‘ইউক্রেনের হাতে কার্ড নেই’ এমন মন্তব্য না করাই ভালো: হানা শেলেস্ট

সাহাব এনাম খান: রুশ আগ্রাসনের সময়ে আপনি আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় কথা বলেছেন, লিখেছেন। আমরা দেখেছি ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির অনেক আগে থেকেই ইউক্রেনের বিশ্লেষক সমাজ রাশিয়ার ‘হাইব্রিড ওয়ারফেয়ার’ এবং কৃষ্ণসাগর কৌশল নিয়ে তাদের পর্যবেক্ষণ নিয়ে আলোচনা করছিলেন। যখন পুরোদমে আক্রমণ শুরু হলো, তখন পশ্চিমসহ পুরো বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। সবচেয়ে বড় কথা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতাকে ধাক্কা দেয়। কিয়েভের জন্য এটি কতটা বিস্ময়কর ছিল? আর ইউক্রেনীয় বিশ্লেষকরা যা জানতেন এবং পশ্চিমা নীতিনির্ধারকরা যা বিশ্বাস করতেন, তার মধ্যে এই পার্থক্য আমাদের পশ্চিমা কৌশলগত পূর্বাভাসের ব্যর্থতা সম্পর্কে কী বলে?

ড. হানা শেলেস্ট: আমি এই বিষয়টিকে কাঠামোগত ব্যর্থতা না বলে বরং মনস্তাত্ত্বিক ব্যর্থতা বলবো। এখানে আমাদের কয়েকটি মৌলিক বিষয় মনে রাখা জরুরি। এমনকি আমি নিজেও পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহ আগে বলেছিলাম, এই আক্রমণের সম্ভাবনা মাত্র ৩০ শতাংশ। কারণ সব ধরনের যৌক্তিক ও বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ থেকে আমাদের প্রত্যাশা ছিল, এটি হয়তো সীমান্তে ছোটখাটো কোনো উস্কানি হবে অথবা ২০১৪ সাল থেকে যেখানে যুদ্ধ চলছে, সেই আগের ফ্রন্টলাইনে কোনো আক্রমণ হতে পারে।

কিন্তু কেউ কল্পনাও করতে পারেনি রাশিয়া পুরো ফ্রন্টলাইন জুড়ে এত বড় আক্রমণ চালাবে। কেউ ভাবেনি কিয়েভ দখল করার চেষ্টা করা হবে এবং ওখানকার সরকার পরিবর্তন করতে চাইবে। কারণ এটি রাশিয়ার জন্য একেবারেই লাভজনক ছিল না। এমনকি রুশ বিশেষজ্ঞরা অবাক হয়েছেন; কারণ যুদ্ধ শুরু করার চেয়ে আলোচনার মাধ্যমেই রাশিয়া অনেক বেশি কিছু অর্জন করতে পারতো। আর রাশিয়া এই যুদ্ধের পরিকল্পনা করেছিল মাত্র তিন দিনের জন্য, চার বছরের জন্য নয়, যেখানে আমরা এখন দেখছি। কিন্তু সমস্যা হলো, মনস্তাত্ত্বিকভাবে সবাই বিশ্বাস করতে চেয়েছিল যে রুশ নেতৃত্ব যৌক্তিক (rational); তারা পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের অসুবিধাগুলো বোঝে। তারা আমাদের ওপর চাপ দেবে, যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় নেতাদের ওপর চাপ দেবে, কিন্তু এই সামরিক সমাবেশ আসলে শুধু ভয় দেখানোর জন্য এবং নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য, ইউক্রেনের মাটিতে যুদ্ধ করার জন্য নয়। 

ইউক্রেনের পক্ষ থেকে আমরা সবসময়ই কিছু উস্কানি মোকাবিলা করার জন্য প্রস্তুত ছিলাম। এমন না যে, আমরা এতটা বড় মাপের কিছু আশা করিনি। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকেই তো আমরা যুদ্ধের মধ্যে ছিলাম। তাই মনের কোণে কোথাও না কোথাও একটা আশঙ্কা ছিল।

ইউরোপীয়দের কথা বলি। যুদ্ধের শুরুতে আমি যখন বিভিন্ন দেশের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা বা পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সাথে কথা বলছিলাম (যারা আমার বন্ধু)। তাদের জিজ্ঞেস করেছি, ‘আমাদের সবার কাছেই তো একই তথ্য ছিল, তাহলে কী হলো? ইউরোপের বিভিন্ন দেশ কেন ভিন্ন ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দিলো?’ তখন আমার এক সহকর্মীর কথা শুনে আমি স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলাম।

তিনি বলেছিলেন, ‘হানা, যারা নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আছেন, তাদের অনেকেরই ২০০৩ সালের ইরাক যুদ্ধের স্মৃতি স্পষ্ট। তাই হ্যাঁ, আমাদের সবার কাছে একই গোয়েন্দা তথ্য ছিল। কিন্তু ইরাক আক্রমণের আগে যুক্তরাষ্ট্র ‘উইপেনস অব ম্যাস ডিস্ট্রাকশন’ (গণবিধ্বংসী অস্ত্র) নিয়ে যেভাবে তথ্য দিয়েছিল, সে কারণে তাদের দেওয়া তথ্যের ওপর এক ধরনের সংশয় কাজ করছিল। তারা ভয় পাচ্ছিলেন, এবারও হয়তো এমন কিছু হচ্ছে। হয়তো সম্পূর্ণ ভুল তথ্য না, কিন্তু তথ্যের কোনো কারসাজি বা ম্যানিপুলেশন হচ্ছে। সুতরাং আমাদের কাছে তথ্য ছিল, গোয়েন্দা রিপোর্ট ছিল, কিন্তু দুটি মনস্তাত্ত্বিক বাধার কারণে আমরা সেই মোমেন্টাম বা সুযোগটি হারিয়েছি: প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আস্থার অভাব এবং দ্বিতীয়ত, রাশিয়ার ওপর এই বিশ্বাস ছিল যে তারা অন্তত যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নেবে। 

ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার এই যুদ্ধ শুধু ইউক্রেন বা রাশিয়ার ঔপনিবেশিক নীতি নিয়ে নয়, বরং এটি তার চেয়েও বড় একটি ব্যাপার: ড. হানা শেলেস্ট, পরিচালক, ইউক্রেনিয়ান প্রিজম

সাহাব: যেমনটা মার্কিন প্রশাসনের কথা বললেন। বাইডেন প্রশাসন এবং ট্রাম্প প্রশাসন। দুই ধরনের মতবাদ । কিন্তু যুদ্ধ তো একটাই। এই দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন আমেরিকান প্রশাসনের মধ্য দিয়ে ইউক্রেনকে তার অস্তিত্বের লড়াই চালিয়ে যেতে হয়েছে। বাইডেন সংহতি প্রকাশ করেছিলেন, কিন্তু তার বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, যুদ্ধ যেন ছড়িয়ে না পড়ে সেভাবে সহায়তা দিয়েছেন, যা আসলে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করেছে। অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসন এসেছিল একটি ব্যবসায়িক লেনদেনের মানসিকতা নিয়ে। ইউক্রেনের কৌশলগত অবস্থান থেকে, যুক্তরাষ্ট্রের কোন অবস্থান ইউক্রেনের স্বার্থ ভালোভাবে রক্ষা করেছে? আর ট্রাম্প প্রশাসন ইউরোপ ও তার বাইরের নিরাপত্তার প্রতিশ্রুতি সম্পর্কে কী বার্তা দিচ্ছে?

শেলেস্ট: প্রথমত আমাদের মাথায় রাখতে হবে দুই প্রেসিডেন্টই মূলত আমেরিকার স্বার্থ রক্ষা করেন। আমরা মূল্যবোধ, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো কিংবা জাতিসংঘ সনদ রক্ষার কথা বলি। তারপরও আমাদের পরিষ্কার বুঝতে হবে বাইডেন বা ট্রাম্প দুজনেই প্রথমত যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করেন। একইসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের হয়ে বিশ্বের ভবিষ্যৎ দেখেন, ইউক্রেনের হয়ে নয়।

এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি তাদের পছন্দ ও অগ্রাধিকারগুলো বুঝতে পারছি? কেন ইউক্রেনকে সমর্থন করা জরুরি, তা কি তাদের বোঝাতে পারছি? কারণ ইউক্রেনের বিরুদ্ধে রাশিয়ার এই যুদ্ধ শুধু ইউক্রেন বা রাশিয়ার ঔপনিবেশিক নীতি নিয়ে নয়, বরং এটি তার চেয়েও বড় একটি ব্যাপার। কারণ রাশিয়া আন্তর্জাতিক আইনের মৌলিক ভিত্তিগুলো লঙ্ঘন করেছে। তারা ৪০০-এরও বেশি আন্তর্জাতিক কনভেনশন বা চুক্তি ভেঙেছে এবং তারা এমনভাবে এ কাজ করে চলেছে যার নেতিবাচক প্রভাব পুরো বিশ্বের ওপর পড়ছে। আমরা জানি ‘খারাপ পক্ষ’ সব সময় ‘ভালো পক্ষের’ চেয়ে দ্রুত শেখে।

তবে দুই প্রেসিডেন্ট ইউক্রেন ইস্যুতে কীভাবে কাজ করেন তার তুলনা করলে দেখা যায়, বাইডেনের ক্ষেত্রে আমাদের সমস্যা ছিল, তার দলের অনেকে মনে করতেন রাশিয়ার চেয়ে চীন বড় হুমকি। তারা মনে করতেন যেকোনো ভাবে রাশিয়াকে চীন থেকে আলাদা রাখতে হবে। তাই তাদের মনে হয়েছিল রাশিয়াকে একেবারে দুর্বল করে দেওয়া ঠিক হবে না। তারা শুধু চেয়েছিল রাশিয়া যেন যুদ্ধ চালিয়ে যেতে না পারে।

দ্বিতীয়ত, তারা সব সময় যুদ্ধ আরও ছড়িয়ে পড়ার ভয়ে ছিল। এটিই ছিল আমাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা। রাশিয়া আমাদের বিরুদ্ধে কৌশলগত ক্ষেপণাস্ত্র থেকে শুরু করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র, সব ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করে ফেলেছে, ইউক্রেনের মারিউপোল বা বুচায় সব ধরনের যুদ্ধাপরাধ করেছে। এর বেশি আপনারা আর কীসের জন্য অপেক্ষা করছেন? ‘এস্কেলেশন’ বলতে আসলে কী বোঝায়?

আমরা যখন যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন মানুষের সাথে কথা বলেছি এবং গবেষণা করেছি, তখন একই উত্তরই বারবার ফিরে এসেছে। সেটা হলো ‘পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহার’। যুদ্ধের শুরুটা যেহেতু খুব অযৌক্তিক ছিল, তাই ওয়াশিংটন এবং সত্যি বলতে ফ্রান্স, জার্মানি ও ইউরোপের অন্যান্য নেতারাও বিশ্বাস করতে শুরু করেছিলেন রাশিয়া যেকোনো মুহূর্তে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে। তারা রাশিয়ার ‘রেড লাইন’ বা চরম সীমায় বিশ্বাস করেছেন এবং এ নিয়ে কী করবেন তা বুঝে উঠতে পারছিলেন না। এমনকি সোভিয়েত ইউনিয়নের কাছে বর্তমানে রাশিয়ার চেয়েও বেশি এবং ভালো মানের পারমাণবিক অস্ত্র ছিল; কিন্তু তাদের কাছে বর্তমান মস্কোর চেয়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া অনেক বেশি অনুমেয় ছিল। তবে আমরা অবশ্যই বোঝানোর চেষ্টা করেছি এবং যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা দিয়ে বাইডেন প্রশাসনের সাথে কাজ করা সম্ভব ছিল। 

প্রথমত, রাশিয়ার এই রেড লাইনগুলো আসলে লাল নয়, এগুলো অনেক ক্ষেত্রেই ‘গোলাপি’। ইউক্রেন এই তথাকথিত রেড লাইনের অনেকগুলোই অতিক্রম করেছে কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নিতে পারেনি, যেমন যখন আমরা ক্রাইমিয়াতে তাদের নৌবাহিনীর সদর দপ্তর ধ্বংস করলাম। কিন্তু একইসাথে, রাশিয়ার জন্য পারমাণবিক অস্ত্র হলো অনেকটা ‘ভায়াগ্রা’র মতো, এটি তাদের একদম শেষ উপায়। কারণ যদি তারা পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে, তাহলে এটাই প্রমাণ হবে যে প্রথাগত বা কনভেনশনাল অস্ত্র এবং সামরিক বাহিনী দিয়ে যুদ্ধ করার ক্ষমতা হারিয়েছে রাশিয়া এবং তারা পুরোপুরি ব্যর্থ। হোয়াইট হাউসের সাথে এই আলোচনাগুলো দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক হলেও শেষ পর্যন্ত অনেক বিষয়ে তাদের বোঝানো সম্ভব হয়েছিল।

রাশিয়া ঠিক তখনই আলোচনার কথা বলে বা আলোচনার জন্য প্রস্তুত বলে জানায়, যখন যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রতিশ্রুতি দেয়: ড. হানা শেলেস্ট, পরিচালক, ইউক্রেনিয়ান প্রিজম

ট্রাম্প প্রশাসনের ক্ষেত্রে পরিস্থিতি কিছুটা কঠিন ছিল। কারণ তারা দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চায়। তারা দীর্ঘ আলোচনার জন্য প্রস্তুত নয়। তারা ইউক্রেনে শান্তি ঠিকই চায়, তাই আমরা তাদের রুশ-পন্থী বা এমন কিছু বলে দোষারোপ করতে পারি না। সমস্যা হলো বিশ্ব রাজনীতি বা যে কোনো বিষয়ে তাদের আলোচনার পদ্ধতি ও দৃষ্টিভঙ্গি একদম আলাদা। তারা বিষয়টিকে ব্যবসার মতো দেখে, ‘আমরা এখনই এবং দ্রুত সমাধান চাই।‘ তারা মনে করে সব কিছুই আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে ফেলা সম্ভব এবং তারা মনে করে এটি কেবল পার্থিব কোনো লেনদেন। তারা যখন পূর্ব ইউক্রেনের জমি নিয়ে কথা বলে,  তারা মনে করে এটি কোনো ‘রিয়েল এস্টেট’ ব্যবসা। তারা সেখানকার মানুষ, নীতি বা জাতীয়তাবাদের কথা ভুলে যায়, এগুলো তাদের কাছে গৌণ।

একারণেই ট্রাম্পের সঙ্গে আলোচনা করা বেশ কঠিন। কারণ যুদ্ধ এমন কোনো বিষয় নয় যা আপনি দ্রুত শেষ করতে পারবেন। আর দ্বিতীয়ত, এটি খুবই অনিশ্চিত একটা বিষয়। আপনি জানেন না কাল পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়াবে।

সাহাব: আপনি কোনোভাবেই শান্তি পরিকল্পনা বলতে চাচ্ছেন না। এখান থেকে রাশিয়া আসলে কী পাচ্ছে? আর ইউক্রেন কি আলোচনার মাধ্যমে এমন কোনো সমঝোতা মেনে নিতে পারে, যা ভবিষ্যতে অন্য কোথাও আগ্রাসনের নতুন কোনো টেমপ্লেট বা মডেল হয়ে দাঁড়াবে না?

শেলেস্ট:  আমি এখন ২৮ দফার পরিকল্পনাটি দেখছি। বিস্তারিত মনে করার চেষ্টাও করছি। যদিও এখন আমরা আর সেই ২৮ দফা নিয়ে অতটা কথা বলি না। কারণ দ্রুতই এটি ২০ দফা হয়েছিল এবং তারপর আরও কিছু পরিবর্তন এসেছে। পয়েন্ট ধরে না বলে, সাধারণভাবে বলি সমস্যাটি কোথায় ছিল।

প্রথমত, নথিপত্রের ভাষায় আপনি রুশ ভাষা থেকে অনুদিত অনেক শব্দ দেখতে পাবেন। ফলে আপনি বুঝতে পারবেন, ওই পয়েন্টগুলোর অনেকগুলোই রুশ পক্ষ থেকে প্রস্তাব করা হয়েছিল। এবং অনেক পয়েন্টই আমাদের ২০২২ সালের এপ্রিলের কথা মনে করিয়ে দেয়। যখন ইস্তাম্বুলে রাশিয়া ও ইউক্রেনের মধ্যে আলোচনা হয়েছিল।

গ্যারান্টির বিষয়টি ছিল সম্ভবত সবচেয়ে সহজ আবার সবচেয়ে জটিল। কারণ সেখানে শুধু বলা ছিল, ‘ইউক্রেন যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে গ্যারান্টি পাবে।‘ কিন্তু কী ধরনের গ্যারান্টি? যুক্তরাষ্ট্র আসলে কী করবে? রাশিয়া যুদ্ধ চালিয়ে গেলে তারা কীভাবে রক্ষা করবে? আপনি এমন অস্পষ্টতা নিশ্চয়ই চাইবেন না। বিশেষ করে, যখন আমাদের ২০১৪ সালের পর রাশিয়ার প্রতিশ্রুতি এবং ১৯৯৪ সালের তথাকথিত ‘বুদাপেস্ট মেমোরেন্ডাম’-এর অভিজ্ঞতা আছে। তাছাড়া রাশিয়া এমন অনেক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করেছিল যা প্রথমত ইউক্রেনের জাতীয়তা এবং রাষ্ট্রসত্তাকে খর্ব করবে। তাদের ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করার সুযোগ দেবে। এমন কিছু প্রস্তাবও ছিল যেখানে ইউক্রেন তার ভূখণ্ডে বিদেশি বাহিনীর সাথে কোনো সামরিক মহড়া চালাতে পারবে না, যদি না অন্য দেশগুলো তাতে অনুমতি দেয়। যেই দেশগুলোর তালিকায় রাশিয়ার নামও ছিল। তার মানে, আমি যদি ইউক্রেনে কোনো সাধারণ সামরিক মহড়া করতে চাই, তবে আমাকে রাশিয়ার অনুমতি নিতে হবে, সেই দেশ, যে আগে আমাকে আক্রমণ করেছে।

এটি কেমন শান্তি চুক্তি? এরপর ইউক্রেনীয় সশস্ত্র বাহিনীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে ফেলার শর্ত ছিল। সাধারণত এ ধরনের শর্ত আগ্রাসনকারী দেশের ওপর চাপানো হয়। আগ্রাসনের শিকার হওয়া দেশের ওপর নয়। সুতরাং আপনি দেখতে পাচ্ছেন আলোচনার টেবিলে যা ছিল, তার সাথে শান্তির কোনো সম্পর্ক নেই। আমি ন্যায়বিচার বা শুধু শান্তির কথা তো বাদই দিলাম। এটি ছিল মূলত এক গাদা প্রস্তাব দিয়ে আমাদের কোণঠাসা করে রাখার একটি চেষ্টা এবং পরে ইউক্রেনকে দোষারোপ করা যে ‘তোমরা এটি স্বাক্ষর করতে চাইছো না, তার মানে আমরা মস্কোতে শান্তি চাই কিন্তু তোমরা ইউক্রেনে শান্তি চাও না।‘

কিন্তু রাশিয়ার সাথে ‘মিনস্ক চুক্তি’র অভিজ্ঞতা থেকে আমরা জানি যে, সব শয়তানি লুকিয়ে থাকে বিস্তারিত বা খুঁটিনাটি বিষয়ের মধ্যে। তাই আমরা এ ধরনের আক্রমণাত্মক প্রস্তাব মেনে নিতে পারি না।

সাহাব: ওয়াশিংটনে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এবং প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কির যৌথ সংবাদ সম্মেলন আমাদের আসলে কী বার্তা দেয়? যুক্তরাষ্ট্র কি ইউক্রেনের ওপর থেকে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছে, নাকি জেলেনস্কি তার দাবিগুলো ঠিকভাবে তুলে ধরতে পারেননি? সেই আলোচনার টেবিলে রাশিয়ার অদৃশ্য উপস্থিতি কেন ছিল?

শেলেস্ট: আপনি ওভাল অফিসের সেই কথোপকথনের কথা বলছেন, যা বিশ্বজুড়ে সংবাদ শিরোনাম হয়েছিল। যদিও এরপর দুই প্রেসিডেন্টের মধ্যে অনেক ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে। তবে ওই নির্দিষ্ট ঘটনাটি সবার কাছেই খুব অদ্ভুত ছিল। কারণ এটি দেখে অনেকটাই উসকানি মনে হচ্ছিল, তা হোক ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত। একজন সাংবাদিকের পক্ষ থেকে ড্রেস কোড বা পোশাক নিয়ে প্রশ্ন করাটা ছিল পুরোপুরি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং অর্থহীন। যারা ঘটনাটি ভুলে গেছেন তাদের মনে করিয়ে দিই, ট্রাম্প নিজেই এর আগে গলফ খেলার পোশাকে অনেক বৈঠক করেছেন। আবার অনেক বিশ্বনেতাও হোয়াইট হাউসে প্রথাগত স্যুট না পরেই এসেছেন। সুতরাং ওই সাংবাদিকের প্রশ্নটি ছিল কেবল উস্কানি দেওয়ার জন্য, আর আমরা সেই সাংবাদিকের পরিচয় ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানি, যা আরেক গল্প।

তবে এর চেয়েও অদ্ভুত ছিল ভাইস প্রেসিডেন্টের (জেডি ভ্যান্স) আচরণ। তিনি পুরো আলোচনায় চুপচাপ ছিলেন, কিন্তু একদম শেষে হঠাৎ করে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠলেন। বলতে শুরু করলেন, ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ‘কৃতজ্ঞ’ নন। অথচ জেলেনস্কি বারবার বলছিলেন যে মার্কিন সরকারের সহায়তার জন্য আমরা কতটা কৃতজ্ঞ। সব মিলিয়ে দৃশ্যটি খুবই বেমানান ছিল। এখন এ ঘটনায় কি সরাসরি রাশিয়ার হাত ছিল নাকি শুধু ছায়া, সেটি আলাদা প্রশ্ন। আমরা জানি সেই সময় মিস্টার হুইটকফ রাশিয়ার প্রতিনিধিদের খুব বেশি বিশ্বাস করেছিলেন। তিনি রাশিয়ার এমন সব দাবি বিশ্বাস করেছিলেন যা খুব সহজেই মিথ্যা প্রমাণ করা যায় এবং পরে যখন তারা বিষয়টি বুঝতে পেরেছে, তখন তাদের অবস্থান বদলাতে দেখা গেছে।

সে কারণেই আমরা ওই ঘটনাটিকে একটি বিচ্ছিন্ন দুর্ঘটনা হিসেবেই দেখতে চাই, নীতি হিসেবে নয়। তবে ওই ঘটনা থেকে আমরা একটি বড় শিক্ষা পেয়েছি, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন ইউক্রেনের ওপর চাপ প্রয়োগ করাকে বেশি সহজ মনে করছে, যা রাশিয়ার চেয়ে দুর্বল। আর এটা একটা বড় ভুল। কারণ ইউক্রেনের ওপর চাপ দেওয়া মানে হলো আগ্রাসনকারীকে পুরস্কৃত করা। এতে শান্তি দ্রুত আসবে না, কারণ রাশিয়া ঐকমত্যের দিকে না এগিয়ে বরং দাবির মাত্রা আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

দ্বিতীয় শিক্ষা হলো, মার্কিন প্রশাসন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে পারেনি। তা হলো, রাশিয়া ঠিক তখনই আলোচনার কথা বলে বা আলোচনার জন্য প্রস্তুত বলে জানায়, যখন যুক্তরাষ্ট্র আরও কঠোর নিষেধাজ্ঞার প্রতিশ্রুতি দেয়। গত চার বছরের ঘটনাপ্রবাহ লক্ষ্য করলে আপনি একটি পরিষ্কার টাইমলাইন দেখতে পাবেন, রাশিয়া যুদ্ধ থামানোর জন্য নয়, বরং ঠিক যখন নতুন কোনো নিষেধাজ্ঞার প্যাকেজ ঘোষণা হওয়ার কথা থাকে, তখনই আলোচনার কথা বলে যাতে নতুন নিষেধাজ্ঞাগুলো পিছিয়ে দেওয়া যায়। 

তৃতীয় শিক্ষাটি হলো, কখনো ভাববেন না কারও হাতে কোনো ‘কার্ড’ নেই। প্রথমত, সেই সময়েও ইউক্রেনের হাতে শক্তিশালী কার্ড ছিল, যা আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সক্ষমতার মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে। রাশিয়া ১২ বছর ধরে চেষ্টা করেও দোনেৎস্ক অঞ্চল পুরোপুরি দখল করতে পারেনি, তিন বছর যুদ্ধ করে তারা আমাদের মাত্র ১ শতাংশ জমি দখল করেছে, তাও ১০ লক্ষাধিক সৈন্য হারানোর বিনিময়ে। এতো সৈন্য হারিয়ে কেউ নিজেকে শক্তিশালী দাবি করতে পারে না। আর এখন মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতির দিকে তাকান, সবাই এখন কার কাছে আসছে? একমাত্র কোন সামরিক বাহিনীর কাছে সত্যিকারের আধুনিক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা আছে যা তারা অন্যদের সাথে শেয়ার করতে চায়? এবং কার কাছে এমন প্রযুক্তি আছে যা অন্য অনেক দেশের কাছে নেই? সেটি হলো ইউক্রেন। তাই এখন যুদ্ধের ভেতর থাকার পরও যুক্তরাষ্ট্রসহ অনেক দেশ তাদের প্রতিরক্ষার জন্য আমাদের কাছে সাহায্য ও পরামর্শ চাইছে। সুতরাং ‘ইউক্রেনের হাতে কার্ড নেই’ এমন মন্তব্য না করাই ভালো। 

সাহাব: আমরা দেখতে পাচ্ছি ইউরোপ জেগে উঠছে। ইউরোপীয় চিন্তাভাবনার পরিবর্তন কি কোনো স্থায়ী পরিবর্তন, নাকি এটি একটি সাময়িক আতঙ্ক? ইউরোপে যুক্তরাজ্য-পোল্যান্ড-ইউক্রেন ত্রিপক্ষীয় সম্পর্কও নতুন রূপ নিতে দেখছি। এখন আমরা কোন ইউরোপের মুখোমুখি? সেই ইউরোপ যারা শেষ পর্যন্ত জেগে উঠেছে, নাকি যারা মস্কোর সাথে আপস করতে চায়, অথবা যারা এখনো আশা করছে এই সমস্যাটি নিজে নিজেই মিটে যাবে?

শেলেস্ট:  আমি বলব যে ইউরোপ সম্পর্কে আমাদের কাছে সত্যিই খুব ভালো খবর আছে। প্রথমত, বেশিরভাগ দেশ থেকেই ‘রাশিয়া-ফার্স্ট’ চিন্তাভাবনা এখন দূর হয়ে গেছে। সেসব দেশের নেতারা এখন আর ওভাবে ভাবেন না। রাশিয়া তাদের আচরণের মাধ্যমেই এটি নিশ্চিত করেছে। আমরা জানি, ২০১৪ এবং ২০২২ সালে ইউরোপীয় নেতারা রাশিয়ার সাথে আলোচনার কতটা চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু প্রতিবারই রাশিয়া তাদের দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে।

শুধু ইউক্রেন নয়, তারা বাল্টিক অঞ্চল, নর্ডিক দেশসমূহ, আর্কটিক এবং ব্রিটিশ দ্বীপপুঞ্জের আশেপাশেও ক্রমাগত উস্কানি দিয়ে চলেছে। তাই বর্তমানে আমি আর কোনো ‘রাশিয়া-ফার্স্ট’ নীতি দেখি না। আমরা শেষ পর্যন্ত একটি ‘ইউরোপ-ফার্স্ট’ নীতির কথা শুনতে পাচ্ছি, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, জেগে ওঠার বিষয়েও কিছু ভালো খবর আছে এবং এটি কেবল অর্থের বিষয় নয়। অর্থ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু আমাদের জন্য সেটি গৌণ। প্রথম ভালো খবর হলো, ইউরোপীয় নেতারা অবশেষে স্বীকার করেছেন যে ইউরোপে যুদ্ধ হতে পারে। ১৯৯১ সালের পর বা বলকান যুদ্ধের পর সবাই ভেবেছিল ইউরোপে যুদ্ধ অসম্ভব; বিশেষ করে ন্যাটো বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের কোনো সদস্য রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে তো নয়ই। কিন্তু এখন সামরিক বাহিনী, নিরাপত্তা সংস্থা, গোয়েন্দা বিভাগ এবং রাজনীতিবিদরা সবাই একমত যে, যেকোনো সময় যুদ্ধ হতে পারে এবং আমাদের এর জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তারা শেষ পর্যন্ত এই চিন্তা থেকে বের হয়ে এসেছে যে যুক্তরাষ্ট্র এসে তাদের রক্ষা করবে। বরং তারা এখন বুঝতে পারছে নিজেদের নিরাপত্তার দায়িত্ব নিজেদেরই নিতে হবে। যখন আমরা বিনিয়োগের কথা বলি, তখন শুধুই বাজেটের কথা আসে না, বাজেট তো বাড়ছেই। কিন্তু আসল বিষয় হলো সেনাবাহিনীর প্রস্তুতি। কারণ অনেক দেশে সামরিক বাহিনী খুব শিথিল অবস্থায় ছিল। এমনকি তারা তাদের ট্যাঙ্কের নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণও করতো না বা নিয়োগ ও উৎপাদনের প্রক্রিয়াগুলো ছিল অনেক পুরনো ও ধীর।

সর্বশেষ কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হলো, ইউরোপ এখন পুনরায় সশস্ত্র হওয়ার কথা ভাবছে। তারা সামরিক শিল্প, উৎপাদন এবং গবেষণা ও উন্নয়নে বিনিয়োগের কথা চিন্তা করছে। আপনি যদি ‘সেফ’ প্রোগ্রাম বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক প্রকল্পগুলো দেখেন, তবে দেখবেন দেশগুলো এখন নিজস্ব সামরিক সক্ষমতা অর্জনে মনোযোগী। আর এখানে ইউক্রেন তাদের প্রতিরক্ষা ও সামরিক শিল্পের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। এখন প্রচুর যৌথ মহড়া হচ্ছে।

পোল্যান্ডে ‘জে-ট্যাক’ (J-TAC) বা জয়েন্ট অ্যানালাইসিস টিচিং অ্যান্ড এক্সারসাইজ সেন্টার তৈরি হয়েছে, এটি ন্যাটো এবং ইউক্রেনের একটি যৌথ বিশ্লেষণ, প্রশিক্ষণ ও মহড়া কেন্দ্র। এখানে যুদ্ধের ট্রেইনিং দেওয়া হয় এবং ইউক্রেনীয়রা এখন প্রশিক্ষণের কাজে বা মহড়ায় ইউরোপীয়দের সাথে কাজ করছে। এই ছোট-বড় অনেকগুলো পাজল মিলে একটি সামগ্রিক চিত্র তৈরি হচ্ছে। যেখানে ইউরোপ একটি প্রকৃত ‘নিরাপত্তা শক্তি’তে পরিণত হচ্ছে। যদিও হাঙ্গেরির ওরবানের মতো কিছু নেতার ভিন্নমত থাকলেও সামগ্রিকভাবে ইউরোপের পূর্ব-পশ্চিম, উত্তর-দক্ষিণ, সব প্রান্তের দেশগুলোর মধ্যে এবং ডান-বাম সব রাজনৈতিক বলয়ের মধ্যেই এই বিষয়ে একটি ঐকমত্য তৈরি হয়েছে। সুতরাং, ইউরোপ বদলাচ্ছে, এটি নিশ্চিত।

Shahab-5সাহাব: আমরা যুক্তরাষ্ট্র বা ইউরোপীয় ইউনিয়নের দিকে ঠিকই তাকাচ্ছি, কিন্তু ইউক্রেনের ক্ষেত্রে বহুপাক্ষিকতা বা ‘মাল্টিল্যাটারালিজম’ কি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ছে? আপনার কি মনে হয় এই বহুপাক্ষিকতাবাদ বাঁচানো কি সম্ভব? ইউক্রেন সংকট কি জাতিসংঘ বা অন্য কোনো ব্যবস্থার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব, নাকি আমরা এখন এমন এক বিশ্বে বাস করছি যেখানে কেবল সামরিক সক্ষমতা আর বড় শক্তির পৃষ্ঠপোষকতাই আপনাকে রক্ষা করতে পারে?

শেলেস্ট: আমি বলবো, বিষয়টি এতটাও সাদা-কালো নয়। প্রথমত, বহুপাক্ষিকতাবাদ মানে শুধু জাতিসংঘ নয়। ইউক্রেনকে নিয়ে আপনি যেসব উদ্যোগ দেখছেন, তার অনেকগুলোই আসলে বহুপাক্ষিক। ইউরোপীয় ইউনিয়ন বহুপাক্ষিক, ন্যাটো বহুপাক্ষিক, ইউক্রেনকে সাহায্যকারী ‘কোয়ালিশন অব দ্য উইলিং’ বা ‘রামস্টেইন ফরম্যাট’, সবই বহুপাক্ষিক। এমনকি আমরা এখন ‘মিনিল্যাটারাল’ শব্দটিও ব্যবহার করছি, যেখানে তিন-চারটি দেশের ছোট ছোট জোট একে অপরকে সাহায্য করছে। অর্থাৎ এটি শুধু দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের বিষয় নয়, বহুপাক্ষিক কাঠামোগুলো এখনও গুরুত্বপূর্ণ।

আমার মনে হয় এই যুদ্ধে ইউক্রেন ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের বহুপাক্ষিক সম্পর্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ রাষ্ট্রের পর রাষ্ট্র ভেঙ্গে দিয়ে রাশিয়ার চাওয়া পূরণ করা সহজ হয়ে যায়। এ কারণেই ২০১৪ এবং ২০২২ সালে তারা ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই ঐক্য ভাঙার চেষ্টা করেছিল যেন প্রতিটি দেশের কাছে আলাদাভাবে পৌঁছানো যায়। কিন্তু যখন পুরো ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা দেয়, তখন রাশিয়ার জন্য পরিস্থিতি কঠিন হয়ে পড়ে। কারণ একটি দেশের নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়া সহজ, কিন্তু যখন বিশ্বের সব বড় অর্থনীতি আপনার বিরুদ্ধে দাঁড়ায়, তখন কী করবেন? এই জোটে অস্ট্রেলিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, নিউজিল্যান্ড বা চিলির মতো দেশগুলোও যুক্ত হচ্ছে। অর্থাৎ ইউক্রেনকে শুধু ইউরোপীয় বহুপাক্ষিকতাবাদই সাহায্য করছে না।

জাতিসংঘের যে উদাহরণ আপনি দিলেন, আমার মনে হয় আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল ছিল সবসময় শুধু নিরাপত্তা পরিষদের ওপর নজর দেওয়া। নিরাপত্তা পরিষদ দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একটি ধ্বংসাবশেষ। কিন্তু ইউক্রেন মূলত ইউনেস্কো, ইউনিসেফ এবং ইউএনডিপি-এর কাছ থেকে অনেক সহায়তা পেয়েছে, বিশেষ করে পুনর্গঠনের কাজে। এমনকি যখন রাশিয়া ইউক্রেনের বন্দরগুলো অবরোধ করে শস্য ও ভোজ্য তেল রপ্তানি বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন ইউক্রেন বিশ্ব খাদ্য সংস্থার (ডব্লিউএফপি) সাথে মিলে দক্ষিণ বিশ্বের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কাজ করেছে। আমরা এ কাজ একা করতে পারতাম না; এই বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোই বিতরণের কাজটি সহজ করে দিয়েছিল।

এজন্যই জাতিসংঘকে কেবল নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ জন সদস্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আরও বড় পরিসরে দেখা উচিত। ২০২২ সাল থেকে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে, যেখানে ১৪৩টি দেশ রুশ আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ইউক্রেনের পক্ষে ভোট দিয়েছে। এটি ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক আদালতে ইউক্রেনীয় ব্যবসায়ীদের ক্ষতিপূরণ পেতে বা নির্যাতিত নাগরিকদের বিচার পেতে সাহায্য করে। সুতরাং আপনাকে জানতে হবে কীভাবে বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোর সুবিধা ব্যবহার করতে হয়। রাশিয়া ক্রমাগত ভেটো দিয়ে বা ম্যানিপুলেট করে এই ব্যবস্থাকে দুর্বল করছে কিন্তু আমাদের কাছে এর চেয়ে ভালো কোনো বিকল্প নেই। আপনি সবকিছু কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে সমাধান করতে পারবেন না। বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মাঝে মাঝারি বা ছোট দেশগুলোকে রক্ষার জন্য এই ব্যবস্থাগুলোর প্রয়োজন আছে। 

আন্তর্জাতিক বিচার আদালতের (আইসিজে) কথা বললে, ২০২২ সালের আগেই ইউক্রেন দুটি মামলায় জিতেছিল এবং এখন তৃতীয় মামলা চলছে যেখানে প্রাথমিক সিদ্ধান্তে আদালত রাশিয়াকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। তারা স্পষ্ট করে বলেছে যে কখন থেকে রাশিয়ার দখলদারি শুরু হয়েছিল। এছাড়া আমরা প্রথমবারের মতো ‘স্টেট স্পনসরিং অব টেররিজম’ বা রাষ্ট্র কর্তৃক সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়ার আন্তর্জাতিক কনভেনশনটি আইসিজেতে ব্যবহার করছি। এর আগে কেউ এটি করার চেষ্টা করেনি। ইউক্রেনই করেছে, আর এটি এখন প্রক্রিয়াধীন, যা অন্যান্য দেশের জন্য একটি উদাহরণ হয়ে থাকবে। এছাড়া আমরা ইউক্রেনে যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য একটি ট্রাইব্যুনালও তৈরি করেছি যা পুরোপুরি বহুপাক্ষিক। এটি কেবল ইউক্রেনের নয়, বরং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি উদ্যোগ।

সবচেয়ে কঠিন বিষয় হলো বুদাপেস্ট মেমোরেন্ডাম। আপনি এবং আমি দুজনেই জানি, এর নাম থেকেই বোঝা যাচ্ছে, ‘মেমোরেন্ডাম’ বা স্মারক কোনো ‘ট্রিটি’ বা আনুষ্ঠানিক চুক্তি নয়। এর কোনো আইনি বাধ্যবাধকতা নেই। তবে রাজনৈতিকভাবে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কারণ ইউক্রেন বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম পারমাণবিক অস্ত্রভাণ্ডার ত্যাগ করেছিল। বড় শক্তিগুলো আমাদের আঞ্চলিক অখণ্ডতা ও অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু আজ আমরা কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? রাশিয়া সেই দেশগুলোর মধ্যে একটি ছিল, যারা এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল। আর সেই মস্কো নিজেই এর প্রতিটি শর্ত লঙ্ঘন করেছে।

এটি শুধু ইউক্রেনের সমস্যা নয়। এখন ইরান বা অন্য কোনো দেশ যারা পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে চায়, আপনি যদি তাদের কাছে গিয়ে বলেন, ‘অনুগ্রহ করে এটি করবেন না, আমরা আপনাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেব।’ তখন তারা কি উত্তর দিবে? তারা বলবে, ‘আমরা কি আপনাদের নিরাপত্তার গ্যারান্টি বিশ্বাস করতে পারি? আপনারা কি সত্যিই আমাদের রক্ষা করতে পারবেন?’

আমরা দেখছি এখন আরও অনেক রাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির ইচ্ছা প্রকাশ করছে। এর ফলে বিশ্বের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ ব্যবস্থা অর্থাৎ পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধের বৈশ্বিক চেষ্টা এক ভয়াবহ সংকটে পড়ছে। তবে শুধু পারমাণবিক ইস্যু নয়, ইউক্রেন যুদ্ধ এবং গত মাসে মধ্যপ্রাচ্যের ঘটনাগুলোর পর অনেক দেশই এখন প্রশ্ন তুলছে, নিরাপত্তার গ্যারান্টি বলতে আসলে কী বোঝায়? বিশেষ করে মার্কিন নিরাপত্তার গ্যারান্টি, যুক্তরাষ্ট্র কি আমাদের রক্ষা করতে পারবে? যুক্তরাষ্ট্র  কি আমাদের প্রতিরক্ষা দিতে পারবে? তারা কি আদৌ তা করতে চাইবে? এবং যদি কোনো খারাপ পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে না আসে, তবে নিজেদের ভূখণ্ডে আমাদের কী ধরনের সক্ষমতা থাকা প্রয়োজন?  

সাহাব: আমরা এখন জিওপলিটিক্যাল পাজল দেখতে পাচ্ছি। যেমন, ইরান, রাশিয়া এবং চীনের অক্ষশক্তি। ইরানের যুদ্ধ দীর্ঘ হচ্ছে। এই জোটকে অনেকে ‘অ্যাক্সিস অব কারেকশন্স’ বা সংশোধনবাদী অক্ষ বলছে। এখন ইউক্রেনের সম্মুখ সারির প্রেক্ষাপট থেকে আপনার কাছে এই জোট কতটা শক্তিশালী মনে হয়, বিশেষ করে, এখন যেহেতু রাশিয়া ও চীনের মতো ইউক্রেনও কিছু বোঝাপড়া পাশ কাটাতে প্রস্তুত? ইরানের সামরিক সরঞ্জামে রাশিয়ার প্রবেশাধিকারকে কীভাবে প্রভাবিত করবে? এটি কি মস্কোকে সাহায্য করবে নাকি ক্ষতিগ্রস্ত করবে? আর উপসাগরীয় অঞ্চলে ইউক্রেনের সম্পৃক্ততা কি রাশিয়াকে আরও বেশি সন্দিহান করে তুলবে, নাকি এতে কিয়েভ কোনো ধরনের সুবিধা পেতে পারে?

শেলেস্ট: আপনার এই প্রশ্নের মধ্যে অনেকগুলো স্তর রয়েছে; এটি শুধু একটি প্রশ্ন নয়। যদি ইউক্রেনীয় দৃষ্টিভঙ্গির কথা বলেন, তবে আমি সংক্ষেপে প্রতিটি স্তর ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করবো।

প্রথমত, যদি গত কয়েক মাসের ঘটনায় ফিরে যাই, রাশিয়া ড্রোন প্রযুক্তি শুরুতে খুব একটা উন্নত ছিল না। তাদের এই প্রযুক্তির উপর বিশ্বাস ছিল না। শুধু ২০২০ সালের নাগোর্নো-কারাবাখ যুদ্ধের পর তারা ড্রোন নিয়ে ভাবতে শুরু করে। ইউক্রেনীয়দের সাথে সংঘাত শুরু হওয়ার পরই তারা ড্রোন তৈরিতে মন দেয়। ইউক্রেন যুদ্ধের শুরুর দিকে ‘শাহেদ’ ড্রোনের আগে রাশিয়ার কাছে বড় কোনো ড্রোন ছিল না।

গত তিন বছরে ইরানের ড্রোন প্রযুক্তিতে বিশাল পরিবর্তন এসেছে। রাশিয়া এখানে প্রচুর বিনিয়োগ করেছে এবং তাদের কারিগরি দক্ষতা দিয়ে ড্রোনগুলোকে উন্নত করেছে। যা এখন অনেক ছোটখাটো ক্ষেপণাস্ত্রের মতো কাজ করে। কিন্তু ইরান ছাড়া রাশিয়ার পক্ষে এ কাজ করা সম্ভব ছিল না। আমরা জানি ইরান এই বছরের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত রাশিয়াকে ড্রোনের মতো বিপুল পরিমাণ অস্ত্র সরবরাহ করেছে। সুতরাং, এক্ষেত্রে ইউক্রেন ইরানকে একটি শত্রু দেশ এবং যুদ্ধের পক্ষ হিসেবেই দেখে।

এই যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে তা আমি জানি না: ড. হানা শেলেস্ট, পরিচালক, ইউক্রেনিয়ান প্রিজম

আসলে ইরানের সাথে আমাদের সমস্যা আরও আগে থেকেই শুরু হয়েছিল, ২০২১ সালে যখন তারা ইরানি আকাশসীমায় কিয়েভ-তেহরান রুটের একটি ইউক্রেনীয় বেসামরিক যাত্রীবাহী বিমান গুলি করে ভূপাতিত করলো, তখন থেকেই আমাদের সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু। আমাদের সব ধরনের আলোচনায় তারা শুধু সব কিছু অস্বীকার করে গেছে। এমনকি সেই ফ্লাইটে নিহত শত শত ইউক্রেনীয় ও কানাডীয় নাগরিকের পরিবারের কাছে তারা ন্যূনতম দুঃখপ্রকাশ করেনি বা ক্ষমা চায়নি। সুতরাং আমাদের সম্পর্ক আগে থেকেই উত্তপ্ত ছিল, তার ওপর তারা প্রকাশ্যে রাশিয়াকে অস্ত্র দিয়ে সমর্থন করতে শুরু করলো, অন্য কোনো দেশ যা এত সরাসরি করেনি। তাই তাদের প্রতি আমাদের কোনো সহানুভূতি নেই।

তবে আমরা অত্যন্ত সতর্ক ছিলাম। কারণ আমাদের মূল শত্রু ছিল রাশিয়ান ফেডারেশন। আমরা শুধু অন্য দেশগুলোকে দেখিয়েছি যে এই সম্পর্কের পরিণতি কী হতে পারে। যেহেতু রাশিয়ার প্রযুক্তি ইরানে যাচ্ছিল, তাই ইরানের সামরিক শক্তি বাড়ছে যা আমাদের জন্যও চিন্তার বিষয়। রাশিয়ার জন্য এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ রাশিয়া খুচরা যন্ত্রাংশের জন্য চরমভাবে নির্ভরশীল; তাদের সামরিক হার্ডওয়্যারের ৭০ শতাংশ থেকে শুরু করে কোনো কোনো ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশ যন্ত্রাংশই বিদেশ থেকে আসে। আগে সেগুলো বিভিন্ন দেশ থেকে আসতো, এখন বেশি আসছে চীন থেকে। তাদের সামরিক শিল্প অন্য দেশের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তাই আমরাও এই অংশীদারদের দিকে নজর রাখছি।

এবার বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে আসি। এই যুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলো ইউক্রেনকে অনেক সাহায্য করেছে, সামরিকভাবে না হলেও মধ্যস্থতাকারী হিসেবে। কাতার এখন ইউক্রেনের অপহৃত শিশুদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করছে। আপনারা জানেন যে রাশিয়া প্রায় ২০ হাজার ইউক্রেনীয় শিশুকে অপহরণ করেছে; যাদের জোরপূর্বক দত্তক নিয়ে বা বিভিন্ন উপায়ে রুশকরণ করা হয়েছে। কাতার এই শিশুদের খুঁজে বের করতে এবং ফিরিয়ে আনতে অন্যতম প্রধান দেশ হিসেবে কাজ করছে। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাত রাশিয়ার টাকা পাচারের ‘ব্ল্যাক হোল’ এবং নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর পথ হওয়া সত্ত্বেও, তারা আমাদের যুদ্ধবন্দীদের ফিরিয়ে আনার আলোচনায় অনেক সাহায্য করেছে। একই কথা সৌদি আরবের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য; তারা আলোচনার ভেন্যু হিসেবে কাজ করেছে এবং বন্দি বিনিময়ে মধ্যস্থতা করেছে। আরও অনেক ক্ষেত্রেই এই দেশগুলো ইউক্রেনকে সহায়তা দিয়েছে।

আমরা বুঝি যে উপসাগরীয় দেশগুলো আগ্রাসনকারী ছিল না এবং তারা ইরানের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করতেও চায়নি। এমনকি তাদের কেউ কেউ ইরান ও আমেরিকার মধ্যে সংলাপের পথ প্রশস্ত করতে সাহায্য করছিল। একারণেই ইরান যখন এই দেশগুলোর ওপর আক্রমণ শুরু করলো, তখন আমরা বুঝতে পারলাম যে ভালো বন্ধু হিসেবে ইউক্রেনের তাদের পাশে দাঁড়ানো উচিত। কারণ ইরান যখন ঘোষণা করলো যে তারা শুধু ‘সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে’ আঘাত হানছে, তা ছিল হুবহু রাশিয়ান ফেডারেশনের সেই একই চেনা বুলি। আমি জানি কীভাবে রাশিয়ার মিসাইল আমাদের হাসপাতাল, থিয়েটার, জাদুঘর, গির্জা বা জনবসতিপূর্ণ এলাকা ধ্বংস করেছিল, অথচ তাদের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিদিন সকালে ব্রিফিংয়ে এসে বলে যে তারা কেবল ‘সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে’ আঘাত করেছে।

কাতারের বন্ধুরা যখন সকালে ফোন করে বলে, ‘এসব কী হচ্ছে?’।  আমি যখন ছবিগুলো দেখি, আমি জানি ওই এলাকাগুলো নিশ্চিতভাবেই কোনো আমেরিকান সামরিক ঘাঁটি নয়। রাশিয়ার মতো ইরানেরও একই কৌশল এবং একই ধরনের বক্তব্য ছিল। এমতাবস্থায় ইউক্রেনের জন্য এটিই যুক্তিযুক্ত ছিল যে আমরা যতটা সম্ভব সাহায্য করবো।

পরিসংখ্যান বলছে, মিসাইল ইন্টারসেপ্ট করার ক্ষেত্রে বা মিসাইল প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় এই দেশগুলো শক্তিশালী হলেও, তারা ইরানের ড্রোনের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে একেবারেই অপ্রস্তুত ছিল। আর এখানেই ইউক্রেনের প্রযুক্তি, জ্ঞান এবং প্রশিক্ষণ কাজে লাগে। সুতরাং, আমরা এই সংঘাতের কোনো পক্ষ নই, আমরা কোনো যুদ্ধে জড়াতে চাই না, আমরা শুধু উপসাগরীয় দেশগুলোকে রক্ষার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি শেয়ার করছি। 

সাহাব: সবকিছু মিলিয়ে যুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বটি দেখতে কেমন হবে? যদি এই যুদ্ধের কোনো সমাপ্তি ঘটে, তবে বিশ্বকে সঠিক পথে রাখতে আসলে কোন বিষয়ের উপর নজর দিতে হবে?

শেলেস্ট: আমরা হয়তো আর আগের বিশ্বকে ফিরে পাবো না। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী যে বিশ্ব ব্যবস্থা ছিল, তা বদলে যাবে অথবা হয়তো একদম নতুনও নয়। কারণ ইতিহাস বারবার ফিরে আসে, শুধু তার বহিঃপ্রকাশগুলো ভিন্ন হয়। আমি যদি দার্শনিক দৃষ্টিকোণ থেকে বলি, তবে আমাদের আবারও মৌলিক মূল্যবোধগুলোতে ফিরে যেতে হবে। কারণ আমরা বড্ড বেশি বাস্তববাদী হয়ে গেছি। ভুলে গেছি এই সবকিছু আসলে কেন? এই ব্যবস্থাগুলো ছিল ছোট-বড় সব জাতির সমতা, মর্যাদা এবং মানবাধিকারের জন্য; যার সবচেয়ে বড় অর্থ হলো বেঁচে থাকার এবং স্বাভাবিকভাবে জীবন যাপনের অধিকার।

আমি গ্রীষ্মের ছুটিগুলোতে মিডিয়াতে সাক্ষাৎকার দেওয়ার বদলে পরিবারের সাথে কাটাতে চাই। হয়তো পরিবারের সাথে কোনো বাগানে সময় কাটাতাম। কিন্তু রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে সেই সাধারণ জীবন আমরা যাপন করতে পারছি না। ইউক্রেন হোক বা বাংলাদেশ বা সামোয়া, সব দেশের মানুষই একটি স্বাভাবিক জীবন চায়। এখানে এই মৌলিক মূল্যবোধগুলো আসলে নিজেদের সত্তায় ফিরে যাওয়ার মতো। আমরা আসলে কী হতে চাই? আমরা কি এমন মানুষ হতে চাই যারা কিছু গড়বে, যারা ভবিষ্যৎ নির্মাণ করবে? নাকি যারা অন্য মানুষের জীবন এবং সবকিছু ধ্বংস করে দেবে?

তবে দর্শন ছেড়ে যদি রাজনৈতিক ও বাস্তববাদী আলোচনায় আসি। আমি মনে করি, প্রথমত বিশ্বকে বুঝতে হবে, আপনি নিরপেক্ষ বা ‘ছদ্ম-নিরপেক্ষ’ হয়ে থাকতে পারেন না। কারণ আগ্রাসনকারী এবং ভুক্তভোগীর মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা সম্ভব নয়। আপনাকে বুঝতে হবে এর অর্থ আপনার জন্য কী দাঁড়ায়। সবার আগে নিজের স্বার্থের কথা ভাবুন। সামুদ্রিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে রাশিয়ার আচরণ দেখুন।

দুঃখিত, কিন্তু আমি এখন ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও হুবহু একই চিত্র দেখতে পাচ্ছি। ২০১৮ থেকে ২০২১ সালের মধ্যে রাশিয়ার কর্মকাণ্ড থেকে চীন অনেক কিছু শিখেছে। আমি সম্প্রতি ফিলিপাইনে গিয়েছিলাম, সেখানে আমরা তাইওয়ান, জাপান বা চিলির পরিস্থিতি নিয়ে অনেক আলোচনা করেছি। জাপান কোথায় আর চিলিই বা কোথায়! কিন্তু আমরা যখন মানচিত্রের দিকে তাকালাম, সংখ্যার দিকে তাকালাম, তখন দেখলাম তাদের রপ্তানি এবং জীবনযাত্রা কতটা বন্দরের ওপর নির্ভরশীল। তাদের বন্দরগুলো কতটা সুরক্ষিত আর মালাক্কা প্রণালীর মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলো বন্ধ করে দেওয়া কতটা সহজ। এতে সাধারণ মানুষের জীবনে কী প্রভাব পড়বে? তারা কি প্রস্তুত?

আমরা জানি চীন খুব সতর্কতার সাথে রাশিয়ার প্রতিটি পদক্ষেপ লক্ষ্য করছে, কীভাবে তারা আমাদের ওপর বা অন্য আগ্রাসনকারীদের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো এড়িয়ে যাচ্ছে। তারা একই কৌশল ব্যবহার করছে। আপনি যদি আজ রাশিয়াকে এই আগ্রাসনের জন্য শাস্তি না দিয়ে পার পেয়ে যেতে দেন বা তাদের নিষেধাজ্ঞা এড়ানোর সুযোগ করে দেন, তবে আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন না যে কাল অন্য কোনো দেশ একই কাজ করবে না। কারণ তারা এখন দেখছে যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া কতটা দুর্বল হতে পারে। একারণেই অন্য দেশগুলোর, বিশেষ করে ছোট ও মাঝারি শক্তির দেশগুলোর স্বার্থেই এটি নিশ্চিত করা প্রয়োজন, আন্তর্জাতিক নিয়মগুলো যেন ঠিকঠাক কাজ করে, আমাদের প্রতিরোধের ব্যবস্থাগুলো যেন কার্যকর থাকে, আমরা যেন বুঝতে পারি আমাদের প্রকৃত বন্ধু কারা এবং যেন নতুন নতুন জোট গঠন করি।

বিষয়টি কেবল ইউক্রেনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারণ আপনি দেখছেন উত্তর কোরিয়া রাশিয়ার কাছ থেকে শিখছে, চীন রাশিয়ার কাছ থেকে শিখছে, ইরান রাশিয়ার কাছ থেকে শিখছে, আবার রাশিয়াও তাদের কাছ থেকে শিখছে। এর পরের দেশটি কে? আপনি কি নিশ্চিত যে আপনার আশেপাশে এমনটি ঘটবে না? আমরাও ২০১৪ সালে পুরোপুরি নিশ্চিত ছিলাম যে ইউক্রেনের মাটিতে কখনো যুদ্ধ আসবে না এবং প্রতিবেশীদের সাথে আমাদের কোনো সীমান্ত বিরোধ নেই।

এই যুদ্ধ কীভাবে শেষ হবে তা আমি জানি না। দুর্ভাগ্যবশত এখানে অনেক ভালো, মন্দ এবং অভাবনীয় পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে আমি এটি নিশ্চিতভাবে জানি যে যুদ্ধ শেষ হওয়া পর্যন্ত আমাদের বসে থাকলে চলবে না। যুদ্ধের শুরু, প্রক্রিয়া এবং ভবিষ্যত পরিকল্পনা ও ব্যবস্থা, সবকিছু থেকেই আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। জাতিসংঘ বা অন্য যেকোনো বহুপাক্ষিক সংস্থা ঠিক ততটাই শক্তিশালী, যতটা এর সদস্য রাষ্ট্রগুলো তাকে হতে দেয়। সুতরাং একে কার্যকর করা আমাদের হাতে, বাংলাদেশের হাতে, কিয়েভের হাতে, ফিলিপাইন, চিলি বা কানাডার হাতে। দেখা যাক পরিস্থিতি কোন দিকে যায়। আমার মনে হয় আমাদের মূল নীতি এবং মূল্যবোধগুলো বৈশ্বিক। এগুলো শুধু ইউরোপীয় বা ইউক্রেনীয় নয়, এগুলো সর্বজনীন। আমাদের শুধু নিজেদের একটি উন্নত সংস্করণ খুঁজে নিতে হবে।