পশ্চিমবঙ্গে মমতাই কি ফের ক্ষমতায় আসছেন নাকি উড়ে যাচ্ছেন বিজেপি জোয়ারে

কে জিতবে পশ্চিমবঙ্গে? মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বে তৃণমূল কংগ্রেস কি ফের জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে পারবে? না কি এ বারে গেরুয়া ঝড়ে সওয়ার হয়ে ক্ষমতা আসতে চলেছে ভারতীয় জনতা পার্টি?

গত বার জোট করে একটিও আসন না-পাওয়া জাতীয় কংগ্রেস এবং বামফ্রন্ট এ বারে আলাদাভাবে নির্বাচনে লড়ছে।

এ বারে কি অন্তত একটি করে আসন জিতে মান বাঁচাতে পারবে রাজ্যের এই দুই প্রাক্তন শাসক দল? ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যটির বিধানসভা নির্বাচন ঘিরে এখন উড়ে বেড়াচ্ছে এই সব অমোঘ প্রশ্ন।

এপ্রিলের ২৩ ও ২৯এ দু’দফায় পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা নির্বাচন শেষ হয়েছে। প্রায় ৯২ শতাংশ ভোট পড়েছে এ বার রাজ্যজুড়ে, যা এক রেকর্ড।

মানুষের রায়কে বুকে আগলে রেখে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন বা ইভিএম-গুলি এখন ঘুমিয়ে রয়েছে প্রতিটি জেলা প্রশাসনের স্ট্রংরুমে। ৪ঠা মে ভোর ভোর সেগুলি বার করে কঠোর পাহারায় গণনাকেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হবে।

বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সামনে সকাল থেকেই শুরু হবে ভোট গণনা। ব্যালট পেপারের মতো গুনে গুনে বান্ডিল বাঁধতে হবে না বলে মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল। তত দিনে উড়ে বেড়াবে এই সব প্রশ্ন। যে যার ধারণা মতো তার জবাব দিতে চেষ্টা করবেন।

গোটা ভোট প্রক্রিয়াটা পরিচালনা করলেন নির্বাচন কমিশনের যে সব অফিসার, তাঁরা প্রতিটি বুথের সিসিটিভি, বিভিন্ন দলের এজেন্টদের নালিশের বহর এবং ভোটকর্মী দলের নেতা প্রিসাইডিং অফিসার-এর দেওয়া রিপোর্টগুলি যাচাই বাছাই করে দেখবেন, কোথায় কোথায় আগে হওয়া নির্বাচন বাতিল করে নতুন করে নির্বাচন করতে হবে।

সেই পুনর্নিবাচনও যদি হয়, শেষ হবে মে-র ২ বা ৩-এর মধ্যেই, যাতে ৪ তারিখে একসঙ্গে তা গণনা করা যায়।

এক্সিট পোলের ফল কি আদৌ মেলে?

ভারতে বিভিন্ন সমীক্ষক সংস্থা তাদের নিজেদের নিজেদের তৈরি পদ্ধতি অনুসরণ করে ভোটের দিন ভোটারদের মতিগতির আভাস নিয়ে তার সাহায্যে ভোটের সম্ভাব্য একটি ফলাফল দেওয়ার চেষ্টা করে। এটিকেই বলা হয় এক্সিট পোল বা বুথ ফেরত সমীক্ষা।

বাংলাদেশে যেমন ভোট শেষ হওয়া মাত্র বুথে বুথে ব্যালট বাক্স খালি করে ভোট গণনা শুরু করে দেওয়া হয়, ভারতে তা হয় না। আগে যখন ব্যালট পেপারে ছাপ মেরে ভোট নেওয়া হত, তখনও ব্যালট বাক্সগুলি একত্র করে কড়া পাহারায় স্ট্রংরুমে রাখা হতো। গণনার দিনে বার করে নিয়ে গিয়ে ব্যালট গোনা হত।

কিন্তু, ভোট গ্রহণ ও ভোট গণনার মধ্যে কয়েকটা দিন সময় থেকে যাওয়ায় ভারতে বুথ ফেরত সমীক্ষার একটি ভাল বাজার তৈরি হয়েছে।

বাংলাদেশে ভোট শেষ হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ফলাফলের আভাস আসা শুরু হয়ে যাওয়ায় এবং সারা রাত ভোট গণনার শেষ পরের দিন সকালের দিকেই পূর্ণাঙ্গ ফল প্রকাশ হওয়ায় বুথ ফেরত সমীক্ষার কোনও জায়গা থাকে না।

আবার ভোটের পরে তড়িঘড়ি গণনা শুরু হয়ে যাওয়ায় অনেক সময়েই কোনও বুথে হওয়া বড়সড় গরমিল খতিয়ে দেখার আগেই চাপা পড়ে যায়। কোনও কেন্দ্রের বাকি বুথগুলির গণনা শেষ হয়ে জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়ে যাওয়ায় অল্প কয়েকটি বুথে ভোট গ্রহণে অনিয়ম ধরা পড়লেও সেখানে পুনর্নিবাচনের বিষয়টি আর গুরুত্ব পায় না।

সেই কারণেই ভারতে ভোট গ্রহণের পরে সময় নিয়ে প্রতিটি বুথে সারা দিনের কাজকর্ম পর্যাপ্ত সময় নিয়ে খতিয়ে দেখা হয়। হাতে কয়েকটা দিন রাখা হয় সম্ভাব্য পুনর্নিবাচনের জন্য।

কিন্তু প্রকৃত ফলাফলের সঙ্গে আদৌ কি মেলে বিভিন্ন সংস্থার করা বুথ ফেরত সমীক্ষার ফল? বাস্তব হল, মেলে না। অনেক সময়ে ভোটের ফলাফলের একটা ট্রেন্ড আগে থেকেই বোঝা যায়। টের পাওয়া যায়, হাওয়া কার দিকে। বুথ ফেরত সমীক্ষায় তারই প্রতিচ্ছবি দেখা যায়।

অথচ বহু ক্ষেত্রে তার থেকে নির্বাচনের প্রকৃত ফল হয় আলাদা। পশ্চিমবঙ্গে ২০২১-এ আগের বিধানসভা নির্বাচনে অজস্র সংস্থা বুথ ফেরত সমীক্ষার ফল প্রকাশ করেছিল। প্রায় সব সমীক্ষার ফলেই দেখানো হয়েছিল শাসক তৃণমূল কংগ্রেসকে পরাজিত করে বিজেপি সরকার গঠন করতে চলেছে।

একেক সংস্থা বিজেপিকে এক এক রকম আসন দিয়েছিল সমীক্ষার ফলাফলে। এমনকি কয়েকটি সংস্থা মোট ২৯৪টি আসনের মধ্যে ২০০টির বেশি বিজেপির জন্য বরাদ্দ করে দিয়েছিল।

ফলাফল বেরোতে দেখা গিয়েছিল, মমতার তৃণমূল কংগ্রেস শুধু যে জয়ী হয়ে ক্ষমতা ধরে রেখেছে তাই নয়, দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন দখল করেছে। বিজেপি পেয়েছে মাত্র ৭৭টি।

সর্বভারতীয় ক্ষেত্রেও, ২০২৪-এর এপ্রিল ও মে-তে হওয়া লোকসভা নির্বাচনে প্রায় প্রত্যেকটি সংস্থা তাদের বুথ ফেরত সমীক্ষার রিপোর্টে জানায়, নরেন্দ্র মোদীর নেতৃত্বে বিজেপি বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ফের সরকার গড়তে চলেছে।

দেশে লোকসভার মোট ৫৪৩টি আসনের মধ্যে বিজেপি একাই ৪০০ বা তার বেশি আসন পেতে চলেছে, এমন পূর্বাভাস দেয় কোনও কোনও সংস্থা।

ফল প্রকাশের পরে দেখা যায়, বিজেপি একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য প্রয়োজনীয় ২৭২টি আসনও পায়নি। তারা জয়ী হয়েছিল ২৪০টি আসনে। দু’টি আঞ্চলিক দলের সমর্থনে ২৯৩টি আসন নিয়ে কোনওক্রমে সরকার গঠন করেন মোদী।

তবুও সাধারণ মানুষ চাতক পাখির মতো তাকিয়ে থাকেন বুথ ফেরত সমীক্ষা বা এক্সিট পোল-এর ফলের দিকে। তা নিয়ে চর্চার তুফান ওঠে চায়ের কাপে।

কোনো সংস্থার সমীক্ষার ফলাফল গোলগোল করে হলেও ভোটের আসল ফলের ধারেকাছে গেলেই শুরু হয় বুক বাজিয়ে ক্রেডিট নেওয়ার পালা। আর না মিললে কখনও এই সব সমীক্ষাওয়ালারা বলেননি, ‘দুঃখিত। আমাদের সমীক্ষা আসল ফলের ধারে কাছেও পৌঁছয়নি। আমরা জনমন বুঝতে ব্যর্থ হয়েছি।’

এই সব সংস্থার কর্তাব্যক্তিরা আবার পরের ভোট শেষ হওয়া মাত্র গম্ভীর মুখে টেলিভিশনের স্টুডিয়োতে এসে বসবেন।

নানা রকম রাশিবিজ্ঞানের জাগলারি দেখিয়ে নজর কাড়ার চেষ্টা করবেন। এই সার্কাসকে ভারতে নির্বাচনের অঙ্গ কিংবা উত্তেজনার শেষে কমিক রিলিফ হিসাবে দেখেন দর্শক-পাঠকেরা।

পশ্চিমবঙ্গের এই নির্বাচন নিয়ে এক্সিট পোল কী বলছে?

প্রায় হাফ ডজন বা তারও বেশি সংস্থা এ বারেও পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল নিয়ে সমীক্ষা প্রকাশ করেছে। তাতে বলা হয়েছে, শাসক তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিরোধী দল বিজেপির মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে চলেছে এ বার।

তবে, অধিকাংশ সমীক্ষার ফলাফলেই আভাস দেওয়া হয়েছে, বিজেপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করতে চলেছে। গত বার আসন সংখ্যা শূন্য থাকলেও বাম ও কংগ্রেস (এ বার আলাদা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছে) এ বার কয়েকটি করে আসন পেতে চলেছে। তবে, তা মিলিতভাবেও দুই অঙ্কে পৌঁছাবে না।

এক্সিট পোল-এর পূর্বাভাস কেন প্রশ্নের মুখে?

আপাতদৃষ্টিতে বিভিন্ন সংস্থার করা এই এক্সিট পোলগুলির পূর্বাভাস বাস্তবসম্মত হলেও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে তা নিয়ে ঘোরতর সন্দেহ রয়েছে।

প্রথমত, এবারে অধিকাংশ সমীক্ষা আর বুথে বুথে গিয়ে করা হয়নি। বদলে কলকাতা থেকে ফোনকল এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহারের কথা জানানো হয়েছে। এর ফলে মানুষের থেকে আরও দূরে চলে গিয়েছে বুথফেরত সমীক্ষা।

অনেকে বলছেন, যুদ্ধের ফলে প্রতিটি ক্ষেত্রই ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে। সমীক্ষাগুলি সঠিকভাবে করার জন্য যে অবকাঠামো গড়া প্রয়োজন, তাতেও তীব্র ব্যয়সঙ্কোচ করতে হয়েছে কর্তৃপক্ষকে। সেই খামতি ঢাকতেই এআই প্রযুক্তির গল্প শোনাতে হচ্ছে তাদের।

সন্দেহের দ্বিতীয় বিষয়টি পুরোপুরি রাজনৈতিক। বিশ্লেষকরা বলছেন, সংগঠনের দিক দিয়ে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাপ্তি বিজেপির চেয়ে এতটাই বিশাল, বিশেষ করে মফস্বল ও গ্রামের ভোটকে তা প্রভাবিত করেছে।

রাজ্যজুড়ে সর্বত্র বিজেপিকে ভোটের প্রচার করাতে হয়েছে ভাড়া করা এজেন্সিকে ব্যবহার করে। কারণ কর্মীদের অপ্রতুলতা। শহরে, এমনকি দক্ষিণ কলকাতার বহু জায়গাতেও প্রত্যেক বুথে গোটা দিন এজেন্ট বসাতে পারেনি বিজেপি।

শাসক তৃণমূলের বিরুদ্ধে মানুষের মধ্যে ক্ষোভ সীমাহীন। কর্মসংস্থানে চূড়ান্ত ব্যর্থতা, মাত্রাছাড়া দুর্নীতি, স্কুলশিক্ষকের চাকরি বিক্রি করে কোটি কোটি টাকা তোলা, দুর্নীতির কারণে উচ্চ আদালত সরকারের সেই নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল করে দেওয়ায় হাজার হাজার মানুষের কর্মচ্যুতি, আর জি কর মেডিক্যাল কলেজে শাসক দলের দুর্বৃত্তের হাতে মহিলা চিকিৎসকের ধর্ষণ, খুন এবং তার প্রমাণ লোপাটে তৃণমূলের নেতা ও সরকারি প্রশাসনের সরাসরি মাঠে নামা— এ সবে রাজ্যের মানুষ ক্ষুব্ধ।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, অনেকে বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মনেপ্রাণে বিরোধী হলেও তৃণমূলের সরকারকে সরানোর লক্ষ্য নিয়ে বিজেপির প্রতীক পদ্মফুলেই ভোটটা দিয়েছেন। কিন্তু এই ক্ষোভকে সঙ্ঘবদ্ধভাবে ভোটযন্ত্রে প্রতিফলিত করতে যে সংগঠনের প্রয়োজন, বিজেপি পশ্চিমবঙ্গে তা তৈরি করতে ব্যর্থ হয়েছে।

তাই নরেন্দ্র মোদী, অমিত শাহ ও অন্য বিজেপি নেতারা উচ্চগ্রামে বক্তৃতা দিয়ে হাওয়া গরম করলেও বিশেষ করে গরিব মানুষ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ভাতা-রাজনীতিকে হারাতে চাননি।

নারীরা জানেন, মাসের এক তারিখ হলেই তৃণমূল সরকারের ‘লক্ষ্মীর ভান্ডার’ প্রকল্পের দেড় হাজার টাকা তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে জমা পড়ে যাবে।

বিজেপি জিতে এলে এই ভাতা তিন হাজার টাকা করার প্রতিশ্রুতি দিলেও, তা দাগ কাটেনি। তৃণমূলের কর্মীরা মনে করিয়ে দিচ্ছেন, এই অমিত শাহ, নরেন্দ্র মোদীর দল বিজেপি প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, কেন্দ্রে সরকারে এলে তারা কালো টাকা দেশে ফেরত এনে প্রতি ভারতবাসীর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা করে জমা করে দেবে।

তাদের প্রশ্ন, ‘১৫ লাখ তো দূর, আপনারা কেউ মোদী সরকারের দেওয়া ১৫টা টাকাও কখনও পেয়েছেন?’ তাঁরা বোঝাচ্ছেন, মমতা সরকার না থাকলে এই ভাতাও যাবে বন্ধ হয়ে।

এর সঙ্গে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশনের খোলাখুলিভাবে বিজেপির পক্ষে নামাটাও পশ্চিমবঙ্গে পদ্ম ফোটায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে বলে আভাস দিচ্ছেন বিশ্লেষকেরা।

নির্বাচনের ঠিক আগে ভোটার তালিকা হালনাগাদ করার নামে যে ভাবে প্রায় ৯০ লক্ষ ৬৬ হাজার নাম বাদ দেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে বহু প্রকৃত ভোটার রয়েছেন।

দ্রুত কাজের জন্য সাধারণ ভোটারদেরও প্রামাণ্য কাগজপত্র নিয়ে লাইনে দাঁড়িয়ে চূড়ান্ত হেনস্থা হতে হয়েছে। অনেকের ধারণা, নির্বাচন সুষ্ঠু করার নামে কমিশনের এই ‘নির্যাতন’ বহু ভোটারকে বিজেপিবিরোধী করে তুলেছে।

আবার লড়াকু ও জনপ্রিয় তরুণ তারকাদের প্রার্থী করে শূন্যের গেরো কাটানোর আশা করছে বামেরা। মালদহ ও মুর্শিদাবাদে নিজেদের পুরনো গড়ে ২-৩টি আসন পাওয়ার জন্য দাঁত চেপে লড়ছে জাতীয় কংগ্রেসও। এঁদের পুরনো ভোট নিজেদের দলের প্রতীকে ফিরলে ভোট কমতে পারে বিজেপির।

সব মিলিয়ে দু’দফার নির্বাচনে মানুষ ঠিক কী রায় দিয়েছেন, তা জানতে ৪ঠা মে-র ভোট গণনা পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে। তার আগে এর সঠিক আভাসটুকুও এ বারে কেউ দিতে পারছেন না। কারণ হাওয়া যথেষ্ট গোলমেলে।