পাশের দেশ ভারতের উত্তর সিকিমের প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত দক্ষিণ লোনাক লেক। হিমালয়ের বরফ গলে জমে জমে সেই পানি থেকে তৈরি হয় ওই লেক।
২০২৩ সালের তেসরা অক্টোবর। রাত তখন ১০টা ১২ মিনিট।
হিমালয় থেকে ভেঙে পড়লো বিরাটাকায় একটি বরফের চাঁই। বাংলায় যাকে বলে হিমবাহ। ইংরেজিতে গ্লেসিয়ার। সেই ধসে যে হড়পা বান তৈরি হয়, তাতে ভেসে যায় বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ একটা অঞ্চল। ভারত থেকে সেনা সদস্যের মরদেহও ভেসে আসে বাংলাদেশে।
বৈজ্ঞানিক গবেষণা অনুযায়ী, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে ওই অঞ্চলের পারমাফ্রস্ট গলে যায়। এর ফলে একটি বিশাল আকৃতির বরফ, পাথরসহ ধ্বংসস্তূপ সরাসরি আছড়ে পড়ে লোনাক লেকের ওপর।
ওই ধসের ওজন এতোটাই ছিলো যে, লেকে তৈরি হয় ৬৫ ফুটের বেশি উঁচু বিশাল ঢেউ। মানে প্রায় ছয়তলা ভবনের সমান উঁচু। বিজ্ঞানীরা ওই ঢেউয়ের নাম দিয়েছেন 'হিমালয়ান সুনামি'।
সেই ঢেউয়ের চাপে সিকিমের প্রাকৃতিক লেক ভেঙে যায় এবং মুহূর্তের মধ্যে নিচের দিকে ধেয়ে আসে প্রায় ৫ কোটি ঘনমিটার পানি। সঙ্গে ভেসে আসে হিমবাহের আরো কয়েককোটি লিটার বরফ গলা পানি, পাথর, কাদা, গাছপালা।
লেক ভাঙা পানি এসে পড়ে তিস্তা নদীতে। হঠাৎ করেই তিস্তার পানি বেড়ে উঁচু হয়ে যায় ২০ ফুট পর্যন্ত। সিকিমের একটা অংশ, পশ্চিমবঙ্গের কালিম্পং, জলপাইগুড়ি এবং অবশেষে সেই হড়পা বান ঢুকে পড়ে বাংলাদেশে।
ধ্বংসলীলা চালাতে চালাতে নিচে নামতে থাকে হড়পা বানটি। তখন সিকিমের সবচেয়ে বড় জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ছিলো ১২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার 'তিস্তা-৩'। মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে পানির তোড়ে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায় ওই কেন্দ্রটির বাঁধ। ধসে পড়ে ৩০টিরও বেশি সেতু এবং হাজার হাজার ঘরবাড়ি।
ভারত সরকারের হিসাবে, ভয়াবহ সেই দুর্যোগে সিকিমে অন্তত ৫৫ জন মানুষের মৃত্যু হয় এবং বহু মানুষ নিখোঁজ হন। নিখোঁজদের মধ্যে ছিলেন সেনা সদস্যরাও।
সেখানে আটকে পড়েন দুই হাজার পর্যটক। যাদের মধ্যে অন্তত ২৩ জন ছিলেন বাংলাদেশি, যাদেরকে পরে উদ্ধার করা হয়েছিলো।
সিকিমের সেই ভয়াবহ পাহাড় ধস ও লেক বিস্ফোরণের সরাসরি এবং মারাত্মক প্রভাব পড়েছিলো বাংলাদেশে। বিপুল পানির স্রোত তিস্তা নদী দিয়ে ধেয়ে আসে। এর ফলে তৈরি হয় আকস্মিক বন্যা।
তিস্তার পানি হু হু করে বেড়ে প্রবাহিত হতে শুরু করে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে। উত্তরাঞ্চলের ৫টি জেলা—লালমনিরহাট, নীলফামারী, রংপুর, কুড়িগ্রাম এবং গাইবান্ধার নিম্নাঞ্চল ও চরাঞ্চল প্লাবিত হয়ে যায়।
বাংলাদেশে সাধারণত অক্টোবর মাসে বন্যা হয় না। কিন্তু সিকিমের হড়পা বানের ঠেলায় অসময়ে তৈরি হয় আকস্মিক বন্যা। শত শত হেক্টরের ফসলি জমি, বিশেষ করে আমন ধান ও শাকসবজির খেত পানির নিচে তলিয়ে যায় এবং ব্যাপক ক্ষতি হয়।
তিস্তার অববাহিকায় থাকা শত শত গ্রাম ও চরাঞ্চলের হাজার হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। নদী ভাঙনের কারণে অনেক পরিবার তাদের ঘরবাড়ি ও ভিটেমাটি হারায়।
ভারতের গজলডোবা ব্যারেজ দিয়ে আসা পানির তীব্র চাপ সামলাতে তিস্তা ব্যারাজের ৪৪টি জলকপাটের সবকটি একযোগে খুলে দেওয়া হয়। ব্যারাজ ও আশেপাশের এলাকা সুরক্ষিত রাখতে পানি উন্নয়ন বোর্ড জারি করে সর্বোচ্চ রেড অ্যালার্ট।
শুধু তাই নয়, ভারত থেকে বাংলাদেশে ভেসে আসে কয়েকটি মরদেহ। গোলাবারুদও ভেসে আসার শঙ্কায় জারি করা হয় সতর্কতা।
নীলফামারীর তিস্তা নদী থেকে উদ্ধার করা হয় একজন ভারতীয় সেনাসদস্যের মরদেহ। পরে একটি ফ্ল্যাগ মিটিংয়ের মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করে বিজিবি।
ভারতে হস্তান্তর করা হয় দেশটির আরো কয়েকজন নাগরিকের মরদেহ।
সিকিমে ভারতীয় সেনাবাহিনীর একাধিক ক্যাম্পে আঘাত করে হড়পা বান। ভেসে যায় তাদের আগ্নেয়াস্ত্র ও বিস্ফোরক। বানের জলের সঙ্গে ভাটির দিকে ভেসে আসতে থাকে সেসবও।
সেসময় বাংলাদেশ সীমান্তেও, তিস্তা নদীর চরে বা পানিতে, এই ধরনের বিপজ্জনক সামরিক সরঞ্জাম বা বিস্ফোরক ভেসে আসার ব্যাপারে, প্রশাসন থেকে সতর্ক করা হয়েছিলো স্থানীয় সাধারণ মানুষদের।
সিকিমের ধস ছিলো মাঝারি ধরনের। কিন্তু তাতেই ক্ষতি হয়েছিলো এতোটা। সম্প্রতি নেপালে যে ঘটনা ঘটেছে, তার সঙ্গে মিল খুঁজে পাবেন বাংলাদেশ ভুক্তভোগী হওয়া সিকিমের সেই ঘটনার।
নেপালে হিমবাহ ধস ও বিপর্যয়
সিকিমের হিমবাহ ধসের সঙ্গে মিল রয়েছে নেপালের সাম্প্রতিক ঘটনা। নেপালের বিপর্যয়টা শুরু হয় তিব্বত সীমান্তের হিমালয় অঞ্চলে।
ধসে পড়া হিমবাহ ও পাহাড়ের অংশটির সম্মিলিত আয়তন ছিলো প্রায় ২০ কোটি ঘনমিটার এবং এর ওজন ছিলো আনুমানিক ১৮ থেকে ২০ কোটি টন। মানে সিকিমের ওই হিমবাহের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।
এটা ধসে পড়ার তীব্রতা এতটাই বেশি ছিলো যে, সেই ধাক্কায় ৫ দশমিক ২ মাত্রার ভূমিকম্পের সমপরিমাণ কম্পন অনুভূত হয়।
সেখানেও হিমবাহের সঙ্গে ধসে পড়ে পাহাড়ের তলদেশের মূল পাথর বা বেডরকসহ পুরো পর্বতগাত্রের একটি বিশাল অংশ। এতে প্রাকৃতিক লেক ফেটে পানির স্রোত আছড়ে পড়ে নদীতে। ঢেউ ওঠে ৩০ ফুট পর্যন্ত।
বিপুল পরিমাণ বরফ আর পানি পাহাড়ি উপত্যকা দিয়ে নামার সময়, পথিমধ্যে আরো যুক্ত হয় পাথর, মাটি ও পলিমাটি। সবমিলিয়ে হড়পা বানটি পরিণত হয়, প্রলয়ংকরী এক তরল মারণাস্ত্রে।
হিমবাহ ধসের পর পানির তোড়টি প্রথম ২২ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে সময় নেয় মাত্র ৬ মিনিট ৫০ সেকেন্ড। অর্থাৎ গড় গতিবেগ ছিলো ঘণ্টায় প্রায় ১৯৩ কিলোমিটার।
বিধ্বংসী ফ্লাশ ফ্লাড বা হড়পা বানটি তিনটি নদীর অববাহিকার ১৬৮ কিলোমিটার এলাকা পর্যন্ত ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। দুর্যোগের তীব্রতা এতটাই বেশি ছিলো যে, বহু মানুষের মরদেহপ্রায় আড়াইশো কিলোমিটার দূরে প্রতিবেশী দেশ ভারতে ভেসে যায়।
কাদা ও পাথরের নিচে চাপা পড়ে সম্পূর্ণ চাপা পড়ে পাহাড়ি উপত্যকার দুই পাশের হাজার ঘরবাড়ি ও বহু বাজার। ৪০টিরও বেশি সেতু এবং বহু কিলোমিটার সড়ক বিলীন হয়ে গেছে।
হড়পা বানের তীব্র স্রোতে মাইলের পর মাইল বনাঞ্চলের গাছপালা উপড়ে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পহেলা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত শুধু মাত্র নেপালেই নিশ্চিতভাবে নিহত হয়েছেন ৯৮৭ জন মানুষ। তিব্বত সীমান্তসহ মোট মৃত্যু আরো বেশি।
নিখোঁজের সংখ্যা প্রায় চার হাজার, যাদের মধ্যে পাঁচশর বেশি বিদেশি পর্যটক। জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের সুড়ঙ্গে আটকে পড়ে শত শত শ্রমিক।
সরাসরি ধ্বংস বা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে নেপালের চলমান ও নির্মাণাধীন প্রায় ১৪টি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। এর মধ্যে ১২টি সচল বিদ্যুৎ কেন্দ্র পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
নির্মাণাধীন 'আপার ত্রিশূলি-১' জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের উঁচু বাঁধের ৯০ শতাংশেরও বেশি অংশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে গেছে।
তাহলে কী দাঁড়ালো? সিকিমের ঘটনার সঙ্গে নেপালের ঘটনার চরিত্র একই রকম। এর কারণ, ঘটনাগুলো একই।
আর এখানেই ভয় বাংলাদেশের। কারণ পূর্ব হিমালয়, মানে বাংলাদেশের পাশে অনেকগুলো ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ রয়েছে। যখন তখন ধসে পড়তে পারে সেগুলো।
হিমবাহ কী এবং কীভাবে ধসে পড়ে?
একটি টার্ম হলো জিএলওএফ- এর পূর্ণরূপ ‘গ্লেইশাল লেইক আউটবার্স্ট ফ্লাড’। বাংলায় বলা হয়- হিমবাহ হ্রদ বা লেকের বিস্ফোরণজনিত বন্যা। এটাই হড়পা বান নামে পরিচিত।
হিমালয় বা আল্পপের মতো পর্বতগুলোর উঁচু এলাকায় হিমবাহের নীচে জমা হয় পাথর, কাদা ও বরফের স্তূপ। এর ফলে প্রাকৃতিকভাবেই তৈরি হয় বাঁধ। এর ভেতরে জমতে থাকে হিমবাহ থেকে গলে যাওয়া পানি। সেই পানি জমে জমে জমে তৈরি হয় বিশাল লেক।
এটাকে বলে ‘গ্লেইশাল লেক’ বা হিমবাহ হৃদ। কিন্তু লেকের ওই কাদা-মাটি-পাথরের বাঁধগুলো কৃত্রিম বাঁধের মতো মজবুত হয় না। মানে একটা জলবিদ্যুৎকেন্দ্রের বাঁধ যতোটা শক্তিশালী, এগুলো ততোটা না।
এই লেকে পানির চাপ বেড়ে গেলে বা হিমবাহ ধস হলে তখন শুরু হয় হড়পা বান। কোটি কোটি লিটার পানি ঝড়ো গতিতে ধ্বংসলীলা চালাতে চালাতে নিচে নামতে শুরু করে।
হড়পা বানের আগে কোনো রকম পূর্ব সতর্কবার্তা পাওয়া যায় না। পাহাড়ি ঢাল বেয়ে এই পানি এতোটাই দ্রুত নিচে নামতে থাকে যে, মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়ার সময়টুকুও পায় না।
স্বাভাবিক বন্যার সময় কিন্তু পানি বাড়তে থাকে ধীরে ধীরে। বড় বন্যাতেও লোকজনকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়।
কিন্তু হড়পা বানে এই সুযোগ একেবারেই পাওয়া যায় না বললেই চলে। আগেই বলেছি বিধ্বংসী স্রোতের সঙ্গে শুধু পানিই থাকে না। থাকে বিশাল বিশাল পাথর, কাদা, উপড়ানো গাছপালা এবং বরফের টুকরো।
এই ভারী মিশ্রণ গতিপথে যা কিছু পায়—রাস্তা, ঘরবাড়ি, সেতু, জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র—সবকিছু গুঁড়িয়ে দেয়।
মূলত দুটি কারণে হড়পা বান বা জিএলওএফ ঘটে। লেকের ঠিক ওপরের পাহাড় থেকে হঠাৎ বিশাল কোনো পাথর, বরফের চাঁই বা তুষারধস সরাসরি লেকের পানির ওপর আছড়ে পড়ে। এর ফলে বিশাল ঢেউয়ের সৃষ্টি হয় এবং পানির প্রচণ্ড চাপে প্রাকৃতিক বাঁধটি এক নিমেষে ভেঙে যায়।
২০২৩ সালে সিকিমের দক্ষিণ লোনাক লেকে এই ঘটনা ঘটেছিলো এবং সম্প্রতি নেপাল-তিব্বত সীমান্তের ঘটনাও একই।
হড়পা বানের পেছনে আরেকটি কারণ হলো- জলবায়ু পরিবর্তন। তাপমাত্রা বৃদ্ধি পাওয়ায় হিমবাহগুলো দ্রুত গলছে। ফলে লেকে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি পানি জমে যাচ্ছে। এতে বাঁধ উপচে বা ভেঙে পানি বের হয়ে আসছে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, নেপালের হড়পা বানের আগের ২৪ ঘণ্টায় ওই অঞ্চলে তীব্র গরমের কারণে প্রচুর বরফ গলেছিলো। এবং এতে দুর্বল হয়ে পড়ে হিমবাহটি।
হিমবাহ ধসের ঝুঁকিতে কেন বাংলাদেশ?
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয় অঞ্চলের তাপমাত্রা দ্রুত বাড়ছে। ফলে সিকিম, নেপাল, ভুটান এবং তিব্বত অঞ্চলে নতুন করে তৈরি হচ্ছে শত শত হিমবাহ লেক। ঝুঁকিও বাড়ছে।
আর বাংলাদেশ যেহেতু এই পাহাড়ি নদীগুলোর অববাহিকায় বা ভাটির দেশে অবস্থিত, তাই হিমালয়ের যেকোনো লেক বিস্ফোরণের পানি সরাসরি বাংলাদেশকে আক্রান্ত করার আশঙ্কা রয়েছে।
কারণ, বাংলাদেশ কোনো বিচ্ছিন্ন জলব্যবস্থার দেশ নয়। বিশাল এই বদ্বীপ গড়ে উঠেছে হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীর পানি আর পলিতে। পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, তিস্তা, ব্রক্ষপূত্র- এর সঙ্গেই বাংলাদেশের ভূগোল, কৃষি, অর্থনীতি—সবকিছু জড়িত।
প্রধান প্রধান নদীগুলো হিমালয়েরে উচ্চতা থেকে নেমে আসায়, সেখানে যা ঘটে, তার প্রভাব নিচের দিকে নামতে বাধ্য। কারণ, হিমালয়ের নদী ব্যবস্থার একেবারে ডাউনস্ট্রিম-এ হলো বাংলাদেশ।
এই ডাউনস্ট্রিম বা ভাটিতে থাকার সমস্যা কী এবং আমরা কত বড় বিপদের মধ্যে রয়েছি?
হিমালয় পর্বতমালার ভৌগোলিক বিষয়ের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে আরো দুটি পর্বতশ্রেণি। হিন্দুকুশ ও কারকোরাম। এই তিনটি পর্বতমালাকে একসঙ্গে বলা হয় হিন্দুকুশ-হিমালয়। বিস্তৃতি প্রায় সাড়ে ৩ হাজার কিলোমিটার এলাকা জুড়ে।
পশ্চিমে আফগানিস্তান, পূর্বে মিয়ানমার। এর আওতায় আরো রয়েছে- পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, ভুটান, চীন এবং বাংলাদেশ।
হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে রয়েছে ৬০ হাজারের বেশি হিমবাহ। কয়েক হাজার ঘন কিলোমিটার বরফ জমে আছে সেখানে। শীতকালে বরফ জমে, গরমকালে ধীরে ধীরে সেই বরফ গলে নদীতে পানি বাড়িয়ে তোলে। এই কারণে হিমালয়কে বলা হয় এশিয়ার বিশাল এক পানির ভাণ্ডার।
কিন্তু সমস্যা হলো— এই ভাণ্ডারের চরিত্র বদলে যাচ্ছে। কীভাবে বদলে যাচ্ছে? এবার সেই আলোচনা।
কাঠমান্ডুভিত্তিক একটি সংস্থা হলো আন্তর্জাতিক সমন্বিত পর্বত উন্নয়ন কেন্দ্র বা ইসিমোড (আইসিএমওডি)। এরা কাজ করে মূলত হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলের পরিবেশ, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পার্বত্য জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন নিয়ে।
ইসিমোডের একটি গবেষণা প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়েছে আশঙ্কাজনক তথ্য।
সেখানে বলা হয়েছে, ২০০০ সালের পর থেকে হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের হিমবাহগুলো গলে যাচ্ছে আগের তুলনায় দ্বিগুণ গতিতে। আর গত ৫০ বছরে হিমবাহগুলোর পুরুত্ব কমেছে আটাশি ফুট।
বিপদটা কিন্তু এখানেই। কারণ, এশিয়ার প্রধান ১০টি নদীর উৎস হলো এই হিমালয় অঞ্চলে। এই বরফ গলার কারণেই, ভাটিতে থাকা প্রায় ২০০ কোটি মানুষ রয়েছে অনিশ্চয়তা এবং মারাত্মক ঝুঁকিতে।
গবেষণায় আরো বলা হয়েছে, ১৯৯০ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে, হিমালয় অঞ্চলের মোট হিমবাহের ১২ শতাংশ এলাকা বিলীন হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে আছে আধা বর্গকিলোমিটারের চেয়ে ছোট আকারের ক্ষুদ্র হিমবাহগুলো। এগুলো খুব দ্রুত সংকুচিত হওয়ার ফলে, হিমবাহ লেক বিস্ফোরণের আশঙ্কা এবং ঝুঁকিও বেড়ে গেছে বহুগুণ।
বিভিন্ন সমীক্ষা অনুযায়ী, সমগ্র হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলে অন্তত ৪০৭টি হিমবাহ লেক ফেটে যাওয়ার বা বিস্ফোরণের উচ্চ ঝুঁকিতে রয়েছে। এর মধ্যে ১৪৮টি উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ লেক রয়েছে পূর্ব হিমালয়ে, মানে বাংলাদেশের দিকে।
ভারতের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ, সেদেশের পাহাড়ি অঞ্চলের প্রায় ১৯৫টি লেককে চিহ্নিত করেছে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে। এর মধ্যে ৬৭টিই 'অতি উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ' ।
কিন্তু এখানেই শেষ না, আরো ঘটনা আছে। বাংলাদেশের প্রধান নদীগুলোর মধ্যে ব্রহ্মপুত্র ও তিস্তার উৎপত্তিস্থল ও অববাহিকা হিমালয়ের পূর্ব ও মধ্য অঞ্চলে।
তিস্তা অববাহিকায় বাংলাদেশের ঠিক ওপরে সিকিমে রয়েছে ৮৫টি হিমবাহ লেক। এদের মধ্যে ১৭টির অবস্থা অত্যন্ত বিপজ্জনক। মানে যেকোনো সময় ফেটে বা বিস্ফোরিত হয়ে হড়পা বান হতে পারে।
মাত্র তিন বছর আগে এই সিকিমেরই 'লোনাক লেক' ফেটে যাওয়ায় বিপর্যয় নেমেছিলো বাংলাদেশে।
ঝুঁকি রয়েছে ব্রহ্মপুত্র অববাহিকাতেও। ভারতের অরুণাচল প্রদেশে ৩২টি এবং তিব্বতের শত শত হিমবাহ লেক সরাসরি অবস্থিত ব্রহ্মপুত্র বা যমুনা নদীর উজানে। যেকোনো সময় এসব লেক ফেটে গেলে সেই বানের পানি ঢুকে পড়বে বাংলাদেশে।
বাংলাদেশের উজানে ভারতে তিস্তা নদী এবং এর বিভিন্ন উপনদীর ওপর অনেকগুলো বাঁধ ও জলবিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করেছে ভারত। নির্মাণাধীন ও পরিকল্পনায় রয়েছে আরো অনেকগুলো। সবমিলিয়ে অর্ধশতাধিক হবে।
শুধু তিস্তাতেই এখন যেসব বাঁধ ও ব্যারাজ আছে, সেগুলোর জলাধারের পানি ধারণক্ষমতা প্রায় ৮ কোটি ঘনমিটারের বেশি।
হিমালয়ে যদি বড় ধরনের একটি হিমবাহ লেক বিস্ফোরিত হয়ে প্রলয়ংকরী হড়পা বানের সৃষ্টি হয়, আর ভারতের তিস্তা নদীর ওপর থাকা সবগুলো বাঁধ, ব্যারেজ এবং জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র ভেসে যায়, তাহলে তা মহাবিপর্যয় ডেকে আনবে বাংলাদেশের জন্য।
দানবীয় স্রোত মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ঢুকে পড়বে বাংলাদেশে। এতে মানুষের প্রাণহানি হবে। বাস্তুতন্ত্র ধ্বংস হবে। কৃষিসহ সামগ্রিক অর্থনীতির ক্ষয়ক্ষতি হবে। এমনকি বড় বড় নদীর তলদেশ পলি জমে ভরাট হয়ে যেতে পারে।
কীভাবে ঝুঁকি মোকাবিলা করবে বাংলাদেশ
কিন্তু এতোবড় ঝুঁকি মোকাবিলা করার উপায় কী? এ থেকে রক্ষা পেতে বাংলাদেশ কী করতে পারে? এসব প্রশ্নের উত্তর বেশ জটিল।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, এই ধরনের বিপর্যয় মোকাবিলা করার ক্ষমতা এককভাবে আসলে বাংলাদেশের নেই। এখানে দরকার একাধিক দেশের সমন্বিত উদ্যোগ।
একটি বড় সমস্যা হলো- নদীর গতিপথ আটকে ব্যারাজ ও বিদ্যুৎকেন্দ্র গড়ে তোলা। এতে নষ্ট হচ্ছে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ। ভরাট হচ্ছে তলদেশ।
নদীর গতিপথ আটকে বাঁধ ব্যারাজ নির্মাণ নিয়ে বহ প্রশ্ন উঠছে। কিন্তু সমাধানের চেয়ে এসবের নির্মাণ দিনকে দিনকে বেড়েই চলেছে।
বিজ্ঞানীরা আরেকটি সমাধানের দিকেও মনোযোগ দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তা হলো- হিমালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ লেকগুলোর তলদেশে কিংবা একপাশে কৃত্রিম পাইপলাইন, সাইফন বা সুড়ঙ্গ তৈরি করে অতিরিক্ত পানি ধীরে ধীরে বের করে দেওয়া হয়। এতে লেকের ভেতরের পানির চাপ কমে যাবে এবং বাঁধ ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকিও কমে আসবে।
আবার প্রাকৃতিক বাঁধের একপাশ সাবধানে কেটে বা খনন করে পানি বের হওয়ার একটি স্থায়ী নিরাপদ পথ তৈরি করা যেতে পারে। যাতে একবারে পানি উপচে পড়ার সুযোগ না পায়।
এছাড়া আগাম সতর্কবার্তা চালু করা। এজন্য কৃত্রিম উপগ্রহ বা ড্রোনের মাধ্যমে হিমালয় অঞ্চলের সব লেকের আয়তন ও পানির উচ্চতা প্রতি মুহূর্তে পর্যবেক্ষণ করা।
লেকের আকার হঠাৎ বাড়লে তা সঙ্গে সঙ্গে চিহ্নিত করা। লেকের নিচে এবং নদী অববাহিকায় এমন সেন্সর বসানো, যা পানির উচ্চতা বা মাটির সামান্য কম্পন টের পেলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংকেত বা অ্যালার্ম বাজিয়ে দেবে।
যেহেতু বাংলাদেশ নদীগুলোর একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত। তাই বাংলাদেশের প্রতিরক্ষাব্যবস্থাও হতে হবে মূলত দুইমুখী। কূটনৈতিক এবং স্থানীয় অবকাঠামোগত।
আর সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে রিয়েলটাইম ডাটা শেয়ারিং এবং যৌথ নদী ব্যবস্থাপনা এখন অত্যন্ত জরুরি একটি বিষয়।
প্রকৃতি কিন্তু বারবারই সতর্কবার্তা দিয়েছে। সিকিম বা নেপালের ঘটনা ভবিষ্যতের বড় দুর্যোগেরও পূর্বাভাস।
তাই, এখনই সময় বৈজ্ঞানিক ও কূটনৈতিক প্রস্তুতি নেওয়ার। আর অবহেলা করলেই, যেকোনো সময় হঠাৎই হয়তো দেখতে হবে, চরম মাশুল গুনছে বাংলাদেশ।