যুদ্ধকে সাধারণত ধরা হয় ধ্বংস, অনিশ্চয়তা আর মানবিক ক্ষতির প্রতীক হিসেবে। কিন্তু আধুনিক বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সেই যুদ্ধই আবার কিছু খাতের জন্য তৈরি করে অস্বাভাবিক সুযোগ। ইরানকে কেন্দ্র করে চলমান যুক্তরাষ্ট্র–ইসরায়েল সংঘাতও তার ব্যতিক্রম নয়।
একদিকে যখন জ্বালানি, খাদ্য ও পরিবহন ব্যয়ে সাধারণ মানুষের চাপ বাড়ছে, তখনই বিশ্বের কিছু বড় করপোরেশন এই অস্থিরতার ভেতরেই বিলিয়ন ডলারের মুনাফা তুলছে।
বিবিসির বিশ্লেষণে উঠে এসেছে এই দ্বৈত বাস্তবতার চিত্র, যেখানে সংকটই কারও জন্য পরিণত হচ্ছে আয়ের নতুন উৎসে।
সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা, বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি। বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও গ্যাস এই গুরুত্বপূর্ণ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। সংঘাতের কারণে এই পথ কার্যত ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং তেলের দাম দ্রুত ওঠানামা শুরু করে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে জ্বালানির এই অস্থিরতা শুধু দাম বাড়ায় না, বরং উৎপাদন, পরিবহন ও ভোক্তা পর্যায় পর্যন্ত একটি চেইন রিঅ্যাকশন তৈরি করে।
এই অস্থির পরিবেশে সবচেয়ে বেশি লাভবান হয়েছে বড় তেল ও গ্যাস কোম্পানিগুলো। যেসব প্রতিষ্ঠানের ট্রেডিং ও হেজিং সক্ষমতা শক্তিশালী, তারা দামের ওঠানামা থেকে অতিরিক্ত মুনাফা তুলতে সক্ষম হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বিপি, শেল ও টোটাল এনার্জিসের মতো ইউরোপীয় জ্বালানি কোম্পানিগুলো প্রথম প্রান্তিকে বিলিয়ন ডলারের মুনাফা ঘোষণা করেছে। মার্কিন প্রতিষ্ঠান এক্সনমোবিল ও শেভরনের আয় তুলনামূলক কিছুটা কমলেও বাজারের প্রত্যাশাকে ছাড়িয়ে গেছে, যা ইঙ্গিত করে যে জ্বালানি খাতে মুনাফার চাপ এখনও উচ্চ।
তবে এই জ্বালানি সংকট শুধু কোম্পানিগুলোর আয়ের গল্প নয়। বরং এটি বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তেলের দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে। এর প্রভাব পড়ে সরাসরি খাদ্য, কৃষি ও উৎপাদন খাতে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে এই চাপ আরও বেশি, কারণ তারা আমদানি-নির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরশীল।
অস্থিরতার এই পরিবেশে একই সময়ে ব্যাংকিং খাতেও তৈরি করেছে নতুন সুযোগ। যুদ্ধ ও ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকিপূর্ণ সম্পদ থেকে সরে এসে নিরাপদ খাতে অর্থ সরিয়ে নিচ্ছেন। এর ফলে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের লেনদেন বাড়ছে, বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে ওঠানামা বাড়ছে এবং হেজ ফান্ড ও ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংকগুলো ট্রেডিং আয়ের নতুন রেকর্ড গড়ছে।
জেপি মরগ্যানের মতো বড় ব্যাংক ট্রেডিং বিভাগ থেকেই এক প্রান্তিকে ১১.৬ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। বিশ্বের শীর্ষ ব্যাংকগুলোর সম্মিলিত মুনাফাও প্রায় ৪৭.৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এমন পরিস্থিতিতে বাজারের অনিশ্চয়তা যত বাড়ে, বড় ব্যাংকগুলোর লেনদেন আয়ের সুযোগও তত বাড়ে।
অন্যদিকে প্রতিরক্ষা খাত এই সংঘাতের সরাসরি সুবিধাভোগীদের একটি। ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিরক্ষা ব্যয় বাড়ছে, কারণ দেশগুলো তাদের সামরিক সক্ষমতা ও মজুদ পুনর্গঠনে ব্যস্ত। ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোন প্রযুক্তি, যুদ্ধবিমান যন্ত্রাংশ এবং নজরদারি প্রযুক্তির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। লকহিড মার্টিন, বোয়িং, নর্থরপ গ্রুম্যান এবং বিএই সিস্টেমসের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন অর্ডারের বড় পাইপলাইন তৈরি করেছে।
তবে এই খাতেও সবকিছু স্থিতিশীল নয়। শেয়ারবাজারে প্রতিরক্ষা কোম্পানিগুলোর শেয়ার কিছু সময়ে বাড়লেও আবার অতিমূল্যায়ন নিয়ে উদ্বেগে কিছুটা পতনও দেখা গেছে। এটি দেখায় যে যুদ্ধ অর্থনীতিতে লাভ থাকলেও তা সবসময় স্থায়ী বা ঝুঁকিমুক্ত নয়।
এদিকে দীর্ঘমেয়াদে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটছে নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে ঝুঁকে। জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় অনেক দেশই বিকল্প উৎসের দিকে ঝুঁকছে। সৌরবিদ্যুৎ, বায়ুশক্তি, বৈদ্যুতিক গাড়ি এবং ব্যাটারি প্রযুক্তির বাজার দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। নেক্সটএরা এনার্জি, ভেস্টাস ও অরস্টেডের মতো কোম্পানিগুলো বিনিয়োগ ও আয়ের ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি দেখছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিবর্তন কেবল পরিবেশগত নয়, বরং কৌশলগতও। দেশগুলো এখন জ্বালানি নির্ভরতা কমিয়ে নিরাপদ ও স্থানীয় উৎসের দিকে যেতে চাইছে, যাতে ভবিষ্যতে এমন সংকটে কম ঝুঁকিতে পড়তে হয়।
সব মিলিয়ে, বর্তমান সংঘাত বৈশ্বিক অর্থনীতিকে দুই ভাগে ভাগ করে দিয়েছে। একদিকে সাধারণ মানুষ ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলো বাড়তি চাপের মধ্যে রয়েছে। অন্যদিকে বড় করপোরেশন ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো এই অস্থিরতার মধ্যেও বিলিয়ন ডলারের মুনাফা গুনছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এটি আধুনিক যুদ্ধ অর্থনীতির একটি পরিচিত বাস্তবতা যেখানে ধ্বংস ও ক্ষতির পাশাপাশি কিছু খাতের জন্য তৈরি হয় অপ্রত্যাশিত লাভের সুযোগ।