ধেয়ে আসছে এল নিনো: কতোটা প্রস্তুত এশিয়া

কোথাও তীব্র গরম, কোথাও শুকিয়ে যাচ্ছে জলাধার। আবার কোথাও রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টি। ফসলের মাঠে পানি নেই, বাজারে খাদ্যমূল্য দিনকে দিন বেড়েই চলেছে। সংকটের নাম- এল নিনো। এই প্রাকৃতিক সংকটের প্রভাব বিভিন্ন পরিসরে ঘিরে ধরেছে এশিয়াকে। 

প্রশান্ত মহাসাগর থেকে ধেয়ে আসা এল নিনো শুধু আবহাওয়ার সংকট নয়। এশিয়ায় এটি খাদ্য, পানি ও নিরাপত্তার জন্যও হুমকি হয়ে উঠতে পারে। চলতি বছরের শেষ দিকে এবং ২০২৭ সালের শুরুতে এল নিনো তীব্র রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা।

গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে মানুষের তৈরি দীর্ঘমেয়াদী জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলতে পারে। এবারের এল নিনো আগের অনেক রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে বলেও সতর্কতা রয়েছে। এর প্রভাব কৃষি, পানি, খাদ্য সরবরাহ, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, পরিবহন এমনকি সামাজিক স্থিতিশীলতার ওপরও পড়তে পারে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, এল নিনোর কারণে এশিয়ার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ চরম খাদ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন। জাতিসংঘের মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেসও সতর্ক করে বলেছেন, ‘এল নিনো আমাদের সামনেই ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে।’

এশিয়ার দেশগুলো তাই এবার শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাসের দিকে তাকিয়ে নেই। কোথাও কৃষকদের কম পানি লাগে এমন ফসল চাষে উৎসাহ দেওয়া হচ্ছে, আবার কোথাও সম্ভাব্য পানির সংকট মোকাবিলায় সমুদ্রের লবণাক্ত পানি পরিশোধনের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।

ধেয়ে আসছে এল নিনো। ছবি: এআই

চীনে ১০০ দিনের অভিযান

এল নিনোর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় চীন এরই মধ্যে কাজ শুরু করেছে।

গত ৯ই অগাস্ট হংকংয়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড হওয়ার পর তীব্র গরমের সময় কর্মীদের সুরক্ষায় নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।

কাজের সময়সূচি পরিবর্তন, শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত পরিবেশ এবং কর্মীদের পর্যাপ্ত বিরতির ব্যবস্থা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রচণ্ড গরমের সময় কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে নিয়োগকর্তাদের আইনি ব্যবস্থার মুখোমুখি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

চীনের মূল ভূখণ্ড বা মেইনল্যান্ডে পরিস্থিতি আরও বিস্তৃতভাবে মোকাবিলার প্রস্তুতি চলছে। চরম আবহাওয়ার জন্য প্রস্তুতি এবং খরা ও অতিবৃষ্টির মতো পরিস্থিতি থেকে ফসল রক্ষায় শুরু হয়েছে ১০০ দিনের বিশেষ অভিযান।

বেইজিং প্রাথমিক সতর্কতা ও আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার পরিকল্পনা নিয়েছে। একই সঙ্গে গত জুলাইয়ে চালু করা জাতীয় পরিকল্পনার আওতায় শহরগুলোকে ‘জলবায়ু ঝুঁকি মানচিত্র’ তৈরির আহ্বান জানানো হয়েছে। এ মানচিত্রে বন্যা ও তীব্র তাপপ্রবাহে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করা হবে। একইসাথে এটি দুর্যোগ আসার পর ব্যবস্থার বদলে আগে থেকেই প্রস্তুতি নিতে সাহায্য করবে। 

মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মৌসুমি দাবানলের ধোঁয়ায় শহরগুলো ছেয়ে যাচ্ছে, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গাছপালা ও কৃষি।

তাইওয়ানে গণমহড়া

তাইওয়ানও এল নিনোর সম্ভাব্য চরম পরিস্থিতিকে মৌসুমি দুর্যোগ হিসেবে দেখছে না। বরং ভূমিকম্প বা সন্ত্রাসী হামলার মতো জরুরি পরিস্থিতি ধরে প্রস্তুতি নিচ্ছে দ্বীপরাষ্ট্রটি।

সেপ্টেম্বরের শুরুতে সেখানে একটি বড় গণমহড়া অনুষ্ঠিত হয়। টানা তিন দিন তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে থাকলে কী হতে পারে, তা ধরে নিয়েই আয়োজন হয় মহড়া।

শুধু গরম নয়, এর সঙ্গে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া, রেল চলাচল ব্যাহত হওয়া, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়া এবং হিটস্ট্রোকের মতো পরিস্থিতিও মহড়া ছিলো।

ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে দ্রুত ঠাণ্ডা ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত জায়গায় পৌঁছে দিতে সরকার ‘কুল ম্যাপ’ নামের একটি অনলাইন প্ল্যাটফর্মের পরীক্ষামূলক কার্যক্রমও চালিয়ে যাচ্ছে।

পানি ও খাদ্য এশিয়ার উদ্বেগ

দক্ষিণ এশিয়ায় এল নিনোর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা আছে ভারত ও শ্রীলঙ্কার।

ভারতের কিছু এলাকায় সেপ্টেম্বরে মৌসুমি বৃষ্টির ঘাটতি প্রায় ৫০ শতাংশে পৌঁছেছে। এর প্রভাব পড়েছে চাল, ডাল, তুলা ও ভুট্টার মতো অর্থকড়ি ফসলের ওপর।

আগামী মাসগুলোতে উৎপাদন আরও কমে গেলে তার প্রভাব পড়বে বাজারে। বিশেষ করে দরিদ্র ও নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য খাদ্যপণ্যের বাড়তি দাম চাপ তৈরি করতে পারে।

ভারত সরকার তাই আগেভাগেই ব্যবস্থা নিচ্ছে। কৃষিমন্ত্রী শিবরাজ সিং চৌহান কৃষকদের জন্য যে ‘সুরক্ষামূলক ঢাল’-এর কথা বলেছেন, তার অংশ হিসেবে প্রায় চারশ ঝুঁকিপূর্ণ জেলায় পানি সংরক্ষণ অবকাঠামো ও বৃষ্টির পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

কৃষকদের ডাল ও বাজরার মতো তুলনামূলক কম পানি প্রয়োজন এমন স্বল্পমেয়াদি ফসল চাষে উৎসাহিত করা হচ্ছে।

বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) জানিয়েছে, এল নিনোর কারণে এশিয়ার প্রায় পাঁচ কোটি মানুষ চরম খাদ্যঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

পানির জন্য হাহাকার শ্রীলঙ্কায়

বৃষ্টির ঘাটতি ও অস্বাভাবিক তাপমাত্রার কারণে শ্রীলঙ্কা গত এক দশকের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ খরার মুখোমুখি হয়েছে। দেশটির বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় দেড় লাখেরও বেশি মানুষ এখন সুপেয় পানির সংকটে পড়েছেন।

পরিস্থিতি শুধু মানুষের জন্য শঙ্কার নয়। চিতাবাঘ, হাতি, কুমির ও চিত্রা হরিণের আবাসস্থল ইয়ালা জাতীয় উদ্যানের পর্যটন এলাকাগুলো বন্ধ করে দিতে হয়েছে কর্তৃপক্ষকে। বন্যপ্রাণীদের বাঁচিয়ে রাখতে ট্যাংকারে করে পানি এনে পুকুর ভরাট করা হচ্ছে। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের মুল্লাইতিভু উপহ্রদেও দেখা গেছে খরা। সুপেয় পানির অভাবে সেখানে হাজার হাজার মাছ মারা যাচ্ছে।

শ্রীলঙ্কার দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ এমন একটি পরিস্থিতির প্রস্তুতি নিচ্ছে, যখন সুপেয় পানির প্রচলিত উৎসগুলো পুরোপুরি শুকিয়ে যেতে পারে। দেশটির এক কর্মকর্তা বলেন, “পানির উৎসগুলো শুকিয়ে গেলে পানি পাওয়ার আর কোনো বিকল্প মাধ্যম থাকবে না।” সেই বিকল্পের কথা ভাবতে গিয়ে এখন সমুদ্রের দিকে তাকাতে হচ্ছে কলম্বোকে।

পানির সংকট চরমে পৌঁছালে সমুদ্রের লবণাক্ত পানি প্রক্রিয়াজাত করে পানযোগ্য করার প্রয়োজন হতে পারে। দেশটির একমাত্র ডিস্যালিনেশন বা লবণাক্ততা দূরীকরণ প্ল্যান্টের ওপর নির্ভর করে এত বড় সংকট মোকাবিলা করা কার্যকর হবে কি না, তা নিয়েও সংশয় রয়েছে।

শুধু এল নিনো নয়

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় সমস্যা আরও জটিল। কারণ এল নিনো সেখানে একা আসছে না। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জ্বালানি, সার, সরবরাহব্যবস্থা এবং খাদ্যমূল্যে বেড়ে যাওয়া।

ইরান যুদ্ধ ইতিমধ্যে বৈশ্বিক জ্বালানি ও সরবরাহব্যবস্থায় প্রায় ভেঙে দিয়েছে। সারের দাম বেড়েছে। তাই কৃষিনির্ভর এই অঞ্চলে উৎপাদন খরচও বাড়ছে।

এর সঙ্গে যোগ হয়েছে মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মৌসুমি দাবানল। ধোঁয়ায় শহরগুলো ছেয়ে যাচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে গাছপালা ও কৃষি।

২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর সময় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরকারগুলো চাষাবাদের সময়সূচি পরিবর্তন এবং পানি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কৃষিতে এর প্রভাব সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছিলো।

কিন্তু এবার আগের সেই কৌশল যথেষ্ট হবে কি-না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।

এরই মধ্যে এই অঞ্চলে চালের উৎপাদন ৮ থেকে ১০ শতাংশ কমে যাওয়ার পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।

সিঙ্গাপুরভিত্তিক জলবায়ু ও খাদ্য নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ এলিসা কৌর লুধর মনে করেন, এবার আগের অভিজ্ঞতার ওপর পুরোপুরি নির্ভর করার সুযোগ নেই।

“আমরা কেবল ধরে নিতে পারি না যে এই এল নিনো গতবারের মতোই হবে। কারণ এখানে একই সময়ে একাধিক চ্যালেঞ্জ একে অপরের ওপর চাপ তৈরি করছে।”

সিঙ্গাপুরের ইউসুফ ইশহাক ইনস্টিটিউটের ক্লাইমেট চেইঞ্জ ফর সাউথইস্ট এশিয়া কর্মসূচির ভিজিটিং ফেলো কৌর লুধরের মতে ফিলিপাইন, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া খাদ্যের দামের ওঠানামার ক্ষেত্রে বিশেষভাবে ঝুঁকিপূর্ণ।

কৌর লুধর বলেন, “সিঙ্গাপুরে আমাদের আয়ের খুব সামান্য অংশ খাদ্যের পেছনে ব্যয় হয়। তা ১০ শতাংশেরও কম। কিন্তু ইন্দোনেশিয়ার মানুষের ক্ষেত্রে খাদ্য কিনতেই মোট আয়ের ৫০ শতাংশ বা তারও বেশি ব্যয় হতে পারে।”

খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হওয়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে কৌর লুধর খাদ্য নিরাপত্তাকে জাতীয় নিরাপত্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।

বিশেষ করে ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনে সামাজিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে খাদ্যের দামের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করেন তিনি।

সম্ভাব্য সংকট মোকাবিলায় দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সরকার ও কৃষকরা পুনরুৎপাদনমূলক কৃষির দিকে ঝুঁকছে। জৈব সারের ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।

গত ৯ই অগাস্ট হংকংয়ে ইতিহাসের সর্বোচ্চ তাপমাত্রার রেকর্ড হওয়ার পর তীব্র গরমের সময় কর্মীদের সুরক্ষায় নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।

দক্ষিণ কোরিয়ায় তাপপ্রবাহের সতর্কতা

দক্ষিণ কোরিয়ার দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে জুলাই মাস ছিল ইতিহাসের সবচেয়ে শুষ্ক। কিন্তু কয়েক সপ্তাহ পরেই আবহাওয়ার চিত্র পাল্টে যায়।

একটি দুর্বল হয়ে পড়া ঝড় সেখানে প্রবল বৃষ্টি নিয়ে আসে। যা দেশটির কোনো আবহাওয়া কেন্দ্রে রেকর্ড হওয়া অন্যতম ভারী বৃষ্টিপাত হিসেবে রেকর্ড করা হয়েছে।

তাপমাত্রা এতোটাই বেড়ে গিয়েছিল যে কৃষকেরা জানিয়েছেন, মাটির নিচে থাকা আলুগুলো যেন ‘সেদ্ধ’ হয়ে যাচ্ছিল।

এই অভিজ্ঞতার পর দক্ষিণ কোরিয়ার আবহাওয়া সংস্থা ১৮ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো তীব্র তাপপ্রবাহের সতর্কতা ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনেছে।

তাপমাত্রার অনুভব বা রিয়েল ফিল ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছালেই অপ্রয়োজনীয় বাহিরের কাজ বন্ধের জন্য সরকারি নির্দেশনা জারি করা হবে।

দিনের সবচেয়ে গরম সময়ে মানুষকে ঘরে থাকার আহ্বান জানিয়ে গত কয়েক সপ্তাহ ধরে দেশজুড়ে মোবাইল ফোনেও সরকারি সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে।

কোরীয় উপদ্বীপের চারপাশের সমুদ্র চলতি মৌসুম স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ। একই সঙ্গে শক্তিশালী হয়ে ওঠা এল নিনোর প্রভাবে এতোদিন দূরে থাকা ঝড় শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।

উত্তর-পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগর থেকে অন্যান্য বছরের তুলনায় আরও শক্তিশালী ঝড় আসার আশঙ্কা করছেন আবহাওয়াবিদরা।

শ্রীলঙ্কায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ জলাধার শুকিয়ে যাওয়ায় দেড় লাখেরও বেশি মানুষ এখন সুপেয় পানির সংকটে পড়েছেন।

জাপানে গরম শেষ হওয়ার আগেই টাইফুনের প্রস্তুতি

এল নিনো এবং মানুষের তৈরি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সম্মিলিত প্রভাব জাপানকেও নতুন ধরনের ঝুঁকির মুখে ফেলছে।

এল নিনোর সময় অতীতে জাপানে তুলনামূলক শীতল গ্রীষ্ম দেখা যেত। কিন্তু সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বাড়তে থাকায় সেই চিত্র বদলে যাচ্ছে।

২০২৩-২৪ সালের সর্বশেষ এল নিনোর সময় জাপানের বিস্তীর্ণ এলাকায় রেকর্ড ভাঙা গরম ও আর্দ্রতা ছিলো।

বর্তমান এল নিনো শুরু হওয়ার পরপরই গত জুলাইয়ে জাপান তাদের ইতিহাসের প্রথম আনুষ্ঠানিক ‘নিষ্ঠুর রকমের গরম দিন’ বা ‘কোকুশোবি’ রেকর্ড করে।

মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর চরম তাপমাত্রার গুরুতর ঝুঁকি বোঝাতে গত এপ্রিলে এই নতুন জাপানি পরিভাষাটি চালু করা হয়।

৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার দিনগুলোকে বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করা হচ্ছে।

গ্রীষ্মের তাপপ্রবাহ কিছুটা কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে জাপানের সামনে নতুন উদ্বেগ হয়ে দাঁড়িয়েছে সম্ভাব্য টাইফুন।

সরকার সাধারণ মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সরকারি সতর্কবার্তা মেনে চলার পাশাপাশি নিজেদের বাড়িঘর সুরক্ষিত রাখার প্রস্তুতি নিতে বলছে। খাবার ও পানি মজুত রাখার পরামর্শও দেওয়া হচ্ছে।

অ্যাপার্টমেন্টে বসবাসকারীদের ফুলের টব, আসবাবপত্রসহ এমন যেকোনো জিনিস ঘরের ভেতরে নিয়ে যেতে বা শক্ত করে বেঁধে রাখতে বলা হয়েছে, যা ঝড়ের সময় উড়ে গিয়ে দুর্ঘটনা ঘটাতে পারে।

এমনকি রাস্তার নিচ দিয়ে যাওয়া আন্ডারপাস নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। চলতি মাসে জাপানের অবকাঠামো মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, জাতীয় মহাসড়কের বেশ কয়েকটি উচ্চঝুঁকিপূর্ণ আন্ডারপাস চিহ্নিত করা হয়েছে। ভারী বৃষ্টির সময় এসব আন্ডারপাস আগেভাগেই বন্ধ করে দেওয়া হবে।

টোকিওর পূর্ব দিকে রেকর্ড পরিমাণ বৃষ্টির সময় দুটি গাড়ির চালক আন্ডারপাসে আটকা পড়ে মারা যাওয়ার পর গত মাসে এসব স্থাপনা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করে।

আন্ডারপাসে অল্প সময়ের মধ্যেই অনেক পানি জমে যেতে পারে। তাই ভারী বৃষ্টির সময় এগুলো দ্রুত প্রাণঘাতী ফাঁদে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি থাকে।

একই সময়ে যখন তাপপ্রবাহ, খরা, অতিবৃষ্টি, খাদ্য উৎপাদন কমে যাওয়া, পানির সংকট ও অর্থনৈতিক চাপ একে অপরকে বাড়িয়ে দিতে পারে, তখন এশিয়ার দেশগুলোর বিদ্যমান ব্যবস্থা কতটা চাপ নিতে পারবে, এই প্রশ্ন উঠছে।

এল নিনো কতোটা শক্তিশালী হবে, তা এখনও পুরোপুরি বোঝা যাচ্ছে না। তবে এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রস্তুতি বলছে, পরিস্থিতি দেখার বদলে সংকটের আগেই ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

তবে প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা যখন এশিয়ার কোটি কোটি মানুষের জীবন, খাদ্য ও পানির ওপর প্রভাব ফেলতে শুরু করবে, তখন এই প্রস্তুতি কতটা কাজে দেবে?

(দ্য গার্ডিয়ান অবলম্বনে)