ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর রাজনৈতিক অঙ্গনে যে উত্তাপ তৈরি হয়েছে, তার কেন্দ্রে এখন দুইটি শব্দ-গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদ।
সংসদ গঠনের দিন থেকেই দেশের প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এই প্রশ্নে কার্যত দুই মেরুতে অবস্থান নিয়েছে।
অন্তর্বর্তী সরকার ঢাকঢোল পিটিয়ে যে গণভোট আয়োজন করেছে, তার রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ভবিষ্যৎ নিয়ে শুরু হয়েছে তীব্র বিতর্ক।
একদিকে সরকারপন্থিরা এটিকে ‘জনমতের বৈধতা’ হিসেবে দেখাতে চাইছেন, অন্যদিকে বিরোধীরা বলছেন- সাংবিধানিক কাঠামোর বাইরে এটি এক নজিরবিহীন পদক্ষেপ।
সংবিধান সংস্কার পরিষদে শপথ নেওয়ার বিষয়টি নিয়েই তৈরি হয়েছে বড় ধরনের আইনি প্রশ্ন।
কোনো কোনো সংবিধান বিশেষজ্ঞের মতে, বর্তমান সংবিধানের আলোকে আলাদা করে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন এবং সেখানকার সদস্য হিসেবে শপথ নেওয়া সরাসরি সাংঘর্ষিক।
সংবিধানের সঙ্গে ‘সাংঘর্ষিক’ হওয়ায় সংস্কারক হিসেবে ‘দ্বিতীয়বার’ যারা শপথ নিয়েছেন তাদের এখন কী হবে?
আরও বিতর্ক তৈরি হয়েছে রাষ্ট্রপতির আদেশে সংবিধান পরিবর্তনসংক্রান্ত গেজেট জারি করা নিয়ে।
সমালোচকরা দাবি করছেন,সংসদীয় প্রক্রিয়া এড়িয়ে রাষ্ট্রপতির আদেশে এমন পরিবর্তন ক্ষমতার ভারসাম্য ও সাংবিধানিক রীতির পরিপন্থি হতে পারে।
রাষ্ট্রপতির জারি করা ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশে’ বলা হয়েছে, পরিষদের অধিবেশন পরিচালনার জন্য কমপক্ষে ৬০ জন সদস্য প্রয়োজন।
এখানেই সামনে আসছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অঙ্ক।
বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট থেকে নির্বাচিত হয়েছেন ২১২ জন সংসদ সদস্য। কিন্তু তারা কেউই সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেননি। অর্থাৎ সংখ্যাগরিষ্ঠ জোট কার্যত এই প্রক্রিয়া থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখেছে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর জোটের ৭৭ জন এমপি শপথ নিয়েছেন এবং সংবিধান সংস্কারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
প্রশ্ন হচ্ছে- এই ৭৭ জন কি এককভাবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে পারবেন?
অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কর্মসূচির সঙ্গে একমত হয়ে, হ্যাঁ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালিয়ে ক্ষমতায় আসার পর বিএনপি কি এখন সেই প্রক্রিয়া থেকে দূরে সরে যাবে? নাকি সরকারের রেখে যাওয়া ‘সাংবিধানিক জটিলতার সংস্কার’ এগিয়ে নিতে পারবে?
‘বিতর্কিত’ সংবিধান সংস্কার পরিষদ
সংবিধান সংস্কার পরিষদ নিয়ে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রপতির এই ধরনের পরিষদ গঠনের এক্তিয়ার আছে কি না এবং এই পরিষদ দিয়ে সংবিধান সংশোধন করলে তা সংবিধানেরই লঙ্ঘন হবে কি না?
ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া জুলাই সনদের ওই গেজেটকে ‘রাষ্ট্রপতির প্রশাসনিক আদেশ’ বলে মনে করছেন।
“কারণ, উনার পক্ষে কোনো সাংবিধানিক আদেশ দেওয়ার আইনগনভাবে কোথাও কোনো এক্তিয়ার নেই এবং এটা পার্লামেন্টারি ফরম অব গভর্নমেন্টের ধারণারও বাইরে,” আলাপ-কে বলেন তিনি।
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া প্রশ্ন তোলেন, “প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে আপনি সংবিধানের সংস্কার করবেন কীভাবে?”
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন আহমেদ গত ১৩ই নভেম্বর জারি করেন ‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) বাস্তবায়ন আদেশ, ২০২৫’-এর গেজেট।
এর আগে ‘সংস্কার’ নিয়ে বছরখানেক ধরে নানা ধরনের সংলাপ ও আলোচনা চালায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
সংস্কারের লক্ষ্যে বিভিন্ন কমিশন গঠন করা হয়। সেইসব কমিশনের সুপারিশ পর্যালোচনা ও গ্রহণের জন্য গঠন করা হয় আরেকটি কমিশন, নাম দেওয়া হয় ঐকমত্য কমিশন।
এরপর সংস্কার প্রতিবেদনগুলোর মধ্য থেকে ৮৪টি প্রস্তাবকে জুলাই চার্টার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং বিরাট আয়োজন করে সেই সনদে স্বাক্ষর করা হয় ১৭ অক্টোবর।
এরপরই রাষ্ট্রপতির গেজেট প্রকাশ করা হয়, যেখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয় গণভোট ও সংবিধান সংস্কারের বিষয়গুলো।
এতে বলা হয়, গণভোটে হ্যাঁ বিজয়ী হলে সংসদ সদস্যদের নিয়ে গঠিত হবে সংবিধান সংস্কার পরিষদ। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নেবেন।
এরপর ছয়মাস অর্থাৎ ১৮০ দিনের মধ্যে ‘সংবিধান সংস্কার সম্পন্ন’ করবেন তারা।
রাষ্ট্রপতির যে আদেশে এতকিছু, সেই আদেশকেই জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলছেন, “সেটা অবৈধ। উনার এক্তিয়ার ছিল না।”
সংসদ সদস্যরা এইভাবে দুইবার শপথ নিতে পারেন না বলে মনে করেন তিনি।
“রাষ্ট্রপতির আদেশেই এই সংবিধানটাকে পরিবর্তন করার জন্য দ্বিতীয়বার আরেকবার শপথ নেবেন। সেটা এই সংবিধানের সাথেই তো বেঈমানি হয়ে গেল। আপনি এই সংবিধানের অধীনে নির্বাচন করে আরেকটা শপথ নিয়ে বলছেন যে, ওই সংবিধানটা আমরা ছুঁড়ে ফেলবো।”
সুপ্রিম কোর্টের এই আইনজীবী বলেন, “তার মানে গাছের আগায় বসে গোড়া কাটার মতো ব্যাপার। উঠলেন যে গাছের গোড়া দিয়ে, সেটা কেটে ফেলবেন। আপনি নিজেও তো পড়বেন ওটা কাটলে।”
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের পাঁচদিনের মাথায় গত ১৭ই ফেব্রুয়ারি সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হয় নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান।
বিএনপি জোটের নির্বাচিতরা এমপি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান।
ওই ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখান জামায়াতে ইসলামীর জোটের নেতারা। প্রথমে তারা শপথ নেবেন না বলে হুমকি দেন। তবে কিছুক্ষণের মধ্যেই অবশ্য এমপি ও সংবিধান সংস্কার পরিষদের হিসেবে শপথ নেন।
এইভাবে দুইবার শপথ নেওয়া যায় না বলে মনে করেন সাংবাদিক খালেদ মুহিউদ্দীন।
“সংবিধানের মাধ্যমে আপনি মন্ত্রী-এমপি হওয়ার শপথ নিলেন। পরের শপথটাই আপনি এটা নিতে পারেন না যে, আমি সংবিধানটা ভাইঙা ফালাইবো। তাহলে আপনার আগের শপথটা ইনভ্যালিড (বাতিল) হয়ে যায়,” বলেন তিনি।
কেন দুইবার শপথ নেওয়া যায় না
সংসদ সদস্যরা কেন দুইবার শপথ নিতে পারেন না তা নিয়েও ব্যাখ্যা দিয়েছেন আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বিদ্যমান সাংবিধানিক পদ্ধতির মধ্যে থেকে সংবিধানকে অস্বীকার করা যায় না।
এই যুক্তির পক্ষে তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকার গঠন ও ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও হয়েছে বিদ্যমান সংবিধানের আওতায়। তাই এই সংবিধানকে অস্বীকার করা বা ভেঙে ফেলার এক্তিয়ার তাদের নেই।
গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দেশের পরবর্তী সরকার কীভাবে গঠিত হবে তা নিয়ে এক ধরনের অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
কোন ধরনের সরকার দেশ চালাবে তা নিয়ে সংবিধানে কোনো কাঠামো নেই। সাংবিধানিক ব্যবস্থায় অন্তর্বর্তী সরকার বলেও কিছুই নেই। সেই পরিস্থিতিতে সংবিধানের ১০৬ ধারা মেনে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন রাষ্ট্রপতি।
এরকম পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রপতি কী করতে পারবেন, তা নিয়ে ১০৬ ধারায় বলা হয়েছে, “যদি কোন সময়ে রাষ্ট্রপতির নিকট প্রতীয়মান হয় যে, আইনের এইরূপ কোন প্রশ্ন উত্থাপিত হইয়াছে বা উত্থাপনের সম্ভাবনা দেখা দিয়াছে, যাহা এমন ধরনের ও এমন জনগুরুত্বসম্পন্ন যে, সেই সম্পর্কে সুপ্রীম কোর্টের মতামত গ্রহণ করা প্রয়োজন, তাহা হইলে তিনি প্রশ্নটি আপীল বিভাগের বিবেচনার জন্য প্রেরণ করিতে পারিবেন এবং উক্ত বিভাগ স্বীয় বিবেচনায় উপযুক্ত শুনানির পর প্রশ্নটি সম্পর্কে রাষ্ট্রপতিকে স্বীয় মতামত জ্ঞাপন করিতে পারিবেন।”
অন্তর্বর্তী সরকার গঠন নিয়ে রাষ্ট্রপতি সুপ্রিম কোর্টের কাছে মতামত চান। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের মতামতের পর গঠিত হয় ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার।
সংবিধান মেনে রাষ্ট্রপতির কাছে শপথ নেন প্রধান উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টা পরিষদের অন্যান্য সদস্যরাও এবং সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে তারা কাজ করতে থাকেন।
কিন্তু বিভিন্ন সংস্কার বিশেষ করে সাংবিধানিক সংস্কারের বিষয় যত এগোতে থাকে ততই বাড়তে থাকে বিতর্ক।
শেখ হাসিনার পতনের আন্দোলনকে যারা সমর্থন করেছিলেন, তাদের অনেকেই বলতে থাকেন, সাংবিধানিক শপথ না নিয়ে ড. ইউনূসের সরকারের উচিৎ ছিল সংবিধান বাইরে গিয়ে নতুন ব্যবস্থায় শপথ গ্রহণ করা।
এদের একজন হলেন লেখক ও কবি ফরহাদ মজহার। তিনি বরাবরই বিপ্লবী সরকার গঠনের পক্ষে প্রচার চালিয়ে এসেছেন।
“প্রথমে বড় ভুল করেছি আমরা। পাঁচ তারিখে আমাদের উচিৎ ছিল রাজু ভাস্কর্য কিংবা শহিদ মিনারের সামনে শপথ নেওয়া জনগণের কাছে। শপথ নিয়েই বলা, বাংলাদেশের সংবিধান বাতিল এবং এখন থেকে বাংলাদেশের জনগণ নতুন গঠনতন্ত্র তৈরি করবে,” একটি অনুষ্ঠানে বলেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকার ‘পুরোনো সাংবিধানিক ব্যবস্থা’ বহাল রেখেছে বলে মন্তব্য করেন এবং তাদের অধীনে ‘নির্বাচন’ নিয়েও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে প্রশ্ন তোলেন প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ফরহাদ মজহার।
প্রায় একইরকম প্রশ্ন তুলেছেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিনি মনে করেন, পাঁচই অগাস্টের পর বর্তমান সংবিধানকে অগ্রাহ্য করে বিপ্লবী সরকার গঠন করলে এই প্রশ্নগুলো এখন উঠতো না।
“যদি এমন হতো, বিপ্লবী সরকার আসলো। তারা এই সংবিধান ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে, বললো যে আমরা নতুন সংবিধান রচনা করবো। আমরা যাক শহীদ মিনারে দাঁড়িয়েই শপথ নিলাম। এরপরের কাজ হতো, বিপ্লবী সরকার নতুন করে সংবিধান তৈরি করে, তার অধীনে নির্বাচন দিলো, নির্বাচন কমিশন গঠন করলো। সবকিছুর একটা নিউ ফরম। তাহলে এ ধরনের প্রশ্নগুলো আসতো না।”
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলছেন, “কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার শপথই নিলেন এই সংবিধানের অধীনে। নির্বাচন করলেন এই সংবিধানের অধীনে।”
তিনি মনে করেন, রাজনৈতিকভাবে কোনো ‘বিদ্যমান বিধিবিধান’ মেনে যদি আইনটাই পাল্টে ফেলতে চান, সেটা করার এক্তিয়ার আছে।
রাজনৈতিক শক্তি ঐক্যবদ্ধভাবে তা ‘শুরুতেই’ করতে পারত বলেও মনে করেন তিনি।
কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার বিদ্যমান সংবিধান মেনে, প্রচলিত কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করার পর, তারপর যখন সেই কাঠামোকেই ভেঙে ফেলতে চাচ্ছেন, প্রশ্ন উঠছে তখনই।
“আপনি যখন একবার বিদ্যমান নিয়ম মানতে শুরু করলেন, চেরি পিকিং করার আর কোনো সুযোগ নেই। মানে এইটুকু নিলাম, ওইটুকু নিলাম না। এইটুকু মানলাম, ওইটুকু মানলাম না। এ ধরনের দ্বিচারিতার কোনো ধরনের কোনো সুযোগ নাই।”
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া আরো বলেন, “আপনি যখন বিদ্যমান আইনের মধ্য দিয়ে কিছু করার চেষ্টা করবেন, তখন আপনার ওই বিদ্যমান আইন কাঠামোর মধ্যেই থাকতে হবে। এর বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।”
আর এই কাঠামোর ভেতরে থেকে রাষ্ট্রপতির আদেশে সংবিধান সংশোধনের গেজেট প্রকাশ করাটাকে ‘নজিরবিহীন’ ঘটনা বলে মনে করা হচ্ছে।
“এখানে আইনগত যে ব্যত্যয় হচ্ছে, রাষ্ট্রপতির প্রশাসনিক আদেশে সংবিধান পরিবর্তন করা যাবে না, যায় না। পৃথিবীতে কোথাও নজির নেই,” মন্তব্য জ্যোতির্ময় বড়ুয়ার।
তবে সংবিধানে অনেক কিছু না থাকলেও ‘গণঅভ্যুত্থান’ থেকে সেসব সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার।
তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে দায়িত্ব পালন করেছেন।
“এখন অনেকগুলো প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। প্রশ্ন তুলতেই পারেন। আমরা অনেক এক্সপার্টদের সঙ্গে আলাপ করে এটা করেছি তাদের সুপারিশে,” আলাপ-কে বলেন তিনি।
বদিউল আলম মজুমদার বলেন, “এখন এটা সংবিধানে নাই। সংবিধানে তো গত সরকারও ছিল না। সংবিধানে এই নির্বাচনও ছিল না। সংবিধানে অনেককিছুই ছিল না। এগুলো হয়েছে গণঅভ্যুত্থানের সৃষ্টি।”
তবে রাষ্ট্রপতির আদেশের ‘ভিত্তি’ না থাকায় দ্বিতীয় শপথ প্রথম শপথের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে মনে করছেন জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
“আপনি পরের শপথটা নিচ্ছেন যে, আমি এই সংবিধানের সব কাটাছেঁড়া করে ফেলে দেবো। কী দাঁড়াইলো? প্রথম শপথের সাথে দ্বিতীয় শপথ সাংঘর্ষিক।”
গণভোটের কী হবে?
সাংবিধানিক বিতর্কের মধ্য দিয়েই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে গেল, যেখানে ৬৮ শতাংশের বেশি 'হ্যাঁ' ভোট পাওয়ায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পথ খুলেছে বলে অনেকেই আশাবাদী।
কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে হ্যাঁ ভোট জেতার ফলেই কি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হবে?
এরই মধ্যে আদালতে গড়িয়েছে গণভোটের ভাগ্য। গণভোট পরিচালনা ও ফলাফলের বৈধতা নিয়ে হাইকোর্টে এক রিট আবেদনে ফলাফল বাস্তবায়ন করা থেকে বিরত রাখতে নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে।
প্রশ্নও উঠছে গণভোটের কাঠামোগত ভিত্তি এবং সেখানকার প্রশ্নমালা নিয়েও।
গণভোটে মোট চারটি প্রশ্ন যুক্ত করা হয়। হ্যাঁ অথবা না উত্তর যুক্ত করা হলেও সরকার হ্যাঁ-এর পক্ষে অবস্থান নেয় জোরালোভাবে।
এমনকি ভোটের ব্যালটে হ্যাঁ- এর পাশে ঠিক চিহ্ন দিয়ে সেখানে ভোট দিতে স্পষ্ট অবস্থান নেয় সরকার।
বাংলাদেশে আগের গণভোটগুলোর ইতিহাস টেনে এবারের গণভোটে চারটি ‘প্রশ্ন’ রাখাকে ‘গোঁজামিল’ বলে উল্লেখ করেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া। তিন বছর আগে অস্ট্রেলিয়াতে এই ধরনের ভোট বাতিলের নজিরও টানেন তিনি।
“আপনি যখন গণভোটে মতামত নেওয়ার চেষ্টা করবেন, তখন আসলে প্রশ্ন হবে একটি। গণভোটে উনারা প্রশ্নইতো করেছেন চারটি। খুবই ক্লামজি কতগুলো প্রশ্ন। সাধারণ জনগণের আসলে বোঝাবুঝির সুযোগই ছিল না যে, আসলে তারা কীসে হ্যাঁ দিচ্ছে, আর কোনোটাতেই বা না দিবে।”
তিনি বলেন, “এই যে প্রক্রিয়া, এইরকম ক্লামজি প্রশ্ন থাকার কারণে ২০২৩ সালে গণভোট বাতিল হয়েছে অষ্ট্রেলিয়াতে। সেই জায়গায় বাংলাদেশের চারটি সেলফ কন্ট্রাডিকটরি ইস্যুতে হ্যাঁ ভোট হলো। কী বিষয়ে হ্যাঁ ভোট হলো? সেটার মধ্যে গোঁজামিল।”
নোট অব ডিসেন্ট কোথায় গেল?
জুলাই সনদে সবই আগে থেকেই বিভিন্ন সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি তুলতে শুরু করে রাজনৈতিক দলগুলো, যদিও ‘নোট অব ডিসেন্ট’সহ বেশিরভাগ দলই তাতে সই করে।
ঐকমত্য কমিশনের আয়োজন করা জুলাই সনদ বিষয়ক সংলাপে অংশ নেয় ৩০টি রাজনৈতিক দল ও জোট অংশ নেয়।
১৬৬টি সংস্কারের প্রস্তাব আলোচিত হলেও দলগুলোর আপত্তিতে ৮২টি বাদ পড়ে। সনদে অন্তর্ভুক্ত করা হয় ৮৪টি প্রস্তাব।
তবে এসব প্রস্তাবের মধ্যেও আপত্তি ওঠে। সনদ সইয়ের সময় ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত জানিয়ে রাখে বিএনপিসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলো।
কিন্তু তাদের আপত্তির বিষয়গুলো কী কী ছিল এবং কেন তারা আপত্তি করেছিল, তা রাখা হয়নি সনদে।
এ নিয়েও যেমন বিতর্ক উঠছে; তেমনি প্রশ্ন উঠছে, ভিন্নমত নিয়ে সনদ বাস্তবায়ন করা সম্ভব?
“নোট অব ডিসেন্ট থাকলে, আসলে চার্টার তৈরি করার সুযোগ নাই। এটাই হচ্ছে বেসিক জায়গায় গলদ,” বলেন ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
“যেখানে নোট অব ডিসেন্টগুলো ছিল, জুলাই চার্টার যখন গেজেট করা হলো, তখন নোট অব ডিসেন্টগুলোকে সেখানে রাখা হলো না। নোট অব ডিসেন্ট হলো সংস্কার প্রস্তাবের অংশ। কারা কী, কোনোটাতে মত দিচ্ছেন, দিচ্ছেন না-সেটা পার্ট হিসেবেই গণ্য করতে হবে। সেটা থাকলো না।”
এই আইনজীবী জানান, নোট অব ডিসেন্ট না থাকলেও গেজেটের মধ্যে ‘কিছুটা উল্লেখ’ থাকলো যে, কারা কারা এইটার পক্ষে, আর কারা কারা এইটার বিপক্ষে।
“যখন আপনি বলছেন, মতৈক্যে পৌঁছানো যায়নি। যেটাতে পৌঁছানো যায়নি, সেটাতে জনগণের মতামত নেওয়ার কিছু নেই। সেখানে নিজেরাইতো আগে ঐকমত্যের মধ্যে আসতে পারলো না, তাহলে ওপিনিয়ন নেবে কার কাছ থেকে?”
তাহলে জুলাই সনেদের ভবিষ্যৎ কী? গণভোট ও সংস্কার কি বাতিল হয়ে যাবে?
Quote_Cards (1)
এই জবাব এখন রয়েছে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে সরকার গঠন করা বিএনপির ওপর। দলটির নেতারা ভোটের আগে সংস্কার প্রক্রিয়ার সঙ্গে ‘প্রায়’ একমত হয়েছিলেন এবং ভোটের পরেও বলেছেন যে, তারা সংস্কার চালিয়ে যাবেন।
তবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে ‘জটিলতা দেখছেন’ অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রক্রিয়ার অন্যতম মুখ্য ব্যক্তিত্ব বদিউল আলম মজুমদার।
“একটা জটিলতা সৃষ্টি হলো। আশা করি বিএনপি বলে যে, তারা এগুলো সংস্কার করবে। অপেক্ষা করতে হবে আরকি, অপেক্ষা করতে হবে,” বলেন তিনি।
বিএনপির এমপির শপথ না নেওয়ায় সংবিধান সংস্কার পরিষদ মুখ থুবড়ে পড়েছে। এই গঠনের গঠনের সম্ভাবনা এখন একেবারেই ফিকে হয়ে গেছে বলে অনেকের ধারণা।
তবুও কেউ কেউ প্রশ্ন করছেন যে, জামায়াত ও এনসিপির জোট মিলে ৬০ জনের কোরাম পূর্ণ করে কী সংস্কার চালাতে পারবে?
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, “পারবে। কিন্তু এইটার রেজাল্টটা কী?”
“ধরেন ২১২ সিট নিয়ে মেজরিটি বিএনপি। জামায়াত জোট ৭৭ পেয়েছে। ৬০ হলেই যদি যদি কোরাম পূর্ণ হয়, ওরা আবার বসে গেল সংবিধান সংশোধন করতে কাউন্সিল হিসেবে। আর এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে গণভোটের অর্ডিন্সেটাকেই বাতিল করে দিলো। তারপর? জটিল ব্যাপার।”
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া মনে করেন, সংগরিষ্ঠদের বাদ দিয়ে আপনি তো কিছুই করতে পারবেন না। গণভোটের অধ্যাদেশটাকেই বাতিল করে দিলো। আর এই আদেশটারই তো কোনো ভিত্তি নেই, যেটার মাধ্যমে দ্বিতীয়বার শপথ নিলো।
সংবিধান সংস্কার পরিষদ আদৌ আর এগোবে কি না, তা নিয়ে সন্দিহান বদিউল আলম মজুমদার।
“এখন পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। আদালতে মামলা হয়েছে। এখন মামলার রায় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে,” বলেন তিনি।
তাহলে গণভোট টিকবে নাকি বাতিল হয়ে যাবে?
এই প্রশ্নের জবাবে জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, “গণভোট একবার দিয়েছেন ঠিক আছে। কিন্তু ওইটার রেজাল্ট কী? গণভোটটায় কী করতে হবে? আফটার ইফেক্টটা কী? আফটার ইফেক্টকে বাস্তবায়নের যে আদেশ, সেটা অ্যাপ্লিকেবল না এবং সেটা টিকবেই না। এটা আদালতে চ্যালেঞ্জ করলে কালকেই বাতিল হওয়ার মতো একটা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অর্ডার।”
সমাধান কোথায়? সংস্কার কি বাস্তবায়ন হবে না?
সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ থেকে বিএনপি সরে আসার পরই তাদের দিকে অভিযোগের আঙুল তুলেছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। এই অবস্থানকে ‘সংস্কারের সঙ্গে প্রতারণা’ বলে দাবি করেছেন তিনি।
অবশ্য বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সংস্কারপ্রক্রিয়া চালিয়ে যাবে ক্ষমতাসীন দলটি।
দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, “জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পদ্ধতিগত দিক নিয়ে কাজ করতে হবে। সংসদ শুরু হলে আমরা আলাপ আলোচনা করবো। ইতোমধ্যে দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, জুলাই সনদের বিষয়ে বিএনপি আন্তরিক।”
সংবিধানে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা পুনরায় ফিরিয়ে আনার দাবিতে দেড় দশক আন্দোলন করেছে বিএনপি। এই প্রস্তাব তাদের ৩১ দফায়ও রয়েছে।
আবার একজন ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হতে পারবেন না বলে জুলাই সনদে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিএনপি ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান থাকার সময়ও তারেক রহমানও কেউ যাতে ‘পরপর দুইবারের বেশি প্রধানমন্ত্রী না হতে পারেন’ সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন।
সবমিলিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের রেখে যাওয়া সাত ডজন সংস্কার প্রস্তাবের কী হবে? এগুলো কি বাস্তবায়ন হবে?
জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, “নির্বাচিত সরকার চাইলেই কি জুলাই চার্টারে যা যা আছে তা কি ছুঁড়ে ফেলতে পারবে? আমি মনে করি না, সেটা করতে পারার মতো কোনো ম্যান্ডেট তাদের থাকবে বা তাদের অস্তিত্ব থাকবে ওইটা করলে।”
“তাদের এখন কী করতে হবে আসলে? বিদ্যমান আইনি ব্যবস্থার মধ্যে সাংবিধানিক বিধিব্যবস্থা অনুসরণ করেই যতটুকু যেভাবে পরিবর্তন করা যায় সেভাবে করতে হবে। এখন গণভোটের আইনটাও একটা অধ্যাদেশ। সেইটারও রেটিফিকেশনের প্রশ্ন আছে সংসদ কর্তৃক।”
তবে জনগণের ‘মতামত’ নিয়েই সংস্কার প্রস্তাবগুলো করা হয়েছে বলে মনে করেন বদিউল আলম মজুমদার।
“যারা বলে যে, এইটা সংবিধানে নাই। হ্যাঁ সংবিধানে তো নাই। সংবিধানে তো অনেক কিছু নাই। যখন জনগণ অনুমোদন করে, তখন এটা সংবিধান থেকে কম গুরুত্বপূর্ণ না, বরং আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। জনগণ সরাসরি অনুমোদন করেছে। গণভোট জনগণের সরাসরি মতামত। জনগণের মতামত আল্টিমেট। এইটেই শেষ কথা।”
গণভোট ও সংবিধান সংস্কার নিয়ে সরকারের গোঁজামিল থেকে বের হয়ে সমাধানের পথও আছে বলে মনে করেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
“যারা সংবিধানের এইসব পরিবর্তনগুলো করেছেন, বা এই সমস্ত বুদ্ধি পরামর্শ দিয়েছেন, তাদের নিজেদেরই কনস্টিটিশনালিজম যেটাকে বলে- সংবিধানের স্টাডি করতে গিয়ে জনগণের ক্ষমতাকে কীভাবে এক্সারসাইজ করতে হয়, এই বেসিক ধারণাগুলোতেই বড় রকমের গোলমাল ছিল।”
“যে কারণে এই গোঁজামিলগুলো করে গেছেন তারা এবং বিদ্যমান সংসদই এইগুলোতে আলোচনা করে তাদের মতো করে বের হয়ে আসতে পারবেন। বের হয়ে আসার সুযোগ আছে,” বলেন জ্যোতির্ময় বড়ুয়া।
সবমিলিয়ে গণভোট ও সংবিধান সংস্কার পরিষদকে ঘিরে তৈরি হওয়া বিতর্ক কেবল প্রশাসনিক বা আইনি নয়, এটি এখন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ধারাবাহিকতা, ক্ষমতার ভারসাম্য এবং জনমতের প্রকৃত অর্থ নিয়ে মৌলিক এক রাজনৈতিক দ্বন্দ্বে রূপ নিয়েছে।
একদিকে অন্তর্বর্তী সরকারের উদ্যোগকে ‘গণঅভ্যুত্থান-উদ্ভূত বৈধতা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। অন্যদিকে সমালোচকেরা বলছেন, বিদ্যমান সংবিধানের কাঠামোর ভেতরে থেকে সেই কাঠামোকেই অস্বীকার করা আইনি ও নৈতিকভাবে সাংঘর্ষিক।
রাষ্ট্রপতির প্রশাসনিক আদেশে গেজেট জারি, সংসদ সদস্যদের দ্বিতীয়বার শপথ, নোট অব ডিসেন্টের অনুপস্থিতি এবং গণভোটের প্রশ্নমালার কাঠামো- সব মিলিয়ে একটি জটিল সাংবিধানিক ধাঁধার জন্ম দিয়েছে।
আবার গণভোটের ভাগ্য আদালতে গড়ানো চূড়ান্ত আইনি অবস্থান স্পষ্ট হতে সময় লাগবে।
এরসঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভোটের পরে রাজনৈতিক বাস্তবতা; সংখ্যাগরিষ্ঠ দল সরে দাঁড়ালে সংস্কার পরিষদের কার্যকারিতা কতটুকু থাকে?