মিয়ানমারে চীনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি: স্টিভ রস  

সাহাব: আপনি জনস্ হপকিন্সের স্কুল অব অ্যাডভান্সড অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজে একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। যেখানে বিষয়টিকে ‘মিয়ানমার সংঘাত: দক্ষিণ এশিয়ার কৌশলগত ঝুঁকি’ হিসেবে সাজানো হয়েছিল। আমরা সবসময় এটিকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ঝুঁকি হিসেবে দেখে এসেছি। প্রথম প্রশ্ন হলো, এই সংকট কি একটি রাষ্ট্রের কাঠামোগত ব্যর্থতা? নাকি এটি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে অথবা পূর্ব ব্লক বনাম পশ্চিম ব্লকের মধ্যে একটি ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় পরিণত হয়েছে? আমরা কীভাবে এর সমাধান করবো?

স্টিভ: আমি মনে করি এটি এমন একটি ইস্যু যা ওয়াশিংটন ডিসি’র নীতিনির্ধারকদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত। প্রথমটি হলো ‘স্ক্যাম সেন্টারের’ ইস্যু। গত বেশ কয়েক বছরে, বিশেষ করে কোভিড এবং ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমার স্ক্যাম সেন্টারের একটি বিশাল কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। মিয়ানমারে এই শিল্পের সাথে হাজার হাজার মানুষ জড়িত। এবং তারা প্রতি বছর আমেরিকানদের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি ডলার হাতিয়ে নিচ্ছে। সুতরাং এখানে একটি উল্লেখযোগ্য স্বার্থ রয়েছে, বা থাকা উচিত।

আমরা এই ইস্যুতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে কিছু নীতিগত পদক্ষেপ এবং কার্যক্রম দেখেছি। আগামী সময়গুলোতে এটি একটি বড় ইস্যু হিসেবে বজায় থাকবে। 

দ্বিতীয়টি হলো মাদক। মিয়ানমার এখন বিশ্বের বৃহত্তম আফিম উৎপাদনকারী দেশ। যা আফগানিস্তানে উৎপাদন কমে যাওয়ার কারণে হয়েছে। এর পাশাপাশি সিন্থেটিক ড্রাগ একটি প্রধান উৎপাদক।

তৃতীয় এবং সম্ভবত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার প্রশ্ন। আমি বলবো, মিয়ানমার আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি হুমকি। যেহেতু অভ্যন্তরীণ সংঘাত সীমান্তের বাইরে ছড়িয়ে পড়ছে এবং এর ফলে শরণার্থী সমস্যা তৈরি হচ্ছে এবং সীমান্ত পেরিয়ে রোগ-বালাই ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাও দেখা দিচ্ছে।

মিয়ানমার ম্যালেরিয়া এবং অন্যান্য রোগের একটি কেন্দ্র হয়ে উঠেছে। আর এই বিষয়গুলো কেবল মিয়ানমারের ভেতরেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। সুতরাং এই সমস্ত কারণে এবং আরও অনেক কারণে, যেগুলো নিয়ে আমি এখন বিস্তারিত বলছি না, আমি মনে করি যুক্তরাষ্ট্রের এই বিষয়ে আরও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

গত ২০ বছরেও, যুক্তরাষ্ট্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে ধারাবাহিক ফোকাস বজায় রাখতে সত্যিই হিমশিম খেয়েছে। তবে আপনার প্রশ্নের উত্তরে আমি বলবো না যে মিয়ানমার একটি ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে, কারণ এই মুহূর্তে এটি আসলে কোনো প্রতিযোগিতা নয়। মিয়ানমারে চীন এককভাবে সবচেয়ে প্রভাবশালী পক্ষ।

এমন অন্য কোনো অংশীদার নেই যারা চীনের প্রভাব ও ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছাতে পারে। আর এই প্রভাব গত দেড় বছরে শুধু বেড়েছেই, যখন ২০২৪ সালের শেষভাগ থেকে চীন মিয়ানমারে অনেক বেশি গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ে।

চীন এক পক্ষকে অন্য পক্ষের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়ে এর সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করেছে। যার এক পক্ষ হলো নেপিডো’র সরকার বা জান্তা সরকার এবং অন্য পক্ষ হলো বিভিন্ন প্রতিরোধ শক্তি ও সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো, এবং নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য সময়ের সাথে সাথে এই বিভিন্ন পক্ষগুলোর প্রতি তার সমর্থনের মাত্রা পরিবর্তন করেছে। সুতরাং আপনি এই সমর্থনের হেরফের দেখতে পাচ্ছেন, যা চীনকে তার স্বার্থ এগিয়ে নিতে সক্ষম করেছে এবং একই সাথে অস্থিরতার এমন একটি মাত্রা তৈরি করেছে যাতে চীন স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে, কিন্তু অন্য পক্ষগুলো সেই পরিস্থিতিতে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না।

সাহাব: এর মানে কি ব্রিটিশদের সেই ক্যারট অ্যান্ড স্টিক নীতির মতো কিছু? এক ধরনের পুরস্কার ও তিরস্কার নীতি, তাই না?

স্টিভ: আমি বলবো চীনের পক্ষ থেকে সমর্থনের একটি অত্যন্ত পরিমিত নীতি রয়েছে। আর এর সেরা উদাহরণ হলো ‘অপারেশন ১০২৭’ নামক হামলা অভিযান, যার নাম দেয়া হয়েছিল এর শুরুর তারিখ অনুযায়ী, ২৩ অক্টোবর ২০২৩। যেখানে দেখা গিয়েছিল মিয়ানমারের জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠী এবং অন্যান্য প্রতিরোধ শক্তির একটি জোট চীন-মিয়ানমার সীমান্তে স্ক্যাম সেন্টারগুলোর সমস্যা সমাধানের অজুহাতে চীনের পরোক্ষ সমর্থনে একটি বড় আক্রমণ শুরু করেছিল। কিন্তু যখন এই আক্রমণ চীনের সহনীয় সীমার বাইরে চলে গিয়েছিল, তখন ২০২৪ সালের অগাস্ট থেকে চীন আবার মিয়ানমার সামরিক বাহিনীকে অনেক বেশি জোরালো সমর্থন দিতে শুরু করে।

আপনি এই ভারসাম্য বজায় রাখার প্রক্রিয়াটি অব্যাহত থাকতে দেখছেন। চীন এখনও নেপিডো’র জান্তা সরকারের পেছনে জোরালোভাবে দাঁড়িয়ে আছে এবং সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ওপর, বিশেষ করে চীন-মিয়ানমার সীমান্তের গোষ্ঠীগুলোর ওপর উল্লেখযোগ্য চাপ প্রয়োগ করছে।

সা্হাব: আমরা এখন দেখতে পাচ্ছি যে স্ক্যাম সেন্টারগুলো সবার জন্যই মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি বাংলাদেশের মাদক বা মাদকদ্রব্যও মূলত মিয়ানমার সীমান্ত থেকে আসছে। আমি দেখেছি যে ওয়াশিংটনের মিয়ানমার নীতি দুটি 'ভুল ধারণার ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। একটি ধারণা হলো যে, যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তর সম্পৃক্ততা চীনের সাথে একটি প্রক্সি ওয়ার ডেকে আনার ঝুঁকি তৈরি করে। আর অন্যটি হলো যে আসিয়ান-নেতৃত্বাধীন কূটনীতিই শেষ পর্যন্ত চীনের মোকাবিলা করার জন্য সেরা বিকল্প হবে অথবা সম্ভবত মিয়ানমারের জন্য আসিয়ানের স্থিতিশীলতার নীতির সাথে আরও বেশি একীভূত হওয়ার সেরা সমাধান হবে। সম্ভবত একই সময়ে ডনাল্ড ট্রাম্প ইউএসএআইডি তহবিল কমিয়ে দিয়েছেন। সেই সাথে যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক আশ্রয় বা সুরক্ষার অধীনে বসবাসরত বার্মিজদের জন্য সাময়িক সুরক্ষা ব্যবস্থাটি বন্ধ করে দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের এই অনুপস্থিতির মূল্য আসলে কী?

স্টিভ: প্রথমে প্রক্সি ওয়ার দিয়ে শুরু করবো। আপনি আগে বার্মা অ্যাক্টের কথা উল্লেখ করেছেন, যা আমার ধারণা ২০২২ সালে এনডিএএ’র অংশ হিসেবে পাস হয়েছিল। এটি মিয়ানমারের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি কৌশল ও নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছিল। আমি মনে করি যা ঘটেছে তা হলো, বাইডেন প্রশাসন এই আইনটি পরিকল্পনা অনুযায়ী পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়নে অনিচ্ছুক ছিল।

শেষ পর্যন্ত আমি মনে করি উভয় দিক থেকেই খারাপ ফল বয়ে এনেছে। যেখানে একদিকে এমন আভাস ছিল যে যুক্তরাষ্ট্র আরও বেশি জড়িয়ে পড়বে। কিন্তু যতুটুকু সম্পদ ও সমর্থন থাকার কথা ছিল তা ছাড়াই। এবং তাই চীনে সেটা এমনভাবে পৌঁছাল যেন তাদের মনে হলো যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমার সামরিক বাহিনী ও নেপিডো প্রশাসনের বিরুদ্ধে জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে অস্ত্র ও সরঞ্জাম দিচ্ছে। আমি মনে করি এটি একটি বড় কারণ ছিল। এই বিষয়টিই একমাত্র কারণ ছিল না, অন্য একটি মূল কারণ হলো ‘অপারেশন ১০২৭’ চীনের আশার চেয়েও বেশি সফল হয়েছিল।

কিন্তু চীন-মিয়ানমার সীমান্তের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো থেকে সমর্থন সরিয়ে নেপিডো জান্তা সরকারকে সমর্থন দেওয়ার ক্ষেত্রে বার্মা অ্যাক্টেরও একটি ভূমিকা ছিল। তাই আমি মনে করি এটি সেই ঝুঁকির কথা প্রমাণ করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে ঘটে যখন সে মিয়ানমারের মতো কোনো জায়গায় আরও বেশি সম্পৃক্ত হওয়ার সংকেত দেয়। কিন্তু সেই সম্পৃক্ততায় পূর্ণ প্রতিশ্রুতি দেয় না। কারণ এটি চীনকে এমন ধারণা দেয় যে যুক্তরাষ্ট্র আরও গভীরভাবে জড়িয়ে পড়বে। সেই অনুযায়ী তাদের অবস্থান পরিবর্তন ও সমন্বয় করে নেয়। তাই আমি মনে করি সেখানে একটি বিপদ আছে।

আসিয়ানকে সম্মান দিয়েই বলছি, আমি মনে করি আসিয়ান-এর নেতারাও স্বীকার করবেন যে ‘ফাইভ-পয়েন্ট কনসেনসাস’, যা নিয়ে ২০২১ সালের এপ্রিলে অভ্যুত্থানের মাত্র কয়েক মাস পরে ঐকমত্যে আসা হয়েছিল, তার পাঁচ বছর পূর্ণ হতে চললেও সেটি মিয়ানমার নিয়ে এঙ্গেজমেন্টের একটি ভিত্তি ও কাঠামো তৈরি করার প্রত্যাশাটি পূরণ করতে পারেনি। আমি মনে করি আসিয়ান এখনও কীভাবে তাদের মিয়ানমার ইস্যুটির দিকে তাকানো উচিত তা ধরতে পারছে না।

গত কয়েক বছরের তুলনায় এখন জোটের মধ্যে বিভাজন অনেক বেশি। মিয়ানমার ইস্যুটি কীভাবে মোকাবিলা করা উচিত তা নিয়ে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মেইনল্যান্ড এবং সামুদ্রিক অঞ্চলের দেশগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার ফলে মিয়ানমারে এবং সামগ্রিকভাবে এই অঞ্চলে চীনের প্রভাবের বিরুদ্ধে একটি উল্লেখযোগ্য সম্ভাব্য ভারসাম্যকারী শক্তি হারিয়ে গেছে বলে আমি মনে করি। আমি আগেই বলেছি যে এটি কেন গুরুত্বপূর্ণ—আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা, স্ক্যাম সেন্টার এবং মাদকের কারণে।

আমার মনে হয় মিয়ানমার নিয়ে সাবধান হওয়ার এবং উদ্বিগ্ন হওয়ার কিছু আদর্শগত কারণও রয়েছে যা আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার কিছু বিষয়ের সাথে যুক্ত। কিন্তু সেই সঠিক ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া কঠিন। এবং আমি মনে করি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এটি নিয়ে হিমশিম খেতে থাকবে যেহেতু গত বছর নতুন প্রশাসন ক্ষমতায় আসার পর থেকে একটি নতুন মিয়ানমার নীতি পর্যালোচনার কাজ চলছে এবং তারা একটি নতুন নীতি স্পষ্টভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে।২০২৪ সাল জুড়ে আরাকানের বিশাল অংশের নিয়ন্ত্রণ আরাকান আর্মি নিয়ে নেওয়ার পর থেকে তাদের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে: স্টিভ রস, সিনিয়র ফেলো, স্টিমসন সেন্টার

সাহাব: রাখাইনে আসলে কী ঘটছে? তার ওপর সবচেয়ে বেশি প্রভাব কার আছে? অথবা সম্ভবত রোহিঙ্গা সংকটের এমন কোনো সমাধান কি আছে যেখানে চীন বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অথবা আসিয়ানের সক্রিয় সহায়তার প্রয়োজন নেই? মিয়ানমারের নির্বাচন কি এই চীন বা যুক্তরাষ্ট্রসহ কাউকে আরও বেশি শক্তিশালী বা কম শক্তিশালী করে তুলবে?

স্টিভ: আমি মনে করি সামগ্রিকভাবে মিয়ানমারে যেকোনো বাইরের স্টেকহোল্ডারের তুলনায় চীনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি। এবং আমি মনে করি এটি রাখাইনের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য।

কিন্তু আমি মনে করি চীনের প্রভাব প্রায়ই বাড়িয়ে বলা হয়। ভৌগোলিক দূরত্বের কারণে চীন-মিয়ানমার সীমান্তের জাতিগত গোষ্ঠীগুলোর ওপর চীনের যতটা প্রভাব রয়েছে, রাখাইনে তার প্রভাব ততটা নেই। একই সময়ে, আমি মনে করি আরাকান আর্মি জানে যে চীনের রেড লাইন কোনগুলো এবং তারা সেই সীমারেখা অতিক্রম করতে অনিচ্ছুক।

কিন্তু চীন কীভাবে এই সংকটের সমাধানের পথে আসলে একটি বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে তা বিবেচনা করাও গুরুত্বপূর্ণ বলে আমি মনে করি। আমি মনে করি গত আট বছরেরও বেশি সময়ে চীন নেপিডো-র জান্তা সরকারকে, কিংবা অভ্যুত্থানের আগে নেপিডো-র এনএলডি সরকারকে রক্ষা করার অভিপ্রায় স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করেছে। সেটি সংঘাতকে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে যেতে না দেওয়ার ইচ্ছার মধ্যেও প্রতিফলিত হয়। মিয়ানমার এবং বাংলাদেশের মধ্যে মধ্যস্থতার ক্ষেত্রে চীনের গুরুত্ব প্রদান, কিন্তু সেখানে অন্যান্য বাইরের অংশীজনকে অন্তর্ভুক্ত না করা। এমন পদক্ষেপগুলোর প্রতি প্রতিরোধ গড়ে তোলা যা সংকটের সমাধানে বা লাঘব করতে সহায়ক হতে পারতো, কিন্তু যেগুলোকে মিয়ানমারের সার্বভৌমত্বের ওপর হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখা যেতে পারে। সুতরাং আমি মনে করি চীনের প্রভাব আছে, কিন্তু তার সীমাবদ্ধতাও আছে। তবে এটি স্পষ্ট নয় যে চীন অবশ্যই সংকটের সমাধান সেইভাবে দেখতে চায় যেভাবে বাংলাদেশ চায়। যখন আপনি রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলেন, তখন এই বিষয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়াটা বেশ ইন্টারেস্টিং। আমি কয়েক বছর আগে শরণার্থী শিবিরগুলোতে ধারাবাহিক কিছু কর্মশালা চালিয়েছিলাম।

কেউ যদি প্রশ্ন করেন, এই সংঘাত নিরসনে কার সবচেয়ে বেশি প্রভাব রয়েছে বলে মনে করেন? তখন তাৎক্ষণিক উত্তর আসে—আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, জাতিসংঘ, ইইউ, যুক্তরাষ্ট্র। এবং এটি এক ধরনের স্বতঃস্ফূর্ত প্রতিক্রিয়া।

কিন্তু যখন আপনি বাস্তবে এর অর্থ কী তা বিশদভাবে বিশ্লেষণ করতে শুরু করবেন, তখন আমি মনে করি একটি অনেক বেশি সূক্ষ্ম উপলব্ধি তৈরি হয় যে প্রকৃতপক্ষে দৈনন্দিন ভিত্তিতে কী ঘটবে তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা কার হাতে।  তখন উত্তরগুলো শক্তিশালী আন্তর্জাতিক পক্ষ থেকে স্থানীয় পক্ষের দিকে সরে আসে। সেটি আরাকান আর্মি হোক, রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠী হোক বা বাংলাদেশ হোক।

এখানে সম্ভবত বাংলাদেশকে একটি একক সত্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে। যেখানে সম্ভবত বেসামরিক ও নিরাপত্তা বাহিনী এবং অন্যদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও মতামত রয়েছে। রোহিঙ্গারা নিজেরা, রোহিঙ্গা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এবং মিয়ানমার সামরিক বাহিনী—যাদের প্রভাব কয়েক বছর আগের তুলনায় এখন কম। তবে অবশ্যই সামগ্রিকভাবে সংকটের ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী এখনও একজন গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন হিসেবে রয়ে গেছে, মূলত আমি বলবো একজন ‘স্পয়লার’ হিসেবে।

তবে ‘আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়’—এর তুলনায় তারা এখনও একটি প্রধান অংশীজন।

সাহাব: মিয়ানমারকে একটি একক রাষ্ট্র হিসেবে এড়িয়ে যেতে পারি না। সুতরাং মিয়ানমারই হলো সেই আইনি সত্তা, যার সাথে আমাদের সম্পৃক্ত হতে হবে। এখন আমরা কীভাবে এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব সমাধান করবো?

স্টিভ: ২০২৪ সাল জুড়ে আরাকানের বিশাল অংশের নিয়ন্ত্রণ আরাকান আর্মি নিয়ে নেওয়ার পর থেকে তাদের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সংঘাত চালানোর সময় এবং রাখাইনের বিভিন্ন অংশ থেকে তাদের উৎখাত করার সময়। কিন্তু অবশ্যই এটি তার পরেও অব্যাহত রয়েছে। আমি মনে করি আমার বিশ্লেষণ কয়েকটি অনুমানের ওপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে।

একটি হলো রাখাইনে, বিশেষ করে উত্তর রাখাইনে আরাকান আর্মির স্থায়িত্ব এবং টিকে থাকার ক্ষমতা এমন একটি বিষয় যা আমাদের মেনে নিতে হবে। আমি অন্যদের মতো বিশ্বাস করি না যে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী রাখাইনে পূর্ণ শক্তিতে ফিরে আসবে, বিশেষ করে উত্তর রাখাইনে; যেভাবে তারা উত্তর শান স্টেট এবং মিয়ানমারের অন্যান্য অংশে অর্থবহ পাল্টা আক্রমণ চালাতে সক্ষম হয়েছে। আমি মনে করি না যে এগুলো রাখাইনে ভালো উদাহরণ।

সুতরাং এটি একটি কারণ যে...

সাহাব: আপনি দ্বিতীয়টিতে যাওয়ার আগেআপনি কেন এমন মনে করেন? আমি যদি এটিকে যুদ্ধের কৌশলের দিক থেকে বা পাল্টা আক্রমণের দিক থেকে দেখিকেবল আলোচনার খাতিরে বলছিআমি হয়তো পাল্টা যুক্তি দিয়ে বলতে পারি যে সবকিছুই নির্ভর করছে মিয়ানমারের এই তিনটি শক্তি কীভাবে একত্রিত হয় এবং যৌথভাবে পাল্টা আক্রমণে যায় তার ওপর।

স্টিভ: অবশ্যই। আমি বলবো যে মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর কৌশল—এবং এটি গত দেড় বছর ধরে চীনের সমর্থনে পরিচালিত হয়েছে—তা হলো একে একে বিভিন্ন গোষ্ঠীকে ধরাশায়ী করা। এবং এর মধ্যে বামার পিডিএফ বাহিনীও অন্তর্ভুক্ত। তবে আপনি দেখেছেন তারা এমএনডিএএ দিয়ে শুরু করেছিল। গত বছরের জানুয়ারিতে এটিই প্রথম গোষ্ঠী যারা যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছিল। টিএনএলএ তাদের অনুসরণ করেছিল।

আমরা দেখেছি মান্দালয়ে সামরিক পাল্টা আক্রমণ সফল হয়েছে, তেমনি দক্ষিণ-পূর্বে কারানি-তেও সফল হয়েছে। সুতরাং গত দেড় বছরে গতির পরিবর্তনের এই ধারাটি দেখা গেছে।

যুক্তির খাতিরে, আপনি দেশের অন্যান্য অংশ থেকে রাখাইনে সামরিক বাহিনীর পুনঃমোতায়েন দেখতে পারেন। দেশের অন্যান্য অংশ থেকে রাখাইনে নিয়মিতভাবে স্বল্প সংখ্যায় সৈন্য চলাচল হয়েছে এবং তা রাখাইন এবং রাখাইন-ইয়োমা পাহাড়ের পূর্ব দিকে উভয় স্থানেই হয়েছে, যেখানে আরাকান আর্মি গত এক বছর বা তার বেশি সময় ধরে মাগওয়ে, এবং সাগাইং, এবং বাগোতে অগ্রসর হয়েছে, দুঃখিত, মাগওয়ে, বাগো এবং ইরাবতী-তে।

যেখানে আমি কিছুটা সন্দিহান তা হলো- এক. আরাকান আর্মি কতটা সুসংহত হয়েছে; দুই. এএ-র যে ভৌগোলিক সুবিধা রয়েছে—অর্থাৎ এই পর্বতমালা যা রাজ্যের বেশিরভাগ অংশকে দেশের বাকি অংশ থেকে আলাদা করে রেখেছে, তিন. রাখাইন জনগোষ্ঠীর মধ্যে এএ-র যে জনসমর্থন রয়েছে, যা উত্তর শান রাজ্যের কিছু এলাকায় একইভাবে মেলেনি, যেখানে এমএনডিএ এবং টিএনএলএ এমন অঞ্চলগুলোতে অগ্রসর হয়েছিল যেখানে তারা ভিন্ন জাতিসত্তার জনসংখ্যাকে নিয়ন্ত্রণ করছিল। এবং গত দেড় বছরে, উল্লেখযোগ্য বিমান হামলা, এএ-কে পিছু হঠানোর উল্লেখযোগ্য প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, বিশেষ করে কিছু সীমান্তবর্তী এলাকায়, যার মধ্যে চাউপিউ অন্তর্ভুক্ত, তারা উল্লেখযোগ্য কোনো অগ্রগতি করতে পারেনি।

আমি মনে করি বিশেষ করে উত্তর রাখাইনে, যেখানে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর বর্তমানে বলতে গেলে আর কোনো উপস্থিতিই নেই, একটি গুরুতর পাল্টা আক্রমণ চালানোর ক্ষমতা, আমি মনে করি তাদের জন্য সেই অত্যন্ত দুর্গম ভূখণ্ডে যাওয়া এবং একটি বিদ্বেষপূর্ণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে অঞ্চল পুনর্দখল করা ও তা ধরে রাখা অত্যন্ত কঠিন একটি কাজ হবে।

সাহাব: এখানে জবাবদিহিতার বিষয়টি চলে আসে। তাই কে আরাকান আর্মিকে জবাবদিহিতার আওতায় আনবে, যদিও তাদের জনম্যান্ডেট রয়েছে? জনম্যান্ডেট থাকার মানে এই নয় যে আপনি স্বৈরাচারী হবেন না। কে তাদের জবাবদিহি করতে যাচ্ছে? তারা কি ভবিষ্যতে নিজেদের একটি জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক দলে রূপান্তরিত করতে যাচ্ছে? নাকি তারা নিজেদের একটি সার্বভৌম দেশ বা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করতে যাচ্ছে?

স্টিভ: অবশ্যই। আগের এএ-র বিরুদ্ধে যে নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে এবং প্রত্যাবাসনের বিষয়ে তাদের সাথে যুক্ত হওয়ার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি শেষ করতে আমি সংক্ষেপে কিছু বলে নেই। এএ-র স্থায়িত্বের পাশাপাশি, আমি মনে করি সম্ভাব্য বিকল্পগুলোর কথা—আমি ব্যাখ্যা করেছি কেন আমি মনে করি না যে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর ফিরে আসার সম্ভাবনা আছে। এবং তার ওপর, তারা যদি ফিরেও আসে, আমি মনে করি তারা রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে অন্তত সমানভাবেই প্রতিকূল হবে।

এটি হবে এমন একটি অঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করার সময় যেখানে বসবাসকারী জনসংখ্যা তাদের প্রতি বিদ্বেষপূর্ণ। অন্য একটি সম্ভাব্য দৃশ্যপট হলো রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর। আমি নিকট থেকে মধ্য মেয়াদে তাদের উত্তর রাখাইনে আরাকান আর্মির আঞ্চলিক নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য হুমকি হিসেবে দেখছি না, বরং ভবিষ্যতে প্রত্যাবর্তনের পথে একটি বাধা হিসেবে দেখছি কারণ তারা বাংলাদেশের ক্যাম্পগুলোকে রোহিঙ্গাদের জন্য কম নিরাপদ করে তুলছে। তারা রাখাইনে সামাজিক সংহতি নষ্ট করছে। তারা বাংলাদেশ-রাখাইন সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে মিয়ানমারে সামগ্রিকভাবে যে নেতিবাচক ধারণা রয়েছে, সেগুলোকে আরও উসকে দিচ্ছে।

তাই সেই বিকল্প দৃশ্যপটগুলো আমি মনে করি বর্তমানের চেয়েও সম্ভবত বেশি সমস্যাজনক। যদিও বর্তমানটিই সমস্যাজনক। তবে এএ এবং জবাবদিহিতা ও স্বীকৃতির বিষয়ে আপনার প্রশ্নে আসি, স্বাধীনতার প্রশ্নে, আমি এএ-কে স্বাধীনতার ঘোষণা দেওয়ার চেষ্টা করবে বলে মনে করি না। আমি মনে করি তারা স্বীকার করে যে এটি তাদের জন্য একটি সমস্যাজনক অবস্থান।

এটি অনেক অসুবিধা নিয়ে আসে এবং উল্লেখযোগ্য কোনো সুবিধা বয়ে আনে না। তাই আমি মনে করি নিকট থেকে মধ্য মেয়াদে, তারা সেই দিকে যাবে এমন সম্ভাবনা খুব কম। আমি মনে করি তারা বেশ স্পষ্টভাবে বলেছে যে তারা একটি উল্লেখযোগ্য মাত্রার স্বায়ত্তশাসন চায়, যা মিয়ানমারের উত্তর-পূর্বে উয়া-রা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে।

আমার মতে এটিই লক্ষ্য বলে মনে হয়, যদিও রাজ্যের রাজধানী সিতওয়ে, যেখানে ভারতীয় নির্মিত বন্দর আছে, এবং চাওপিউ, যেখানে চীনের তেল ও গ্যাস পাইপলাইনগুলো শুরু হয়েছে এবং একটি বন্দর প্রকল্পের স্থান, এবং অবশেষে চাওপিউ থেকে মান্দালয় এবং সেখান থেকে ইউনান পর্যন্ত একটি রেল প্রকল্প—এসবের ওপর সামরিক বাহিনীর অব্যাহত নিয়ন্ত্রণের কারণে এটি জটিল। তাই আমি মনে করি এই ফ্যাক্টরগুলো কিছু ভূ-রাজনৈতিক ব্যাপারকে প্রভাবিত করে। আইডিপি এবং রাখাইন থেকে যারা বাস্তুচ্যুত হয়েছে তাদের ইস্যুতে, আমি মনে করি সামরিক বাহিনী এবং এএ-র মধ্যে এখানে একটি পার্থক্য টানা আবার গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর থেকে মিয়ানমারে এখন ৩৪ লক্ষ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত অবস্থায় আছে। মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীই সেই বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার জন্য দায়ী যারা এখন বাংলাদেশে শরণার্থী। ২০২৩ সালের শেষ দিক থেকে প্রায় দেড় লাখ রোহিঙ্গা যারা বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে, তাদের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ তখন সীমান্ত পার হয়েছে যখন রাখাইনে সক্রিয় যুদ্ধ চলছিল, যা রাখাইন থেকে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের ক্ষুদ্র পরিসরে চলমান বাস্তুচ্যুত অবস্থাকে অস্বীকার করার জন্য নয়, বরং কেবল সেই পার্থক্যটি তুলে ধরার জন্য। জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে, আমি মনে করি এএ-র একটি শাসনতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

আমি মনে করি রাখাইন জনগোষ্ঠীর জন্য তারা সামরিকভাবে যা অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে তার কারণে তাদের হাতে বেশ খানিকটা সুযোগ রয়েছে। আমি মনে করি ম্রা’উ দখল করার প্রতীকী মূল্য, যা আরাকান রাজ্যের রাজধানী ছিল, তাকে খাটো করে দেখা উচিত নয়। আমি মনে করি এটি তাদের এবং রাখাইন জনগোষ্ঠীর জন্য একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রতীকী বিজয়, এবং এটি তাদের নিজেদের মতো শাসন করার জন্য কিছুটা বেশি অবকাশ দেয় যা অন্যথায় হতো না।

কিন্তু রাখাইন কয়েক বছর ধরে মানবিক অবরোধের মধ্যে রয়েছে। গালফে যুদ্ধের কারণে সারা দেশে গ্যাসের দাম বাড়ছে, তবে বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যে, সিতওয়েতে রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে যে বেসামরিক নাগরিকদের জন্য জ্বালানির দাম প্রতি লিটারে ২০ ডলার পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা অত্যন্ত চড়া দাম। রাখাইন রাজ্যে কেবল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর জন্যই নয়, যদিও আমি বলবো যে তারা অন্যদের চেয়ে বেশি তীব্রভাবে ভুগছে, বরং রাখাইন এবং ম্রাউক এবং চিন ও অন্যান্য জাতিগত সংখ্যালঘুদের জন্যও অনেক প্রকৃত ভোগান্তি রয়েছে।

এএ-কে এখন এটা দেখাতে হবে যে তারা তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে সামাজিক সেবা, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা প্রদান করতে পারে, তারা বিচার পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে পারে এবং গত পাঁচ-ছয় বছরে যেসব প্রাথমিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে এবং ক্রমবর্ধমানভাবে সুসংহত হয়েছে, সেগুলো দিয়ে তারা স্থানীয় জনগণের চাওয়া ও প্রয়োজন মেটাতে পারে। এবং যদি তা না হয়, আমি মনে করি কেবল রোহিঙ্গা সম্প্রদায় এবং কেবল অ-রাখাইন সম্প্রদায় নয়, বরং রাখাইন সম্প্রদায় থেকেও কিছু পাল্টা প্রতিক্রিয়া শুরু হবে।

গত কয়েক বছরে আপনি মিয়ানমার সীমান্তের ওপারের বিষয়গুলোয় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখেছেন: স্টিভ রস, সিনিয়র ফেলো, স্টিমসন সেন্টার

সাহাব: বাংলাদেশের কূটনীতির সমালোচনা আছে। অনেকে বলেন, বাংলাদেশের প্রকৃত কৌশলের অভাব রয়েছে। বাংলাদেশের প্রত্যাবাসন নিয়ে ভাবতে হবে, তবে রোহিঙ্গাদের মতে এটিকে বাস্তবসম্মতও হতে হবে। বাংলাদেশ গত ১০ বছরে কূটনৈতিকভাবে আসলে কী অর্জন করেছে তার দিকে তাকালে, তা আমাদের বুঝতে সাহায্য করেআমি আপনার মতামত চাচ্ছি যে আমাদের কি কোনো সুসঙ্গত কৌশল ছিল?

স্টিভ: এই সমস্যাটি কতটা কঠিন এবং চ্যালেঞ্জের- সেই মাত্রা শুরুতেই স্বীকার করা জরুরি বলে মনে করি। সুতরাং এই ধরনের বিশাল মাত্রার একটি চ্যালেঞ্জের নিকটবর্তী সমাধান যে কোনো সরকারের কাছ থেকে আশা করা মানেই প্রত্যাশাকে একটি অবাস্তব পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া। ২০১৭ সালের সংকটের প্রাথমিক দিনগুলোতে বা এই সংকটের এই পর্যায়ে, একটি সুসঙ্গত কৌশল ছিল, তবে সেটি সমস্যাযুক্ত ছিল।

কৌশলটি ছিল ১৯৯০-এর দশকের প্রত্যাবাসন পদ্ধতিগুলোর পুনরাবৃত্তির চেষ্টা। ১৯৯০-এর দশকের আদলেই প্রত্যাবাসন চালিয়ে যাওয়া, যখন অনুপ্রবেশকারীদের সংখ্যা ছিল দুই থেকে আড়াই লক্ষ, যা বর্তমান সংখ্যার এক-তৃতীয়াংশেরও কম। তাই আমি মনে করি সমস্যার মাত্রা, চ্যালেঞ্জ এবং মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর ভিন্ন ক্ষমতা কাঠামো, চীন এবং মিয়ানমারের প্রতি চীনের সমর্থন—সবই সেই সময়ের সেই পদ্ধতিতে ভূমিকা পালন করেছিল।

তারপর থেকে, আমি বলবো যে অবশ্যই এমন কিছু লোক দেখানো কাজের উপাদান ছিল, যা আমার মনে হয় ঘরোয়া দর্শকদের সন্তুষ্ট করতে এবং দীর্ঘস্থায়ী সংকটের প্রকৃতি সম্পর্কে বাংলাদেশের উদ্বেগগুলোকে গুরুত্ব দিতে এবং অভ্যন্তরীণ কিছু উদ্বেগকে শান্ত করতে করা হয়েছিল। তবে আমি মনে করি অন্যান্য প্রচেষ্টাগুলো আরও বাস্তবিক। এবং আমি মনে করি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ক্ষেত্রে, তারা দুটি বিশেষ বিষয়ে কৃতিত্বের দাবিদার।

এএ-র সাথে সরাসরি যুক্ত হওয়ার ট্যাবু ভেঙে ফেলা। এবং আমি মনে করি এটি নতুন সরকারকে এমনভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে যা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মতো একই রাজনৈতিক মূল্য ছাড়াই সম্ভব। অন্যটি হলো রোহিঙ্গা সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের ভূমিকাকে উপরে ওঠানো এবং রোহিঙ্গাদের আলোচনার টেবিলে এমনভাবে স্থান দেওয়া যা আগে দেওয়া হয়নি।

তারা সঠিক প্রতিনিধি ছিল কিনা বা ক্যাম্পে রোহিঙ্গা সুশীল সমাজ এবং রাজনৈতিক নেতৃত্বের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা আছে কিনা তা নিয়ে আমরা বিতর্ক করতে পারি। তবে সেটি নিজেই পূর্ববর্তী সরকারগুলোর তুলনায় একটি পরিবর্তন ছিল। আমি মনে করি সঠিক দিকে একটি পদক্ষেপ। আমি মনে করি রোহিঙ্গাদের টেবিলে থাকা এবং এএ-র সাথে সম্পৃক্ত হওয়া—এই উভয় উপাদানই এটি কীভাবে সামনে এগোবে তার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

তবে আমি বলব যে চ্যালেঞ্জের আকারের কারণে একটি সুসংগত কৌশল তৈরি করা খুব কঠিন ছিল। এবং গত কয়েক বছরে আপনি মিয়ানমার সীমান্তের ওপারের বিষয়গুলোয় বড় ধরনের পরিবর্তন দেখেছেন। ২০২১ সালে সামরিক অভ্যুত্থান হয়েছে। ২০১৮ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত রাখাইনে দুটি ভিন্ন পর্যায়ে যুদ্ধ ছড়াতে দেখা গেছে। সেই সময় এএ এবং সামরিক বাহিনীর মধ্যে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ সংঘাত হয়েছিল। যা প্রায়ই উপেক্ষা করা হয়। তারপর ২০২৩ সালের শেষের দিকে এএ রাজ্যের বিশাল অংশ দখল করে নেওয়ার সাথে সাথে আবারও সংঘাত শুরু হয়। সুতরাং মিয়ানমার পক্ষ থেকে আসা এই বিশাল প্রতিধ্বনিগুলোর সাথে খাপ খাইয়ে নেওয়া বাংলাদেশের জন্য একটি উল্লেখযোগ্য এবং বোধগম্য চ্যালেঞ্জ ছিল।

সাহাব: আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ে একটি বিশাল বয়ান প্রচলিত আছে­- বাংলাদেশের নিরাপত্তা সংস্থাগুলো রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্য থেকে আসা সশস্ত্র আন্দোলনকে উৎসাহিত করেছে। তাই যদি হয়, তাহলে কেন বাংলাদেশ সরকার আরাকান আর্মির সাথে বসছে? সুতরাং আমি বলছি না যে সরকার-সরকার, কিন্তু মূলত আমি বলতে চাচ্ছি যে বাংলাদেশি সংস্থাগুলো আরাকান আর্মির সাথে বৃহত্তর যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করছে।

স্টিভ: আমি হয়তো রাখাইন পক্ষ থেকে শুরু করবো এবং কেন্দ্রীয় ও উত্তর রাখাইনের মধ্যে কিছু পার্থক্য তুলে ধরবো। আমি মনে করি কেন্দ্রীয় এবং উত্তর রাখাইনে রোহিঙ্গাদের মধ্যে সব সময় সাংস্কৃতিক পার্থক্য ছিল। কেন্দ্রীয় রাখাইনে তারা সাধারণত জনসংখ্যার প্রায় ২০ থেকে ৪০ শতাংশ ছিল।

এটি ছিল ২০১৭-পূর্ব পরিস্থিতি। এর ফলে, তাদের উত্তর রাখাইনের রোহিঙ্গাদের মতো ততটা হুমকি হিসেবে দেখা হতো না, যেখানে তারা জনসংখ্যার ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ ছিল। তারা কেন্দ্রীয় রাখাইনে আরও ভালোভাবে মিশে ছিল এবং উত্তর রাখাইনের রোহিঙ্গাদের তুলনায় ধর্মীয় ও সামাজিকভাবে কম রক্ষণশীল হিসেবে বিবেচিত হতো। আমি মনে করি গত কয়েক বছরের একটি মূল বিকাশ হলো রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উত্থান। কেন্দ্রীয় রাখাইনে সেটি কোনো ফ্যাক্টর ছিল না। এর ফলে, আমি মনে করি কেন্দ্রীয় রাখাইনে রাখাইন এবং রোহিঙ্গাদের মধ্যে তুলনামূলকভাবে ভালো সম্পর্ক দেখা যায়।

উত্তর রাখাইনের তুলনায় কেন্দ্রীয় রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য কিছুটা বেশি সুযোগ দেওয়া হয়। আমি মনে করি উত্তর দিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। আমি মনে করি, একটি যুক্তি দেয়া যায় যে সেখানে আরাকান আর্মির পক্ষ থেকে একটি প্রকৃত হুমকির ধারণা রয়েছে।

গত ৬ থেকে ১২ মাসে, এবং বিশেষ করে ২০২৪ সালের সংঘাতের সময়, যখন ক্যাম্পগুলো থেকে সামরিক বাহিনী এবং এএ-র বিরুদ্ধে এবং সামরিক বাহিনীর পক্ষে লড়াই করার জন্য লোক নিয়োগ করা হচ্ছিল, আপনি জানেন, এটি একটি দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করেছিল যে রোহিঙ্গারা এএ-র প্রতি বৈরি এবং তাদের অবাধে যাতায়াতের ক্ষমতা একটি হুমকি। এবং এটি এমন একটি ডাইনামিক যা আমার মনে হয় দ্রুত ছড়িয়ে পড়েছে। আমি মনে করি আপনি এই যুক্তিও দিতে পারেন যে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর উপস্থিতিকে অন্যান্য গোষ্ঠীর তুলনায় রোহিঙ্গাদের সাথে ভিন্ন বা খারাপ আচরণ নিয়ে আলোচনা এড়ানোর একটি অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা হয়।

তাই, হ্যাঁ, আমি বলবো যে সীমান্তের বিষয়গুলো বেশ জটিল। আপনি জানেন, আমরা গত ছয় বা ১২ মাসে আরসা-র মতো গোষ্ঠীগুলোর হামলার হার বাড়তে দেখেছি। আপনি জানেন, সেটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে হুমকি হিসেবে দেখার দৃষ্টিকোণে ভূমিকা রাখে এবং উত্তর রাখাইনে যেসব রোহিঙ্গা এখনও আছে এবং যারা ফিরে আসতে চায় তাদের জন্য পরিস্থিতি জটিল করে তোলে। সেই সব কারণে যা আমি আগে উল্লেখ করেছি, কীভাবে এটি রাখাইন-রোহিঙ্গা সম্পর্ক, রাখাইন-বাংলাদেশ সম্পর্ক এবং মিয়ানমারে সামগ্রিকভাবে রোহিঙ্গাদের কীভাবে দেখা হয় তার ওপর প্রভাব ফেলে। বিষয়টিকে একটু বৃহত্তর পরিসরে দেখলে, আমি মনে করি এটি বলা প্রয়োজন যে মিয়ানমারে বর্তমানে এএ-কে প্রতিরোধকারীদের অগ্রভাগে দেখা হয়। এটি বর্তমানে সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করা বৃহত্তম সশস্ত্র গোষ্ঠী।

মিয়ানমারে অঞ্চল এবং বৃহত্তর জনসংখ্যার ওপর অন্য যে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর চেয়ে বেশি নিয়ন্ত্রণ করে। এবং সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সামনের সারিতে থেকে লড়াই করা সেই গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে রোহিঙ্গাদের লড়াই করা মিয়ানমারে সামগ্রিকভাবে রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে ধারণাকে আঘাত করে। সুতরাং, আপনি জানেন, আমি মনে করি এএ-কে আরও প্রমাণ করতে হবে যে তারা তাদের প্রশাসনে রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্ত করবে, বিশেষ করে উত্তর রাখাইনে—চলাচলের স্বাধীনতা নিশ্চিত করবে, সামাজিক সেবা এবং জীবনযাত্রার সুযোগ নিশ্চিত করবে।

ভারপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ হিসেবে, এই মৌলিক অধিকারগুলো প্রদানের প্রাথমিক দায়িত্ব তাদেরই।

সাহাব: প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত প্রতিটি আলোচনা শেষ পর্যন্ত একটি খুব অস্বস্তিকর প্রশ্নে এসে পৌঁছায়। অনেক সময় কূটনৈতিক আলোচনায় ক্রমাগত সেটি এড়িয়ে যাওয়া হয়। আরাকান আর্মি কি রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসিত হওয়ার পর তাদের মধ্যে অথবা বৌদ্ধদের সাথে কোনো ধরনের সহাবস্থান ব্যবস্থা তৈরি করবে?


স্টিভ: রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে কাঠামোগত সহিংসতাকে ‘রাষ্ট্র-উৎপাদিত’ হিসেবে অভিহিত করার বিষয়টিতে একটি পিন আটকে রাখতে চাই। কারণ আমি মনে করি এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ফ্রেমওয়ার্ক; যা বর্তমান প্রেক্ষাপটে মাঝে মাঝে হারিয়ে যায়, আর তা হলো—রোহিঙ্গাদের ‘পর’ করে দেওয়ার এই প্রক্রিয়াটি কয়েক দশক ধরে ঘটেছে এবং এর নেতৃত্ব দিয়েছে ও পরিচালনা করেছে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। তাই আমি মনে করে এটি স্বীকার করা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, সেই পক্ষটি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কোনো নির্ভরযোগ্য অংশীদার হতে পারে না।

তবে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রশ্নটি নিয়ে আমি বলবো, আমি অবশ্যই আশা করি এটি বাস্তবসম্মত। আর এটি এমন একটি বিষয় যেখানে আমি চিরন্তন আশাবাদী। আমি মনে করি, এই ধরণের কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করতে হলে আপনাকে আশাবাদী হতেই হবে।

মিয়ানমার এবং রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের জন্য এটি সত্যিই একটি বিশাল ক্ষতি হবে যদি এটি অর্জন করা না যায়। এবং মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর যে আকাঙ্ক্ষা - রোহিঙ্গাদের রাখাইন থেকে সম্পূর্ণ নির্মূল করা - তা যদি সফল হয়। তবে মিয়ানমারে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান বাস্তব হওয়ার পথ এখনও অনেক বাকি।

এবং সেখানে পৌঁছাতে অনেক দূর যেতে হবে। আমি মনে করি প্রয়োজনীয় কিছু উপাদান হলো- শুরুতে উভয়পক্ষের মধ্যে একে অপরের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ার মানসিকতা থাকতে হবে, এবং সেটা সদিচ্ছার সাথে। রাখাইন এবং বাংলাদেশ উভয় স্থানেই প্রকৃত, বৈধ এবং প্রতিনিধিত্বশীল রোহিঙ্গা সুশীল সমাজকর্মীদের বিকাশের জন্য আরও সুযোগ থাকা প্রয়োজন।

২০১৭ থেকে ২০১৯ সালের মধ্যে একটি সময় ছিল যখন আমি মনে করি বাংলাদেশে সেই স্পেস ছিল। আমার মনে হয় ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে তারপর থেকে সেই জায়গাটি কিছুটা সংকুচিত হয়েছে। এর অর্থ হলো, মানুষ যেভাবে তাদের কণ্ঠস্বর তুলতে চায়, সেভাবে হয়তো তারা পারছে না বা তুলতে চাচ্ছে না। আমি মনে করি রোহিঙ্গা গোষ্ঠীগুলোর কর্মকাণ্ডের ওপর কিছু বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। তবে সাধারণভাবে, বৈধ রোহিঙ্গা সুশীল সমাজকর্মীদের বিকাশের জন্য আরও সুযোগ থাকা দরকার। এবং সীমান্তের উভয় পাশে রোহিঙ্গা সশস্ত্র যোদ্ধাদের সুযোগ সংকুচিত করা দরকার।

আমি মনে করি আরাকান আর্মি এবং রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মধ্যে যে শক্তির ভারসাম্যহীনতা রয়েছে, তা মোকাবিলার জন্য একটি উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন। এবং আমাদের এটি স্বীকার করতে হবে যে সেই শক্তির ভারসাম্যহীনতা আছে। আমি মনে করি একটি “ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন” মেকানিজম সম্ভবত প্রয়োজন।

একটি শুরুর জায়গা হতে পারে রাখাইন এবং রোহিঙ্গা উভয়ই সামরিক বাহিনীর অধীনে কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, অভিজ্ঞতাগুলো। এটি একটি উপযুক্ত শুরুর জায়গা হতে পারে। আমি মনে করি সেই সব কর্মীদের জন্য আরও সুযোগ থাকা প্রয়োজন যারা শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান অর্জন করতে চায়।

আমি মনে করি এটি এএ-র ওপরও বর্তায় - এটি স্বীকার করা যে তারা একা এটা করতে পারবে না। যদিও তারা কিছুটা চেষ্টা করছে। আপনি এএ-কে রোহিঙ্গাদের সাথে ইফতার ও ঈদ উদযাপন করতে দেখছেন এবং সামাজিক সংহতির জন্য ফুটবল ম্যাচ ও এই জাতীয় অন্যান্য জিনিস করতে দেখছেন।

কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। যেখানে আমি মনে করি ক্যাম্পের নিরাপত্তা পরিস্থিতি এমন যে, সেখানে বর্তমানে রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বয়ানের বিপরীতে কোনো শক্তিশালী পাল্টা বয়ান নেই। কারণ সেই পাল্টা বয়ানটি স্পষ্টভাবে বলার মতো পর্যাপ্ত জায়গা এবং নিরাপত্তা সেখানে নেই।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, আমি মনে করি সুশীল সমাজ এবং এমন কর্মকাণ্ডের জন্য আরও সুযোগ থাকা দরকার যা সম্প্রদায়গুলোর মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে উৎসাহিত করবে। এটি নিশ্চিতভাবেই একটি মধ্য থেকে দীর্ঘমেয়াদী প্রচেষ্টা।

সাহাব: যে শব্দটি ব্যবহার করেছেন'শক্তির ভারসাম্যহীনতা, সেটি নিয়ে কিছুটা কথা বলা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারপর আপনি ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন ব্যবস্থার কথাও বলেছেন। আমি মনে করি এই দুটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর যদি আমাদের লক্ষ্য হয় এই দুটি সত্তার মধ্যে এক ধরনের সহাবস্থান। আমরা রোহিঙ্গাদের স্কিল দিতে ইচ্ছুক। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে একটি বিশাল উদ্বেগও রয়েছে। কারণ আমাদের শ্রমবাজারে ইতিমধ্যে ২০ লাখেরও বেশি মানুষ অন্তর্ভুক্ত আছে। বেকারত্বের হারও অত্যন্ত বেশি। তাহলে আমরা কীভাবে তাদের কর্মসংস্থান দেব বা তারা এই দক্ষতা দিয়ে কী করবে? এমনকি অ্যামনেস্টি বারবার বলেছে যে প্রত্যাবাসন হলেও পরিস্থিতি কারো ফিরে যাওয়ার জন্য অনুকূল নয়। কেউ যদি মিয়ানমারের ভূমি আইনের দিকে তাকানএকবার আপনি জায়গা খালি করে দিলে রোহিঙ্গারা কি তা ফিরে পাবে, মানে সম্পত্তি কি তাদের ফিরিয়ে দেওয়া হবে? তাই কোন শর্তে, কোন গ্যারান্টি, কোন সময়সীমা এবং কোন পক্ষকে কী করতে হবে যাতে এটি কেবল আকাঙ্ক্ষা বা কাল্পনিক এবং তাত্ত্বিক না হয়ে বাস্তব হয়ে ওঠে?

স্টিভ: এটা মাল্টি-বিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন। আমি মনে করি প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া যখন শুরু হবে, সেটা হবে আনুষ্ঠানিকভাবে। আপনি জানেন, যদি রাখাইন থেকে এমন সংকেত আসে যে অল্প সংখ্যায় রোহিঙ্গারা ফিরে যেতে পারছে, তাদের জীবনযাত্রার সুযোগ রয়েছে, তাদের হয়তো আদি জমিতে প্রবেশের সুযোগ রয়েছে, সামাজিক সেবা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে, তাদের চলাফেরার কিছুটা স্বাধীনতা রয়েছে।

যদি এই ধরনের কিছু সংকেত পাঠানো হয়, তবে আমি মনে করি বর্তমানে ক্যাম্পে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক রোহিঙ্গা আছেন। নিজেদের এবং তাদের পরিবার নিয়ে ক্যাম্পে চিরকাল থাকার চেয়ে ভালো বিকল্প হিসেবে দেখবেন। রাখাইন এবং রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থার সংকট এবং আস্থার ঘাটতি অব্যাহত রয়েছে। যে কোনো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এ সংকট মোকাবিলা করা প্রয়োজন। সেটা অনানুষ্ঠানিক হোক বা অন্য কিছু। শুরুর জায়গাটি সম্ভবত অনানুষ্ঠানিক হবে। শুরু হবে রাখাইনে রয়ে যাওয়া রোহিঙ্গাদের সাথে কেমন আচরণ করা হচ্ছে সেই সংকেতের মাধ্যমে। কেন্দ্রীয় বা উত্তর রাখাইন উভয় ক্ষেত্রেই এই আচরণ সংকেত দেবে।

একটি বিষয় চ্যালেঞ্জিং হতে পারে। একটি হলো আদি বাসস্থানে প্রত্যাবর্তন। অনেক ক্ষেত্রে গ্রামগুলোর এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই। ২০১৬ এবং ২০১৭ সালের ক্লিয়ারেন্স অপারেশনের পর কিছু গ্রাম মিয়ানমার সামরিক বাহিনী বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দিয়েছিল। কিছু গ্রাম জঙ্গল দখল করে নিয়েছে। কিছু গ্রাম বা ঘরবাড়িতে অন্যান্য জাতিগোষ্ঠী বসবাস শুরু করেছে।

তাই মানুষ কোথায় ফিরে যেতে পারে, সেই প্রশ্নটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এই মুহূর্তে সেসব প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই। অন্য যে প্রশ্নটি আমি মনে করি বিশেষভাবে সংবেদনশীল, তা হলো নাগরিকত্বের প্রশ্ন। এমন কিছু যা আমরা আজ এখনও আলোচনা করিনি, তবে এটি রোহিঙ্গাদের ঘিরে থাকা অনেক বিষয়ের মূলে রয়েছে।

১৯৮০-র দশকে তাদের নাগরিকত্ব কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। সময়ের সাথে সাথে তাদের অধিকার ক্রমশ হ্রাস করা হয়েছিল। এটি অনেক রোহিঙ্গার মূল দাবি, কারো কারো জন্য এটি ফিরে যাওয়ার পূর্বশর্ত। আমি মনে করি সেই সমস্যাটি কীভাবে সমাধান করা যায় তা নিয়ে একটি প্রকৃত প্রশ্ন রয়েছে। যখন আপনার কাছে আরাকান আর্মির মতো একটি অরাষ্ট্রীয় সশস্ত্র গোষ্ঠী রাখাইনের বা রাখাইনের বেশিরভাগ অঞ্চলের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। আপনি যখন নেপিডোতে একটি সামরিক বা আধা-বেসামরিক সরকার দেখেন, যারা রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার বিষয়ে আসলে কোনো আগ্রহ দেখায়নি, তখন আপনি কীভাবে এটি সমাধান করবেন? ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর এনইউজি গঠিত হলেও তারা এই ইস্যুতে কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। একজন সাধারণ রোহিঙ্গার কাছে বাস্তবে যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো নাগরিকত্ব যে অধিকারগুলো দেয় সেগুলোর বাস্তবায়ন। আর এটি এমন কিছু যা আরাকান আর্মি যদি চায়, তবে বর্তমানে রাখাইনে থাকা এবং যারা ফিরে যেতে পারে সেই রোহিঙ্গাদের দিতে পারে, এমনকি তা আনুষ্ঠানিক নাগরিকত্ব প্রদানের চেয়ে কম কিছু হলেও।

সাহাব: যদি আপনি এবং আমি কোনো রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বা রাখাইনে বা হয়তো কোনো সিচুয়েশন রুমে বসে থাকিমানে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে, আঞ্চলিক সম্প্রদায়কে- যারা এই মুহূর্তে মিয়ানমার ইস্যুতে কাজ করছেন তাদের প্রতি আপনার সুপারিশগুলো কী হবে?

স্টিভ: তাহলে প্রশ্ন আসে, এই সংকটকে প্রভাবিত করার সবচেয়ে বেশি ক্ষমতা কার আছে? সেখানে আমার উত্তর হলো, যেসব পক্ষ মাঠের সবচেয়ে কাছাকাছি। তাই এই ক্ষেত্রে, আমি মনে করি তারা হলো- রোহিঙ্গা, এএ এবং বাংলাদেশ।

এরাই আসলে সেই মূল অংশীদার যাদের এখানে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ তৈরি করার ক্ষমতা রয়েছে। আমি মনে করি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অন্যান্য অংশীদাররা, সম্ভবত মিয়ানমারে এবং অন্য কোথাও, একটি সহায়ক ভূমিকা পালন করতে পারে। তবে সমস্যা এবং চ্যালেঞ্জের সবচেয়ে কাছাকাছি থাকা পক্ষগুলোকেই সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথটি বের করতে হবে।

বাংলাদেশ পক্ষের জন্য আমি যা পরামর্শ দেব তা হলো, এই স্বীকৃতি দেওয়া যে প্রত্যাবাসনের স্বল্পমেয়াদী লক্ষ্য, যা গত সাড়ে আট বছর ধরে খুব সামান্য সাফল্যে অনুসরণ করা হয়েছে, তা এখনও একটি উদ্দেশ্য হওয়া উচিত - রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন বাস্তবায়ন করা। কিন্তু একে মধ্যমেয়াদী সমাধানগুলোর সাথে আরও ভালোভাবে মেলাতে হবে যা সেই প্রত্যাবাসনকে রাখাইনের ভারপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের কাছে আরও আকর্ষণীয় এবং আরও টেকসই করে তুলবে। এর জন্য কয়েকটি মূল উপাদান রয়েছে। আপনি আগে তার একটির কথা উল্লেখ করেছেন, দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশ পক্ষের উদারতা। কিন্তু প্রশ্ন হলো যে বাংলাদেশের নিজস্ব শ্রমশক্তির ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার প্রেক্ষিতে এটি কোথায় গিয়ে ঠেকবে।

আমি মনে করি রাখাইনের অর্থনৈতিক শূন্যস্থানগুলোর সাথে রোহিঙ্গারা যেসব দক্ষতা নিয়ে আসতে পারে সেগুলোর সমন্বয় করার জন্য সম্ভবত যথেষ্ট কাজ করা হয়নি। এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে আমি মনে করি কিছু কাজ করা যেতে পারে। আমি মনে করি কক্সবাজারে ইতিমধ্যে বিদ্যমান অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিগুলোর দিকে নজর দেওয়া এবং সম্ভবত ক্যাম্পগুলোর ভেতরে ইতিমধ্যে বিদ্যমান অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিগুলো থেকে শুরু করা এবং সেগুলোকে নিয়মিত করার উপায়গুলো খোঁজা।

আমি মনে করি শিক্ষা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এবং এটি এমন একটি ক্ষেত্র যা তহবিল কমানোর ফলে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিন্তু যেখানে বিনিয়োগের প্রয়োজন রয়েছে এবং সম্ভবত কিছু প্রযুক্তিগত সরঞ্জাম রয়েছে যা এটিকে আরও সক্ষম করতে সাহায্য করে।

তা দূরশিক্ষণ হোক বা কৃত্তিম বুদ্ধিমত্তার উদ্ভাবন হোক। কিন্তু এটি এমন একটি ক্ষেত্র যেখানে আমি মনে করি কিছু উন্নয়ন প্রয়োজন। আমরা সুশীল সমাজের সুযোগের ইস্যুটি আলোচনা করেছি।

আমি মনে করি এটি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আমার একটি বিশেষ পছন্দের ইস্যু আমি বলবো তা হলো - বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে স্থানীয়করণ ইস্যুটিকে কীভাবে দেখা হয়। বাংলাদেশে আমার অভিজ্ঞতা অনুযায়ী এটিকে এমন কিছু হিসেবে দেখা হয় যা কেবল আন্তর্জাতিক এনজিও থেকে বাংলাদেশি এনজিওগুলোতে স্থানীয়করণের ওপর ফোকাস করে।

এখানে স্থানীয়করণকে যেভাবে ধারণা করা হয়, তাতে রোহিঙ্গাদের অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ থাকা উচিত। রোহিঙ্গাদের আরও নেতৃত্বদানকারী অবস্থানে রাখার ক্ষেত্রে এটি তাদের এখানেও ভালো সেবা দেবে এবং রাখাইনে ফিরে যাওয়ার পরেও কাজে দেবে। এবং এমন দক্ষতা তৈরি করা যা প্রত্যাবাসনকে আরও টেকসই করতে সক্ষম করে।

পরিশেষে নিরাপত্তার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি। ক্যাম্পের ভেতরে উদ্বেগের বিষয়ে আলোচনার সময় রোহিঙ্গারা এখনো এক নম্বর ইস্যু হিসেবে এটিকেই তুলে ধরে। এটি এখন বেশ কয়েক বছর ধরে অব্যাহত রয়েছে।

দশ লাখেরও বেশি মানুষের জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা করা এবং জনসংখ্যার মধ্যে নিরাপত্তার ডাইনামিক নিয়ন্ত্রণ করা বাংলাদেশের জন্য একটি অত্যন্ত কঠিন চ্যালেঞ্জ। তবে ভবিষ্যতে প্রত্যাবাসনের সহায়ক হিসেবে যদি আমরা সীমান্তের বাংলাদেশ অংশে পরিস্থিতির উন্নতি দেখতে চাই—নিরাপত্তা হলো আমার উল্লেখ করা সেই অন্য সব জিনিসের ভিত্তি।