ইরানে যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘স্পষ্ট কৌশল’ নেই, অর্জিত হয়নি লক্ষ্য 

সম্ভাব্য ইরান আক্রমণের প্রস্তুতিতে যখন শত শত মার্কিন সেনা পারস্য উপসাগরের দিকে অগ্রসর হচ্ছে, তখন কাগজে-কলমে এটি একটি সামরিক অভিযানের পরিকল্পনা মনে হলেও বাস্তবে এর চিত্র অনেক বেশি জটিল।

কারণ, ইরান কেবল একটি রাষ্ট্র নয়, এটি ভৌগোলিক, সামরিক ও রাজনৈতিকভাবে এমন এক শক্তিশালী কাঠামো, যাকে পরাস্ত করা সহজ নয় বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

ইরানে হামলার শুরুর সময় ডনাল্ড ট্রাম্প ও বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসন পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তার কিছুই হয়নি।

সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতাসহ বেশ কয়েকজন কমান্ডার নিহত হলেও ইসলামিক রিপাবলিকে টিকে রয়েছে আগের শাসন ব্যবস্থাই।

আকাশপথে হামলা চালিয়ে শত শত বেসামরিক নাগরিককে হত্যা এবং অবকাঠামো ধ্বংস করে ইরানের দখল আমেরিকা নিতে পারবে না নিশ্চিত করেই বলছেন বিশ্লেষকরা।

তাহলে আফগানিস্তান, ইরাক বা সিরিয়ার মতো স্থলপথে অভিযান চালাবে আমেরিকা?

বিশ্লেষকদের মতে, স্থলপথে ইরান হামলা চালানো অসম্ভব। এর পেছনে তিনটি কারণ উল্লেখ করে একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করেছে লন্ডনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম মিডল ইস্ট আই।

স্থল অভিযান চালানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়সাপেক্ষ হতে পারে। আর একবার তা শুরু হয়ে গেলে যুদ্ধের গতিপথ এবং স্থায়িত্ব সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী করা কঠিন হয়ে যাবে বলে মনে করছেন তারা।

ইউনিভার্সিটি অফ সাউথ ফ্লোরিডার গ্লোবাল অ্যান্ড ন্যাশনাল সিকিউরিটি ইনস্টিটিউটের রিসার্চ ফেলো আরমান মাহমুদিয়ান মিডল ইস্ট আই-কে বলেন, "আপনি যদি এই ধরনের সামরিক আক্রমণের ইতিহাসের দিকে তাকান, তবে দেখবেন যে সাধারণত একবার স্থল আক্রমণ শুরু হলে তা নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।"

মিডল ইস্ট আই স্থলযুদ্ধের সম্ভাব্য তিনটি দৃশ্যপটের কথা উল্লেখ করেছে। প্রথমত, স্থলযুদ্ধের মাধ্যমে পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালিতে অবস্থিত ইরানি দ্বীপপুঞ্জ দখল করতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। কিংবা ইরানের দক্ষিণ উপকূলে আক্রমণও করতে পারে তারা। আক্রমণ হতে পারে পশ্চিম ইরানের কুর্দি-অধ্যুষিত এলাকা দিয়েও।

তবে এই প্রতিটি পথের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে চরম বিপদ এবং ভয়াবহ প্রতিকূলতা।

পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের দ্বীপপুঞ্জ

ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার চেয়েও এবারের যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করেছে হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়া।

যুদ্ধের আগে প্রতিদিন প্রায় ২ কোটি ব্যারেল তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হতো, যা বিশ্বব্যাপী মোট তেল চাহিদার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ। যুদ্ধ শুরুর পর থেকে ইরান এই পথে চলাচলকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্য করে হামলা চালাচ্ছে এবং কার্যত পথটি বন্ধ করে দিয়েছে।

পারস্য উপসাগর এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের দ্বীপপুঞ্জ

সাম্প্রতিক কয়েক দিনে শুধু “মিত্র” দেশগুলোর হাতে গোনা কয়েকটি ট্যাংকারকে পারাপারের অনুমতি দিয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিরাপদে পারাপারের অনুমতির জন্য বেশকিছু জাহাজের কাছ থেকে ইরান প্রায় ২ মিলিয়ন ডলার পর্যন্ত অর্থ আদায় করছে।

ইরানের ভৌগোলিক অবস্থান এবং হরমুজ প্রণালির ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ বৈশ্বিক তেল ও গ্যাসের দাম বাড়িয়ে দিয়েছে, ফলে প্রণালিটি পুনরায় চালু করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর চাপও বেড়েছে।

এতে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপের সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

এই হামলার ফলে আরও জোরালো ধারণা তৈরি হয়েছে যে, ওয়াশিংটন দ্বীপটি দখলের চেষ্টা করতে পারে। কারণ ট্রাম্প রাজনীতিতে প্রবেশের অনেক আগে, ১৯৮৮ সালে দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এমন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, এমন পদক্ষেপ খুব একটা লাভজনক হবে না বরং হিতে বিপরীত হতে পারে।

আরমান মাহমুদিয়ান মিডল ইস্ট আইকে বলেন, যদি যুক্তরাষ্ট্র খার্গ দ্বীপ দখলের চেষ্টা করে তাহলে ইরান হয়ত সেই দ্বীপে সরাসরি যুদ্ধ নাও করতে পারে।

“সেই দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে লড়াই করার কোনো কারণ ইরানের নেই। কারণ সেখানে তাদের জয়ের কোনো বাস্তব সম্ভাবনা নেই। বরং তারা হয়ত আমেরিকানদের দ্বীপটি দখল করতে দেবে এবং পরে সেখানেই তাদের উপর আঘাত হানবে।”

মাহমুদিয়ান আরও বলেন, “হরমুজ প্রণালির মধ্যে তিনটি দ্বীপ। কেশাম, হরমুজ ও লারাক। এই দ্বীপগুলোতেও রয়েছে একই সমস্যা। সেখানে কোনো মার্কিন অভিযান চালানো হলে জটিলতার মুখোমুখি হতে হবে।”

ইরানবিরোধী ও ইসরায়েলপন্থী ওয়াশিংটনভিত্তিক ‘থিঙ্ক ট্যাংক’-এর বিশ্লেষক ফারজিন নাদিমিও বিষয়টির সাথে একমত হয়েছেন।

ইরানি পডকাস্টার বোজর্গমেহর শারাফেদিনকে তিনি বলেন, “খার্গ দ্বীপের সামরিক দখল কোনোভাবেই বাস্তবসম্মত বা যৌক্তিক নয়। এমনকি ইরানের দ্বীপগুলো দখল করা হলেও সেগুলো ধরে রাখা খুবই কঠিন হবে।”

বিশেষজ্ঞরাও বলছেন যে, খার্গ দ্বীপ দখল করা হলে তেলের দাম আরও বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।”

ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো অ্যালেক্স ভাটানকা মিডল ইস্ট আইকে বলেন,“যুক্তরাষ্ট্র খার্গ দ্বীপ দখল করে ইরানের তেল প্রবাহ বন্ধ করতে পারে। তবে এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ইরানের প্রায় ১৫ লাখ ব্যারেল তেল দৈনিক বাজার থেকে সরিয়ে দিলে আবারও দাম বেড়ে যাবে।”

খার্গ ছাড়াও, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় জলসীমায় মোট ৪২টি দ্বীপ রয়েছে, যার মধ্যে ১৮টি জনবসতিপূর্ণ এবং ২৪টি জনবসতিহীন।

এরমধ্যে সবচেয়ে বড় দ্বীপ হলো কেশাম। প্রায় ১,৫০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের এই দ্বীপটি বাহরাইন ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশের চেয়েও বড় এবং ইরানের মূল ভূখণ্ড থেকে মাত্র ২ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত।

ছবি আলাপ (3)

ইরানের ‘ট্রিপল আইল্যান্ডস’ নামে পরিচিত তিনটি দ্বীপ হলো- গ্রেটার টান্ব, লেসার টান্ব এবং আবু মুসা অত্যন্ত সেন্সিটিভ অঞ্চল। তবে এসব দ্বীপের মালিকানা দাবি করে আসছে  সংযুক্ত আরব আমিরাতও।

যুক্তরাষ্ট্র এগুলো দখল করে সংযুক্ত আরব আমিরাতের কাছে হস্তান্তর করতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

তবে ভাটানকা বলছেন যে, এটি উপসাগরীয় দেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদে সমস্যা তৈরি করতে পারে।

“হয়তো যুক্তরাষ্ট্র তাদের বন্ধু সংযুক্ত আরব আমিরাতকে একটি সুবিধা দিতে চায়, যদিও আমিরাতকেও ভালোভাবে ভেবে দেখতে হবে যে এমন পরিস্থিতিতে তারা সত্যিই ওই দ্বীপগুলো চায় কি না।”

ভাটানকা ও মাহমুদিয়ানের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি এসব দ্বীপ দখল করে, তবে প্রধান উদ্দেশ্য হবে সামরিক নয় বরং রাজনৈতিক চাপ তৈরি করা এবং সেই ভূখণ্ড ফেরতের বিনিময়ে ইরানকে কিছু ছাড় দিতে বাধ্য করা।

অন্যদিকে, ইরানের সূত্রে মিডল ইস্ট আই বলছে যে, কোনো স্থল আক্রমণ হলে ইরান প্রতিক্রিয়াস্বরূপ সংযুক্ত আরব আমিরাতের উপর হামলা করবে। কারণ, তারা মনে করে, আমিরাত এই সংঘাতে পরোক্ষভাবে জড়িত।

ইরানের দক্ষিণ উপকূল

ইরানের দক্ষিণ উপকূল শুরু হয়েছে ইরাক সীমান্তের আবাদান থেকে এবং ১,৮০০ কিলোমিটার অতিক্রম করে বিস্তৃত হয়েছে পাকিস্তান সীমান্তের কাছাকাছি পর্যন্ত। খুজেস্তান, বুশেহর, হরমোজগান এবং সিস্তান ও বেলুচিস্তান প্রদেশকে ঘিরে রয়েছে এটি। পারস্য উপসাগর, হরমুজ প্রণালি এবং ওমান সাগরের মতো ভৌগোলিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ জলপথ পর্যন্ত বিস্তৃত এখান দিয়ে।

ইরানের দীর্ঘ দক্ষিণ উপকূলরেখা প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার জন্য অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ, উপকূলের প্রতিটি অংশে নজর রাখা কঠিন। তবে এই বিস্তৃতির জন্য যে কোনো বিদেশি আক্রমণকারীর পক্ষে উপকূল দখল ও নিয়ন্ত্রণ নেওয়া অত্যন্ত কঠিন হয়ে যাবে।

ইরানের দক্ষিণ উপকূল

মাহমুদিয়ানের মতে, যুক্তরাষ্ট্র যদি দ্বীপের বাইরে স্থল আক্রমণ করে, তবে ইরানের দক্ষিণ উপকূল হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্যবস্তু, কারণ এতে হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়া সহজ হবে এবং একই সাথে উপসাগরের ওপারে থাকা মার্কিন ঘাঁটির কাছাকাছি হওয়ায় অঞ্চলটি সামরিক ও ভোলোলিকভাবে গুরুত্ব বহন করে।

“স্থল আক্রমণের ক্ষেত্রে সেনাবাহিনীকে তাদের ঘাঁটির কাছাকাছি থাকতে হয়, যাতে লজিস্টিক ঠিক রাখা যায়, নতুন সৈন্য আনা যায় এবং আহতদের সামনে থেকে পেছনে সরানো সম্ভব হয়,” তিনি বলেন।

তিনি আরও বলেন, এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী নৌক্ষমতা এই সম্ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

“বর্তমানে পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী আধিপত্য বিস্তার করছে, এবং সেখানে মোতায়েন বাহিনীগুলো মূলত মেরিন যুদ্ধ পরিচালনায় প্রশিক্ষিত।”

তবুও মাহমুদিয়ান সতর্ক করে বলেন, যদি সীমিত পরিসরের কোনো উপকূলীয় অভিযান চালানো হয়, তবে তা দ্রুত নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।

“ধরা যাক, আপনার লক্ষ্য হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি ইরানের কিছু অংশের উপকূল নিয়ন্ত্রণ করা। আপনি হয়ত উপকূল দখল করতে পারবেন, কিন্তু আপনার সৈন্যেদের ওপর তখন নিয়মিত হামলা হতে থাকবে”, বলেন তিনি।

“তাদের সুরক্ষা দিতে এবং প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান গড়ে তুলতে ভূ-খন্ডের আরও ভেতরের দিকে অগ্রসর হতে হবে। তখন সংঘাতের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা খুবই কঠিন হয়ে পড়বে।”

এ ধরনের পরিস্থিতিতে ইরানের বিশাল ভৌগোলিক আয়তন আবারও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর হয়ে উঠবে।

নাদিমি একটি সাক্ষাৎকারে বলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা হামলার পরও ইরান তার ভৌগোলিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে আক্রমণ অব্যাহত রাখতে সক্ষম হয়েছে।

তিনি বলেন, ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র লঞ্চারগুলো দেশজুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে, আর ড্রোন ও অন্যান্য অস্ত্র ভূগর্ভস্থে সংরক্ষিত আছে।

“ইরান এখনো তরল জ্বালানির মিসাইল ছুঁড়ছে,” তিনি বলেন। “এগুলোর জন্য প্রয়োজন বড় লঞ্চার, যা খোলা জায়গায় প্রস্তুত করতে হয়। আর ইরান তার বিশাল ভূখণ্ডের কারণে এই ধরনের লঞ্চার ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করতে পারছে।”

বিশ্বের ১৭তম বৃহত্তম দেশ ইরানের আয়তন ১৪ লাখ বর্গকিলোমিটারেরও বেশি।

দেশটিতে দাশত-ই কাভীর এবং লুত মরুভূমি নামে দুটি বড় মরুভূমি রয়েছে। 

ইরানে ২,০০০ মিটারের বেশি উচ্চতার ৩৯০টিরও বেশি পাহাড় রয়েছে, যার মধ্যে ৪,০০০ মিটারের ওপরে উচ্চতার পাহাড়ের সংখ্যা ৯২টি। 

মধ্যপ্রাচ্যের সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, প্রায় ৫,৭০০ মিটার উচ্চতার মাউন্ট দামাভান্দও ইরানেই অবস্থিত।

ভাটানকা বলেন, এসব ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্যই স্থলযুদ্ধে ইরানের পক্ষে সুবিধাজনক হতে পারে।

তিনি আরও বলেন, “দেশটি পাহাড়ি ভূখণ্ডে ভরা, এবং আমরা জানি ইরান সরকার বহু বছর ধরে তাদের সামরিক সম্পদ ভূগর্ভে সংরক্ষণ করে আসছে। এছাড়া ইরান অনেক আগেই এমন পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিয়েছে এবং ২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের তুলনায় ইরান এখন এই ধরনের যুদ্ধ সামলাতে অনেক বেশি সক্ষম।”

কুর্দি-অধ্যুষিত এলাকা

ইরানের উপর পশ্চিম দিক থেকে স্থল আক্রমণের আরেকটি সম্ভাব্য পথ হতে পারে ইরাক ও তুরস্ক সীমান্তের কাছে অবস্থিত জাগরোস পর্বতমালা এবং কুর্দি অধ্যুষিত অঞ্চল।

যুদ্ধের শুরু থেকেই কিছু বিশ্লেষক বলেছিলেন, ইরাকি কুর্দিস্তানে অবস্থানরত ইরানবিরোধী কুর্দি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে এমন আক্রমণের ক্ষেত্রে স্থলবাহিনী হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে।

ছবি আলাপ (4)

ইরান যুদ্ধ শুরুর পর এসব গোষ্ঠী সরাসরি কোনো সংঘাতে জড়ায়নি। তবে ১৯এ মার্চ তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত একটি অনলাইন সম্মেলনে কুর্দিস্তান ফ্রি লাইফ পার্টি এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী কুর্দিস্তান ফ্রিডম পার্টির কমান্ডাররা ইসরায়েলকে সহযোগিতার ইঙ্গিত দেন।

তবুও বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই পরিস্থিতি ওয়াশিংটনের প্রত্যাশিত ফল এনে দিতে পারবে না। 

মাহমুদিয়ানের মতে, এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র আকাশপথে সহায়তা দেবে, আর কুর্দি বাহিনী স্থলভাগে অভিযান পরিচালনা করবে।

মাহমুদিয়ান ব্যাখ্যা করে বলেন “এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত প্রথমে কুর্দি বাহিনীকে সামনে পাঠাবে। কারণ তারা ভূখণ্ড সম্পর্কে ভালো জানে। তারা দুর্গম এলাকায় লড়াই করবে এবং জাগরোস পর্বতমালা অতিক্রম করবে, আর পেছনে তাদের অনুসরণ করবে যুক্তরাষ্ট্রের বাহিনী।”

তবে মাহমুদিয়ান সতর্ক করেন যে, এই ধরনের কৌশল কুর্দি যোদ্ধাদের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল হতে পারে। কারণ ওই অঞ্চলে ইরানি বাহিনীর শক্তিশালী সামরিক উপস্থিতি রয়েছে।

ইরান ইতোমধ্যেই এই ধরনের পরিস্থিতির প্রস্তুতি হিসেবে সামরিক মহড়ার আড়ালে বিপুলসংখ্যক সৈন্য ওই অঞ্চলে স্থানান্তর করেছে বলে গত মাসে মিডল ইস্ট আই জানিয়েছে।

ভাটানকার মতে, কুর্দি গোষ্ঠীগুলো এমন অভিযানে দীর্ঘমেয়াদে টিকে থাকতে পারবে কি না তা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। কারণ তাদের অনেক বাহিনী তুলনামূলকভাবে হালকা অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত এবং বড় আকারের সংগঠিত ইউনিটের অভাব রয়েছে।

মাহমুদিয়ান বলেন, “তারা মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান সহায়তার ওপর নির্ভর করতে পারবে। কিন্তু তাদেরকে ভারী ক্ষয়ক্ষতি মেনে নিতে হবে। যতই তারা কুর্দি-অধ্যুষিত অঞ্চল ছেড়ে পার্সিয়ান সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় গভীরে ঢুকতে থাকবে, তাদের পরিস্থিতি ততই কঠিন হয়ে উঠবে।”

তিনি বলেন, “আমি মনে করি না যে ইরাকি কুর্দি বাহিনী ইরানে ঢুকে শেষ পর্যন্ত তেহরান পর্যন্ত অগ্রসর হতে পারবে। তাদের সেই সক্ষমতা নেই।”

লক্ষ্য নেই, যুক্তরাষ্ট্র কী চায়?

ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশল ও লক্ষ্য এখনো পরিষ্কার নয়। মিডল ইস্ট আইয়ের প্রতিবেদন অনুযায়ী, যদি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্য হয়ে থাকে ইরানের নেতৃত্ব পরিবর্তন, তাহলে কয়েক সপ্তাহের বিমান হামলা ও শীর্ষ সামরিক-রাজনৈতিক ব্যক্তিদের হত্যার পরও ইরানের শাসন ও ক্ষমতার কাঠামো ভাঙেনি। এক্ষেত্রে বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য অর্জন হয়নি।

আর লক্ষ্য যদি হয় ইরানের ওপর চাপ সৃষ্টি করে আলোচনায় বসানো। তাহলেও এখন পর্যন্ত তেমন কোনো সফলতা দেখা যায়নি। বরং ইরানের নেতৃত্ব আরও কঠোর ও অনমনীয় অবস্থান নিয়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দখলদারিত্ব ইরানের জাতীয়তাবাদকে আরও শক্তিশালী করে। মাহমুদিয়ান ১৯৮০–১৯৮৮ এর ইরান-ইরাক যুদ্ধের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ইরান-ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস দেখায় যে, ইরানের কিছু এলাকা দখল করা সম্ভব হলেও তা ধরে রাখা সহজ নয়। এখানে দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অত্যন্ত কঠিন।

“ইরান-ইরাক যুদ্ধের সময় আমরা দেখেছি, ইরান তার ভূখণ্ড দখল অবস্থায় থাকাকালীন কখনোই আলোচনায় যায় না বা শান্তিচুক্তি করে না।” 

মাহমুদিয়ান জানান, ইরান-ইরাক যুদ্ধের প্রথম বছরে, যখন ইরাক খোররামশাহর দখল করে এবং আবাদান অবরোধ করে, তখন তারা ইরানকে আলোচনার প্রস্তাব দেয়। কিন্তু ইরান জানিয়ে দেয় যে, তাদের ভূখণ্ড বিদেশি দখলে থাকা অবস্থায় তারা কোনো আলোচনা বা শান্তিচুক্তিতে যাবে না।

ভাটানকা একমত হয়ে বলেন, ইরান পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো স্পষ্ট বা সুসংগঠিত কৌশল আছে বলে মনে হয় না।

তিনি বলেন যে, যুদ্ধ শুরুর সময় ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু যে ‘রেজিম চেঞ্জ’ বা শাসন পরিবর্তনের কথা বলেছিলেন, তা হয়নি।

“শাসন পরিবর্তনের জন্য কোনো বড় বা সুস্পষ্ট কৌশল এখানে ছিলো না। পুরো পরিকল্পনাটা মূলত এই আশার উপর দাঁড়িয়ে ছিল যে ইরানের জনগণ নিজেরাই উঠে দাঁড়াবে এবং সরকারকে সরিয়ে দেবে।”

তিনি আরও বলেন, “এটা যুদ্ধের কোনো কৌশল নয় বরং এটা শুধু একটা আশা।”

 

[মিডল ইস্ট আই-এর প্রতিবেদন অবলম্বনে]