ছেলের এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের টাকা জোটেনি নাসিমা আক্তারের। আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুরে একটি পোশাক কারখানায় সুইং অপারেটরের কাজ করেন তিনি। মাস শেষে পান ১৪ হাজার ৫০০ টাকা। এই টাকা থেকে চাল, ডাল, তেল, সবজি আর ঘরভাড়া মেটানোর পর ছয়জনের সংসারে পরীক্ষার ফরমের জন্যও কিছু থাকে না। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে নিজের সংসারের এই হিসাব দিয়েছেন নাসিমা।
একজন শ্রমিকের মাসিক আয় ১৪,৫০০ টাকা। তারপরও ছেলের পরীক্ষার ফরম পূরণের টাকা নেই। প্রশ্ন হলো, সংসার চালাতে তাহলে তার কত টাকা প্রয়োজন? আর সেই প্রয়োজন মেটানোর মতো বেতন দেওয়ার সামর্থ্য পোশাক কারখানাগুলোর আছে কি-না?
পহেলা নভেম্বর সরকার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে। শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে, মজুরি সেই অনুপাতে বাড়েনি, এই অভিযোগ বহুদিনের। অন্যদিকে কারখানামালিকদের বক্তব্য, উৎপাদন খরচ, জ্বালানি, ঋণ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার চাপের মধ্যে বড় অঙ্কের মজুরি বৃদ্ধি সামলানো সহজ নয়। বোর্ডের সামনে এখন এই দুই হিসাব মেলানোর চ্যালেঞ্জ।
তাহলে, নতুন মজুরি কত হতে পারে? আগের মজুরির ইতিহাস, বর্তমান বাজার এবং উৎপাদনের খরচ পাশাপাশি রাখলে আলোচনার একটি ভিত্তি পাওয়া যায়।
৬২৭ টাকার সংসার
বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে প্রথম ন্যূনতম মজুরি কাঠামোর বহুল উল্লেখিত অঙ্ক ৬২৭ টাকা। সময়টি ১৯৮৪–৮৫ সালের দিকের। অবশ্য ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি প্রেসের ‘ইজ দ্য বাংলাদেশ প্যারাডক্স সাসটেইনেবল?’ গ্রন্থের একটি অধ্যায়ে ১৯৮৪ সালের প্রথম মজুরি বোর্ডের অঙ্ক ৫৬০ টাকা বলা হয়েছে। মূল সরকারি প্রজ্ঞাপন ছাড়া এই পার্থক্যের নিষ্পত্তি করা যাচ্ছে না। ৬২৭ টাকা ধরে নিচের ঐতিহাসিক তুলনাটি করা হয়েছে।
তখন চালের দাম কত ছিল? বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৯৮৩–৮৪ অর্থবছরের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৮৪ সালের জুনে মোটা চালের গড় ন্যূনতম খুচরা দাম ছিল কেজি প্রতি ৭ টাকা ১২ পয়সা। সেই দামে পুরো মজুরি দিয়ে প্রায় ৮৮ কেজি চাল কেনা যেত। কিন্তু পুরো মাসের বেতন তো চালের দোকানেই রেখে আসা যায় না। ভাড়া ছিল, চিকিৎসা ছিল, পরনের কাপড়ও লাগত।
তখনকার বাজারেও মূল্যস্ফীতির চাপ ছিল। ঢাকার মধ্যবিত্ত পরিবারের ভোক্তা মূল্যসূচক ১৯৮৩ সালের জুনের ৩৪০.৩০ থেকে পরের বছরের জুন পর্যন্ত ৩৮২.২৬ হয়েছিল। অর্থাৎ বৃদ্ধির পরিমাণ ছিল ১২.৩৩ শতাংশ। খাদ্যপণ্যের সূচক বেড়েছিল ১৭.৫৩ শতাংশ। অর্থাৎ আশির দশকের সংসারও বাজারের ধাক্কার বাইরে ছিল না। তবে, এটি মধ্যবিত্ত পরিবারের তৎকালীন সূচক, শ্রমিকের এখনকার ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি তুলনা করা যাবে না।
ঘরভাড়ার কাছে আটকে থাকা বেতন
১৯৮৮ সালের ঢাকা পৌর এলাকার বস্তি ও অনানুষ্ঠানিক বসতির জরিপের সারণিতে। সেখানে মাসিক ভাড়ার প্রচলিত সীমা ছিল ২০০-২৫০ টাকা। যুক্তরাজ্যের বাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০০ সালে জমা দেওয়া মো. ইকবাল আলম খানের পিএইচডি গবেষণা ‘স্ট্রাগল ফর সারভাইভাল: নেটওয়ার্কস অ্যান্ড রিলেশনশিপস ইন আ বাংলাদেশ স্লাম’-এ উদ্ধৃত একটি সারণি থেকে এ তথ্যটি পাওয়া গেল।
এবার গাজীপুরের পোশাকশ্রমিক লাকির ঘরে আসা যাক। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে তিনি জানিয়েছেন, তার বাসাভাড়া চার হাজার টাকা। পুরোনো জরিপ ও লাকির অভিজ্ঞতা ভিন্ন সময় ও ভিন্ন এলাকার ছবি। এগুলো দিয়ে একই ধরনের ঘরের ভাড়া বৃদ্ধির হার নির্ধারণ করা যায় না।
সাম্প্রতিক চিত্র তুলনামূলক স্পষ্ট। প্রথম আলোয় প্রকাশিত বিবিএসের হিসাবে, ২০২২ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে বাড়িভাড়া বেড়েছে প্রায় ২৭ শতাংশ। শ্রমিকের আবাসনের ব্যয় তাই শুধু কারখানার মজুরি দিয়ে সামলানোর বিষয় নয়। সাশ্রয়ী বাসস্থান, যাতায়াত ও প্রয়োজনীয় সেবায় সরকারের উদ্যোগও দরকার। নইলে বাড়তি বেতনের একটি অংশ ভাড়া ও সংশ্লিষ্ট খরচেই চলে যাবে।
২০১৪ সালের হিসাবখাতা
২০১৫ সালে দৈনিক ইত্তেফাকে প্রকাশিত একটি লেখায় আগের বছরের মাঠসমীক্ষার বিবরণ পাওয়া যায়। সাভার, আশুলিয়া ও উত্তরার ৪৭টি কারখানার ২৫০ জন শ্রমিকের ওপর সমীক্ষাটি করা হয়েছিল।
সেখানে চার থেকে পাঁচ সদস্যের পরিবারের মাসিক খাবার খরচ ধরা হয় ৫থেকে ৬ হাজার টাকা, বাড়ি ভাড়া ২ থেকে ৩ হাজার টাকা, সন্তানের পড়াশোনা ১ হাজার থেকে দেড় হাজার টাকা, চিকিৎসা ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা এবং পোশাক ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা। সব মিলিয়ে মাসিক ন্যূনতম প্রয়োজনের অঙ্ক প্রায় ১১,৩০০ টাকা।
অথচ তখন একজন উপার্জনকারী শ্রমিক ওভারটাইমসহ পেতেন ৬ থেকে ৭ হাজার টাকা। পরিবারের একাধিক সদস্য কাজ করলে সম্মিলিত আয় দাঁড়াতো গিয়ে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকাতে।
সংসার টানতে তখনও বাড়তি কর্মঘণ্টা অথবা আরেকজন উপার্জনকারী লাগত। এক দশকের বেশি সময় পরও সেই হিসাবের ধরন খুব বদলায়নি।
বাজারের থলে ভরার আগেই টাকা শেষ
ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ, টিসিবির হিসাবে এই বছরের ৩০ অক্টোবর ঢাকায় মোটা চালের দাম ছিল কেজিপ্রতি ৫০ থেকে ৫৫ টাকা, মাঝারি চাল ৫৬ থেকে ৬৫ টাকা। অক্টোবরের শেষে বাংলা ট্রিবিউনের বাজার প্রতিবেদনে ব্রয়লার মুরগি ১৮০ থেকে ১৯০ টাকা কেজি, ডিম ডজনপ্রতি ১৩০ থেকে ১৪০ এবং অনেক সবজি ৬০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রির তথ্য আছে।
ধরা যাক, কোনো শ্রমিক পরিবার নিয়ে ৬ হাজার ৫০০ টাকা মাসিক ভাড়ার বাসায় পরিবার নিয়ে থাকেন। ২০২৩ সালের ঘোষিত কাঠামোর প্রারম্ভিক ন্যূনতম মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে বাড়ি ভাড়া বাদ দিলে থাকে ৬ হাজার টাকা।
এই টাকায় মাসের বাজার করতে হবে। ৩০ কেজি মাঝারি চাল ৬০ টাকা দরে ১ হাজার ৮০০ টাকা, ৩ কেজি ডাল আনুমানিক ৩৫০ টাকা, ৩০টি ডিম ৩৫০ টাকা এবং পাঁচ লিটার তেল প্রায় ১ হাজার টাকা ধরলে এই কয়েকটি পণ্যেই খরচ প্রায় ৩ হাজার ৫০০ টাকা।
বাকি থাকে আড়াই হাজার টাকা। তখনও মাছ, সবজি, জ্বালানি, যাতায়াত, চিকিৎসা ও সন্তানের পড়াশোনা বাকি। এটি পূর্ণাঙ্গ পুষ্টির তালিকাও নয়। শ্রমিকের বাজারে সরকারি তালিকার সর্বনিম্ন দাম সব সময় পাওয়া যায় না। আবার সব পরিবারের খাদ্য চাহিদাও এক না। এই হিসাবেই বোঝা যায়, শুধু মৌলিক কয়েকটি খরচ মেটাতেই বেতনের বড় অংশ শেষ হয়ে যাচ্ছে।
লাকির অভিজ্ঞতায় ঘাটতির বিষয়টা আরও স্পষ্ট। গাজীপুরের এই পোশাকশ্রমিক ওভারটাইমসহ মাসে ২১,৯০০ টাকা আয় করেও দুই সন্তানসহ চার সদস্যের সংসারে চালাতে ঋণ করতে হয়। তার বক্তব্যে মজুরি বাড়ানোর তাগিদের সঙ্গে কারখানার সামর্থ্যের চিন্তাও আছে। বেশি বেতন ঠিক হলে মালিক তা নিয়মিত দিতে পারবেন কি না, সেই আশঙ্কাও রয়েছে।
অর্থাৎ, বেশি মজুরির পাশাপাশি নিয়মিত বেতন পাওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। মাস শেষে বেতন পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকলে ঘোষিত নতুন ন্যূনতম মজুরির সুফলও পাওয়া যাবে না।
প্রয়োজনের অঙ্ক আর দাবির অঙ্ক
পোশাক খাতে সর্বশেষ ন্যূনতম মজুরি নির্ধারিত হয় ২০২৩ সালে। তখন প্রারম্ভিক মজুরি আট হাজার থেকে বাড়িয়ে ১২ হাজার ৫০০ টাকা করা হয়। সেই বছরের ১লা ডিসেম্বর থেকে কার্যকর হওয়া এই বৃদ্ধির হার ছিল ৫৬.২৫ শতাংশ। এটি ঘোষিত প্রারম্ভিক অঙ্ক। ইনক্রিমেন্ট পাওয়া পুরোনো শ্রমিকের বর্তমান বেতন আলাদা।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ৮.৩৪ শতাংশ। বিডিপলিসিল্যাবের হিসাবে, ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে নির্ধারিত মজুরি পরবর্তী মূল্যস্ফীতিতে ক্রয়ক্ষমতার বিচারে ২২.৩ শতাংশ মূল্য হারিয়েছে।
এই ক্ষয় পুষিয়ে আগের অবস্থায় ফিরতেই প্রয়োজন প্রায় ১৬ হাজার ১০০ টাকা। অর্থাৎ ওই অঙ্কে পৌঁছানো মানে জীবনমানের উন্নতি নয়, হারানো ক্রয়ক্ষমতা উদ্ধার করা।
তবে জীবনধারণযোগ্য মজুরির হিসাব আরও বেশি। আঙ্কার রিসার্চ ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের হালনাগাদ হিসাবে, ঢাকা শহরের জন্য একজন পূর্ণকালীন শ্রমিকের মাসিক মজুরি ৩০ হাজার ৪৫৯ টাকা। আশপাশের শিল্পাঞ্চলের জন্য তা ২৫ হাজার ১৬৬ টাকা।
ঢাকার হিসাবটিতে চার সদস্যের পরিবার, গড়ে ১.৫৮ জন উপার্জনকারী এবং পরিবারের মোট ন্যূনতম ব্যয় ৪৮ হাজার ২২ টাকা ধরা হয়েছে। এটি পরিবারের একাধিক উপার্জনকারী ধরে হিসাব করা ব্যক্তিপ্রতি মজুরি। তাই একে সরাসরি পরিবারের মোট প্রয়োজনীয় ব্যয় হিসেবে দেখা যাবে না।
শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি ৩০ হাজার টাকা থেকে ৩৭ হাজার ১২৫ টাকার মধ্যে। তিনটি উল্লেখযোগ্য প্রস্তাব পাশাপাশি রাখলে পার্থক্যটি বোঝা যায়।
এগুলো সংগঠনগুলোর পূর্ণ তালিকা নয়। তবে দাবিগুলোর মধ্যে পার্থক্য শুধু মোট টাকার অঙ্কে নয়, মজুরি কাঠামোতেও। মূল মজুরি কত হবে, আর কতটা ভাতা হিসাবে দেওয়া হবে, সেটিও দর-কষাকষির বিষয়।
এখানে চার ধরনের হিসাব রয়েছে। প্রায় ১৬ হাজার ১০০ টাকা হলো মূল্যস্ফীতিতে ক্ষয় হওয়া ক্রয়ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের অঙ্ক। ২৫ হাজার ১৬৬ টাকা থেকে ৩০ হাজার ৪৫৯ টাকা জীবনধারণযোগ্য মজুরির গবেষণাভিত্তিক হিসাব।
আর ৩০ হাজার টাকা থেকে ৩৭ হাজার ১২৫ টাকা শ্রমিক সংগঠনগুলোর দাবি। এগুলোর সঙ্গে আগের মজুরি বৃদ্ধির ধারাও মিলিয়ে দেখা দরকার।
আগে কত চাওয়া হয়েছিল, কত মিলেছিল
মজুরি বোর্ডে শ্রমিকপক্ষ যে দাবি তোলে তা শেষ পর্যন্ত হুবহু গৃহীত হয়না। আগের কয়েক দফার ইতিহাসে সেই ব্যবধান দেখা যায়।
আগের দাবির বিপরীতে চূড়ান্ত মজুরির অনুপাত দিয়ে এবারের মজুরি নির্ভরযোগ্যভাবে অনুমান করা যাবে না। সময়, বাজার এবং পোশাক শিল্পখাতের অবস্থা বদলেছে। তবে আগের মজুরি বৃদ্ধির হার তুলনা করলে একটা ধারণা পাওয়া যায়।
এবার ১২ হাজার ৫০০ টাকার ওপর আগের চার দফার একই বৃদ্ধির হার প্রয়োগ করলে অঙ্কটা দাঁড়ায় এমন:
অর্থাৎ, আগের চার দফা বৃদ্ধির হার ধরলে এবার প্রারম্ভিক মজুরি দাঁড়াতে পারে ১৮ হাজার ৯০০ টাকা থেকে ২২ হাজার ৬০০ টাকার মধ্যে। অন্যদিকে, ১২ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ৩০ হাজার টাকা করতে হলে তা বাড়াতে হবে ১৪০ শতাংশ। যা আগের চার দফার প্রতিটি বৃদ্ধির হারের চেয়ে বেশি।
অবশ্য শুধু অতীত বৃদ্ধির হার দিয়ে বর্তমান সময়ের প্রয়োজন নির্ধারণ করা যায় না। গেল কয়েক বছরের মূল্যস্ফীতি, বাড়িভাড়া, শ্রমিকের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা এবং পোশাক শিল্পের বর্তমান অবস্থাও বিবেচনায় নিতে হবে। ইতিহাস এখানে তুলনার ভিত্তি, চূড়ান্ত সুপারিশ না।
শ্রমিকের ৫ হাজার, কারখানার ৫০ লাখ
শ্রমিকের সংসারে পাঁচ হাজার টাকা বাড়তি আয় মানে কিছুটা স্বস্তি। কিন্তু কারখানার হিসাবে একই অঙ্কের প্রভাব অনেক বেশি।
একটি কারখানায় এক হাজার শ্রমিকের প্রত্যেকের বেতন পাঁচ হাজার টাকা বাড়লে সরাসরি বেতন ব্যয় বাড়ে মাসে ৫০ লাখ টাকা, বছরে ছয় কোটি টাকা। এটি প্রত্যেকের গড় বৃদ্ধি ৫ হাজার ধরে উদাহরণ; কোনো কারখানার প্রকৃত হিসাব নয়। মূল মজুরির পরিবর্তনে ওভারটাইম ও সংশ্লিষ্ট পাওনাও বাড়লে ব্যয় আরও বদলাবে।
তবে শ্রমিকের মজুরি যে হারে বাড়বে, কারখানার মোট উৎপাদন ব্যয়ও সেই হারে বাড়বে, বিষয়টা এমন না। উদাহরণ হিসেবে, মোট ব্যয়ের ২০ শতাংশ শ্রমব্যয় হলে, আর সেই শ্রমব্যয় ৫০ শতাংশ বাড়ে, তাহলে অন্য সব খরচ অপরিবর্তিত থাকলে মোট উৎপাদন ব্যয় বাড়বে ১০ শতাংশ।
অর্থাৎ, মজুরি বৃদ্ধির প্রকৃত প্রভাব বুঝতে কারখানার ব্যয়ের কাঠামো দেখতে হবে। কাঁচামাল, ঋণের সুদ, জ্বালানি, পরিবহন, উৎপাদন ব্যবস্থাপনা এবং অন্যান্য খরচের তুলনায় শ্রমব্যয়ের অংশ কত, সেটি গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশি ক্রেতারা পণ্যের দাম না বাড়ালে এই বাড়তি অর্থ কোথা থেকে আসবে, মালিকের উদ্বেগের জায়গা সেখানেই।
চাপে আছে পোশাক কারখানা
শ্রমিকের সংসারে ঘাটতি থাকলেও সব কারখানার হাতে তা মেটানোর মতো উদ্বৃত্ত নেই। বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে স্পারো গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শোভন ইসলাম মজুরি বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও শিল্পের সক্ষমতার প্রশ্ন তুলেছেন। ভিয়েতনামের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় শ্রমিকের দক্ষতা বিবেচনার কথাও বলেছেন তিনি।
পোশাক কারখানামালিকের হিসাব মাসের বেতনেই শেষ হয় না। কাঁচামাল, ঋণ, জ্বালানি ও সময়মতো চালান পাঠানোর খরচও আছে। উৎপাদন থেমে থাকলেও কিছু স্থায়ী ব্যয় চলতেই থাকে। বিকল্প জ্বালানিতে কাজ চালাতে হলে অথবা চালান দেরি হলে বাড়তি চাপ তৈরি হতে পারে। বড় রপ্তানিকারক ও ছোট সাব-কন্ট্রাক্টিং কারখানার পক্ষে সেই ধাক্কা সামলানোর ক্ষমতাও সমান নয়।
অক্টোবর–ডিসেম্বরের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি মৌসুমে ক্রয়াদেশ সরে যাওয়ার আশঙ্কা জানিয়েছেন শাশা গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক শামস মাহমুদ। অন্য উৎপাদক দেশেও ক্রয়াদেশ নেওয়ার সক্ষমতা আছে, সেটিই তার উদ্বেগ। নির্ধারিত সময়ে পণ্য পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হলে ক্রেতা বিকল্প খুঁজতে পারেন। তবে আশঙ্কা আর বাস্তবে ক্রয়াদেশ সরে যাওয়ার পরিমাণ আলাদা করে দেখতে হবে।
এসবের সবকিছু একজন মালিকের নিয়ন্ত্রণে থাকে না। বিশ্ববাজারে চাহিদা কমা, যুদ্ধের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন কিংবা গ্যাস-বিদ্যুতের অনিশ্চয়তার জন্য তাকে একা দায়ী করা যায় না। আবার শ্রমিকের প্রয়োজনও এসব কারণে ছোট হয়ে আসে না। মজুরি বোর্ডের কাজ হবে খরচ ও সামর্থ্যের দাবি যাচাই করে এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো, যা ঘোষণার পর নিয়মিত দেওয়া সম্ভব।
সরকার সহায়তা দেবে কি না, মালিকেরা সেই প্রশ্নও তুলেছেন। সহায়তা কেবল কারখানায় টাকা দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ হতে হবে কেন? নির্ভরযোগ্য জ্বালানি, শ্রমিকের সাশ্রয়ী আবাসন ও লক্ষ্যভিত্তিক খাদ্যসহায়তাও চাপ কমানোর নীতিগত পথ হতে পারে।
দক্ষতার প্রসঙ্গেও হিসাবটি দুই দিক থেকে দেখতে হবে। প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি ও ব্যবস্থাপনা উৎপাদনে ভূমিকা রাখে। শ্রমিকের হাতের গতিই একমাত্র মাপকাঠি নয়। তাই সামর্থ্যের আলোচনা যেমন প্রয়োজন, তেমনি কারখানাভিত্তিক তথ্য প্রকাশও প্রয়োজন। সব মালিককে এক পাল্লায় মেপে কিংবা সব দায় শ্রমিকের ওপর রেখে বিশ্বাসযোগ্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
একই বাজারে অন্য শ্রমিকেরা
পোশাকশিল্পের মজুরি নিয়ে আলোচনা হলেও একই বাজারে অন্য খাতের শ্রমিকেরাও জীবনযাত্রার ব্যয়ের চাপে আছেন। ট্যানারি খাতে বিভাগীয় শহর ও সাভারের জন্য ২০২৪ সালের কাঠামোয় ন্যূনতম মজুরি ১৮,০০১ টাকা। হোটেল-রেস্তোরাঁ খাতে ২০২৫ সালের কাঠামোয় এক তারকা হোটেল ও সর্বোচ্চ ১০০ আসনের রেস্তোরাঁর সর্বনিম্ন গ্রেডে ১৩,০৫০ টাকা। পোশাকশিল্পে ২০২৩ সালের ঘোষিত প্রারম্ভিক অঙ্ক ১২,৫০০ টাকা।
কাজ, দক্ষতা ও ব্যবসার ধরন আলাদা বলে এক খাতের অঙ্ক অন্য খাতে সরাসরি বসানো যায় না। সব খাতের শ্রমিকর একই বাজার থেকে চাল-ডাল-সবজি-মাছ-মাংস কেনে। আর বাড়িভাড়া, যাতায়ত খরচ, চিকিৎসা ব্যয়সহ অন্যান্য সব খরচও একই সবার জন্য।
সেজন্য মজুরি পর্যালোচনা শুধু পোশাকশিল্পে সীমাবদ্ধ রাখার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে শ্রমিকের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সরকারেরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে। সাশ্রয়ী আবাসন, গণপরিবহন, চিকিৎসা ও প্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যে সহায়তা থাকলে চাপ কমবে। শুধু মজুরি বাড়িয়ে সব সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। আবার এসব সেবার ঘাটতি দেখিয়ে ন্যায্য মজুরির প্রশ্নও এড়িয়ে যাওয়া যাবে না।
মজুরি ও কর্মসংস্থান, দুটিই রক্ষার প্রশ্ন
মজুরি বাড়ানোর আলোচনায় আরেকটি প্রশ্ন প্রায়ই আসে; কারখানার ব্যয় বেড়ে গেলে মালিকরা শ্রমিক কমাবেন? কিছু কাজে যন্ত্রের ব্যবহার বাড়িয়ে কম শ্রমিকে উৎপাদন চালানোর চেষ্টা হতে পারে। তবে অটোমেশনও বিনা খরচে সম্ভব নয়। যন্ত্রপাতি কেনার জন্য পুঁজি লাগে, প্রয়োজন হয় দক্ষ জনবলের। সব কারখানার সেই সামর্থ্য নেই। আবার সব কাজ পুরোপুরি যন্ত্রের মাধ্যমে করাও সহজ নয়
তবে, অটোমেশন যে মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে গবেষণাতেও তার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে। ২০২৫ সালে প্রকাশিত ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশনের গবেষণায় ৪২৯ জন শ্রমিকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, অটোমেশনের পর উৎপাদন লাইনে শ্রমিকসংখ্যা গড়ে ৩০.৫৮ শতাংশ কমেছে। বেশি চাপে পড়েছেন হেলপাররা। এটি জরিপে অন্তর্ভুক্ত উৎপাদন লাইনের হিসাব, সারা দেশের চাকরি হারানোর হার নয়। স্থানচ্যুত শ্রমিকদের একাংশকে অন্য বিভাগেও নেওয়া হয়েছে।
২০২৪ সালে ‘দ্য ইন্ডিয়ান জার্নাল অব লেবার ইকোনমিকস’-এ প্রকাশিত মাহতাব উদ্দিন ও ফারহিন ইসলামের গবেষণায় হিসাব করা হয়েছে, উৎপাদনসহ অন্য পরিস্থিতি অপরিবর্তিত থাকলে প্রযুক্তিগত উন্নতিতে উৎপাদনশীলতা ৩০ শতাংশ বাড়ার ফলে বাংলাদেশের উৎপাদনশিল্পে প্রায় ১২ লাখ ২০ হাজার কর্মসংস্থান কমতে পারে। এটি শুধু গার্মেন্টসের হিসাব নয়, তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়ার কথা বস্ত্র ও পোশাক খাতের। উৎপাদন বাড়লে কিংবা প্রযুক্তি শ্রমিককে সরিয়ে দেওয়ার বদলে তাঁর কাজের সামর্থ্য বাড়ালে ফল ভিন্নও হতে পারে।
এই গবেষণাগুলো মজুরি বৃদ্ধির কারণে চাকরি হারানোর হিসাব নয়। এগুলো প্রযুক্তির পরিবর্তনে কর্মসংস্থানের ঝুঁকি নিয়ে।
তবে প্রযুক্তির পরিবর্তনে কাজ রক্ষার প্রস্তুতি প্রয়োজন। মজুরি নির্ধারণেও শ্রমিকের প্রয়োজনের সঙ্গে কারখানার সামর্থ্য মিলিয়ে দেখতে হবে।
বৃদ্ধির হার ও সময় এমন হওয়া দরকার, যাতে শ্রমিক কিছুটা স্বস্তি পান, কারখানাও বাড়তি ব্যয় সামলে নিতে পারে। আর নতুন যন্ত্র এলে পুরোনো শ্রমিককে সেই যন্ত্রে কাজ শেখানোর দায়িত্বও নিতে হবে।
নাসিমার বেতন বাড়া প্রয়োজন, কিন্তু তার কাজটিও থাকা প্রয়োজন। মালিকপক্ষকে তাই কতটা দিতে পারবেন এবং আরও দেওয়ার পথে কী বাধা, তার স্বচ্ছ হিসাব তুলে ধরতে হবে। সেই বাধা কাটাতে সরকার ও ক্রেতাদের ভূমিকা নির্দিষ্ট হলে শ্রমিকের প্রাপ্য মেটানোও সহজ হবে।
শুধু মজুরি বাড়লেই হবে না, নিয়মিতও হতে হবে
নতুন মজুরি বোর্ডের সামনে কাজ তাই শুধুই একটা সংখ্যা নির্ধারণ করা না। শ্রমিকের সংসার চালাতে কত টাকা প্রয়োজন, কারখানার পক্ষে কতটা দেওয়া সম্ভব এবং বাড়তি ব্যয় সামলাতে সরকার ও বিদেশি ক্রেতাদের কী ভূমিকা থাকতে পারে, তারও হিসাব করতে হবে।
এক ধাপে বড় বৃদ্ধি কিছু কারখানার জন্য কঠিন হতে পারে। তাই বৃদ্ধির সময়সূচি, লক্ষ্যভিত্তিক সরকারি সহায়তা এবং উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েও ভাবতে হবে। নির্ভরযোগ্য গ্যাস-বিদ্যুৎ, সহজ অর্থায়ন, শ্রমিকের প্রশিক্ষণ ও সাশ্রয়ী আবাসন, এসবের সঙ্গেও মজুরি নির্ধারণের সম্পর্ক রয়েছে।
আবার সব কারখানার আর্থিক অবস্থাও এক না। বড় রপ্তানিকারক ও ছোট সাব-কন্ট্রাক্টিং কারখানার সক্ষমতা আলাদা। তাই কারখানাভিত্তিক তথ্য যাচাই না করে কোনো অঙ্ককে সবার জন্য তা বাস্তবায়নযোগ্য তা বলা কঠিন।
তবে মালিকের সক্ষমতার যুক্তি দিয়ে শ্রমিকের ন্যূনতম প্রয়োজন উপেক্ষা করা যাবে না। আবার এমন অঙ্ক নির্ধারণ করেও লাভ নেই, যা ঘোষণার পর নিয়মিত দেওয়া সম্ভব হবে না। শ্রমিকের মজুরি বৃদ্ধির সুফল তখনই পাওয়া যাবে, যখন বেতন সময়মতো তাদের হাতে পৌঁছবে।
নাসিমা আক্তারের ছেলের এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণের টাকা আসা উচিৎ তার নিয়মিত বেতন থেকেই। আর সেই বেতন বাড়ানোর মতো সক্ষমতা কারখানায় তৈরি হওয়াও জরুরি। নতুন মজুরি কাঠামোর সাফল্য শেষ পর্যন্ত শুধুই ঘোষিত অঙ্ক দিয়ে মাপা যাবে না। দেখতে হবে, শ্রমিকে সংসারে তার কতটা প্রভাব পড়ল এবং কারখানাগুলো সেই মজুরি নিয়মিত দিতে পারবে কি-না।