ইরানে ফের হামলার ছক প্রস্তুত, ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় ওয়াশিংটন

চীন সফর শেষ করে যুক্তরাষ্ট্রে ফিরেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প। তবে বেইজিং থেকে ফেরার পরই তার সামনে এখন সবচেয়ে কঠিন সিদ্ধান্ত। 

ইরানের বিরুদ্ধে স্থগিত থাকা সামরিক হামলা আবার শুরু করবেন, নাকি শেষ মুহূর্তের কূটনৈতিক সমঝোতার পথ খোলা রাখবেন।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেননি। তবে তার শীর্ষ সহযোগীরা ইরানে নতুন করে সামরিক হামলা শুরুর পরিকল্পনা প্রস্তুত রেখেছেন। 

আর ইরানের দেওয়া প্রস্তাবও ট্রাম্পের পছন্দ হয়নি বলে জানিয়েছে নিউ ইয়র্ক টাইমস। চীন সফর শেষে এয়ার ফোর্স ওয়ানে সাংবাদিকদের ট্রাম্প বলেছেন, “আমি প্রস্তাবটি দেখেছি। এবং আমার যদি প্রথম বাক্য পছন্দ না হয়, তবে সেটি ছুড়ে ফেলে দেই।”

আলোচনার অচলাবস্থা ভাঙতে ট্রাম্প যদি আবার সামরিক শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেন, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত হামলায় ফিরতে পারে বলে জানিয়েছে সংবাদমাধ্যমটি। 

ইরানকে ঘিরে ট্রাম্প এখন দুই ধরনের চাপের মুখে। একদিকে, এই যুদ্ধ তার জন্য রাজনৈতিকভাবে ক্রমেই দায় হয়ে উঠছে। অন্যদিকে, তিনি যে লক্ষ্যকে যুদ্ধের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে তুলে ধরেছিলেন যে ইরানকে কখনো পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে না দেওয়া, সেই লক্ষ্য এখনো পুরোপুরি অর্জিত হয়নি।

হরমুজ প্রণালি ঘিরে সমঝোতার চেষ্টা

নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দেশের কর্মকর্তারা এখন একটি সমঝোতার চেষ্টা করছেন। সেই সমঝোতার মূল লক্ষ্য হলো ইরান যেন হরমুজ প্রণালি আবার খুলে দেয়। 

এটি হলে ট্রাম্প দেশে ফিরে বলতে পারবেন, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপ কাজ করেছে এবং তিনি একটি বড় কূটনৈতিক সাফল্য পেয়েছেন।

হরমুজ প্রণালি বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই পথ দিয়ে বিপুল পরিমাণ তেল ও গ্যাস পরিবহন হয়। তাই প্রণালিটি বন্ধ থাকলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো বিশ্বের জ্বালানি বাজার ও অর্থনীতিতে বড় চাপ তৈরি হয়।

চীন সফরে প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের সঙ্গে ইরান ইস্যুতেও আলোচনা করেছেন ট্রাম্প। বেইজিং তেহরানের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশীদার এবং হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহনের ওপরও নির্ভরশীল। 

ডনাল্ড ট্রাম্প (বামে) ও শি চিনপিং

তবে ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরানের ওপর চাপ দিতে শি চিনপিংকে কোনো অনুরোধ করেননি তিনি। 

এ ছাড়া বৈঠকে কী কী আলোচনা হয়েছে, তার পূর্ণ বিবরণ এখনো প্রকাশ করা হয়নি।

শুরু হতে পারে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’

নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, পেন্টাগন এখন এমন প্রস্তুতি নিচ্ছে, যাতে ট্রাম্প নির্দেশ দিলেই ইরানের বিরুদ্ধে স্থগিত থাকা সামরিক অভিযান আবার শুরু করা যায়।

গত মাসে ট্রাম্প যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করার পর ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ স্থগিত করা হয়েছিল। 

যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ মার্কিন কংগ্রেসকে বলেছেন, “যদি প্রয়োজন হয় তবে অভিযানের পরিকল্পনা প্রস্তুত আছে আমাদের।”

একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো ৫০ হাজারের বেশি অতিরিক্ত সেনাকে স্বাভাবিক মোতায়েনে ফিরিয়ে আনার পরিকল্পনাও রয়েছে বলেও জানান তিনি।

অর্থাৎ, ওয়াশিংটন এখন দুই প্রস্তুতিই নিয়ে রাখছে। একদিকে হামলা বাড়ানোর পরিকল্পনা, অন্যদিকে পরিস্থিতি শান্ত হলে সেনা সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের বড় প্রস্তুতি

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল সম্ভাব্য নতুন হামলার জন্য জোর প্রস্তুতি নিচ্ছে। 

মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক দুই মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, যুদ্ধবিরতির পর এটিই সবচেয়ে বড় সামরিক প্রস্তুতি। তাদের মতে, হামলা আবার শুরু হলে তা আগামী সপ্তাহের মধ্যেই হতে পারে।

চীন সফরে যাওয়ার আগে ট্রাম্প বলেছিলেন, ইরান হয় চুক্তি করবে, নয়তো ধ্বংস হবে।

তিনি বলেছেন, “ইরানকে হয় চুক্তি মানতে হবে, নাহলে তারা নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। অর্থাৎ আমরাই জিতবো।”

তার ভাষায়, দুই পথের যেকোনো একটিতেই যুক্তরাষ্ট্র জিতবে। অর্থাৎ ট্রাম্প এখনো সামরিক অভিযানের সম্ভাবনা পুরোপুরি বাদ দেননি।

হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্য কী

যুক্তরাষ্ট্র যদি আবার হামলা শুরু করে, তাহলে কয়েক ধরনের সামরিক বিকল্প বিবেচনায় আছে। এর মধ্যে আছে ইরানের সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামোতে আরও ব্যাপক বোমা হামলা।

আরেকটি বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প হলো যে বিশেষ বাহিনীকে ইরানের ভেতরে পাঠানো। তাদের লক্ষ্য হতে পারে গভীর ভূগর্ভে থাকা পারমাণবিক উপাদান। 

বিশেষ করে ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনায় থাকা উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের উদ্বেগ রয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, কয়েকশ মার্কিন স্পেশাল অপারেশনস সেনা মার্চ মাসেই মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছেছেন।

এই মোতায়েনের উদ্দেশ্য ছিল ট্রাম্প চাইলেই যেন ইরানের ভেতরে বিশেষ অভিযান চালানোর বিকল্প হাতে থাকে।

তবে এমন অভিযান অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ বাহিনীকে সুরক্ষা দিতে কয়েক হাজার সহায়ক সেনা প্রয়োজন হতে পারে। তারা নিরাপত্তা বলয় তৈরি করবে। 

এতে ইরানি বাহিনীর সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষের ঝুঁকি থাকবে। মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, এ ধরনের অভিযানে বড় ধরনের প্রাণহানির আশঙ্কা রয়েছে।

ইরানও প্রস্তুত

ইরানও সম্ভাব্য হামলার জন্য প্রস্তুত থাকার কথা জানিয়েছে। ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফ বলেছেন, কোনো আগ্রাসন হলে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী জবাব দিতে প্রস্তুত। 

তিনি বলেন, “আমাদের সামরিক বাহিনী যেকোনো হামলার জবাব দিতে প্রস্তুত। যদি কেউ ভুল পদক্ষেপ নেয় তবে মাশুল গুণতে হবে। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে তিনি আরও বলেন, পুরো বিশ্ব ইতোমধ্যে জেনে গেছে যে আমরা যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত। তারা চমকে যাবে।  

তার বক্তব্যে স্পষ্ট ইঙ্গিত যে তেহরান নতুন সংঘাতের আশঙ্কা করছে এবং পাল্টা হামলার প্রস্তুতিও নিচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট ও চীনের সংঘাত

যুদ্ধবিরতির আগে ইরানকে হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন ট্রাম্প।  

তিনি বলেছিলেন, বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ না করলে ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের ধ্বংসাত্মক হামলা চালানো হতে পারে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প তখন ইরানের সেতু ও বিদ্যুৎকেন্দ্রের মতো গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ধ্বংসের কথাও বলেছিলেন। 

তবে নিউইয়র্ক টাইমস বলছে, কোনো সরকারকে চাপ দিতে ইচ্ছাকৃতভাবে বেসামরিক অবকাঠামো ধ্বংস করা যুদ্ধ আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।

যুদ্ধবিরতির সময়ও সক্রিয় মার্কিন সেনারা

যুদ্ধবিরতির পরও যুক্তরাষ্ট্র বসে ছিল না। পেন্টাগনের শীর্ষ কর্মকর্তা ও সামরিক নেতৃত্ব জানিয়েছেন, এই বিরতির সময় যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে থাকা যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমানগুলো আবার অস্ত্রসজ্জিত করেছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে দুই কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। যুদ্ধবিরতির আগেও কখনো এতটা প্রস্তুত ছিল না তারা। 

মার্কিন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন বলেছেন, সামরিক কর্মকর্তারা এখনো বেসামরিক নেতৃত্বের জন্য বিভিন্ন ধরনের বিকল্প প্রস্তুত রেখেছেন। 

এর আগে, পেন্টাগন ব্রিফিংয়ে জেনারেল কেইন জানিয়েছিলেন মধ্যপ্রাচ্যে ৫০ হাজারের বেশি সেনা, দুটি বিমানবাহী রণতরী, এক ডজনের বেশি নৌবাহিনীর ডেস্ট্রয়ার এবং বহু যুদ্ধবিমান প্রস্তুত আছে। 

নির্দেশ পেলে তারা ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের সামরিক অভিযান আবার শুরু করতে পারবে।

তিনি দাবি করেন, “আমরা বসে আছি বলে দুর্বল বলে ভুল করা যাবে না।” 

‘জয়’ সহজ নয়

মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারাও স্বীকার করছেন, ইরানের বিরুদ্ধে জয় সহজ হবে না। যুক্তরাষ্ট্র আগের হামলায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থল, রেভল্যুশনারি গার্ডসের অস্ত্রভাণ্ডার ও সামরিক অবকাঠামোতে আঘাত হেনেছিল।

তবে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ইরান আবার বেশিরভাগ ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনা, লঞ্চার ও ভূগর্ভস্থ অবকাঠামোয় প্রবেশাধিকার ফিরে পেয়েছে।

নিউইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি ইরানের ৩৩টি ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনার মধ্যে ৩০টিতেই তেহরান আবার কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ফিরে পেয়েছে।

এসব স্থাপনা ওই সরু জলপথ দিয়ে চলাচলকারী মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারের জন্য বড় হুমকি হতে পারে।

খার্গ দ্বীপ পরিকল্পনা

মধ্যপ্রাচ্যে এখনো প্রায় পাঁচ হাজার মার্কিন মেরিন সেনা রয়েছে। সেনাবাহিনীর এলিট ৮২তম এয়ারবর্ন ডিভিশনের আরও দুই হাজার প্যারাট্রুপারও অবস্থান করছে। 

সামরিক কর্মকর্তাদের মতে, ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনা ঘিরে বিশেষ অভিযান হলে এসব সেনা নিরাপত্তা বলয় তৈরিতে ব্যবহার হতে পারে।

আরেকটি সম্ভাব্য পরিকল্পনায় আছে ইরানের তেল রপ্তানির গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ দখল। 

তবে কর্মকর্তারা বলছেন, দ্বীপটি দখল করা গেলেও সেটি ধরে রাখতে আরও বেশি স্থলসেনা প্রয়োজন হবে।

কী করবেন ট্রাম্প

সব মিলিয়ে চীন সফর শেষে ট্রাম্প এখন এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে দাঁড়িয়ে। একদিকে কূটনৈতিক সমঝোতার পথ আছে। ইরান যদি হরমুজ প্রণালি খুলে দেয়, তাহলে ট্রাম্প এটিকে রাজনৈতিক জয় হিসেবে তুলে ধরতে পারেন।

অন্যদিকে সামরিক পথও প্রস্তুত। সেই পথে গেলে ইরানের সামরিক স্থাপনা, পারমাণবিক অবকাঠামো কিংবা জ্বালানি রপ্তানি কেন্দ্রকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্র বড় হামলা চালাতে পারে।

তবে ঝুঁকিও অনেক। নতুন করে হামলা শুরু হলে ইরানও পাল্টা জবাব দিতে পারে। হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল আরও বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা বাড়তে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি আরও গভীর মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে পারে।

তাই প্রশ্ন এখন একটাই, ট্রাম্প কি নিজেকে বিজয়ী দেখানোর মতো একটি সমঝোতা খুঁজবেন, নাকি ইরানকে আরও চাপ দিতে আবারও বোমার পথেই হাঁটবেন?

এই সিদ্ধান্ত শুধু ওয়াশিংটন বা তেহরানের ভবিষ্যৎ নয়, মধ্যপ্রাচ্য, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার হিসাবও বদলে দিতে পারে।  

(নিউ ইয়র্ক টাইমস অবলম্বনে)