ইরান যুদ্ধ বন্ধে আশার আলো তৈরি হলেও বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত ট্রাম্প-শি বৈঠক দৃশ্যমান কোনো সমঝোতা ছাড়াই শেষ হলো। তিনদিনের চীন সফরে একাধিক বৈঠক করেও ইরান ইস্যুতে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সরে আসেনি যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টা এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যেই রয়ে গেছে।
শুক্রবার (১৫ মে) দুপুরের পর বেইজিং আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে এয়ার ফোর্স ওয়ানে নিজ দেশের উদ্দেশ্যে রওনা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প বিদায়ের সময় তাকে আনুষ্ঠানিক সম্মান জানায় চীন। এর আগে টানা দুইদিন চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি।
আল জাজিরার বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ওয়াশিংটন চীনের কাছ থেকে আরও সক্রিয় ভূমিকা প্রত্যাশা করলেও বৈঠক শেষে দুই দেশের অবস্থানের আসল পার্থক্য স্পষ্টভাবেই সামনে এসেছে।
ইরান প্রশ্নে মিলল না অভিন্ন অবস্থান
বিশ্লেষকদের মতে, সফরের আগে ওয়াশিংটন আশা করেছিল ইরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বেইজিং আরও সক্রিয় ভূমিকা নেবে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি খুলে দেওয়া ও ইরানকে নতুন শর্তে আলোচনায় ফেরানোর বিষয়ে চীনের সহায়তা চেয়েছিলো যুক্তরাষ্ট্র।
তবে বৈঠক শেষে দুই দেশের বিবৃতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ইরান প্রশ্নে তাদের অবস্থানের মৌলিক পার্থক্য আগের মতোই রয়ে গেছে।
চীন তাদের বিবৃতিতে আবারও যুদ্ধবিরতি, সংলাপ ও রাজনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দিয়েছে।
তারা বলছে, ইরান পরিস্থিতি শুধু আঞ্চলিক দেশগুলোর জন্য নয়, পুরো বিশ্বের জন্যই উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, যুদ্ধের কারণে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের মানবিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়েছে এবং দ্রুত একটি “পূর্ণাঙ্গ ও স্থায়ী যুদ্ধবিরতি” প্রয়োজন।
শান্তি পরিকল্পনার কথা বলল চীন
শি জিনপিংয়ের পূর্ব ঘোষিত চার দফা শান্তি পরিকল্পনার কথাও পুনরায় উল্লেখ করেছে চীন। এতে রাজনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সমাধান, যৌথ নিরাপত্তা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও উন্নয়নভিত্তিক সহযোগিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। তবে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মতো কঠোর অবস্থান নেয়নি বেইজিং।
অন্যদিকে হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে স্পষ্টভাবে বলা হয়, “ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করতে পারবে না।” একইসঙ্গে ওয়াশিংটন দাবি করে, হরমুজ প্রণালি অবশ্যই উন্মুক্ত রাখতে হবে এবং এর সামরিকীকরণ বা টোল আরোপের যেকোনো প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছে দুই পক্ষ।
তবে চীনের সরকারি বিবৃতিতে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নিয়ন্ত্রণ, টোল আদায় বা সামরিক উপস্থিতির বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করা হয়নি। এটিই দুই দেশের অবস্থানের বড় পার্থক্য হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।
জ্বালানি বাজারে বাড়ছে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ এখন ৭৭তম দিনে পৌঁছেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর সংঘাত শুরু হলে পাল্টা জবাব দেয় ইরানও। এরপর থেকে পুরো অঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। বাহরাইন, কুয়েত, কাতার, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে থাকা মার্কিন স্থাপনাগুলোও হামলার ঝুঁকিতে পড়ে।
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে জ্বালানি বাজারে। মার্চের শুরু থেকে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে ইরান। আগে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস সরবরাহ হতো এর মাধ্যমে। ফলে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ ও মূল্য নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চীন এই প্রণালি দিয়ে আসা উপসাগরীয় তেলের অন্যতম বড় ক্রেতা হওয়ায় সংকটটি বেইজিংয়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তবু ট্রাম্প-শি বৈঠকে এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো যৌথ রূপরেখা আসেনি।
চীনের সহায়তা চাইলেও ভিন্ন বার্তা ট্রাম্প প্রশাসনের
সফরের আগে ও চলাকালে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন কর্মকর্তা চীনের ওপর চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করেন। মার্কিন অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট প্রকাশ্যে বলেন, হরমুজ প্রণালি খুলে দিতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগে চীনের অংশ নেওয়া উচিত। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও বেইজিংকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
তবে একই সময়ে ট্রাম্প আবার সাংবাদিকদের বলেন, “ইরানের ব্যাপারে আমাদের কারও সাহায্যের প্রয়োজন নেই।” মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ কংগ্রেসে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে স্বীকার করেন, ইরানের ওপর চীনের “প্রচুর প্রভাব” রয়েছে, যদিও শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি প্রভাব ট্রাম্পের হাতেই রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।