সাহাব এনাম খান: প্রথমেই আপনার বইটি সম্পর্কে জানতে চাই।
রোনান লি: বইটি বের হয়েছে কয়েক বছর হলো। বইয়ের মূল ফোকাস তিনটি বিষয়ের ওপর: রোহিঙ্গাদের পরিচয়, সংকটের ইতিহাস এবং মিয়ানমারে হেইট স্পিচ। আমার মতে, ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর যেই ভয়াবহ নৃশংসতা দেখেছি, তা শুধু কয়েক মাস বা বছরের ঘটনার ফলাফল ছিল না; বরং এটি ছিল কয়েক দশক ধরে চলা জাতিগত নিধনের চূড়ান্ত রূপ। ইতিহাসও তাই বলে।
এর আগে কখনো কখনো সহিংসতা এতটাই তীব্র হয়েছে যে ‘৭০, ‘৮০ এবং ‘৯০-এর দশকেও আমরা দেখেছি রোহিঙ্গাদের লাখে লাখে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে। তাদের মধ্যে কেউ কেউ ফিরে গেছেন, কেউ ফেরেননি, কেউ আবার অন্য দেশে চলে গেছেন। আমরা দেখেছি, কয়েক দশক ধরে মিয়ানমারে মৌলিক অধিকারের ওপরও কড়া বিধি-নিষেধ।
১৯৬০ এবং ৭০-এর দশক থেকেই স্বাস্থ্যসেবা এবং শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ কঠোরভাবে সীমিত করা হয়। সেই সাথে ছিল চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞা। রোহিঙ্গারা নিজ এলাকায় কার্যত বন্দি হয়ে পড়েছিল, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার অনুমতি ছিল না তাদের। সুতরাং, এটি ২০১৬ বা ২০১৭ সালে শুরু হয়নি, বরং কয়েক দশক ধরে চলে আসছিল। রোহিঙ্গাদের দৃষ্টিতে ২০১৭ সালে তাদের জোরপূর্বক বিতাড়ন ছিল কয়েক দশকের নির্যাতনের চূড়ান্ত পরিণতি।
তবে বিশ্বের গণমাধ্যম বা জাতিসংঘ ও বিভিন্ন দেশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা, যাদের আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বলে থাকি, তাদের কাছে ২০১৭ সালের ঘটনাটি ছিল একেবারেই নতুন। অনেকে সেবারই প্রথম রোহিঙ্গাদের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে পারে। তাই তাদের কাছে সংকটটি নতুন মনে হচ্ছিল।
এর পেছনের কয়েক দশকের নির্যাতনের দিকে না তাকিয়ে তারা নজর দিচ্ছিল সংকটের তাৎক্ষণিক কারণগুলোর দিকে। বিশ্বের যেকোনো আন্তর্জাতিক সংকটের ক্ষেত্রে আমরা এটি বারবার ঘটতে দেখি। গণমাধ্যম আর ত্রাণ অনেক দ্রুতই পৌঁছায়, তবে রাজনীতিবিদরা তথ্য পান মূলত আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম থেকে। আর গণমাধ্যমে অনেক সময়ই একটি প্রতিবেদেনের এক বা দুই প্যারাগ্রাফের মধ্যে একটি পুরো বিষয়কে ব্যাখ্যার চেষ্টা করা হয়। আমার মনে হয় ২০১৭ সালে রোহিঙ্গাদের কয়েক দশকের সেই যন্ত্রণার ইতিহাসটি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছিল।
আর এই কয়েক দশকের নির্যাতনের কারণেই সংকটটি এত দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে। এ কারণেই রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়া নিয়ে আলোচনাটি এত কঠিন। মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর কাছ থেকে রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার ক্ষমতা কেড়ে নিলেই হবে না, বরং যেই নীতিগুলো ২০১৭ সালের ঘটনাকে উসকে দিয়েছিল, সেগুলোকে পরিবর্তন করতে হবে। রোহিঙ্গাদের বিতাড়িত করার বিরুদ্ধে মিয়ানমারের মূলধারার রাজনীতি থেকে কোনো শক্ত বিরোধিতা আসেনি, সেটা সরকারি দল থেকে হোক বা বিরোধী দল থেকে।
তবে হ্যাঁ, এটা স্বীকার করা গুরুত্বপূর্ণ যে মিয়ানমারের রাজনৈতিক প্রান্তে কিছু সাহসী মানুষ ছিলেন, যারা এ নিয়ে কথা বলেছিলেন, তবে তারা সংখ্যায় খুবই কম। তাদের সাহসিকতাকে অবশ্যই স্বীকার করা উচিত। কারণ তরুণদের, বিশেষ করে ইয়াঙ্গুনের, জন্য ২০১৭ সালে এসব নিয়ে কথা বলা অত্যন্ত কঠিন ছিল। তবে তারা সংখ্যায় কম ছিলেন।
মিয়ানমারের মূলধারার প্রায় প্রত্যেকেই তখন রোহিঙ্গাদের ওপর তাতমাদোর (মিয়ানমার সেনাবাহিনী) কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেছিল।
সমর্থনকারীদের মধ্যে তৎকালীন স্টেট কাউন্সিলর, কার্যত প্রধানমন্ত্রী অং সান সু চিও ছিলেন। ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর তিনি এখন জান্তার কারাগারে বন্দি। কিন্তু যখন তিনি ক্ষমতায় ছিলেন, ২০১৭ সালে তিনি একইসাথে স্টেট কাউন্সিলর এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কর্মকাণ্ডকে সমর্থন করেছিলেন।
এর থেকেই বোঝা যায়, সে সময় মিয়ানমারে রোহিঙ্গা-বিদ্বেষী মনোভাব কতটা গভীর ছিল। আমরা এর গভীরে যেতে হলে আমাদের দেখতে হবে মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠী আসলে দেশটাকে কেমন দেখতে চায়। ২০১৭ সালের ঘটনা আমাদের দেখিয়েছে যে, মিয়ানমারের বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠরা তাদের দেশটিকে মূলত একটি বৌদ্ধ রাষ্ট্র এবং সাংস্কৃতিকভাবে কেবল বৌদ্ধদের দেশ হিসেবেই দেখতে চেয়েছিল।
মিয়ানমারের মুসলিম সংখ্যালঘু হিসেবে রোহিঙ্গারা এই ‘বৌদ্ধ দেশ’ গড়ার পথে বাধা হিসেবে বিবেচিত হয়। আমার শঙ্কা হলো, রোহিঙ্গারা সংখ্যালঘু মুসলিম ঠিকই, কিন্তু মিয়ানমারে আরও অনেক ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু রয়েছে। দেশটির ৮৫ শতাংশের বেশি মানুষ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী হলেও বাকি ১৫ শতাংশ কিন্তু অন্য ধর্মাবলম্বী।
আমার ভয় হলো, যখন আদর্শগতভাবে তারা রোহিঙ্গাদের মতো এক একটি সংখ্যালঘুকে নির্মূল করতে সফল হবে, তখন তারা অন্যদের ওপরও চড়াও হবে। বর্তমানে মিয়ানমারে এটিই ঝুঁকি। ভবিষ্যতে এক সংখ্যালঘু শেষ হলে তারা পরবর্তী সংখ্যালঘুর দিকে নজর দেবে। এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে মিয়ানমারের গৃহযুদ্ধের মূল কারণ।
সাহাব: মূল সমস্যা হলো একদিকে আমরা বার্মাকে দেখি, যা একটি ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক প্রকল্প ছিল। আরেকদিকে দেখি ১৯৮২ সালের নাগরিকত্ব আইন। যার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের জাতীয়তা কেড়ে নেয়া হয়েছিল। এখন এই বিশেষ কাঠামোটি কি আপনার মতে ব্রিটিশদের থেকেই নেয়া, নাকি বার্মিজ সরকার বা বামারদের পরিচয়ের নির্মাণ সাম্রাজ্যবাদী আমলেরও আগের? এবং সেই ইতিহাস আজকের মিয়ানমারে পশ্চিমাদের ভূমিকা নিয়ে কোনো নৈতিক ভার বহন করে কি?
রোনান: এটা বেশ স্পষ্ট যে ঔপনিবেশিক আমলের আগে, অর্থাৎ ব্রিটিশ আমলের আগে জাতিসত্তা, বর্ণ এবং ধর্ম নিয়ে ধারণাগুলো বর্তমান মিয়ানমারের তুলনায় আমার মতে ‘হালকা’ ছিল। সুতরাং ঔপনিবেশিক আমলে অবশ্যই বড় কোনো পরিবর্তন এসেছিল।
আমার মনে হয়, যা পরিবর্তিত হয়েছিল তা হলো ব্রিটিশদের দ্বারা নির্ধারিত সামাজিক স্তরের বিন্যাস। এই নিয়মগুলো কিছু মানুষকে বেশি সুবিধা দিয়েছে, অন্যদের কম। শুরুতে এই সুবিধাগুলো কেবল মানুষের পারসেপশনের মধ্যে থাকলেও, বছরের পর বছর এই পার্থক্যগুলো সমাজের আসল সত্য হয়ে দাঁড়ায়।
মিয়ানমারের স্বাধীনতা আন্দোলন, বিশেষ করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগের আন্দোলন ছিল বৈচিত্রময় সম্প্রদায় ও সংস্কৃতির আন্দোলন। মিয়ানমারের স্বাধীনতা আন্দোলনে শিক্ষিত মুসলিমরাও সক্রিয় ছিলেন, তবে আধিপত্য ছিল বৌদ্ধদেরই। এতে আধিপত্য ছিল বামার জাতিসত্তার, যারা মূলত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী। ঔপনিবেশিক আমলে মিয়ানমারের বৌদ্ধ ধর্মীয় শ্রেণির মধ্যে অনেক ক্ষোভ ছিল। যা বর্তমান সময় পর্যন্ত টিকে আছে।
মিয়ানমারের সন্ন্যাসী সমাজ বা ‘সংঘ’ অনেকটাই রাজনৈতিক, অন্যান্য বৌদ্ধ প্রধান দেশের তুলনায় অনেক বেশি। এর মূলে রয়েছে ব্রিটিশদের মিয়ানমার থেকে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত করার সিদ্ধান্ত। রাজতন্ত্রই ছিল বৌদ্ধ সন্ন্যাসী সমাজের প্রধান পৃষ্ঠপোষক, যা রাজার বিদায়ের সাথে হারিয়ে যায়। রাতারাতি দেশটি ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত হয়। রাজা ছিলেন সন্ন্যাসী সমাজের প্রধান আর্থিক দাতা- প্রজাদের কাছ থেকে কর সংগ্রহ করে তার বড় একটি অংশ সন্ন্যাসী সমাজকে দান করতেন। রাজার অপসারণ মিয়ানমারে বৌদ্ধ ধর্মের জন্য একটি সংকট তৈরি করে।
অনেক ধর্মপ্রাণ বৌদ্ধ ও বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের কাছে এই সংকটই ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতার ডাক হয়ে ওঠে। ফলে উপনিবেশবিরোধী আন্দোলনে সন্ন্যাসীদের অত্যন্ত সক্রিয় রাজনৈতিক ভূমিকা দেখা যায়। এই আন্দোলনের মধ্যে একটি ধারণার জন্ম হয়, যে ব্রিটিশ শাসনের বিরোধিতা করা প্রতিটি বৌদ্ধের ধর্মীয় কর্তব্য, কারণ তারা সন্ন্যাসী সমাজের ক্ষতি করেছে।
ফলে ১৯৪৮ সালে দেশ যখন স্বাধীন হয়, আমরা প্রাক-ঔপনিবেশিক সময়ের তুলনায় একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন মিয়ানমার দেখতে পাই, যেখানে একজন ব্যক্তির ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ই নির্ধারণ করে, সে কী কাজ করতে পারবে এবং সরকারের কাছে কতটুকু সুবিধা পাবে। এটি প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলের চেয়ে অনেক ভিন্ন অবস্থা। এর সাথে যুক্ত হয় ব্রিটিশ আমলে বৌদ্ধ ধর্মের ওপর হওয়া আঘাত নিয়ে জমে ওঠা আক্রোশ।
১৯৪৮ থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত মিয়ানমারে একটি গণতান্ত্রিক পর্ব আসে, যেখানে সুষ্ঠু নির্বাচন হচ্ছিল, বিভিন্ন রাজনৈতিক দল নির্বাচিত হচ্ছিল। স্বাধীনতার ঠিক পরপর আমরা রোহিঙ্গাদের সংসদে এবং সরকারের উঁচু পদেও থাকতে দেখি। তারা তখন জাতীয় রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ ছিল।
তবে ১৯৫০-এর দশকে মিয়ানমারের রাজনীতিতে বৌদ্ধ ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম করার একটি জোরালো চাপ আসতে থাকে। এর আগে সংবিধানে বৌদ্ধ ধর্মের বিশেষ মর্যাদার স্বীকৃতি দেওয়া হলেও তা রাষ্ট্রধর্ম ছিল না। কিন্তু ১৯৫০-এর দশকে আমরা গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চাকারীদের মধ্যেও বৌদ্ধ ধর্মকে দেশের রাজনীতি ও সংস্কৃতির কেন্দ্রে আনার পক্ষে দৃঢ় মনোভাব দেখতে পাই। ১৯৬২ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর এই মনোভাব আরও অনেক তীব্র হয়।
এরপর মিয়ানমারে সামরিক বাহিনী ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতাকে পোক্ত করতে ধর্মকে ব্যবহার করে। সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার জন্য হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয় ধর্মকে। ১৯৬০-এর দশকের শুরুতে আশা ছিল, সামরিক বাহিনী হয়তো কয়েক বছর ক্ষমতায় থেকে গণতান্ত্রিক সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তর করবে, তবে তারা তা করেনি। ১৯৬২ সাল থেকে তারা আজ পর্যন্ত ক্ষমতা ছাড়েনি। অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় পার হয়ে গেছে, তারা এখনও দেশ চালাচ্ছে এবং ধর্মকে ব্যবহার করছে নিজের ক্ষমতাকে বৈধতা দিতে।
১৯৪৮ সালে স্বাধীনতার সময় বার্মা এমন এক দেশ ছিল যেখানে কারা দেশটির অংশ হবে, তা নিয়ে ঐকমত্য ছিল না। যেমন, কারেন সম্প্রদায় বিশ্বাস করতো যে ব্রিটিশরা তাদের আলাদাভাবে স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। শান সম্প্রদায়েরও ছিল একই বিশ্বাস।
ফলে ১৯৬২ সালের অভ্যুত্থানের পর মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর জন্য রাষ্ট্র গঠন একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ হয়ে দাঁড়ায় এবং তারা ধর্মের মাধ্যমে তা সম্পন্ন করে।
সাহাব: তার অর্থ হলো এই জাতীয়তাবাদ থেকেই যাবে। তাহলে কি রাজনৈতিক বৌদ্ধ সন্ন্যাসীদের সঙ্গে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের মুসলিম নেতৃত্বের যোগাযোগ ও আস্থা বাড়ালেই সমাধান বা কোনো পরিবর্তন হবে বলে মনে করেন?
রোনান: অবশ্যই সাহায্য করবে। কিন্তু মিয়ানমারে যা প্রয়োজন তা হলো দেশটির সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ আসলে তাদের দেশটিকে কেমন দেখতে চায়? সেসব নিয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট এবং স্বচ্ছ আলোচনা। আমি যেভাবে দেখি, সমস্যাটি হলো, এই সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশটি বৌদ্ধ এবং জাতিগতভাবে বামার। রাখাইনরা বামার নয়, তারা একটি ভিন্ন বৌদ্ধ গোষ্ঠী। তবে মিয়ানমারের বর্তমান সীমান্তের মধ্যে ধর্মীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ হলো বৌদ্ধ এবং জাতিগতভাবে বামার। প্রশ্নটি হলো, বামাররা মিয়ানমারকে কেমন দেখতে চায়? ২০১৭ সালের ঘটনা আমাদের বলে যে, বামার সংখ্যাগরিষ্ঠরা মিয়ানমারকে কেবল একটি বৌদ্ধ রাষ্ট্র হিসেবেই দেখতে চায়। তারা দেশটিকে বৌদ্ধ হিসেবেই দেখে এবং দাবি করে যে অন্যদেরও এখানে স্থান আছে, তবে তা শুধু বৌদ্ধ সংস্কৃতির সাথে মিশে গিয়ে বৌদ্ধ ধর্মের কাছে গ্রহণযোগ্য আচরণ করার শর্তে। অর্থাৎ, তাদের দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক হিসেবে বা বামার বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠদের অধীনস্ত হিসেবে থাকতে হবে।
এটি মিয়ানমারে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের একটি রেসিপি। মিয়ানমার বিশ্বের দীর্ঘতম গৃহযুদ্ধের দেশ। স্বাধীনতার পর থেকেই এখানে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়েছে যা এখনও থামেনি। থামেনি কারণ এখানে একটি রাজনৈতিক সমঝোতা প্রয়োজন। এটি কোনো সংখ্যালঘু গোষ্ঠীকে যুদ্ধে পরাজিত করার বিষয় নয়, কারণ এখানকার সমস্যাগুলো সামরিক নয়, রাজনৈতিক। তারা একটি রাজনৈতিক সমাধান চায়। তারা চায় তাদের ধর্মীয় মতামত প্রকাশ করতে এবং প্রকাশ করার কারণে ‘রাষ্ট্রদ্রোহী’ হিসেবে গণ্য না হতে। তারা এমনভাবে তাদের জাতীয় পোশাক পরতে চায়, তাদের গান গাইতে চায় এবং নিজেদের ভাষায় কথা বলতে চায় যাতে একে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে দেখা না হয়। এবং যতক্ষণ না মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠরা এটি মেনে নিতে প্রস্তুত হচ্ছে, ততক্ষণ দেশে সংঘাত লেগেই থাকবে। আর এই সংঘাত, সংঘাত হয়তো ঠিক শব্দ নয়, এই সংকটের কেন্দ্রে রয়েছে বামার সংখ্যাগরিষ্ঠদের সামরিক শক্তি দ্বারা ক্ষমতা চর্চা, বরং সেই জনগোষ্ঠীর সংঘাত যাদের, তারা বৌদ্ধ ধর্মের সাথে একীভূত হওয়ার কম যোগ্য বলে মনে করে, অর্থাৎ রোহিঙ্গা মুসলিম সম্প্রদায়।
বৌদ্ধ ধর্মের অধিকাংশই রোহিঙ্গাদের রাষ্ট্র গঠনের প্রকল্পের জন্য হুমকি মনে করে। তারা যে ‘ওয়েস্টার্ন গেট’-এর কথা বলে, যা মূলত নাফ নদী। সেটি কেবল তাদের কাছে ইসলাম প্রবেশের পথ নয়, বরং ব্রিটিশরাও এই পথেই মিয়ানমারে এসেছিল। ফলে মিয়ানমারের অনেক রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের কাছে এই ‘পশ্চিম তোরণ’ ধারণাটি বুথিডং বা মংডু এলাকায় কারা বাস করছে তার চেয়ে বড় একটি রাজনৈতিক ধারণা।
মিয়ানমারের অনেকের সাথে সীমান্ত আছে, কিন্তু সব জায়গায় ইস্যু এক নয়। তারা থাইল্যান্ড সীমান্ত নিয়ে এভাবে কথা বলে না। ঐতিহাসিকভাবে মিয়ানমার অন্য যেকোনো রাষ্ট্রের চেয়ে থাইল্যান্ডের সাথে বেশি যুদ্ধ করেছে। কিন্তু আধুনিক সময়ে তারা থাইল্যান্ড সীমান্ত নিয়ে সেভাবে কথা বলে না যেভাবে তারা ওয়েস্টার্ন গেট নিয়ে বলে।
সুতরাং মূল প্রশ্নটি হলো মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠরা কেমন রাষ্ট্র চায়। তারা কি এমন একটি দেশ চায় যেখানে জাতিগত ও ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা জাতীয় রাজনীতির অংশ হয়ে জাতীয় রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে পারবে? নাকি তারা এক-সাংস্কৃতিক এবং এক-ধর্মীয় হয়ে অন্য সবাইকে বাদ দিতে চায়? তথ্যপ্রমাণ বলছে, বামার বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠরা দেশটিকে এক-সাংস্কৃতিক এবং এক-ধর্মীয় করতে চায়। কিন্তু একইসাথে তারা সামাজিক স্থিতিশীলতা, শান্তি এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিও চায়—যা মূলত একটি বহু-সাংস্কৃতিক সমাজেই সম্ভব যেখানে সংখ্যালঘুরা নিজেদের বিকশিত করার সুযোগ পায় এবং তাদের যুক্তিসঙ্গত রাজনৈতিক দাবিগুলো পূরণ না হওয়ার কারণে অস্ত্র হাতে তুলে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে না।
রোহিঙ্গাদের রাজনৈতিক দাবিগুলো খুব সাধারণ। মৌলিক মানবাধিকার, সন্তানদের শিক্ষা, এক গ্রাম থেকে অন্য গ্রামে চলাচল, কাজ করার সুযোগ, দরকার হলে হাসপাতালে যাওয়া এবং ধর্মীয় চর্চার অধিকার।
এগুলো কি দেশের স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হিসেবে দেখা উচিত? এগুলো অত্যন্ত সাধারণ বিষয় যাকে বিশ্বের অনেক মানুষ খুব সহজ ও স্বাভাবিক মনে করে। কিন্তু যতক্ষণ মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠরা সংখ্যালঘুদের এই অধিকারগুলোকে মূল্য দিচ্ছে না, ততক্ষণ সংঘাত চলবেই।
সাহাব: এ জায়গায় বেশ কয়েকটি প্রশ্ন করতে হয়। রাজনৈতিক শাসন নিয়ে আরাকান আর্মির অবস্থান কী? তারা কি স্বায়ত্তশাসন চায় নাকি কনফেডারেশন? রিপাব্লিকের কথা যদি বাদ দেই, তাহলে তারা কি কোনো ধরনের সহাবস্থান চায়?
রোনান: অনেক ক্ষেত্রে মিয়ানমারের সংখ্যাগরিষ্ঠদের মনোভাব সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীগুলোর রাজনৈতিক মহলেও দেখা যায়। আমরা রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির ক্ষেত্রে এটি খুব স্পষ্টভাবে দেখি। আরাকান আর্মির রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি আদর্শগতভাবে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর মতোই।
তারা প্রায় একইরকম, শুধু একটি জায়গায় পার্থক্য—আরাকান আর্মি মনে করে তাদের মূল ভিত্তি হলো রাখাইন জাতিগোষ্ঠীর বৌদ্ধরা, বামার বৌদ্ধরা নয়।
কোনো গবেষক যখন মিয়ানমারকে বাইরে থেকে দেখেন, তিনি আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমার সেনাবাহিনীর আদর্শকে প্রায় এক মনে করবেন। শুধু একটি প্রধান পার্থক্য ছাড়া, তা হলো, কোন জাতিগোষ্ঠীকে তারা নিজেদের মূল ভিত্তি মনে করে। এখানেই আরাকান আর্মি এবং মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর মধ্যে সংঘাত। তবে আরাকান আর্মি কোন ধরনের দেশ দেখতে চায়, সেই আদর্শের দিক দিয়ে তারা সামরিক বাহিনীর অনেকটাই কাছাকাছি, যা তারা হয়তো স্বীকার করতে চাইবে না।
রাখাইন রাজ্যে একচ্ছত্র আধিপত্যের জন্যই তারা সামরিক বাহিনীর সাথে লড়াই করছে। সামরিক বাহিনী চায় রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে থাকুক, আরাকান আর্মি চায় তাদের হাতে। তাদের ধারণা হলো, একবার রাজ্যের নিয়ন্ত্রণ পেলে তারাই সব নীতি নির্ধারণ করবে।
আমার মনে হয়, আরাকান আর্মি যদি বিশ্বাস করতো যে তারা মিয়ানমারের অংশ না থেকে স্বাধীন থাকতে পারবে, তবে তারা সানন্দে স্বাধীনতাই ঘোষণা করতো। কিন্তু বাস্তবতা হলো তারা জানে যে এটি বর্তমানে সম্ভব নয়। রাজ্যের জনসংখ্যা এবং অবকাঠামো বর্তমানে স্বাধীনতার জন্য প্রস্তুত নয়। সুতরাং তাদের আপসটা হলো, তারা রাজ্যের নিয়ন্ত্রণের জন্য লড়াই করবে এবং আশা করবে যে রাজ্যের ওপর জাতীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ সীমিত থাকবে।
যেমন, তারা রাখাইনে কর সংগ্রহ করবে, পুলিশ বাহিনী চালাবে এবং হয়তো বৈদেশিক অর্থনৈতিক নীতি বা পাসপোর্ট ইস্যু করার মতো বিষয়গুলো ছাড়া বাকি সবই নিয়ন্ত্রণ করবে। এটাই তাদের দৃষ্টিভঙ্গি।
এখন চিন্তার বিষয় হলো, আরাকান আর্মিও মিয়ানমার সামরিক বাহিনীর মতোই একটি অগণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান। এটি রাখাইনদের মনোভাবের প্রতিফলন হলেও তা অগণতান্ত্রিক। সাধারণ রাখাইনদের পক্ষে এই আর্মির রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধিতা করা কঠিন। ফলে রাখাইনে এমন একটি পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেখানে একটি সশস্ত্র গোষ্ঠী রাখাইন বৌদ্ধদের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি করে পুরো রাখাইন জনগোষ্ঠীর ওপর তাদের রাজনৈতিক মতাদর্শ চাপিয়ে দিচ্ছে। তারা রাখাইনের ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো আলোচনায় যেতে রাজি নয়। ঠিক যেমন মিয়ানমার সামরিক বাহিনী পুরো মিয়ানমার নিয়ে কোনো আলোচনা চায় না। আর এটিই এখন নতুন সংকট তৈরি করছে। সামরিক বাহিনী রাখাইনদের বাদ দিতে চায়।
আর আরাকান আর্মির দৃষ্টিভঙ্গিও প্রায় একই রকম। তারা রোহিঙ্গাদের দেশের রাজনৈতিক কাঠামোর পূর্ণ অংশ হিসেবে গণ্য করে না।
সাহাব: প্রত্যাবাসন নিয়ে আগে বাধা ছিল মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী। এখন আরাকান আর্মি দ্বিতীয় পক্ষ হিসেবে সামনে এসেছে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে আরাকান আর্মি কি কোনো প্রকৃত আগ্রহ বা গতিশীলতা তৈরি করতে পারবে?
রোনান: আমি মনে করি রোহিঙ্গাদের ব্যাপারে মিয়ানমার সামরিক বাহিনী এবং আরাকান আর্মির মধ্যে আদর্শিক পার্থক্য খুবই সামান্য। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি প্রায় এক। আমি বলবো, পাবলিক রিলেশনের দিক দিয়ে আরাকান আর্মি মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি দক্ষ। এটা কয়েক বছর ধরে খুবই পরিষ্কার যে তারা আন্তর্জাতিক মহলে ভালো বার্তা দিতে পারে। কিন্তু তারা আন্তর্জাতিকভাবে যা বলছে, রাখাইনের মাঠপর্যায়ে তার প্রতিফলন সবসময় দেখা যাচ্ছে না। সুতরাং কোনো রোহিঙ্গা কি রাখাইনে নিজেকে নিরাপদ মনে করবে?
আপনি যদি আরাকান আর্মির আন্তর্জাতিক বক্তব্য বিশ্বাস করেন তবে মনে হবে তারা নিরাপদ। কিন্তু আপনি যদি রাখাইনের মাঠপর্যায়ের কথা শোনেন, তবে আপনার ধারণা ঠিক উল্টো হবে।
বাংলাদেশের অবশ্যই আরাকান আর্মির সাথে যোগাযোগ রাখা প্রয়োজন, কারণ সহজভাবে বলতে গেলে সীমান্তের ওপারে তাদের একটি সামরিক প্রভাব রয়েছে; তারা একটি বাস্তবতা, তারা সেখানে আছে, তাদের হাতে অস্ত্রশস্ত্র রয়েছে। এছাড়া মিয়ানমারের বর্তমান সংকট বা গৃহযুদ্ধ যেন সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে ছড়িয়ে না পড়ে, তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য নিরপত্তার দিক দিয়ে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কিন্তু প্রত্যাবাসনের কথা বললে, এটি খুব দ্রুত ঘটার মতো জিনিস না। তাই আমাদের সম্ভবত আগামী দিনগুলোতে পরিস্থিতি কেমন হতে পারে তা নিয়ে ভাবতে হবে—আগামীকাল বা আগামী মাসের কথা নয়, বরং আগামী কয়েক বছরের কথা ভাবতে হবে।
আমার ধারণা মিয়ানমারের ভেতরে যা দেখছি তা হলো - আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যে নিজের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করছে। কিন্তু এটি এমন এক পরিস্থিতিতে ঘটছে যখন মিয়ানমারের সেনাবাহিনী সারাদেশে ছড়িয়ে পড়েছে। সারাদেশেই হিমশিম খাচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে মিয়ানমার সেনাবাহিনী যা করে এসেছে তা হলো, যখন তারা চাপে পড়ে, তখন তারা এক জায়গা থেকে সরে আসে এবং অন্য জায়গায় চুক্তি, আপস বা সামরিক অভিযানের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করে। বাকি সমস্যা সামাল দিয়ে ফেললে, তাদের আবার রাখাইন রাজ্যে ফিরে আসার সম্ভাবনা প্রবল। তাই রাখাইন রাজ্যের বর্তমান পরিস্থিতি দুই-তিন বছর পর একইরকম থাকবে বলে আমি মনে করি না।
এক বছরের মধ্যে আমরা আরাকান আর্মিকে আরও দুর্বল কিংবা আরও শক্তিশালী হতে দেখতে পারি। সেটি এখনো দেখা বাকি। সুতরাং এই ফ্যাক্টরগুলো চলতেই থাকবে। যুদ্ধ চলাকালীন কোনো প্রত্যাবাসন সম্ভব নয়, ব্যাপারটা খুবই সিম্পল। যতক্ষণ আরাকান আর্মির সাথে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সরাসরি সংঘাত চলছে, ততক্ষণ আপনি এমন একটি জনপদে সাধারণ মানুষকে ফিরিয়ে নিতে পারেন না। যেখানে উভয়পক্ষই ইঙ্গিত দিয়েছে যে তারা এই সাধারণ মানুষকে তাদের রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ মনে করে না। এটি বিপজ্জনক হবে। রাখাইনের বেসামরিক নাগরিকদের যুদ্ধে এমনভাবে ব্যবহার করা হতে পারে যা সব পক্ষের জন্যই ক্ষতিকর হবে এবং আরও সংঘাতের সৃষ্টি হবে।
সাহাব: সবাই মিয়ানমারের স্থিতিশীলতা চায়। চীন চায়, ভারত চায়, বাংলাদেশিরা চায়, থাইরা চায়, আসিয়ানও চায়। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই স্থিতিশীলতা আসলে কার সংজ্ঞায় হবে?
রোনান: চীনের সংজ্ঞায়। সেটাই হলো স্থিতিশীলতা। এটাই উত্তর। এ নিয়ে কোনো প্রশ্ন নাই। ভূ-রাজনৈতিকভাবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কোন দিকে যাবে এবং তারা কোন পর্যায়ের অস্থিতিশীলতাকে ‘গ্রহণযোগ্য’ মনে করবে, তা মূলত চীন নির্ধারণ করবে।
চীন সেটি ঠিক করবে। চীন যদি মিয়ানমারকে তার নিজের আঙিনা মনে করে, তবে সে মিয়ানমারে এমন এক পর্যায়ের স্থিতিশীলতা চাইবে যেখানে মিয়ানমার চীনের স্বার্থের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে না—তা সীমানার ক্ষেত্রে হোক বা অর্থনীতির। আর যতক্ষণ সেটি বজায় থাকবে, ততক্ষণ জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য এবং এই অঞ্চলের প্রধান শক্তি হিসেবে চীন বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করবে। মিয়ানমারের সাথে তাদের দীর্ঘ স্থল সীমান্ত আছে।
তারা মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে তেল ও গ্যাস নিচ্ছে, যা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা বর্তমানে হরমুজ প্রণালির মতো সাপ্লাই চেইনের ‘চোক পয়েন্ট’-এর ওপর নির্ভরশীলতার ঝুঁকিগুলো দেখতে পাচ্ছি। চীনের উদ্বেগ মালাক্কা প্রণালি এবং দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে। তাই মিয়ানমারের মধ্য দিয়ে তেল ও গ্যাসের সংযোগ চীনের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আর যতক্ষণ এই সুবিধাগুলো বজায় থাকবে, ততক্ষণ চীন মিয়ানমারকে স্থিতিশীলতাকে গ্রহণযোগ্য পর্যায়ের মনে করবে।
অবশ্য মিয়ানমার এখনো সেই পর্যায়ে পৌঁছায়নি। চীনের ধারণা অনুযায়ী মিয়ানমার এখনও সেখানে নেই। কিন্তু মিয়ানমারে সংঘাতের কলকাঠি চীন কীভাবে নাড়ে, তা আপনাদের দেখতে হবে।
যেমন, ‘থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’ যখন মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই শুরু করেছিল—যা এখন এক বছরের বেশি সময় আগের কথা—এবং মান্দালয় ও চীনের মধ্যকার স্থলপথ নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিল; তা সম্ভব হয়েছিল, কারণ চীন তাদের সবুজ সংকেত দিয়েছিল এবং সম্ভবত অস্ত্র বা অনুমোদন দিয়েছিল। এর কারণ হলো, চীনের সাথে সীমান্তবর্তী এলাকায় জালিয়াতি চক্রগুলো বন্ধ করতে মিয়ানমারের জান্তার ব্যর্থতায় চীন অসন্তুষ্ট ছিল। চীন চেয়েছিল জান্তা যেন এগুলো বন্ধ করে, কিন্তু তারা তা করেনি। তখন ‘থ্রি ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স’ জানায় তারা এটি করবে, এবং চীন তাদের অনুমতি দেয়। ফলে তারা মিয়ানমার সেনাবাহিনীকে পরাজিত করে, যা সেনাবাহিনীর জন্য একটি বড় বিপর্যয় ছিল।
সুতরাং চীন যতক্ষণ সন্তুষ্ট, ততক্ষণই মিয়ানমারের সংঘাত বা স্থিতিশীলতার মাত্রা নির্ধারিত হবে। আর মনে রাখা জরুরি যে, চীন একটি শক্তিশালী মিয়ানমার চায় না। সেটি চীনের রাজনৈতিক স্বার্থের অনুকূল নয়। চীন মিয়ানমারে নির্দিষ্ট মাত্রার সংঘাত ও অস্থিতিশীলতা বজায় রাখতে চায়। কারণ এটি মিয়ানমারকে দুর্বল রাখে, যা চীনের জন্য সুবিধাজনক। চীন শুধু চায় না যে এই সংঘাত তার নিজের দেশে ছড়িয়ে পড়ুক বা তার অর্থনৈতিক স্বার্থে আঘাত করুক। তাই মিয়ানমারের ভবিষ্যতের মাপকাঠি ‘শান্তি ও ভালোবাসা’ নয়, বরং চীনের কাছে ‘গ্রহণযোগ্য সংঘাতের মাত্রা’।
সাহাব: আগামী বছরগুলোতে এই সংকটে পশ্চিমাদের প্রতিক্রিয়া কেমন হতে পারে বলে আপনি মনে করেন?
রোনান: পশ্চিমাদের প্রতিক্রিয়া হবে এমন- তারা মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে সব সঠিক কথাগুলো বলবে। কিন্তু কাজের বেলায় খুব সামান্যই করবে। কয়েক দশক ধরে এই সংকটে পশ্চিমাদের অবস্থান মূলত এমনই।
হ্যাঁ, ২০১৭ সালে পশ্চিমা অর্থ সহায়তা এসেছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু আন্তর্জাতিক সহায়তার কাঠামো আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন। ট্রাম্প প্রশাসন মানবিক খাত থেকে বিশাল অংকের অর্থ প্রত্যাহার করে নিয়েছে। ইউএসএইড (USAID)-কে ধ্বংস করাটা অনেক বড় সমস্যার সৃষ্টি করেছে।
আন্তর্জাতিক অনুদানের সংস্কৃতি এখন ১০ বছর আগের তুলনায় বদলে গেছে। তাই আমি মনে করি আর্থিক সহায়তার ক্ষেত্রে সামনে খুব কঠিন সময় আসছে।
আর এ কারণেই, রোহিঙ্গা শরণার্থীদের যে এই আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল করে রাখা হয়েছে, এটি একটি বড় সমস্যা। তাদের নিজস্ব ব্যবসা বা জীবিকা নির্বাহের সুযোগের ওপর যে বিধিনিষেধ রয়েছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শরণার্থী শিবিরের ভেতরে তাদের বিধিনিষেধগুলো সমস্যাজনক। এসবের কারণে তারা বাইরে কাজ করতে পারছে না। এটি দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের নতুন সরকারের জন্য একটি চ্যালেঞ্জ হবে। তাদের সামনে এই বাস্তবতা আসবে যে পশ্চিমাদের কাছ থেকে বা আগের দাতা উৎসগুলো থেকে সেই অর্থটুকু আর আসবে না, যার ওপর রোহিঙ্গারা নির্ভর করছিল।
এর স্পষ্ট সমাধান হলো— আমার মনে হয় এই দাবিটি উঠবে—রোহিঙ্গাদের নিজেদের টিকে থাকার জন্য অন্য জীবিকা নির্বাহের সুযোগ করে দেওয়া। এটিকে বাংলাদেশের নতুন সরকারের গুরুত্বের দিতে হবে। আমার মনে হয় পশ্চিমাদের কাছ থেকে রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা খুব একটা পাওয়া যাবে না।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রতি ট্রাম্প প্রশাসনের দৃষ্টিভঙ্গি বাইডেন প্রশাসনের চেয়ে অনেক ভিন্ন। আমি সাহস করে বলতে পারি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হয়তো মানচিত্রে রাখাইন রাজ্য খুঁজে পেতেও হিমশিম খাবেন। মিয়ানমারে কী ঘটছে তা নিয়ে তার কোনো আগ্রহ নেই। তিনি এটাকে চীনের আঙিনা মনে করেন। তাই বাইডেন প্রশাসনের সময় বা অতীতে ওবামার সময় আমরা যে ধরনের মার্কিন সম্পৃক্ততা দেখেছি, তা এখন দেখা যাবে না।
সাহাব: এমন কোন দু’টি বা তিনটি কাজ আছে যা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের ভিন্নভাবে করা উচিত? আর সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশের জন্য—একটি বাস্তবসম্মত এবং মর্যাদাপূর্ণ পথ আসলে কেমন হওয়া উচিত, যদি তা অস্বস্তিকরও হয়?
রোনান: এ বিষয়টি পুরোপুরি রাজনৈতিক সদিচ্ছার। মানুষ আসলে কতটুকু করতে প্রস্তুত, সব তারই ওপর নির্ভর করছে। এখানে কোনো তাৎক্ষণিক সমাধান নেই, যা রাতারাতি সব ঠিক করে দেবে। এখানে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি অনুপস্থিত তা হলো- রোহিঙ্গাদের মানুষ হিসেবে, এবং রাজনৈতিক সত্তা হিসেবে গণ্য করা। তারা কেবল ভুক্তভোগী শরণার্থী নয়। তারা আমাদের মতো মানুষ এবং তাদের একটি রাজনৈতিক জীবন আছে, যা তাদের পাওয়ার অধিকার আছে। এর মানে হলো সাধারণ রোহিঙ্গাদের কাছ থেকে এই অস্বস্তিকর কথাগুলো শোনা। তাদেরকে নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগ দেওয়া। যেন একজন সাধারণ রোহিঙ্গা তার রাজনৈতিক অভিমত প্রকাশের একটি প্ল্যাটফর্ম পায়।
সাধারণ রোহিঙ্গাদের প্ল্যাটফর্ম দিলে তারা সভা-সমাবেশ করবে এবং এমন কিছু দাবি করবে যা অনেক সরকার দিতে রাজি নয়। কিন্তু এই সংকটের মৌলিক সমাধানের জন্য হওয়া প্রয়োজন। আপনি কোনো প্রত্যাবাসন বা দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা করতে পারবেন না, যদি সাধারণ রোহিঙ্গারা মনে না করে যে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের সত্যিকারের কোনো ভূমিকা ছিল। সুতরাং এটিই প্রথম কাজ হওয়া উচিত।
আমি মনে করি, শরণার্থী শিবিরের ভেতরে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে নিরুৎসাহিত না করে উৎসাহিত করা উচিত। দ্বিতীয়ত, শরণার্থী শিবিরের ভেতর জীবিকা নির্বাহের সুযোগের বিষয়টি সমাধান করা দরকার। আমরা জানি দাতা দেশগুলো থেকে কম অর্থ আসবে। এটি এখনই দেখা যাচ্ছে। রোহিঙ্গাদের সহায়তার কলকাঠি বন্ধ করে দেওয়া এটা বলার মতো যে—রেশন কম পাবেন কিন্তু কাজও করতে পারবেন না বা বাগান করতে পারবেন না। এটি কোনো টেকসই অবস্থান না। তাই বাংলাদেশের নতুন সরকারের উচিত দ্রুত রোহিঙ্গাদের জীবিকার সুযোগের বিষয়টি দেখা। আর তৃতীয় বিষয়টি হলো, ভূ-রাজনৈতিক—সব পক্ষকে নিয়ে একটি খোলামেলা আলোচনা হওয়া উচিত যে তারা ভবিষ্যতে আসলে কী চায়, মুখে যা বলছে তা নয়। আমি এ বিষয়ে কিছু বন্ধ দরজার বৈঠকের পরামর্শ দেব যাতে প্রকৃত ধারণা পাওয়া যায়।
আমার প্রবল ধারণা হলো, মিয়ানমারের সেনাবাহিনী, যা এখন মিয়ানমারের সরকার, জান্তা সরকার চায় না রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে আসুক। তারা পারলে রাখাইনে থাকা বাকি ৫ লক্ষ রোহিঙ্গাকেও তাড়িয়ে দিতো বা মেরে ফেলতো।
আবার আশঙ্কা আছে যে আরাকান আর্মিও হয়তো তাদের ফেরত চায় না। তারা যদি কাউকে ফেরত নেয়ও, তবে তা নেবে সস্তা শ্রমের প্রয়োজনে।
তারা রোহিঙ্গাদের রাখাইনের রাজনৈতিক কাঠামোর অংশ করবে না। আর এটি দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। তাই রোহিঙ্গাদের ভবিষ্যৎ আসলে কোথায় তা নিয়ে আমাদের গুরুত্বের সাথে কথা বলতে হবে।
অস্বস্তিকর বিষয় এটিই—আমি এর পক্ষে বলছি না, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরবর্তী সময়ের দিকে তাকালে দেখবেন পৃথিবীর অনেক জায়গায় পপুলেশন সোয়াপ হয়েছে। এক জায়গার মানুষকে অন্য জায়গায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর ধারণা ছিল, দুর্ভাগ্যবশত যাদের সরানো হয়েছে তাদের মতামত নেয়া ছাড়াই। ভাবা হয়েছিল, দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতার জন্য কিছু মানুষকে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় সরানোই ভালো হবে। গ্রিস এবং তুরস্কের মধ্যে আমরা এমনটি দেখেছি। এমন অনেক দেখেছি।
দীর্ঘমেয়াদে, এই বিষয়গুলো সংশ্লিষ্ট জনগোষ্ঠীর ওপর কয়েক প্রজন্ম ধরে প্রভাব ফেলে। কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে, আপনি যদি কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরে জন্ম নেওয়া একটি শিশু হন, আপনার ভবিষ্যৎ আসলে কী? বর্তমান পরিস্থিতি অনুযায়ী তার ভবিষ্যৎ হলো— আপনি ক্যাম্পে জন্মেছেন, ক্যাম্পে বড় হবেন এবং ক্যাম্পেই মারা যাবেন। এটি আমাদের সবার জন্য লজ্জার।
এটিকে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য পরিণতি হিসেবে মেনে নেয়া উচিৎ না। আমার মনে হয় এটিকে আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে। আর জন্য প্রয়োজন সমঝোতা, অনেক ক্ষেত্রে তা হতে হবে সব পক্ষের মধ্যে এক অস্বস্তিকর সমঝোতা।