সারাদেশ যখন শিশুদের মধ্যে হামের ভয়াবহ সংক্রমণ সামাল দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে, ঠিক তখনই নতুন উদ্বেগ হয়ে সামনে আসছে ডেঙ্গু।
একদিকে হামে আক্রান্ত ও মৃত্যুর মিছিল, অন্যদিকে বর্ষা ঘনাতেই বাড়ছে মশাবাহিত রোগ ডেঙ্গুর বিস্তার- দ্বিমুখী এই স্বাস্থ্য ঝুঁকির পরিস্থিতি সামাল দিতে হচ্ছে বাংলাদেশকে।
জুন মাস থেকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ দ্রুত ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে। আক্রান্তের চাপ তুলনামূলক বেশি ঢাকার বাইরের জেলাগুলোতে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে দ্রুত সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে ডেঙ্গু ‘ব্যাপক আকারে’ ছড়িয়ে পড়তে পারে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৭ জুন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৭০২ শিশু। এর মধ্যে নিশ্চিতভাবে হামে মৃত্যু হয়েছে ৯৩ জনের।
একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত হয়েছে ৮১ হাজার ৯৫৫ জন এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত আক্রান্তের সংখ্যা ১১ হাজার ৫৯৪।
এই সংকটের মধ্যেই বাড়ছে ডেঙ্গুর প্রকোপ। ২৬ জুন পর্যন্ত ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫৪৬ জনে, মৃত্যু হয়েছে ১৩ জনের।
গত মে মাসে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ছিলো ৭১৪ জন, যা জুনে লাফ বেড়ে সংক্রমিত হয়েছে ২ হাজার ৩৪৯ জন। এই বৃদ্ধিকেই স্বাস্থ্যখাতে নতুন সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ডেঙ্গু পরিস্থিতি কত বিপজ্জনক হতে পারে
এক সময় ঢাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও ডেঙ্গু এখন ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর প্রকোপ ও সংক্রমণের হার বৃদ্ধি পেয়েছে আশঙ্কাজনক ভাবে।
বাংলাদেশে ১৯৬৪ সালে প্রথমবারের মতো এই রোগ শনাক্তের পর তখন ডেঙ্গু পরিচিতি পেয়েছিলো ‘ঢাকা ফিভার’ নামে। কারণ এর প্রকোপ দেখা গিয়েছিলো কেবল ঢাকার ভেতরেই।
২০০০ সালে যখন বাংলাদেশে প্রথম বড় আকারে ডেঙ্গুর মহামারি দেখা দেয় এবং ঢাকাই ছিলো এই রোগের মূল কেন্দ্রস্থল বা এপিসেন্টার। ২০১০ সাল পর্যন্ত দেশের মোট ডেঙ্গু রোগীর প্রায় ৯১ শতাংশই ছিল ঢাকার অধিবাসী।
গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সাল পর্যন্ত ডেঙ্গু প্রধানত ঢাকা বিভাগের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতেই বেশি ঘনীভূত ছিলো।
কিন্তু ২০১৯ সালের পর থেকে এই চিত্র পুরোপুরি বদলে যায়। মানুষের যাতায়াত, জলবায়ু পরিবর্তন এবং ঢাকার বাইরেও দ্রুত নগরায়ণের ফলে এডিস মশা ও ডেঙ্গু ভাইরাস সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে।
২০২৫ সালে বাংলাদেশে প্রায় ১ লাখ ৩ হাজার মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছিলো এবং এই রোগে প্রাণ হারিয়েছিলেন ৪১৩ জন।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৬৪টি জেলার প্রায় সবকটিতেই ডেঙ্গু রোগীর খবর পাওয়া যায়। আর এ বছর আক্রান্তদের বড় অংশই ঢাকার বাইরে।
এ বছর আক্রান্ত ৫ হাজার ৫৪৬ জনের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ১ হাজার ৯৪৮ জন। এরপরই রয়েছে বরিশাল বিভাগ ১ হাজা ৪৯১ জন। চট্টগ্রামে ১ হাজার ৪৫ জন এবং সবচেয়ে কম রংপুর বিভাগে কম ৩০ জন।
ঢাকা বিভাগের মধ্যে ঢাকা দক্ষিণ সিটিতে আক্রান্ত ৭৮৮ জন এবং উত্তর সিটিতে ৪৬৮ জন।
কীটতত্ত্ববিদ ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক কবিরুল বাশার আলাপ-কে বলেন, “এখন যে অবস্থাটা আমরা দেখছি, প্রতিদিনই (ডেঙ্গু) বাড়বে। জুন মাসের যে সংখ্যাটা, জুলাই মাসে কমপক্ষে তার দ্বিগুণ, অগাস্ট মাসে হবে তিনগুণ।”
ডেঙ্গুর পূর্বাভাস নিয়ে কাজ করা এই অধ্যাপক মন্তব্য করেন, “অগাস্ট ও সেপ্টেম্বরে ডেঙ্গু বড় একটা হিট করবে।”
বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, আর্দ্রতা, এডিস মশার ঘনত্ব এবং ডেঙ্গু রোগী- এই কয়টি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ডেঙ্গু নিয়ে একটি পূর্বাভাস মডেল তৈরি করেছেন কবিরুল বাশার। এই মডেলের ওপর ভিত্তি করে, কতদিন পরে ডেঙ্গু কতটুকু পিকে উঠবে তাও অনুমান করেন তিনি।
কবিরুল বাশার মনে করেন, এবার ঢাকার তুলনায় ঢাকার বাইরের কয়েকটা এলাকাতে বেশি হিট করবে ডেঙ্গু।
এর মধ্যে রয়েছে- বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের কিছু জেলা; ঢাকার আশেপাশের জেলাগুলো; যেমন- গাজীপুর, নরসিংদী, কুমিল্লা, মুন্সিগঞ্জ, ময়মনসিংহ, মানিকগঞ্জ, চাঁদপুর, মাদারীপুর।
বরিশাল বেল্ট থেকে বাগেরহাট ছড়াবে এবং পাহাড়ি বান্দরবনেও এবার ডেঙ্গু রোগী বেশি হবে বলে জানান কবিরুল বাশার।
“এই জেলাগুলোতে বেশি হবে কারণ- ঢাকাতে ডেঙ্গুর ইতিহাস খুব পুরোনো। ২০০০ সাল থেকে ঢাকায় ডেঙ্গু শুরু হয়েছে এবং এখনো চলছে। অলরেডি ঢাকার ৫০ শতাংশ মানুষ আক্রান্ত হয়েছে এবং তাদের বডিতে ডেঙ্গুর এন্টিবডি আছে। ঢাকায় চান্স অফ ইনফেকশন কমে গেছে। আর যে জেলাগুলোর কথা বলেছি, সেগুলো ওপরের দিকে যাচ্ছে।”
“আরেকটা হচ্ছে- ঢাকায় সিটি করপোরেশন যতটা স্ট্রং, যতটা কাজ করে। অন্য জায়গায় তো তারা অতটা স্ট্রং না। এসব কারণে ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে বেশি হবে।”
ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় কী, প্রস্তুতি কতটা
ডেঙ্গু প্রতিরোধে সাধারণ জনগণকে সঙ্গে নিয়ে মশা নির্মূল অভিযান চালাতে হবে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি দেশের হাসপাতালগুলোর প্রস্তুতি থাকতে হবে।
এবারের ডেঙ্গু পরিস্থিতি নিয়ে জানতে চাওয়া হলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখা) অধ্যাপক ডা. হালিমুর রশিদ আলাপ-কে বলেন, “আগের বছর মতো সিরিয়াস মনে হচ্ছে না। এখনো বেশ কম।”
“ডেঙ্গু প্রতিরোধের কাজ সিটি করপোরেশনের। আমাদের কাজ চিকিৎসা দেওয়া। দেশের সব হাসপাতালে ডেঙ্গু রোগীদের নির্দেশনা দেওয়া আছে,” যোগ করেন তিনি।
ডেঙ্গু প্রতিরোধে করণীয় কী জানতে চাওয়া হলে আইইডিসিআর-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মুশতাক হোসেন আলাপ-কে বলেন, “সরকারের দায়িত্ব মূল। সরকার নীতিমালা অনুযায়ী কাজ করবে। মশা নিয়ন্ত্রণ করার জন্য জনগণকে সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্ন অভিযান চালাতে হবে।”
“মশা মারার জন্য কীটতত্ত্ববিদদের পরামর্শ, রাসায়ানিক প্রয়োগ এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা- এই তিনটা জিনিস একসঙ্গে করতে হবে।”
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, “মানুষকে সম্পৃক্ত করে পরিচ্ছন্ন করা ছাড়া এই কেরোসিনের ধোয়া ছিটিয়ে কোনো কাজ হচ্ছে না, হবেও না। এতে কোনো আউটপুট নাই।”
তাই পরিচ্ছন্ন অভিযানে জনগণের প্রতিনিধি ও স্বেচ্ছাসেবকদের সম্পৃক্ত করে জনগণকে হাতেকলমে করে দেখাতে হবে বলে মনে করেন মুশতাক হোসেন।
“আর এটা শুধু ঢাকা শহর না, পুরে বাংলাদেশেই করতে হবে। কারণ, ডেঙ্গু সারাদেশেই ছড়িয়ে পড়েছে।
মুশতাক হোসেন আরও বলেন, “চিকিৎসার যে প্রস্তুতি, সনাতন পদ্ধতিতেই সরকার চলছে। চিকিৎসাপদ্ধতি শুরু করতে হবে তৃণমূল পর্যায়ে।”
ডেঙ্গু পরিস্থিতি মোকাবিলা এবং প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম আরও জোরদার করতে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলমের তত্ত্বাবধানে একটি বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এই টাস্কফোর্স মাঠ পর্যায়ে কার্যক্রম তদারকি, প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা দেওয়া, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধি এবং জরুরি পদক্ষেপ বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে বলে মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে।
এছাড়া ডেঙ্গু ও অন্যান্য মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছে মন্ত্রণায়।
এর মধ্যে রয়েছে- স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্পৃক্ত করে ডেঙ্গু প্রতিরোধ বিষয়ক বিশেষ প্রচারণা কার্যক্রম পরিচালনা; স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে পরিচ্ছন্নতা অভিযান জোরদার করা; এডিস মশার প্রজননস্থল শনাক্ত ও ধ্বংসে বিশেষ অভিযান পরিচালনা ইত্যাদি।
ড. মুশতাক হোসেন বলেন, “আউটব্রেক কথাটার সঙ্গে সঙ্গে চলে আসে আউটব্রেক রেসপন্স। যেখানে রোগী পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে র্যাপিড রেসপন্স টিম গিয়ে স্থানীয় স্বাস্থ্য কর্মীদের নিয়ে রোগী খুঁজে বের করবে।”
তিনি বলেন, একইসঙ্গে মশা খুঁজে বের করতে হবে, রোগীকে মশারির ভেতর রাখতে হবে এবং প্রয়োজন হলে হাসপাতালে নিয়ে চিকিৎসা দিতে হবে।
আর মশা নিয়ন্ত্রণের ওপরই এ বছর সংক্রমণ বাড়বে না কমবে, তা নির্ভর করছে বলে মনে করেন কীটতত্ত্ববিদ কবিরুল বাশার।
“গতবার এক লাখের ওপর আক্রান্ত হয়েছে। এবছর কতটা আক্রান্ত হবে, এই মুহূর্তে বলা যাবে না। এটা নির্ভর করবে মশা নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের ওপর।”
তিনি বলেন, “বড় হিটের আগে মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্বে যারা আছেন, তারা যদি ভালো কাজ করেন, তাহলে গত বছরের সমান হবে না। আর যদি তারা ভালো কাজ না করতে পারেন, তাহলে গতবছরকে ছাড়িয়ে যাবে।”