ছয় দশক ধরে চলে আসা দুই দলের শাসনের অবসান ঘটেছে তামিলনাড়ুর রাজনীতিতে। চেন্নাইয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে ১০ই মে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিয়েছেন দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার মেগাস্টার সি. জোসেফ বিজয়।
এই শপথের মাধ্যমে দ্রাবিড় রাজনীতিতে ভেঙ্গে গেলো ডিএমকে আর এআইএডিএমকে’র দ্বিমেরু আধিপত্য।
‘থালাপাতি বিজয়’ নামে পরিচিত জোসেফ বিজয়ের দল টিভিকে রচনা করলো এক নতুন ইতিহাস।
রবিবার শপথ নিয়েই চমকে দিলেন থালাপতি বিজয়। সরাসরি কাজে নেমে পড়েছেন তামিলনাড়ুর নতুন মুখ্যমন্ত্রী।
নির্বাচনী ইশতেহার পূরণে প্রথম দিনেই নিয়েছেন বেশ কিছু সিদ্ধান্ত।
দিয়েছেন ২০০ ইউনিট পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিনামূল্যে দেওয়ার ঘোষণা। এছাড়াও মাদক নির্মূল এবং নারী নিরাপত্তার জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের প্রক্রিয়া শুরু করেছেন বিজয়।
বিনামূল্যে বিদ্যুতকে স্বস্তি হিসেবে দেখছে তামিলনাড়ুর মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত পরিবারগুলো। গত কয়েক বছরে তামিলনাড়ুতে বাড়তে থাকা মাদকের বিস্তার নিয়ে অনেকবারই সরব হয়েছিলেন বিজয়।
ক্ষমতা পেয়েই মাদক চক্রের নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইউনিট গঠন করেছেন তিনি।
এছাড়া নারীদের জন্য ‘ভয়হীন পরিবেশ’ নিশ্চিত করতে পুলিশেকে নির্দেশ দিয়েছেন বিশেষ উইং খোলার।
এরআগে সকাল ১০টায় চেন্নাইয়ের জওহরলাল নেহরু স্টেডিয়ামে শপথ নেন থালাপতি বিজয়। তামিলনাড়ুর গভর্নর রাজেন্দ্র বিশ্বনাথ আরলেকার নতুন মুখ্যমন্ত্রীকে শপথ পড়ান।
শপথ নেন নতুন সরকারের নয়জন মন্ত্রীও।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের রাজনীতিক ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী। এসেছিলেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) রাজ্য পর্যায়ের শীর্ষ নেতারাও।
বিজয়ের রাজনৈতিক উত্থান
রাজনীতিতে ‘থালাপতি’র এই উত্থান আকস্মিক ঘটনা নয়। এটি ছিল দীর্ঘ পরিকল্পনা, কঠোর নিয়মানুবর্তিতা এবং রূপালি পর্দার গ্ল্যামারকে তৃণমূলের জনসেবায় রূপান্তর করার এক সুনিপুণ পরিকল্পনার পরিণতি।
বিজয়ের রাজনীতির প্রথম ধাপ ছিল তার ফ্যান ক্লাব ‘বিজয় মক্কাল ইয়াক্কাম’(ভিএমআই)। এই ফ্যান ক্লাবটিকে একটি সুশৃঙ্খল সামাজিক সংগঠনে রূপ দেয় বিজয়। ‘ভিএমআই’কে ২০০৯ সাল থেকেই রক্তদান শিবির, গরিব শিক্ষার্থীদের বৃত্তি এবং দুর্যোগে ত্রাণ বিতরণের মত কাজের মাধ্যমে একটি বিকল্প ‘সেবা নেটওয়ার্কে’ পরিণত করেন এই নায়ক। পরবর্তীতে এই সংগঠনটি তার রাজনীতির প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়।
এছাড়াও নিজের সিনেমাগুলোকে রাজনীতির প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করেছেন থালাপাতি।
থুপ্পাক্কি, কাত্থি ও সরকারের মত সিনেমাগুলোয় দুর্নীতি এবং কৃষি সংকট, জিএসটি, বিনামূল্যে সরকারি সেবা এবং ভোটের গুরুত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বার্তা দেন তিনি। এই সিনেমাগুলোর সংলাপ তাকে সাধারণ মানুষের কাছে একজন ‘ত্রাণকর্তা’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
বিজয়ের এই রাজনৈতিক উত্থানের পথে লড়তে হয়েছে নিজের বাবার বিরুদ্ধেও।
বিজয়কে না জানিয়েই ২০২১ সালে তার নামে রাজনৈতিক দল নিবন্ধন করার চেষ্টা করেছিলেন বিজয়ের বাবা চলচিত্র পরিচালক এস.এ. চন্দ্রশেখর। নিজের নামের বা ছবির কোনো রাজনৈতিক অপব্যবহার সহ্য করবেন না বলে জনসমক্ষে ঘোষণা দেন বিজয়। শুধু ঘোষণাতেই থেমে থাকেননি তিনি। নিজের বাবা মায়ের বিরুদ্ধে সেবার আদালতেও গিয়েছিলেন তিনি। বিজয়ের এই সিদ্ধান্ত তাকে একজন স্বাধীন ও দৃঢ়চেতা জননেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
এই পদক্ষেপের মাধ্যমে তিনি বার্তা দেন যে, কারো শিখিয়ে দেওয়া পথে চলবেন না, বরং নিজের শর্তে রাজনীতিতে আসবেন দক্ষিণী সিনেমার এই সুপারস্টার। এই ঘটনা বিজয়ের নেতৃত্বের প্রতি জনগণের আস্থা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
অবশেষে ২০২৪ সালের ২রা ফেব্রুয়ারি বিজয় তার রাজনৈতিক দল ‘তামিলগা ভেট্টি কাজাগাম’ বা টিভিকে’র নাম ঘোষণা করেন।
ভোটে অংশগ্রহনের ক্ষেত্রেও কৌশলী ছিলেন তিনি। সেবছরের লোকসভা নির্বাচন এড়িয়ে তিনি পুরো শক্তি সঞ্চয় করেন ২০২৬ এর বিধানসভা নির্বাচনের জন্য।
দলের মূল স্লোগান নির্ধারণ করেন ‘ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক ন্যায়বিচার’। নিজেকে তুলে ধরেন পেরিয়ার এবং আম্বেদকরের আদর্শের অনুসারী হিসেবে।
টিভিকে ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নিজেদের পরিকল্পনার ফলও পান হাতেনাতে।
ডিএমকে এবং এআইএডিএমকের মতো শক্তিশালী দলগুলোর আধিপত্য ভেঙ্গে ২৩৪টির মধ্যে ১০৮টি আসন পায় বিজয়ের দল। জোট শরিকদের সমর্থনে ১২১টি আসনের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি।
আর এরই মধ্য দিয়ে ১৯৬৭ সালের পর প্রথম তামিলনাড়ুর রাজনীতির প্রধান দুই প্রধান দুই দলের বাইরে কোনো শক্তি চেন্নাইয়ের ক্ষমতায় বসল।
রূপালি পর্দার ৪০ বছর
বিজয়ের অভিনয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিলো ১৯৮৪ সালে শিশু শিল্পী হিসেবে। চার দশক পর এসে নাম লেখান বিশ্বের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া অভিনেতাদের তালিকায়।
সিনেমার এই যাত্রার শুরুটাও সহজ ছিলো না বিজয়ের জন্য। বাবার পরিচালনায় অভিনয় করে শুরুতেই ‘নেপোটিজমে’র তকমা আর তীব্র সমালোচনা সহ্য করতে হয় তাকে। পুভে উনাক্কাগা’ বা ‘কাদালুক্কু মারিয়াদাই’র মতো সিনেমা দিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন রোমান্টিক হিরো হিসেবে। হয়ে ওঠেন তরুণ প্রজন্মের ‘হার্টথ্রব’। গিল্লি’ সিনেমার মাধ্যমে সিনেমায় অ্যাকশন হিরো হিসেবে নিজের জায়গা পাকা করেন বিজয়। নিজের ফ্যান ক্লাবগুলোকে ২০০৩ সালের পর থেকে সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করতে শুরু করেন বিজয়। ভূষিত হতে থাকেন ‘থালাপতি’ বা কমান্ডার উপাধিতে।
থুপ্পাক্কি’ থেকে ‘লিও’, তার প্রতিটি সিনেমা বক্স অফিসে শত শত কোটি টাকার ব্যবসা করে। থালাপতির সিনেমাগুলো কেবল বিনোদন নয়, দিতে থাকে দুর্নীতি বিরোধী রাজনৈতিক বার্তা।
বিজয়ের চ্যালেঞ্জ
বিজয়ের রাজনীতির মূল মন্ত্র হলো ‘ধর্মনিরপেক্ষ সামাজিক ন্যায়বিচার’। তিনি নিজেকে পেরিয়ারের যুক্তিবাদ, আম্বেদকরের সাম্যবাদ এবং কামরাজের সুশাসনের অনুসারী হিসেবে দাবি করেন। তবে তার সামনে এখন বিশাল চ্যালেঞ্জ।
তামিলনাড়ুর ওপর চেপে থাকা প্রায় ১০ লক্ষ কোটি টাকার ঋণের বোঝা সামলে কীভাবে তিনি বিনামূল্যে বিদ্যুৎ বা অন্যান্য জনকল্যাণমূলক প্রকল্প বাস্তবায়ন করবেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
সিনেমার পর্দায় বিজয়কে বহুবার দেখা গেছে অসম্ভবকে সম্ভব করতে। তবে রূপালি পর্দার গ্ল্যামার এবং বাস্তব প্রশাসনের জটিলতার তফাৎ আকাশ-পাতাল।
এমজিআর বা জয়ললিতার মতো বিজয়ও রুপালি পর্দার জাদুকে দীর্ঘস্থায়ী শাসনে রূপান্তর করতে পারবে, নাকি তার এই জয় কেবল একটি ক্ষণস্থায়ী রোমাঞ্চ হয়ে থাকবে, তার উপর নির্ভর করবে ভারতের জাতীয় রাজনীতির অনেক সমীকরণ।