হোয়াইট হাউসে গুলি: এবারও খুব কাছেই ছিলেন ট্রাম্প, এ নিয়ে কতবার?

হোয়াইট হাউসের বাইরের নিরাপত্তা চৌকিটি অন্যান্য দিনের মতো শনিবারও ছিল স্বাভাবিক। সাংবাদিকদের ক্যামেরা, নিরাপত্তা ব্যারিকেড, আর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের উপস্থিতির কারণে ছিল সর্বোচ্চ সতর্কতাও। 

কিন্তু সেই “স্বাভাবিকতা” ভেঙে দেয় হঠাৎ এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা, ভেসে আসতে থাকে একের পর এক গুলির শব্দ। প্রায় ৩০টি গুলির শব্দ।

গুলি, সাইরেন আর চিৎকারে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। মুহূর্তেই থমকে যায় ওয়াশিংটনের হৃদস্পন্দন। দৌড়ে নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নেন সবাই।

পৃথিবীর সবচেয়ে সুরক্ষিত জায়গাগুলোর একটি, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার কেন্দ্র। সেই হোয়াইট হাউসের সামনেই ঘটেছে গুলি বিনিময়ের এমন ঘটনা।

এবারও সেখানেই ছিলেন ট্রাম্প। ওই ঘটনার পর ট্রাম্পসহ অন্যান্য কর্মকর্তাদেরও দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।

এ নিয়ে চারবার গুলির ঘটনার আশেপাশেই ছিলেন বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর এই ব্যক্তি। গত এক মাসের ব্যবধানে যা দ্বিতীয়বার।

এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নয়, মার্কিন রাজনৈতিক সহিংসতার নতুন বাস্তবতাকেই সামনে আনছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

হোয়াইট হাউসে গুলি

শনিবার সন্ধ্যা ছয়টার কিছু পরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের সরকারি বাসভবন এবং প্রধান কর্মস্থল হোয়াইট হাউসের ঠিক বাইরেই গুলির শব্দে কেঁপে ওঠে ওয়াশিংটন।

সিক্রেট সার্ভিসের বরাতে রয়টার্স জানায়, সেভেনটিনথ স্ট্রিট ও পেনসিলভানিয়া এভিনিউ এলাকার একটি নিরাপত্তা চেকপয়েন্টের দিকে এগিয়ে আসেন এক ব্যক্তি। তার আচরণ সন্দেহজনক মনে হলে নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে থামানোর চেষ্টা করেন।

পরে তিনি ব্যাগ থেকে একটি আগ্নেয়াস্ত্র বের করে কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে গুলি চালানো শুরু করেন।

এরপর দায়িত্বরত কর্মকর্তারা পাল্টা গুলি চালান এবং সন্দেহভাজন হামলাকারী গুলিবিদ্ধ হয়। পরে তাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে সেখানে তার মৃত্যু হয় বলে জানায় সংস্থাটি।

গোলাগুলির ঘটনায় একজন পথচারীও গুলিবিদ্ধ হয়েছেন বলেও রয়টার্সকে পাঠানো বিবৃতিতে জানিয়েছে আমেরিকান সিক্রেট সার্ভিস।

তবে তার আঘাত কতটা গুরুতর, তা স্পষ্ট করা হয়নি।

বিভিন্ন মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত সিক্রেট সার্ভিসের আরেকটি বিবৃতিতে বলা হয়, পথচারী ব্যক্তি হামলাকারীর প্রথম দফার গুলিতে নাকি উভয়পক্ষের গোলাগুলির সময় আহত হয়েছেন- তা এখনো নিশ্চিত নয়।

ওপিবিকে সিক্রেট সার্ভিস জানিয়েছে, এই ঘটনায় তাদের কোনো কর্মকর্তা আহত হননি এবং ঘটনার সময় হোয়াইট হাউসে অবস্থানরত ট্রাম্পের ওপর এর কোনো “প্রভাব পড়েনি”।

আতঙ্কে সাংবাদিকরা

ঘটনার পরপরই পুরো এলাকা ঘিরে ফেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। সাময়িকভাবে লকডাউন করা হয় হোয়াইট হাউস কমপ্লেক্স। সেখানে অবস্থান করা সাংবাদিকদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয় বলে জানিয়েছে এবিসি নিউজ।

গণমাধ্যমটির হোয়াইট হাউস প্রতিনিধি সেলিনা ওয়াং গুলির ঘটনার সময়ের একটি ভিডিও এক্স হ্যান্ডেলে পোস্ট করে বর্ণনায় লেখেন, “আমি তখন হোয়াইট হাউসের নর্থ লন থেকে একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভিডিওর জন্য আমার আইফোনে রেকর্ডিং করছিলাম, ঠিক তখনই আমরা গুলির শব্দ শুনতে পাই। মনে হচ্ছিল যেন কয়েক ডজন গুলি চালানো হয়েছে। আমাদের দ্রুত দৌড়ে প্রেস ব্রিফিং রুমের ভেতরে চলে যেতে বলা হয়েছিল এবং আমরা এখন সেখানেই আটকে আছি।”

স্থানীয় নিউজ চ্যানেল ‘ডিসি নিউজ নাউ’ এর একজন উপস্থাপক ক্রিস ফ্ল্যানাগান, যিনি হোয়াইট হাউস ব্রিফিং রুমে আশ্রয় নিয়েছিলেন, তিনি জানিয়েছেন যে প্রায় ৩০টি গুলি চালানো হয়েছিল।

ট্রাম্প ছিলেন হোয়াইট হাউসে

ঘটনার সময় মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প হোয়াইট হাউসেই অবস্থান করছিলেন বলে জানিয়েছে মার্কিন গণমাধ্যম। 

তবে প্রেসিডেন্ট নিরাপদ ছিলেন এবং তাকে কোনো নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে পড়তে হয়নি, সংবাদ প্রকাশ করেছে রয়টার্স।

হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেন, “প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে তাৎক্ষণিকভাবে ব্রিফ করা হয়েছিল এবং পুরো ঘটনার সময় তিনি সম্পূর্ণ নিরাপদ ছিলেন।”

কে এই ব্যক্তি, কেন হামলা?

নিউইয়র্ক পোস্ট তাদের প্রতিবেদনে জানিয়েছে, নিহত সন্দেহভাজনের নাম নাসির বেস্ট। বয়স মাত্র ২১ বছর।

তার মানসিক স্বাস্থ্যসংক্রান্ত সমস্যা ছিল এবং অতীতেও নিরাপত্তা এলাকায় বিশৃঙ্খল আচরণের অভিযোগ ছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে পূর্ণ পরিচয় নিশ্চিত করা হয়নি।

যৌথ তদন্ত চলছে বলে এফবিআই পরিচালক কাশ প্যাটেলের বরাতে জানিয়েছে এক্সিওস। 

তার ভাষ্য, “হামলার উদ্দেশ্য, অতীত ইতিহাস এবং সম্ভাব্য কোনো যোগসূত্র খুঁজে বের করতে এফবিআই সিক্রেট সার্ভিসকে সহায়তা করছে।”

এদিকে ঘটনার পর ট্রুথ সোশ্যালের এক পোস্টে ট্রাম্প হামলাকারী নিয়ে লেখেন, “উক্ত বন্দুকধারীর একটি সহিংস অতীত ছিল এবং সম্ভবত আমাদের দেশের সবচেয়ে লালিত ও ঐতিহাসিক স্থাপনাটি নিয়ে তার এক ধরনের উগ্র মোহ ছিল।”

আগেও তিনবার, নিরাপত্তায় প্রশ্ন

মনে আছে নিশ্চয়, একজন সাবেক প্রেসিডেন্ট, আবার নির্বাচনি রাজনীতির কেন্দ্রীয় মুখ ডনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক যাত্রা যত এগিয়েছে, ততই বাড়ছিল তার নিরাপত্তা সংশয়।

কখনো সমাবেশে ছাদ থেকে ছোড়া গুলি কানের পাশ দিয়ে বেরিয়ে গেছে। রক্তাক্ত অবস্থায় মঞ্চে নামিয়ে আনা হয় ট্রাম্পকে। একই ঘটনায় এক সমর্থক নিহত হন। নিরাপত্তা বাহিনীর পাল্টা গুলিতে হামলাকারীও মারা যায়। সরাসরি ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে এটিই এখন পর্যন্ত একমাত্র প্রাণঘাতী হামলা।

এরপর গত মাসেই হিলটন হোটেলে হোয়াইট হাউস করেসপনডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের ডিনার অংশ নিতে গিয়ে শুনেছেন গুলির শব্দ। ডিনার অনুষ্ঠানের ভেন্যু হোটেলের ভেতরে এক বন্দুকধারী গুলি চালিয়েছিল। তখন সেখানেই ছিলেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। মেলানিয়া ট্রাম্পসহ দ্রুত তার সেই স্থান ত্যাগ করার ভিডিও তখন নেট দুনিয়ায় ভাইরাল।

যা সবশেষ পৌঁছে গেছে তার সরকারি বাসভবন এবং প্রধান কর্মস্থলের সামনের রাস্তায়।

বিশ্লেষকদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে সুরক্ষিত স্থাপনাগুলোর একটি হিসেবে পরিচিত হোয়াইট হাউসের সামনে এ ধরনের হামলা যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার জন্য বড় সতর্কবার্তা হয়ে উঠেছে।

এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নয়, মার্কিন রাজনৈতিক সহিংসতার নতুন বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক সহিংসতা ও নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে। বিশেষ করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনকে ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই হোয়াইট হাউসের সামনে এমন ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

সাবেক সিক্রেট সার্ভিস কর্মকর্তা জনাথন ওয়াকরো সিএনএনকে কে বলেন, “এই ঘটনাটি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তোলে যে, কীভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনাগুলোর কাছাকাছি একটি সাধারণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিও খুব দ্রুত একটি প্রাণঘাতী সংঘর্ষে রূপ নিতে পারে।”