নেপাল কেন বারবার ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়ে?

সতর্ক করে দিয়েছিলো কয়েকটি পরিবেশ-বিষয়ক সংগঠন। ভয়ানক ঝুঁকিতে রয়েছে নেপালের নির্দিষ্ট কিছু পাহাড়ি অঞ্চল ও নদীর অববাহিকা। পাঁচ মাস আগের কথা। তখনো কেউ ভাবতেও পারেননি এক নিমেষের ফ্ল্যাশ ফ্লাডে শত শত প্রাণ চলে যাবে। ভেঙেচুরে ভেসে যাবে বাড়িঘর, ব্রিজ, রাস্তাঘাট সবকিছু।

এখন উদ্ধার, নিখোঁজদের ফিরে পাওয়া, আর প্রাণ হারানো মানুষদের খোঁজার কাজ চলছে। দেড় লাখ বর্গকিলোমিটারেরও কম আয়তনের দেশটি কেন নিয়মিতই এমন ভয়াবহ প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কবলে পড়ে?

এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে তাকাতে হবে নেপালের ভূ-প্রকৃতি ও ভৌগোলিক অবস্থানের দিকে। সাথে উঠে আসবে দেশটির পর্যটন-অর্থনীতি, অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত উন্নয়নসহ আরো অনেক বিষয়। সবচেয়ে বড় কথা, নেপালের অবস্থানটাই এমনভাবে, তাতে করে এমন বিপর্যয় আসলে এড়ানো কঠিন।

উত্তরে হিমালয় এবং দক্ষিণে ভারতের সীমান্তবর্তী সমভূমির মাঝে চেপে রয়েছে নেপাল। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৬০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত তরাই সমভূমি থেকে ভূমি অত্যন্ত খাড়াভাবে ৮,৮৪৮.৮৬ মিটারের মাউন্ট এভারেস্টে গিয়ে মিশেছে। এর উত্তর-দক্ষিণের দূরত্ব মাত্র ১৫০ থেকে ২৫০ কিলোমিটার। 

এই খাড়া ভূমিরূপের অর্থ হলো, পানি এবং আলগা পাথর খুব দ্রুত নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। দেশটির মধ্য দিয়ে ৬ হাজারেও বেশি নদী ও উপনদী প্রবাহিত হয়, যার অনেকগুলোরই উৎপত্তি হিমালয়ে এবং এগুলো জুন-সেপ্টেম্বর মাসের বর্ষাকালে ফুঁসে ওঠে।

দেশটির ভূমিকম্পের ঝুঁকিও এসেছে একই ভূতাত্ত্বিক গঠন থেকে। পর্বতগুলো ভূতাত্ত্বিক বিচারে তুলনামূলক নবীন এবং ইন্ডিয়ান ও ইউরেশিয়ান প্লেটের সংঘর্ষের ফলে এখনও উপরের দিকে ঠেলে উঠছে, যা হিমালয়কে বিশ্বের অন্যতম প্রধান ভূমিকম্পপ্রবণ অঞ্চলে পরিণত করেছে। 

নেপাল ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটনিক প্লেটের চরম সংঘাতময় অঞ্চলের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এই দুটি বিশাল প্লেট প্রতিবছর প্রায় ২০ থেকে ২১ মিলিমিটার গতিতে একজন আরেকজনের দিকে এসে ধাক্কা মারে।

প্রায় পাঁচ কোটি বছর আগে এই দুই প্লেটের একটা প্রচণ্ড সংঘর্ষ হয়েছিলো। সে সংঘর্ষের ফলাফলে প্রাচীন টেথিস মহাসাগর একেবারে অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলে। আর সেখান থেকেই জন্ম নেয় হিমালয় পর্বতমালা।

সে সময় পৃথিবীর যে সারফেস, সেটা প্রচণ্ডভাবে ভাঁজ হয়ে ওপরে উঠে গিয়ে তৈরি করে এই বিশাল পর্বতমালা ও তার সর্বোচ্চ শৃঙ্গগুলো। আর এটা কিন্তু থেমে যায়নি, এখনো চলছে। এ জন্য হিমালয়কে পৃথিবীর সবচেয়ে তরুণ ও দ্রুত বর্ধনশীল পর্বতমালা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

হিমালয় পর্বতমালা এখনো প্রতিবছর গড়ে প্রায় ৫ মিলিমিটার করে ওপরের দিকে উঠছে। নেপাল বারবার ভয়াবহ ভূমিকম্প ও ভূমিধসের কবলে পড়ার এটা বড় কারণ।

নেপালের ভূতত্ত্ব বিভাগ দেশটির বৈচিত্র্যময় ও ফাটলযুক্ত ভূখণ্ডকে এর ভূ-প্রকৃতির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে; অন্যদিকে এর দুর্যোগ-ঝুঁকি মূল্যায়ন সূচকে খাড়া ঢাল, ভঙ্গুর ভূতাত্ত্বিক গঠন এবং তীব্র বৃষ্টিপাতকে ভূমিধসের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। রাস্তাঘাট নির্মাণ, বন উজাড় এবং অপরিকল্পিত উন্নয়ন এই ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।

জলবায়ু পরিবর্তন যোগ করছে ঝুঁকির নতুন মাত্রা

ভৌগোলিক ভঙ্গুরতার পাশাপাশি সবচেয়ে বড় ঘাতক হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তন। নেপালে বরফে ঢাকা পর্বতমালায় হাজার হাজার হিমবাহ বা গ্লেসিয়ার রয়েছে। বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে হিমালয়ের এই বরফ গলছে রেকর্ড গতিতে। হিমবাহ যখন গলে যায়, তখন তার পেছনে বা পাশে প্রাকৃতিকভাবে বরফ ও পাথরের বাঁধ তৈরি হয়ে বরফ গলা পানির বিশাল বিশাল হ্রদ বা 'গ্লেসিয়াল লেক' তৈরি হয়।

ভাবুন তো, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে চার-পাঁচ হাজার মিটার উঁচুতে থাকা বিশাল এক কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক পানির ট্যাংক যদি হঠাৎ ভেঙে পড়ে? যখন অতিরিক্ত বৃষ্টি হয় বা হিমবাহের বিশাল বরফের খণ্ড (Ice avalanche) সেই হ্রদে এসে পড়ে, তখন তাসের ঘরের মতো প্রাকৃতিক পাথর ও বরফের বাঁধ ভেঙে কোটি কোটি লিটার কাদা, বরফ আর পানির স্রোত পাহাড়ি উপত্যকার দিকে নেমে আসে। পরিবেশ বিজ্ঞানীদের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনগুলো বলছে, নেপালে এমন নতুন নতুন হিমবাহ হ্রদ তৈরি হচ্ছে যা যেকোনো মুহূর্তে বোমার মতো ফেটে যেতে পারে!

উষ্ণ জলবায়ুর কারণে নেপালের প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো আরও জটিল হয়ে উঠছে। ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা হিমবাহ গলে যাওয়া ত্বরান্বিত করছে এবং উচ্চতাংশের চরম পরিস্থিতি তৈরি করছে। হিমবাহ পিছিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে পাথর ও ধ্বংসাবশেষের প্রাকৃতিক বাঁধের পেছনে হিমবাহ হ্রদ (Glacial lakes) তৈরি হতে পারে। এই বাঁধগুলো ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ পানি হঠাৎ ভাটিতে (নিচের দিকে) নেমে আসতে পারে, যা হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত প্লাবন বা 'জিএলওএফ'-এর সৃষ্টি করে। উষ্ণায়ন এবং অতিরিক্ত বৃষ্টিপাত বরফ, পাথর ও পাহাড়ি ঢালকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে, যা ভূমিধস, হিমধস এবং আকস্মিক বন্যার সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয়।

এল নিনোও কী ঝুঁকি হতে পারে?

অনেকে প্রশ্ন তোলেন, প্রাকৃতিক আবহাওয়ার চক্র যেমন এল নিনো বা লা নিনা—এগুলো কি নেপালের এই দুর্যোগের জন্য দায়ী? উত্তর হচ্ছে, হ্যাঁ, সরাসরি এবং পরোক্ষ দুভাবেই। এল নিনোর প্রভাবে সমুদ্রের তাপমাত্রা পরিবর্তিত হয়, যা এশিয়ার মনসুন বা বর্ষা বায়ুর স্বাভাবিক গতিপথকে এলোমেলো করে দেয়। এর ফলে কোনো বছর নেপালে চরম খরা দেখা যায়, আবার মাঝেমধ্যে অল্প সময়ের মধ্যে প্রচুর পরিমাণ বৃষ্টিপাত ঘটে। যখন পুরো এক মাসের বৃষ্টি মাত্র কয়েক ঘণ্টায় পাহাড়ে ঝরে পড়ে, তখন পাহাড়ি মাটির পক্ষে তা ধারণ করা সম্ভব হয় না। ফলে ওপরের নরম মাটি, পাথর ও বরফ একসঙ্গে ধসে নিচের দিকে নামতে থাকে। আর সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই আবহাওয়ার চরমভাবাপন্নতা এমন হয়েছে যে, যখন তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গিয়েছে। 

উন্নয়ন কার্যক্রম বিপদকে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে

প্রাকৃতিক ঝুঁকিগুলো যখন মানুষ, ঘরবাড়ি ও অবকাঠামোতে আঘাত হানে, তখন তা মহাবিপর্যয়ে পরিণত হয়। নেপালের বেশিরভাগ অবকাঠামোই দুর্গম পাহাড়ি ভূখণ্ডের মধ্য দিয়ে তৈরি করতে হয়। প্রায়ই খাড়া পাহাড় কেটে রাস্তা বানানো হয়। সমতল ভূমির অভাব থাকায় নদী উপত্যকাগুলোতেই শহর ও গ্রাম গড়ে উঠেছে। নেপালের নিজস্ব দুর্যোগ-ঝুঁকি মূল্যায়নে বন উজাড়, ঝুঁকিপূর্ণ ঢালে অবৈধ দখল এবং রাস্তা ও অন্যান্য অবকাঠামোর অপরিকল্পিত নির্মাণকে ভূমিধসের ঝুঁকি বৃদ্ধিকারী উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

দেশটি এই ভঙ্গুরতার উদাহরণ দেখেছে বারবার। ২০১৫ সালের ভূমিকম্প ভূমিকম্পজনিত ঝুঁকির ভয়াবহতা দেখিয়েছিলো। ২০২১ সালের বিপর্যয় প্রমাণ করেছে কীভাবে তীব্র বৃষ্টিপাত ভূমিধস ও নদীর প্রবাহের সাথে মিলে ধ্বংসাত্মক রূপ নিতে পারে। বিশ্বব্যাংকের এপ্রিল ২০২৫-এর 'নেপাল ডেভেলপমেন্ট আপডেট' অনুসারে, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরের বন্যা ও ভূমিধসে প্রায় ৪৭ বিলিয়ন নেপালি রুপিরও বেশি ক্ষতি হয়েছে।

দায় কি শুধু প্রকৃতির?

পর্যটন ব্যবসা ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির আশায় নেপালে গত কয়েক দশকে দ্রুত ও অপরিকল্পিত অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হয়েছে। ভূতাত্ত্বিক সমীক্ষা ছাড়াই পাহাড়ের গায়ে বুলডোজার চালিয়ে তৈরি করা হয়েছে রাস্তাঘাট। এর ফলে পাহাড়ি মাটির বন্ধন শিথিল হয়ে গেছে, যা বর্ষার সময় ভারী ভূমিধসের মূল কারণ।

অন্যদিকে, পাহাড়ি নদীর কোল ঘেঁষে তৈরি করা হয়েছে রিসোর্ট, হোটেল এবং বাঁধ। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ রুদ্ধ করার কারণে যখন পানির চাপ বাড়ে, তখন তা চারপাশের মানববসতি ভাসিয়ে নিয়ে যায়। অর্থাৎ, প্রাকৃতিক দুর্যোগের সাথে মানুষের অদূরদর্শিতা যুক্ত হয়ে এটিকে এক ভয়াবহ মানবসৃষ্ট ট্র্যাজেডিতে রূপ দিয়েছে।

তাহলে ভবিষ্যতে নেপালের পরিস্থিতি কেমন হতে পারে? বিজ্ঞানীদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন রোধে বৈশ্বিক উদ্যোগ যদি কার্যকর না হয়, তবে সামনের দিনগুলোতে এই ধরনের বিপর্যয়ের সংখ্যা ও তীব্রতা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। হিমালয়ের বরফ গলতেই থাকবে, এবং আরও ভয়াবহ সব প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে দেশটি।

নেপাল কি এই ঝুঁকি কমাতে পারে?

নেপাল ভূমিকম্প প্রতিরোধ করতে পারবে না, বর্ষাকাল থামাতে পারবে না কিংবা হিমালয়কে ধরে রাখতে পারবে না। কিন্তু আগে থেকে সতর্ক হতে পারলে, বা ঠিকঠাক প্রস্তুতি নিতে পারলে, এই ক্ষতি কমিয়ে আনা যাবে।

ন্যাশনাল ডিসাস্টার রিস্ক রিডাকশন অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট অথরিটি জানিয়েছে যে, নেপাল কেবল বন্যা-নির্দিষ্ট সতর্কতা থেকে বেরিয়ে এসে বন্যা, ভূমিধস, ভূমিকম্প এবং হিমবাহ-সম্পর্কিত ঝুঁকিগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করে একটি 'বহু-ঝুঁকি আগাম সতর্কবার্তা ব্যবস্থার' দিকে অগ্রসর হয়েছে। এই ব্যবস্থার অধীনে ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ, পূর্বাভাস, সতর্কতা প্রচার এবং প্রস্তুতিমূলক পদক্ষেপকে একত্রিত করা হয়েছে।

দেশটি আবহাওয়া ও জলবায়ু পর্যবেক্ষণ এবং বন্যার সতর্কবার্তা দেওয়ার সক্ষমতাও বৃদ্ধি করেছে। বিশ্বব্যাংক বলছে, আবহাওয়ার পূর্বাভাস এবং বন্যার সতর্ক বার্তার উন্নতির ফলে সতর্কতাগুলো আরও নিখুঁত ও সময়োপযোগী হয়েছে; অন্যদিকে নেপালের 'ন্যাশনাল অ্যাডাপটেশন প্ল্যান'-এ সম্ভাব্য দুর্যোগের আগাম তথ্য প্রদানকে তাদের জলবায়ু-সহনশীল কৌশলের অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

নীতিগত এবং আর্থিক পরিবর্তনের মাধ্যমেও দুর্যোগ প্রস্তুতির কাজে সহায়তা করা হচ্ছে। ২০২৪ সালে, বিশ্বব্যাংক নেপালের দুর্যোগ মোকাবেলা, আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোতে ঝুঁকি-সচেতন বিনিয়োগ জোরদার করার জন্য ১৫০ মিলিয়ন ডলারের জরুরি অর্থায়ন অনুমোদন করেছে। মূল চ্যালেঞ্জ হলো নেপাল এমন একাধিক ঝুঁকির মুখোমুখি, যেগুলো একসাথে ঘটতে পারে বা একটি অপরটিকে উস্কে দিতে পারে। তাই দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা এখন অবকাঠামো ও সম্প্রদায়কে আরও সহনশীল করার পদক্ষেপের পাশাপাশি বহু-ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তুতির ওপর ক্রমশ বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।