নীরব গণঅভ্যুত্থান—পশ্চিমবঙ্গে ২৩এ ও ২৯এ এপ্রিলের বিধানসভা নির্বাচনের পরে ৪ঠা মে যে ফল প্রকাশিত হল, তাকে এক কথায় এভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস (টিএমসি) এই নির্বাচনে বিপাকে পড়তে পারে, এই আশঙ্কা দলের নেতৃত্বের মধ্যে ছিল। কিন্তু সেই বিপদ যে এভাবে তাদের সরকারের মূলোৎপাটন করবে তা কল্পনাও করেনি।
বিধানসভার ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২১৩টিতে (২০৮টি বিজেপি, ৩টি বাম ও আইএসএফ জোট এবং ২টি কংগ্রেস) টিএমসিকে পরাস্ত করে যে জিতে যাবে তা এমনকি বিজেপি নেতৃত্বও হিসাবের মধ্যে রাখেনি। তৃণমূল নেতৃত্বের পাশাপাশি তাই তারাও বিস্ময় ঢাকতে পারছেন না।
কঠোর প্রহরায় সোমবার ভারতীয় সময় সকাল ৮টায় ভোট গণনা শুরুর পরই শাসক ও বিরোধী পক্ষের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছবি ফুটে ওঠে। এগিয়ে থাকা আসনের সংখ্যায় বিজেপি এবং তৃণমূলের মধ্যে ফারাক প্রায় ছিলোই না।
প্রথম দিকে গোনা হচ্ছিল ভোটের কাজে অংশ নেওয়া সরকারি কর্মীদের আগাম ভোট দেওয়া পোস্টাল ব্যালটগুলি। ঘণ্টা দুয়েক পরে শুরু হয় ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনের (ইভিএম) ভোট গণনা।
সাধারণ ভোটারদের দেওয়া ভোট ‘সেইভ’ করে রাখা হয় এই যন্ত্রে। একেকটি বুথের জন্য একেকটি ইভিএম। ২০-২৫টি করে রাউন্ড লাগে সব ভোট গণনার জন্য।
প্রথম কয়েক রাউন্ডে ফলাফলেও তীব্র রেষারেষি স্পষ্ট হচ্ছিল। দুপুরের পর গণনার রাউন্ড কয়েক ধাপ এগোতে ছবিটা একেবারেই বদলে গেলো। বিরোধী বিজেপির আসন সংখ্যা লম্বা লম্বা লাফে বাড়তে লাগল।
বিপরীতে শাসক তৃণমূলের লাফের পরিধি অনেক কম। বিকালে রাজ্যজুড়ে বিজেপি কর্মীরা আবির উড়িয়ে রাস্তায় নামল।
দুয়েক জায়গায় শাসক দলের কর্মীদের দু-চার ঘা পিটিয়েও দিল। ২০১১ সালে এই অবস্থায় মমতার আগের মুখ্যমন্ত্রী সিপিএম নেতা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য গণনার দিনে জনমতের প্রাথমিক প্রতিফলন দেখে দুপুর-দুপুরই রাজ্যপালের হাতে পদত্যাগ পত্র তুলে দিয়ে পরাজয় স্বীকার করে নিয়েছেলেন।
তিনি বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, ইনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। মনোবল ধরে রাখতে ফেইসবুক লাইভে কর্মীদের উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে মমতা দাবি করলেন, আসলে তৃণমূলই সরকার গড়তে চলেছে, নির্বাচন কমিশন শুধু বিজেপির জেতা আসনগুলি দেখিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে, যাতে শাসক দলের কর্মীরা হতাশ হয়ে গণনা কেন্দ্র ছেড়ে বেরিয়ে যান।
মমতা কর্মীদের বললেন, “দিনের শেষে তৃণমূলের জেতা আসনগুলি দেখাতেই হবে। তাই হতাশ হওয়ার কোনও কারণ নেই, গণনাকেন্দ্র ছেড়ে বেরিয়ে যাওয়াও যাবে না। বেরিয়ে গেলেই কারচুপি করে বিজেপিকে জেতানো হবে।” তবে মমতার চিরপরিচিত এই চক্রান্ত থিওরিও কাজে এলো না। বিজেপির আসন বেড়েই চলল।
অবশেষে দিন হল অবসান, নামল গ্রীষ্মসন্ধ্যা। চারিদিকে গেরুয়া আবিরের সঙ্গে আতসবাজির রোশনাই। বিজেপির আসন সংখ্যা কিছুক্ষণ ১৯৭-তে আটকে থাকার পরে হঠাৎই দুইশ'র ঘর পেরিয়ে ২০৫-এ পৌঁছে গেলো।
নিজের পাড়া ভবানীপুরে প্রার্থী হয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজেই। নিরাপদ আসন, পরিচিত মুখ। কিন্তু এখানেও তাকে তাড়া করে এসে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিলেন বিজেপি'র শুভেন্দু অধিকারী।
আগেরবার, ২০২১-এ মেদিনীপুরের নন্দীগ্রাম আসনে মমতাকে পরাজিত করেছিলেন শুভেন্দু। মমতা মুখ্যমন্ত্রী হয়ে পরে ভবানীপুরে দাঁড়িয়ে বিপুল ব্যবধানে জিতে এসেছিলেন।
শুভেন্দু এবারও নন্দীগ্রামে প্রার্থী হয়েছিলেন, সঙ্গে দ্বিতীয় আসন হিসাবে বেছে নেন ভবানীপুরকে। দুপুরের মধ্যেই নন্দীগ্রামে জয় নিশ্চিত হয়ে যায় শুভেন্দুর।
ভবানীপুরে তখন বিপুল ব্যবধানে এগিয়ে মমতাই। কিন্তু ১৩ রাউন্ড গণনার পরে সেই ব্যবধান দ্রুত কমতে শুরু করল। গণনায় কারচুপির অভিযোগ তুলে মুখ্যমন্ত্রী মমতা নিজে হাজির হলেন গণনা কেন্দ্রে। ছুটে গেলেন শুভেন্দুও।
বাদানুবাদে দীর্ঘ সময় সেখানে স্থগিত হয়ে যায় ভোট গণনা। ততক্ষণে, অন্যত্র একটার পর এক আসন পেয়ে বিজেপির জয়যাত্রা চলতে লাগলো। প্রায় তিন ঘণ্টা থমকে থাকার পরে বেশি রাতে আবার গণনা শুরু হতে দেখা গেল দ্রুত ব্যবধান মুছে গেল মমতার।
গণনাকেন্দ্র ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন তিনি, ক্লান্ত, হতাশ অভিব্যক্তি নিয়ে। লাফ দিয়ে এগিয়ে গেল শুভেন্দু অধিকারীর ভোটের অঙ্ক। শেষ পর্যন্ত বেশি রাতে ঘোষণা করা হল, প্রায় ১৬ হাজার ভোটে পরাজিত হয়েছেন বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
এই অমোঘ ঘোষণা যেন তৃণমূল কংগ্রেসের কফিনে ঠুকে দেওয়া শেষ পেরেকটি। কারণ তার আগেই দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয়ী হয়ে বিজেপির পরবর্তী সরকার গঠন নিশ্চিত হয়ে গিয়েছে।
বিরুদ্ধ ভোটের প্লাবনে উৎখাত হয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার। এর পরে মুখ্যমন্ত্রী মমতার পরাজয়টি যেন অবধারিতই ছিল।
কেন এই ফলাফল পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনের? বিজেপি নেতৃত্বও জানেন, এই জয়ের কারণ তাদের কৃতিত্বের চেয়ে অনেক বেশি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যর্থতা।
এই ফলের অর্থ এই নয় যে রাজ্যের মানুষ বিজেপির হিন্দুত্ববাদী এজেন্ডাকে আলিঙ্গন করে নিজের করে নিয়েছেন। এই ফলের অর্থ এই নয় যে, অন্য রাজ্যে বিজেপি সরকারের বর্বরতা ও ব্যর্থতার ইতিহাস বাঙালির অজানা। এই ফল বলে না যে, বিজেপির উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতি, অদ্ভুত ভাষার কথাবার্তায় এ রাজ্যের মানুষ সিলমোহর দিলেন।
আসলে এই ফলের মাধ্যমে মমতার মতো এক ‘ভয়ানক’ শাসককে প্রত্যাখ্যান করেছেন রাজ্যের মানুষ। মমতা ও তার ভাইপো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে শাসক দলের নেতা-মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে ওঠা সীমা ছাড়ানো দুর্নীতির অভিযোগের বিচার চেয়েছেন পশ্চিমবঙ্গবাসী।
নিয়োগ দুর্নীতির মতো বেপরোয়া কেলেঙ্কারির মাথাদের শাস্তি চেয়েছেন রাজ্যের মানুষ। নিয়োগ পরীক্ষা বন্ধ করে, কর্মসংস্থানের সব পথ রুদ্ধ করে দেড়-দু’হাজার টাকা ভাতা ছড়িয়ে ভোট কেনার ফন্দি যে রাজ্যবাসী ভালোভাবে নিচ্ছে না, ভোটের এই ফল তার প্রমাণ।
শাসক দলের নেতৃত্বে রাজ্যজুড়ে যে অশুভ সিন্ডিকেট শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবহণ থেকে প্রতিটি ক্ষেত্রে দখলদারি চালাচ্ছে, ভোটে রাজ্যবাসী তার ধ্বংস চেয়েছেন।
আরজি কর হাসপাতালের এক মহিলা চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের নায়ককে রক্ষা করতে, হত্যার প্রমাণ লোপাট করতে সরকার, প্রশাসন ও শাসক দলের লোকেরা যেভাবে তৎপর হয়েছিল, ভোটে সেই সরকারের উৎখাত চেয়েছেন সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্যবাসী। রাজ্য সরকারি কর্মচারীরাও মমতাকে ভোট দেননি, কারণ নানা অজুহাতে ডিএ (মহার্ঘ্য ভাতা) বকেয়া রেখে তিনি তাদের বঞ্চিত করেছেন।
এজন্য বাঁ-হাতে হলেও বিজেপির প্রতীকে ভোটটি দিয়ে এসেছেন মানুষ। আর সেই কাজ তারা করেছেন অত্যন্ত সঙ্গোপনে। যে যার ভোটটি সদ্ব্যবহার করেছেন রেজিম চেইঞ্জের জন্য।
নির্বাচন কমিশন নিশ্চিত করেছে, মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে, নিরাপদে তার বহুমূল্য ভোটটি দিয়ে আসতে পারেন। এটাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য।
অপছন্দের সরকারকে গণতান্ত্রিক পথে ভোটের মাধ্যমে বারবার উৎখাত করেছে ভারতের মানুষ। কখনও কেন্দ্রে, কখনও রাজ্যে। পশ্চিমবঙ্গে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকারকে বিদায় করে আরও একবার সেই পথে আস্থা রাখলেন তারা।
নতুন সরকারের মুখ্যমন্ত্রী কে হবেন? বিজেপি এর আগে পশ্চিমবঙ্গের শাসন ক্ষমতায় আসেনি। এবারেও যে আসবে, তেমন আত্মবিশ্বাস তাদের নেতারা সেভাবে দেখাননি। তাই ভোটের আগে মুখ্যমন্ত্রী পদে কারও নাম ঘোষণা করার প্রয়োজনটুকুও বোধ করেনি বিজেপি নেতৃত্ব।
এবার সে দায়িত্ব এসে পড়ার পরেই নানা নাম উঠে এসেছে। বিজেপি আসলে অরাজনৈতিক সামাজিক সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের (আরএসএস) রাজনৈতিক শাখা। মুখ্যমন্ত্রী নির্বাচনে তাই আরএসএস'র পূর্ব প্রশিক্ষণের একটি বিষয় বাড়তি গুরুত্ব পেয়ে যায়।
দিলীপ ঘোষ, সুকান্ত মজুমদার বা রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের সেই সঙ্ঘ ঘনিষ্ঠতার অভিজ্ঞতা রয়েছে। নেই যার, তিনি শুভেন্দু অধিকারী।
তিনি গত বিধানসভায় বিজেপির বিরোধী দলনেতা ছিলেন। পরপর দুইবার মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নির্বাচনে পরাজিত করে নিজের জনপ্রিয়তার প্রমাণ দিয়েছেন। কিন্তু কংগ্রেসের ছাত্র সংগঠনে শুভেন্দুর রাজনৈতিক হাতেখড়ি।
পরে মমতার দল তৃণমূল কংগ্রেসে যোগ দিয়ে যুব সংগঠনের সভাপতির দায়িত্ব নেন। কিন্তু মমতা যখন নিজের ভাইপোকে সরাসরি যুব সংগঠনের মাথায় বসিয়ে শুভেন্দুর প্রভাব ছাঁটতে নামেন, তিনি বিজেপিতে যোগ দেন।
তৃণমূলে থাকাকালীন নারদা কেলেঙ্কারিতে শুভেন্দুর নিজে হাতে ঘুষের টাকা নেওয়ার ভিডিও সামনে এসেছিল, যা ভাল চোখে দেখে না আরএসএস। ভবানীপুরে মমতাকে পরাস্ত করার পরে মুখ্যমন্ত্রী পদে অবশ্যই সব চেয়ে জোরালো ভাবে উচ্চারিত হবে শুভেন্দুর নাম।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার কপালে শিকে ছিঁড়ে, নাকি ভিন্ন ক্ষেত্র থেকে অন্য কাউকে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী বেছে নেয় বিজেপি ও আরএসএস'র কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব, সবার নজর এখন ওই দিকেই।