ডার্ক ঈগল: আমেরিকার হাইপারসনিক ‘ট্রাম্প কার্ড’

ইরান যুদ্ধে মার্কিন ‍যুক্তরাষ্ট্রের হাইপারসনিক মিসাইল মোতায়েনের প্রস্তাবের পেছনে পরিবর্তিত ‘কৌশলী’ অবস্থান রয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।  

প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত নিরাপত্তা বিষয়ক গবেষণা সংস্থা ‘সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’ বলছে, ইরান তাদের ব্যালিস্টিক মিসাইল লঞ্চারগুলোকে এমন জায়গায় সরিয়ে নিয়েছে যা বর্তমান মার্কিন ‘প্রিসিশন স্ট্রাইক মিসাইল’ বা পিআরএসএম এর নাগালের বাইরে। কারণ, এগুলোর রেঞ্জ ৫০০ থেকে ৮০০ কিলোমিটার।

ইরান গত কয়েক দশকে পাহাড়ের গভীরে শত শত কিলোমিটার টানেল এবং বাঙ্কার তৈরি করেছে বলে ধারণা সমর কৌশলবিদদের। এগুলো 'মিসাইল সিটিস' নামে পরিচিত।
বাঙ্কারগুলো মাটির প্রায় ৫০০ মিটার গভীরে অবস্থিত। এগুলোকে এমনভাবে ডিজাইন করা হয়েছে যেন ‘বাঙ্কার বাস্টার’ এর মতো শক্তিশালী বোমা বা বড় আকারের বিমান হামলাও এগুলোর কোনো ক্ষতি করতে না পারে।

ইরান ও আমেরিকা বর্তমানে এমন এক পরিস্থিতিকে পড়েছে, যেখানে কোনো পক্ষই না পাচ্ছে চূড়ান্ত জয়, আবার যুদ্ধ থেকে পিছিয়েও আসতে পারছে না। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সামরিক কৌশলের ভাষায় একে বলা হয় ‘স্ট্রাটেজিক ডেডলক’ বা কৌশলগত অচলাবস্থা।

ডার্ক ঈগলের মতো হাইপারসনিক মিসাইল মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র এই ‘ডেডলক’ খোলার শেষ চেষ্টা করতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

মার্কিন গণমাধ্যম অ্যাক্সিওস-এর বিশ্লেষণ হলো, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি এবং আঞ্চলিক আধিপত্য নিয়ে একটি ‘শর্ট অ্যান্ড পাওয়ারফুল’ আঘাতের পরিকল্পনা করছেন ট্রাম্প। যাতে আলোচনার টেবিলে নমনীয় হতে বাধ্য হয় ইরান।

ডার্ক ঈগলের বিশেষত্ব

ডার্ক ঈগল-এর পোশাকি নাম ‘লং রেঞ্জ হাইপারসনিক ওয়েপন’ বা এলআরএইচডাব্লিউ। শব্দের চেয়ে ৫ গুণ বেশি গতিতে ছুটতে পারে এই মিসাইল। ঘণ্টায় ৬ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি।

এই মিসাইলের আর একটি বিশেষত্ব হলো এর ‘ম্যানুভারেবিলিটি’। সাধারণ ব্যালিস্টিক মিসাইল একটি নির্দিষ্ট পথে চলে। ফলে সহজেই তা শনাক্ত করে ধ্বংস করা যায়। কিন্তু ডার্ক ঈগল মাঝ আকাশে দিক পরিবর্তন করতে পারে। এটি বায়ুমণ্ডলের ওপরের স্তরে ‘গ্লাইড’ করে চলে। শত্রুপক্ষের রাডার ডার্ক ঈগলকে শনাক্ত করার আগেই ‘পিন-পয়েন্ট একিউরেসি’তে লক্ষ্যে আঘাত হানে। ওয়ারহেড ছোট হলেও এর প্রচণ্ড গতিশক্তি যেকোনো বাঙ্কার বা ভূগর্ভস্থ স্থাপনা ধ্বংস করার জন্য যথেষ্ট।

ডার্ক ঈগল তৈরিতে কাজ করছে আমেরিকার শীর্ষ ডিফেন্স জায়ান্টরা। মিসাইলের প্রাইম কন্ট্রাক্টর হলো লকহিড মার্টিন। এই কোম্পানি তৈরি করেছে এফ-৩৫ ও এফ-২২-এর মতো পঞ্চম প্রজন্মের অত্যাধুনিক যুদ্ধবিমান। মোটর বা প্রপালশন সিস্টেম বানিয়েছে নর্থরপ গ্রাম্মান এবং গ্লাইড বডি ডাইনেটিক্স। এই নর্থরপ বানিয়েছে সাড়া ফেলে দেওয়া স্টেলথ বোমারু বিমান বি-২।  
মূলত চীন এবং রাশিয়ার উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে টেক্কা দিতেই ডার্ক ঈগলের ডিজাইন করা হয়েছে।

ব্লুমবার্গের প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিটি মিসাইলের দাম প্রায় ১৫ মিলিয়ন ডলার। যা বাংলাদেশি টাকায় ১৮০ কোটি টাকার বেশি। আর ‘ব্যাটারি’র দাম প্রায় ২ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বা ৩৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি। আর এই ধরনের মিসাইল আছে মাত্র আটটি।    

ভূরাজনীতিতে ডার্ক ঈগলের প্রভাব

ইরান যুদ্ধে ডার্ক ঈগলের মোতায়েন শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, পুরো পৃথিবীর ভূরাজনীতিতে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। আমেরিকার এই পদক্ষেপের ফলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে হিসাব কষতে হবে ইরান এবং তার মিত্রদের। বিশ্বজুড়ে বাড়বে হাইপারসনিকের প্রতিযোগিতা। আরও দ্রুতগতির ও বিধ্বংসী হাইপারসনিক অস্ত্র বানানোর পেছনে ছুটবে রাশিয়া, চীন বা উত্তর কোরিয়ার মতো দেশগুলো।

ইতোমধ্যে রাশিয়ার হাতে আছে কিনঝাল, ওরেশনিক, জিরকন, অ্যাভানগার্ড-এর মতো হাইপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র। এরমধ্যে ওরেশনিক ও কিনঝাল ছুটতে পারে শব্দের গতির ১০ গুণ গতিতে। 
ইরান যুদ্ধে হাইপারসনিক মিসাইল মোতায়েনের সিদ্ধান্তে ইতোমধ্যে ‘বিশ্বজুড়ে কৌশলগত ভারসাম্য নষ্ট করা’র পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে রাশিয়া। এই ধরনের অস্ত্র মোতায়েনকে ‘উস্কানিমূলক’ বলে অভিযোগ করেছেন রুশ কর্মকর্তারা।

মার্কিন সিদ্ধান্তের সমালোচনা করছেন চীনের কর্মকর্তারাও। দেশটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র আমেরিকার এই তৎপরতাকে মধ্যপ্রাচ্যের সামরিকীকরণের চেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন।

নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক বিশ্লেষণে লেখা হয়েছে, হাইপারসনিক অস্ত্রের এই প্রতিযোগিতাকে আমেরিকা, রাশিয়া ও চীনের মধ্যে একটি নতুন 'আর্মস রেস' বা অস্ত্র প্রতিযোগিতা সৃষ্টি করবে। রাশিয়ার কিনঝাল এবং চীনের ডিএফ-১৭ এর বিপরীতে আমেরিকার ডার্ক ঈগলকে দেশদুটি ভালোভাবে দেখছে না বলেও জানায় নিউ ইয়র্ক টাইমস।

ডার্ক ঈগল কী ট্রাম্পের ‘তুরপের তাস’

ডার্ক ঈগলকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শেষ ‘তুরপের তাস’ হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। অ্যাক্সিওস এর মতে, এটি তার ‘ম্যাক্সিমাম প্রেশার ২.০’ ক্যাম্পেইনের সবচেয়ে ধারালো অস্ত্র। ট্রাম্প প্রশাসন দেখাতে চায় যে, আগের চেয়ে তারা অনেক বেশি আগ্রাসী এবং প্রযুক্তিগতভাবে উন্নত। হাইপারসনিক মিসাইল দিয়ে গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু দ্রুত ধ্বংস করে যুদ্ধ শেষ করা ট্রাম্পের কৌশল বলেও জানিয়েছে অ্যাক্সিওস।
‘সেন্টার ফর স্ট্রাটেজিক এন্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ’-এর বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ট্রাম্প সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যে ‘এন্ডলেস ওয়ার’ বা অন্তহীন যুদ্ধের বিরোধী। একইসাথে ইরাক বা আফগানিস্তানের মতো হাজার হাজার সৈন্য পাঠিয়ে বছরের পর বছর যুদ্ধও করতে চান না তিনি। ডার্ক ঈগল হলো এমন একটি অস্ত্র, যা দিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যে ইরানের কমান্ড সেন্টার বা মিসাইল সাইট ধ্বংস করে দেওয়া যায়। এটি ট্রাম্পকে একটি ‘ক্লিন’ এবং ‘কুইক’ বিজয়ের সুযোগ দেবে বলেও ওই বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।

দ্য ইকনমিক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হচ্ছে, ডার্ক ঈগলকে ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা ‘মাগা’ ক্যাম্পেইনের অংশ হিসেবে দেখেন ট্রাম্প। আমেরিকার কাছে এমন সব ‘সুপার ডুপার’ মিসাইল আছে যা রাশিয়া বা চীনের কাছে নেই বলে অনেকবারই দাবি করেছেন ট্রাম্প।

তাই ডার্ক ঈগল মোতায়েন করার মাধ্যমে ট্রাম্প বিশ্বকে দেখাতে চান যে, তার নেতৃত্বেই আমেরিকা প্রযুক্তিগতভাবে অজেয় হয়ে উঠেছে। 
আর হাইপারসনিক মিসাইল মোতায়ানকে শুধু ইরানের বিরুদ্ধে লড়াই নয়, বরং রাশিয়া ও চীনের সামনে ট্রাম্প নিজের ক্ষমতা প্রদর্শনের একটি বড় সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করছে বলে মন্তব্য করে ব্লুমবার্গ।

ট্রাম্পকে একজন ‘ডিলমেকার’ বলে আখ্যায়িত করেছে ‘ফাউন্ডেশন ফর ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিস’। তাদের মতে, ট্রাম্প ইরানকে আলোচনার টেবিলে আনতে চান, কিন্তু সেটা নিজের শর্তে। আর এই আলোচনায় আমেরিকাকে বাড়তি সুবিধা দেবে ডার্ক ঈগল। কারণ, যখন কোনো দেশের কাছে এমন অস্ত্র থাকে, যা শত্রু দেশ ঠেকাতে পারে না, তখন আলোচনার টেবিলে সেই দেশ অনেক বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

‘মিলিটারি ওয়াচ’ ম্যাগাজিনের একটি বিশেষ ফিচারে বলা হয়েছে, ইরান এতদিন তাদের পর্বতমালার আড়ালে নিজেদের ‘অস্পৃশ্য’ মনে করতো, যেখানে আমেরিকার প্রচলিত বিমান বা মিসাইল পৌঁছাতে পারবে না। ট্রাম্পের এই ‘ডার্ক ঈগল’ ইরানের সেই মানসিক শান্তি কেড়ে নিয়েছে।

“ডার্ক ঈগল ট্রাম্পের জন্য রাজনৈতিক ইমেজ রক্ষা, দ্রুত যুদ্ধ শেষ করার উপায় এবং ইরানকে নতজানু করার একটি সমন্বিত কৌশল। এটি এমন একটি অস্ত্র যা দিয়ে ইরানের কয়েক দশকের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনাকে গুড়িয়ে দেওয়া যায়। তাই এটিকে মনে করা হচ্ছে ট্রাম্পের ‘শেষ তুরপের তাস।”

ইরানের সক্ষমতা ও প্রতিরোধ

নিজেদের আকাশসীমা রক্ষায় ইরান ব্যবহার করে বাভার ৩৭৩ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেম। এটা রাশিয়ার এস-৪০০ এর চেয়েও শক্তিশালী দাবি করে দেশটির সামরিক কর্মকর্তারা।

তবে সামরিক বিশেষজ্ঞদের মতে, ডার্ক ঈগলের মতো হাইপারসনিক গ্লাইড ভেহিকল ঠেকানোর সক্ষমতা পৃথিবীর কোনো একক ডিফেন্স সিস্টেমের নেই।

ইরান বিশ্বাস করে, মিসাইল প্রতিরোধের তুলনায় পাল্টা আঘাত হানার নীতিতে। তাদের হাতে আছে ফাত্তাহ ১ ও ফাত্তাহ ২ এর মত হাইপারসনিক মিসাইল। ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সির খবরে এসব মিসাইলকে শব্দের গতির ১৩ থেকে ১৫ গুণ পর্যন্ত দাবি করা হয়েছে।

‘আইআরজিসি’র কমান্ডার মজিদ মুসাভি সতর্ক করে বলেছেন, ডার্ক ঈগল ব্যবহার হলে মার্কিন ঘাঁটিতেও ‘বেদনাদায়ক আঘাত’ হানা হবে।
তবে বিশ্লেষকরা বলছেন, ডার্ক ঈগল এমন এক শক্তিশালী হারপারসনিক মিসাইল, যা ব্যবহার করা হলে বদলে যেতে পারে যুদ্ধের গতিপথ।

ইরানেরও রয়েছে নিজস্ব হাইপারসনিক প্রযুক্তি এবং বিশাল মিসাইল ভাণ্ডার। তারাও যদি পালটা আঘাত হানা শুরু করে তাহলে যুদ্ধের পরিসর আরও বড় হবে বলে সতর্ক করছেন বিশ্লেষকরা।