া নির্দেশনা মেনে অনেক আন্দোলনকারীই তেলাপোকার মাস্ক পরে, হাতে গোলাপ বা ফুলের তোড়া এবং বই নিয়ে হাজির হয়েছিলেন আন্দোলনে।
আলজাজিরার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে শিবানী নামের একজন নারী পুলিশ কর্মকর্তার কথা। জনসমাবেশ থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে বিক্ষোভ দেখছিলেন তিনি। শিবানী জানান, তার বড় মেয়েও আন্দোলনকারীদের একজন। তিনি বলেন, “এই ছেলেমেয়েরা তাদের ভবিষ্যত নিয়ে চিন্তিত, অভিভাবক হিসেবে আমিও চিন্তিত। জীবনে এমন একটা সময় আসেই, যখন মানুষকে নিজের অধিকারের জন্য রাস্তায় নেমে আসতে হয়, তাই না?”
ভারতীয় বার্তা সংস্থা পিটিআই’এর খবর অনুযায়ী, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে এই আন্দোলনে ৬ জনকে আটক করেছে পুলিশ। দিল্লি পুলিশের দাবি, বিক্ষোভ চলাকালে ককরোচ পার্টির দুই পক্ষের মধ্যে সম্ভাব্য সংঘর্ষ এড়াতে তাদের আটক করা হয়।
সিজেপির ইন্সটাগ্রাম হ্যান্ডেলে এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে অভিজিত দিপকে জানান, যদি শিক্ষামন্ত্রী শিগগিরই পদত্যাগ না করেন, তাহলে এই আন্দোলনকে দেশব্যাপী আন্দোলনে পরিণত করা হবে। তিনি বলেছেন, পদত্যাগের দাবিতে তিনি ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ও শহরে গিয়ে সেখানে বিক্ষোভের ডাক দেবেন, তারপর দিল্লিতে সমস্ত শিক্ষার্থী ও তরুণদের একত্রিত হওয়ার আহ্বান জানাবেন।
তারুণ্যের প্রতিনিধি সিজেপি
ভারতের ১৪০ কোটি মানুষের প্রায় অর্ধেকেরই বয়স ৩০ এর নিচে। তবুও আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে তরুণদের অংশগ্রহণ সীমিত। বিবিসির এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, সাম্প্রতিক এক সমীক্ষার তথ্য অনুযায়ী, ভারতের ২৯ শতাংশ তরুণ রাজনীতি থেকে পুরোপুরি দূরে। রাজনৈতিক দলের সদস্য হিসেবে আছেন মাত্র ১১ শতাংশ তরুণ।
অভিজিত দিপকে বলেছিলেন, “মানুষ হতাশ, কারণ তারা মনে করেন তাদের কথা শোনা হয় না বা তাদের প্রতিনিধিত্ব নেই।”
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে বিভিন্ন বিক্ষোভ। তরুণদের নানা আন্দোলন শ্রীলঙ্কা, নেপাল এবং বাংলাদেশে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে সক্ষম হয়েছে।
ভারতে এখন পর্যন্ত এমন পরিস্থিতি তৈরি না হলেও কর্মসংস্থান, বৈষম্য এবং ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির মতো সমস্যাগুলোর মুখোমুখি হয়েছে ক্রমবর্ধমান এই অর্থনীতি। অনেকেই বলছেন, নতুন প্রজন্মের জন্য শিক্ষা এখন আর স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করছে না।
যদিও অভিজিত দিপকে ভারতে তরুণদের এই আন্দোলনের সাথে নেপাল বা শ্রীলঙ্কার অভ্যুত্থানের তুলনা করতে নারাজ। তিনি বলেছেন, ভারতের পরিস্থিতি অন্যরকম। তার যুক্তিতে ভারতীয় তরুণদের মধ্যে হতাশা রয়েছে, কিন্তু তার বহিঃপ্রকাশের মাধ্যম ভিন্ন।
তার কথায়, “জেন-জি ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক দলের উপর থেকে হাল ছেড়ে দিয়েছে এবং তারা এমন এক রাজনৈতিক ফ্রন্ট তৈরি করতে চায়, যার ভাষা নিজেরা বুঝতে পারে।”
সিজেপির ওয়েবসাইট থেকেও এমন বার্তাই পাওয়া যায়। সিজেপি নিজেকে “অলস এবং বেকারদের কণ্ঠস্বর” হিসেবে দাবি করে। দলটির দাবি, তারা “জিরো স্পন্সর”, অর্থাৎ কারো টাকায় এই প্ল্যাটফর্ম চলে না। যারা আর আশেপাশের বাস্তবতা থেকে নিজেদের অন্ধ করে রাখতে চাননা, তাদের নিয়েই গঠিত ককরোচ পার্টির, এমনটাই দাবি দলটির।
তবে এই হাস্যরসের মধ্যে লুকিয়ে আছে জবাবদিহিতা, গণমাধ্যম সংস্কার, নির্বাচনি স্বচ্ছতা এবং নারীদের প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির মতো রাজনৈতিক দাবিগুলো।
অনেকের মতে সিজেপি তার প্রতিনিধিত্বের জন্য যে প্রতীকী চরিত্র বেছে নিয়েছে, তাতেও নির্দিষ্ট অর্থ লুকিয়ে আছে।
অভিজিত দিপকে বলেন, “আমি মনে করি সিজেপি একটা সূচনা মাত্র। তরুণরা বর্তমান রাজনৈতিক ব্যবস্থায় বিরক্ত এবং আরও অনেক যুব সংগঠন এরপর এগিয়ে আসবে।”