খাদের কিনারায় ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী

চরম এক রাজনৈতিক সংকটের মুখোমুখি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ক্ষমতায় আসার মাত্র দুই বছরের মাথায় অভ্যন্তরীণ কোন্দলে জর্জরিত লেবার পার্টি।

নিজ দলের এমপিরাই স্টারমারের পদত্যাগ দাবি করছেন। সম্প্রতি স্থানীয় নির্বাচনে লেবার পার্টির ব্যপক ভরাডুবির পর জোরালো হয়েছে এই দাবি। স্কাই নিউজের খবরে বলা হয়েছে, লেবার পার্টির ৮০জন এমপির তার পদত্যাগ চাইছেন।

এর মধ্যে আছে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদসহ বেশ কয়েকজন মন্ত্রী। স্টারমারকে পদত্যাগ করিয়ে নতুন নেতৃত্বের নির্বাচন শুরু করতে প্রয়োজন এক পঞ্চমাংশ বা ৮১ জন লেবার এমপির স্বাক্ষর।

দ্য গার্ডিয়ানের খবরে বলা হয়েছে, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইভেট কুপার এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন যে, তার উচিত ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি ‘সুশৃঙ্খল প্রক্রিয়া’ শুরু করা।

সরকারের প্রথম কোনো সদস্য হিসেবে পদত্যাগ করেছেন আবাসন ও সম্প্রদায় বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জুনিয়র মন্ত্রী মিয়াট্টা ফানবুল্লাহ। পদত্যাগপত্রে স্টারমারকে ‘দেশের জন্য যা সঠিক তা’ করার এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি নির্দিষ্ট সময়সূচি ঘোষণার আহ্বান জানিয়েছে ফানবুল্লাহ।

অন্তত ছয়জন মন্ত্রী পর্যায়ের পার্লামেন্টারি প্রাইভেট সেক্রেটারি (পিপিএস) পদত্যাগ করেছেন বলে জানিয়েছে বিবিসি। এর মধ্যে আছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের পিপিএস জো মরিস।

প্রধানমন্ত্রীর ওপর ‘জনগণের আর কোনো আস্থা বা বিশ্বাস নেই’ বলে মন্তব্য করেছেন মরিস। স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিংকে দেখা হচ্ছে একজন সম্ভাব্য প্রধানমন্ত্রী পদপ্রার্থী হিসেবে।

এছাড়াও পদত্যাগ করেছেন উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামির পিপিএস মেলানি ওয়ার্ড, ক্যাবিনেট অফিস মন্ত্রী ড্যারেন জোনসের পিপিএস নওশাবাহ খান এবং পরিবেশমন্ত্রী এমা রেনল্ডসের পিপিএস টম রুডল্যান্ডও। পিপিএস একটি অবৈতনিক পদ, যেখানে মন্ত্রীরা তাদের সহকারী হিসেবে এমপিদের নিয়োগ দেন।

সরকারের প্রথম কোনো সদস্য হিসেবে পদত্যাগ করেছেন আবাসন ও সম্প্রদায় বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের জুনিয়র মন্ত্রী মিয়াট্টা ফানবুল্লাহ।

টেন ডাউনিং স্ট্রিটে মন্ত্রীরা

নিজের দলের ভেতর থেকে পদত্যাগের প্রবল চাপের মধ্যেই মঙ্গলবার যুক্তরাজ্য সময় সাড়ে নয়টায় শীর্ষ মন্ত্রীদের নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন স্টারমার।

বৈঠকে ‘পদত্যাগ করবেন না’ বলে মন্ত্রীদের সাফ জানিয়ে দিয়েছেন তিনি। টেন ডাউনিং স্ট্রিট সূত্রে আল জাজিরা এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।

কাতারভিত্তিক গণমাধধ্যমটির খবরে বলা হয়েছে, স্থানীয় নির্বাচনে ভড়াডুবির দায় স্বীকার করে স্টারমার বলেছেন, “আমরা জনগণকে যে পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলাম, তা বাস্তবায়নের দায়িত্বও আমার।”

মন্ত্রিসভার রুদ্ধদ্বার বৈঠক শেষে গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেন বেশ কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রী। প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বের ওপর পূর্ণ আস্থা প্রকাশ করেছেন আবাসন, সম্প্রদায় এবং স্থানীয় সরকার বিষয়ক মন্ত্রী স্টিভ রিড, বাণিজ্যমন্ত্রী পিটার কাইল, কর্ম ও পেনশন বিষয়ক মন্ত্রী প্যাট ম্যাকফ্যাডেন এবং প্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী লিজ কেন্ডাল।

এই কঠিন সময়ে ঐক্যবদ্ধ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে তার কাজ চালিয়ে যেতে সহায়তা করার কথা জানান এই মন্ত্রীরা।

প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলিও। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম 'এক্স'-এ দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছেন, “এই মুহূর্তে আরও রাজনৈতিক অস্থিরতা ব্রিটেনের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থি।” হিলি বলেন, বিশ্বজুড়ে চলমান যুদ্ধ এবং আসন্ন বৈশ্বিক সংকটের এই সময়ে দেশের মানুষ সরকারের কাছ থেকে বলিষ্ঠ নেতৃত্ব আশা করে, যা প্রধানমন্ত্রী বর্তমানে দিয়ে যাচ্ছেন।”

মন্ত্রিসভার একটি ছোট অংশ প্রকাশ্যে সমর্থন দিলেও বড় অংশ চুপ। অনাস্থার জন্য প্রয়োজনীয় এক পঞ্চমাংশ এমপির প্রকাশ্য বিরোধিতা আর সম্ভাব্য নেতৃত্বের দাবিদারদের নীরবতা কিয়ারমারের ভবিষ্যৎ নিয়ে সংশয় বাড়িয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী জন হিলিও

বিপর্যয়ের মুখে লেবার পার্টি

সম্প্রতি স্থানীয় নির্বাচনে প্রায় ১ হাজার ৫০০ কাউন্সিলর আসন হারিয়েছে লেবার পার্টি। ক্ষমতা হারিয়েছে এক শতাব্দী ধরে একচ্ছত্র আধিপত্য ধরে রাখা ওয়েলসেও।

এছাড়া স্কটিশ পার্লামেন্টের ১২৯টি আসনের মধ্যে মাত্র ১৭টিতে জয় পেয়েছে দলটি। হলিরুড নির্বাচনে এখন পর্যন্ত এটাই লেবার পার্টির সবচেয়ে খারাপ ফলাফল। নির্বাচনে ভরাডুবির পর থেকেই পদত্যাগের চাপ বেড়েছে স্টারমারের উপর।

এই ফলাফল দেখে ২০২৯ সালের সাধারণ নির্বাচনে লেবার পার্টির জয় নিয়ে সন্ধিহান হয়ে পড়েছেন অনেক লেবার এমপি।

প্রধানমন্ত্রীর সর্বোচ্চ চেষ্টাও ভোটারদের কাঙ্ক্ষিত প্রত্যাশা পূরণ করতে পারছে না বলে মন্তব্য করেন হেক্সামের এমপি জো মরিস। তিনি বলেন, লেবার কাউন্সিলর এবং প্রার্থীরা এমন সব সিদ্ধান্তের দায়ভার বহন করছেন যা তাদের ছিল না।

নিজেদের ‘এখনই দিক পরিবর্তন দরকার’ বলে মনে করেন গিলিংহাম ও রেইনহ্যামের এমপি নওশাবাহ খান। তিনি বলেন, “আমি রাজনীতিতে এসেছি ব্যর্থতার পাশে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য নয়।”

শাবানা মাহমুদের পিপিএস স্যালি জেমসন বলেন, কিয়ারের উচিত সেপ্টেম্বর বা তার কিছু পরেই বিদায়ের পরিষ্কার সময়সীমা জানানো।

লেবার পার্টির ভেতরে একটি ‘গোপন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ’ তৈরি করা হয়েছে বলে জানিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান।  যেখানে নেতৃত্ব পরিবর্তনের উপায় নিয়ে এমপিরা নিয়মিত আলোচনা করছেন বলে জানায় সংবাদমাধ্যমটি।

বিরোধী দল কনজারভেটিভ পার্টি এরই মধ্যে স্টারমারের বিরুদ্ধে একটি ‘অনাস্থা প্রস্তাব’ আনার প্রস্তুতি নিচ্ছে বলে উঠে এসেছে দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফের খবরে। 

লেবার পার্টিতে চলমান সংকটের নেপথ্যে অ্যান্ডি বার্নহাম ও ওয়েস স্ট্রিটিংয়ের ভূমিকা আছে। মন্ত্রিসভার একাধিক সদস্যের বরাতে খবরটি দিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান।

পদত্যাগ দাবি করে সাবেক শ্যাডো চ্যান্সেলর জন ম্যাকডোনেল বলেন, “আমরা কিয়ারকে সুযোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি আমাদের ভোটারদের দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন।”

বিকল্প কে

যদি কিয়ার স্টারমার পদত্যাগ করেন, তবে সম্ভাব্য তিনজনের নাম বেশি আলোচনায় আসছে। তারা হলেন বর্তমান উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেনার, চ্যান্সেলর অব দি এক্সচেকার (অর্থমন্ত্রী) র‍্যাচেল রিভস এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং।

স্পষ্টভাষী অ্যাঞ্জেলা নিজ দলের ভেতরে বেশ জনপ্রিয় । অর্থনীতিতে দখল থাকা র‍্যাচেল রিভসের গ্রহণযোগ্যতা আন্তর্জাতিক মহলে বেশি। অন্যদিকে তরুণ প্রজন্মের নেতা ওয়েস স্ট্রিটিংকে অনেকেই দেখেন লেবার পার্টির ভবিষ্যৎ হিসেবে।

স্টারমার স্বেচ্ছায় পদত্যাগ না করলে জটিল এবং নাটকীয় রূপ নিতে পারে ব্রিটেনের সংসদীয় গণতন্ত্র পরিস্থিতি।

এক্ষেত্রে একে একে পদত্যাগ করতে পারেন মন্ত্রিসভার জ্যেষ্ঠ সদস্যরা। ব্রিটিশ রাজনীতিতে একে বলা হয় ‘দ্য ক্যাবিনেট ক্যু’।

স্টারমার সরে না গেলে তার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অনাস্থা প্রস্তাব আনতে পারেন লেবার পার্টির এমপিরা। এক পঞ্চমাংশ এমপি আবেদন করলেই হবে অনাস্থা ভোট। ভোটে অর্ধেকের বেশি লেবার এমপি স্টারমারের বিপক্ষে ভোট দিলে পদচ্যুত হবেন স্টারমার।

শুধু নিজের দলের ভেতরেই নয়, বিরোধী কনজারভেটিভ পার্টি বা লিবারেল ডেমোক্র্যাটরা সরকারের বিরুদ্ধে আনতে পারে অনাস্থা প্রস্তাব।

এতে লেবার পার্টির বিদ্রোহী এমপিরা ভোট দিলে বা ভোটদানে বিরত থাকলে পড়ে যেতে পারে লেবার পার্টির সরকার। এমন পরিস্থিতিতে ১৪ দিনের মধ্যে গঠন করতে হবে নতুন সরকার। আর তা না পারলে অনিবার্য হয়ে পড়বে আগাম সাধারণ নির্বাচন।

সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ও দলীয় সমর্থন হারানোর পও পদত্যাগ করতে অস্বীকৃতি জানালে বিশেষ ক্ষমতা ব্যবহার করতে পারেন ব্রিটেনে রাজা তৃতীয় চার্লস। এটিই হতে পারে সাংবিধানিক অচলাবস্থা নিরসনে শেষ ধাপ।

কিয়ার স্টারমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের সমীকরণ বেশ জটিল। নিজের নীতিতে বড় ধরণের পরিবর্তনের মাধ্যমে পদ্যত্যাগ দাবি করা এমপিদের সন্তুষ্ট করতে পারলে টিকেও যেতে পারে তার প্রধানমন্ত্রিত্ব। অন্যথায়, মাত্র এক দশকেই অষ্টম প্রধানমন্ত্রী আসতে পারেন টেন ডাউনিং স্ট্রিটের মসনদে।