টানা পাঁচদিন ভারী বৃষ্টির আভাস: জনদুর্ভোগ ও ভূমিধসের শংকা

দেশের আকাশজুড়ে মেঘের আনাগোনা আর অবিরাম বৃষ্টি। আষাঢ়ের এই সময়ে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট মৌসুমি বায়ুর সক্রিয়তা এবং বায়ুচাপের পার্থক্যের কারণে দেশের অধিকাংশ অঞ্চলে বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে।

আবহাওয়া অধিদপ্তরের সর্বশেষ পূর্বাভাস বলছে, শনিবার (১১ই জুলাই) পর্যন্ত এই বৃষ্টিপাতের প্রবণতা চলতে পারে। আকাশজুড়ে মেঘ আর দমকা হাওয়ার দাপট থেকে সহসাই মুক্তি মিলছে না।

বৃষ্টির গতিপ্রকৃতি ও অঞ্চলভেদে প্রভাব

আবহাওয়াবিদদের তথ্যমতে, বৃষ্টির তীব্রতা প্রতিদিন সব এলাকায় সমান থাকবে না। কোনো দিন দক্ষিণাঞ্চলে, আবার কোনো দিন উত্তর ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারী বর্ষণ হতে পারে।

মঙ্গলবারের বিজ্ঞপ্তিতে আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ভারতের দক্ষিণ ঝাড়খণ্ড ও উড়িষ্যা এলাকায় অবস্থান করা মৌসুমি স্থল নিম্নচাপটি দুর্বল হয়ে এখন পূর্ব মধ্যপ্রদেশ ও তার আশাপাশের এলাকায় সুস্পষ্ট লঘুচাপ হিসেবে অবস্থান করছে। এটি আরও পশ্চিম-উত্তর-পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়ে ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে।

তবে স্থলভাগের এই লঘুচাপ দুর্বল হলেও উত্তর বঙ্গোপসাগর ও আশপাশের এলাকায় এখনো বায়ুচাপের বড় ধরনের পার্থক্য বিদ্যমান। ফলে মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর বেশ সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে তা প্রবল অবস্থায় আছে। এতে নতুন করে বঙ্গোপসাগরে বড় কোনো নিম্নচাপ সৃষ্টির ইঙ্গিত না থাকলেও, বৃষ্টি ও ঝড়ো হাওয়ার অনুকূল পরিবেশ বজায় থাকবে।

সমুদ্রবন্দর ও উপকূলীয় সতর্কবার্তা

আবহাওয়া পরিস্থিতির এই অস্থিরতায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরের জন্য ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে। গভীর সমুদ্রে থাকা সব মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সোমবার (৬ই জুলাই) থেকেই আবহাওয়া অধিদপ্তর এই পরিস্থিতির কথা জানিয়ে আসছিল। বিশেষ করে উপকূলীয় অঞ্চলে ঝড়ো হাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল এবং সেই সতর্ক সংকেত মঙ্গলবারও কার্যকর রয়েছে।

পাহাড়ধস ও জলাবদ্ধতার ঝুঁকি

আগামী চার দিনের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দিতে গিয়ে আবহাওয়াবিদ একেএম নাজমুল হক এক ভিডিও বার্তায় জানিয়েছেন, দেশের প্রায় সব বিভাগের ৭৫ থেকে ১০০ শতাংশ এলাকাতেই অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হতে পারে।

তবে ভয়ের জায়গাটি হলো অতিভারী বর্ষণ। বিশেষ করে খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও অতিভারী বর্ষণের পূর্বাভাস রয়েছে। এই অতিরিক্ত বৃষ্টির ফলে চট্টগ্রাম শহরে জলাবদ্ধতা এবং পাহাড়ি এলাকায় বিচ্ছিন্নভাবে ভূমিধসের ঝুঁকি চরম পর্যায়ে রয়েছে। রবিবার গভীর রাতে কক্সবাজার শহরে ও উখিয়া উপজেলার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসে নারী ও শিশুসহ ৯জনের মৃত্যুর হয়েছে। 

সপ্তাহজুড়ে আবহাওয়ার চিত্র

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, সপ্তাহজুড়ে বৃষ্টি ও বজ্রসহ বৃষ্টির প্রবণতা অব্যাহত থাকবে, তবে ভারী বর্ষণের কেন্দ্র এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে সরে যাবে। মঙ্গলবারের (৭ই জুলাই) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অধিকাংশ এলাকায় দমকা হাওয়াসহ বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

একই সঙ্গে রংপুর, রাজশাহী ও ঢাকা বিভাগের অনেক এলাকাও বৃষ্টির আওতায় থাকতে পারে। বুধবার (৮ই জুলাই) বৃষ্টির প্রবণতা উত্তরের দিকে আরও বিস্তৃত হবে। এদিন রংপুর, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের কোথাও কোথাও অতিভারী বর্ষণের সম্ভাবনা রয়েছে।

বৃহস্পতিবার (৯ই জুলাই) পরিস্থিতি একই থাকলেও ময়মনসিংহ, চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে ভারী বর্ষণের দাপট বজায় থাকতে পারে। শুক্রবার (১০ই জুলাই) বৃষ্টির পরিধি দেশের আট বিভাগেই আরও বিস্তৃত হবে এবং সবখানেই দমকা হাওয়াসহ মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে।

শনিবার (১১ই জুলাই) বৃষ্টি কিছুটা কমার ইঙ্গিত পাওয়া গেলেও বরিশাল ও চট্টগ্রাম বিভাগের অনেক এলাকায় বৃষ্টি অব্যাহত থাকবে।

তাপমাত্রা ও জীবনযাত্রা

এই দীর্ঘস্থায়ী বৃষ্টিপাতের মধ্যেও তাপমাত্রার বড় কোনো পরিবর্তন নেই। দিনের তাপমাত্রা ৩০ থেকে ৩৫ ডিগ্রি এবং রাতের তাপমাত্রা ২৪ থেকে ২৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করছে।

ভ্যাপসা গরম ও বৃষ্টির এই লুকোচুরিতে জনজীবন কিছুটা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষ করে নিচু এলাকার মানুষ এবং যারা প্রতিদিন জীবিকার প্রয়োজনে বাইরে বের হন, তারা চরম দুর্ভোগে পড়েছেন।

আবহাওয়া অধিদপ্তর তাদের বর্ধিত পূর্বাভাসে জানিয়েছে, শনিবারের (১১ই জুলাই) পর বৃষ্টির দাপট ধীরে ধীরে কমতে পারে। তবে মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকায় পুরোপুরি রোদ ঝলমলে আকাশ দেখার জন্য হয়তো আরও কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হবে।