বই থেকে বন্দুক: শিক্ষার্থীরা যেভাবে নিশ্চিত করেছিলো আলজেরিয়ার স্বাধীনতা

মেডিকেল পড়ুয়া একদল ভবিষ্যত চিকিৎসক। প্রকৌশল বিদ্যায় শিক্ষারত ভবিষ্যত প্রকৌশলী। আরো নানা খাতে সমাজ গঠনের হাতিয়ার তৈরি হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর চৌহদ্দিতে।

আলজেরিয়ার হাজারো তরুণ-তরুণীর সামনে তখন উজ্জ্বল ভবিষ্যতের হাতছানি। কিন্তু এর মধ্যে ১৯৫৬ সালের ১৯এ মে যা ঘটলো, তাতে আগামীর স্বপ্নে বিভোর তারুণ্য বই-খাতা-কলম তুলে রাখলেন।

তাদের কাছে এসেছিলো স্বাধীনতার ডাক। ভাবলেন আপাতত পড়াশোনা তোলা থাক। ক্যাম্পাস, পরীক্ষা সব ছেড়ে রাজপথে নেমে এসেছিলেন ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের আহ্বানে।

আলজেরিয়া তখন ফ্রান্সের অধীন। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে নানা বৈষম্যে ক্ষোভ জমছিলো আলজেরিয়ার মানুষের মধ্যে।

এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে ফ্রান্স আলজেরিয়ানদের শিক্ষাগ্রহণ সীমিত করে রেখেছিল। ১৯৫৬ সালের ধর্মঘটের আগে আলজিয়ার্স বিশ্ববিদ্যালয়ে মুসলিম আলজেরীয় শিক্ষার্থীর চেয়ে ইউরোপীয় শিক্ষার্থী ছিলো নয় গুণ বেশি।

ঔপনিবেশিক নীতির সব বাধা পেরিয়ে অনেকে উচ্চশিক্ষা নিতে পেরেছিলো। ফ্রান্স অবশ্য আশা করেছিল, আলজেরিয়ার জনগণ দমন-পীড়নের শিকার হলেও সমাজের উচ্চশিক্ষিত শ্রেণি তাদের পাশে দাঁড়াবে না।

১৯৫৪ সালের পহেলা নভেম্বর বিপ্লব শুরু হওয়ার পর থেকে আলজেরিয়ার স্বাধীনতা আন্দোলন ক্রমেই শক্তি অর্জন করছিলো।

ফ্রান্স এই বিপ্লবকে দেখছিলো অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সংকট হিসাবেই। ফরাসি শাসকরা বারবারই বলছিলো আলজেরিয়ার শিক্ষার্থী, পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীদের সাথে এই স্বাধীনতা সংগ্রামের কোনো সম্পর্ক নেই।

ফরাসি ঔপনিবেশিক শাসকরা ভাবতেন, তরুণ আলজেরীয়রা যারা ফরাসি স্কুল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্য দিয়ে গেছে, তারা ছিল ফরাসি সভ্যতারই সম্পদ। তাদের কাছ থেকে তাই আনুগত্য আর নিরপেক্ষতা প্রত্যাশা করছিলেন তারা।

১৯৫৬ সালের শুরুতে দমন-পীড়ন মাত্রা ছাড়িয়ে যায়। আন্দোলন দমনে চার লাখেরও বেশি সেনা মোতায়েন করেন ফরাসি প্রধানমন্ত্রী গি মোলে। সাধারণ মানুষের ঘরবাড়ি ধ্বংস আর নির্যাতন চলছিলো হামেশাই।

আলজেরীয় বুদ্ধিজীবী ও ছাত্রনেতারা ছিলেন নজরদারিতে। ১৯৫৬ সালের জানুয়ারিতে ছাত্রনেতা বেলকাসেম জেদ্দুর এবং ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত চিকিৎসক বেনাউদা বেনজেরদজেব হত্যার শিকার হয়। ফুঁসে ওঠে শিক্ষার্থীরা।

আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে আলজেরিয়ার বিপ্লব কোনো সংখ্যালঘু বিদ্রোহ নয়, বরং জাতীয় আন্দোলন, যাতে সব শ্রেণি, পেশা, বয়সের মানুষের সমর্থন আছে।

শিক্ষার্থীদের দমনে কঠোর ফ্রান্স

শিক্ষার্থী সংগঠনগুলো দমন করতে আগ্রাসী হয়ে ওঠে ফ্রান্স। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় আলজেরীয় শিক্ষার্থীদের বৃত্তি বাতিল করা হয়। প্রকাশ্যে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করলেই গ্রেপ্তার করা হয়।

আলজেরিয়ার তরুণ শিক্ষিত শ্রেণির জন্য বার্তাটি ছিলো স্পষ্ট, ফ্রান্স বুদ্ধিজীবীদের জনগণের পাশে দাঁড়াতে দেবে না।

এই দমন-পীড়নই তাদের স্বাধীনতার বাসনা আরো দৃঢ় করে। শুধু সশস্ত্র যোদ্ধা নয়, আলজেরিয়ার বিপ্লবে আহতদের জন্য চিকিৎসক-নার্স, ব্যবস্থাপনার জন্য প্রকৌশলীসহ ফরাসি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই শক্তিশালী করতে শিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবকও প্রয়োজন হয়ে ওঠে।

জাতীয় ছাত্র সংগঠনের উত্থান

১৯৫৫ সালের ৮ই জুলাই প্যারিসে প্রতিষ্ঠা হয় জেনারেল ইউনিয়ন অব আলজেরিয়ার মুসলিম স্টুডেন্টস। যা ফ্রান্স ও আলজেরিয়াজুড়ে থাকা আলজেরীয় শিক্ষার্থীদের এক ছাতার নিচে জড়ো করে।

১৯৫৬ সালের মার্চে প্যারিসে অনুষ্ঠিত সংগঠনটির দ্বিতীয় কংগ্রেসে তারা স্বাধীনতার পক্ষে স্পষ্ট অবস্থান নেয় এবং ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টের সাথে যুক্ত হয়।

এর প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে ছিলেন আহমেদ তালেব ইব্রাহিমি, মোহাম্মদ সেদ্দিক বেনইয়াহিয়া, আবদেলহামিদ মেহরি এবং আইসা মেসাউদি। যারা বুঝেছিলেন যে শিক্ষিত বা অশিক্ষিত, সকল আলজেরীয়ের পূর্ণ অংশগ্রহণ ছাড়া স্বাধীনতা অর্জন সম্ভব নয়।

১৯৫৬ সালের ১৭ ও ১৮ই মে আলজিয়ার্সের ড. সাদানে ক্লাবের জরুরি সভার পর ক্লাস-পরীক্ষার অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট ডাকা হয়।

ঘোষণা আসে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বেঞ্চ ছেড়ে যুদ্ধের ময়দানে যাওয়ার। “নিরপেক্ষ থাকার আর কোনো জায়গা নেই।”

নারীরা সমানভাবে অংশ নেয় আলজেরিয়ার স্বাধীনতা সংগ্রামে।

স্বাধীনতার ডাকে সাড়া

ধর্মঘটের আহ্বানের প্রতিক্রিয়া ছিল অভূতপূর্ব। আলজেরিয়া ও ফ্রান্সের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে থাকা সব আলজেরীয় শিক্ষার্থীর মধ্যে তা ছড়িয়ে পড়ে।

এটি কোনো এক বিভাগ বা শহরের আন্দোলন ছিল না। মেডিসিন, ফার্মাসি, প্রকৌশল, আইন, বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থীরা একসাথে বেরিয়ে আসে। নারী ও পুরুষ সমান অংশ নেয়।

অনেকেই সরাসরি সশস্ত্র যোদ্ধা হয়ে জাতীয় মুক্তি বাহিনীতে যোগ দেয়। অন্যরা আলজেরিয়ার শহরগুলোতে গোপন দায়িত্ব পালন করে। তথ্য সংগ্রহ, বার্তা বহন এবং প্রতিরোধ নেটওয়ার্ককে সহায়তা করে।

যারা ফ্রান্সে বহিষ্কার হয়ে সুইজারল্যান্ডসহ অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হয়েছিল, তারা যেখানে পড়াশোনা চালিয়ে যায় বটে। তবে আন্তর্জাতিক ছাত্রসমাবেশে আলজেরিয়ার পক্ষে অবস্থান তুলে ধরে।

যুদ্ধের কাঠামো বদলে দেয় শিক্ষার্থীরা

জাতীয় মুক্তি বাহিনীর সামরিক সক্ষমতায় শিক্ষার্থী ধর্মঘটকারীদের অবদান ছিল গুরুত্বপূর্ণ। মেডিকেল শিক্ষার্থীরা যুদ্ধ ময়দানে মেডিকেল সেবা গড়ে তোলে।

ফার্মেসি শিক্ষার্থীরা সীমিত সম্পদের মধ্যেও ওষুধ সরবরাহ ও বণ্টন নিশ্চিত করে। প্রকৌশল শিক্ষার্থীরা লজিস্টিক, যোগাযোগ এবং প্রতিরোধ অবকাঠামো তৈরিতে প্রযুক্তিগত জ্ঞান কাজে লাগায়।

ফ্রান্স যে বিপ্লবকে গ্রামীণ ও অশিক্ষিত বিদ্রোহ হিসেবে দেখাতে চেয়েছিলো, শিক্ষার্থী ধর্মঘট সেটিকে নতুন চরিত্র দেয় যে, যা হয়ে ওঠে আলজেরিয়ার শিক্ষিত প্রজন্মের বিদ্রোহও।

ফ্রান্স দ্রুত এবং কঠোর প্রতিক্রিয়া জানায়। বৃত্তি বাতিল করা হয়। ১৯৫৮ সালের ২৮এ জানুয়ারি স্টুডেন্টস ইউনিয়নকে আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত ঘোষণা করা হয়।

সংগঠনটি তিউনিসে নির্বাসনে গিয়ে পুনর্গঠিত হয় এবং স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত বিপ্লবের সেবা চালিয়ে যায়।

যখন ১৯৬২ সালের ৫ই জুলাই স্বাধীনতা আসে তখন শিক্ষার্থীরাই যুদ্ধক্ষেত্র, নির্বাসন ও কারাগার থেকে ফিরে এসে জাতি গঠনে মনোযোগ দেয়।

যেভাবে মোড় ঘুরে যায় বিপ্লবের

১৯এ মে’র ধর্মঘটের তিন মাস পর, ১৯৫৬ সালের অগাস্টে লিবারেশন ফ্রন্ট রাজনৈতিক ও সামরিক কাঠামো নির্ধারণ করে।

এর আগেই আন্দোলনে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ প্রমাণ করে আলজেরিয়ার বিপ্লব কোনো সংখ্যালঘু বিদ্রোহ নয়, বরং জাতীয় আন্দোলন, যাতে সব শ্রেণি, পেশা, বয়সের মানুষের সমর্থন আছে।

যখন ১৯৬২ সালের ৫ই জুলাই স্বাধীনতা আসে তখন শিক্ষার্থীরাই যুদ্ধক্ষেত্র, নির্বাসন ও কারাগার থেকে ফিরে এসে জাতি গঠনে মনোযোগ দেয়।

ফ্রান্সের পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্তির সময় আলজেরিয়ায় নিরক্ষরতার হার ছিল ৮৫ শতাংশের বেশি। পুরো দেশে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৩ হাজারেরও কম।

এই সংগ্রাম থেকে এক নতুন আলজেরিয়া তৈরি হয়। এখন দেশটির ৭০ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ত্রিশের নিচে।

নতুন আলজেরিয়া শিক্ষাকে জরুরি জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করে। আলজিয়ার্স, ওরান ও কনস্টান্টিনের মতো বড় শহরগুলোতেই শুধু নয় বরং দেশের সব অঞ্চলে বিশ্ববিদ্যালয় তৈরি হয়।

২০২৫ সালের মধ্যে আলজেরিয়ায় উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ১১৫টিতে পৌঁছায়, যেখানে প্রায় ২০ লাখ পূর্ণকালীন শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়ে নারীদের অংশগ্রহণ ৬০ শতাংশের বেশি, যা বিশ্বে নারীদের উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণের অন্যতম সর্বোচ্চ হার।

জ্ঞান ও সুযোগের এই বিস্তার ১৯৫৬ সালের ১৯এ মে’র উত্তরাধিকার। যে শিক্ষার্থীরা একদিন স্বাধীন আলজেরিয়ার জন্য লড়াই করতে তাদের শ্রেণিকক্ষ ছেড়ে গিয়েছিল, স্বাধীনতার পর সেই শ্রেণিকক্ষেই ফিরে আসে মন্ত্রী, অধ্যাপক, ডাক্তার, প্রকৌশলী এবং কূটনীতিক হিসেবে। প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে তোলে যা আজ লাখ লাখ তরুণ আলজেরীয়কে সেবা দিচ্ছে।

সত্তর বছর আগের সেই শিক্ষার্থীদের রাজপথে নেমে আসা রসদ জুগিয়েছিলো স্বাধীনতা সংগ্রামে। যা দেশটিকে গড়ে তুলেছে ভবিষ্যতের সম্পদ হিসাবে।