ঢাকায় এখন তাপমাত্রা ৩৬ বা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কিন্তু গুগল বলছে ‘ফিলস লাইক ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস’। আগামী বছর এই গরম আরও বাড়বে? আর এই সব কিছুর জন্য দায়ী আবহাওয়ার চরম অবস্থা ‘এল নিনো’। যার প্রভাব এরই মধ্যে অনেক দেশে পড়তে শুরু করেছে। জাতিসংঘও জানিয়ে দিয়েছে সতর্কবার্তা।
ভারত
মে মাসের শেষভাগে ভারতের উত্তর প্রদেশের বুন্দেলখন্ড অঞ্চলের বান্দা জেলার তাপমাত্রা ৪৮ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। বলা হচ্ছে, এটি ভারতের ইতিহাসে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা। টানা আট থেকে নয় দিন ওই সময়ে ৪৭-৪৮ ডিগ্রি তাপমাত্রা ছিল। অবস্থা এমন যে সকাল ১০টার মধ্যেই বান্দার বাজারঘাট বন্ধ হয়ে যায়। রাস্তাঘাটও হয়ে পড়ে জনশূন্য।
দুপুরে সবাই ঘরের ভেতর বন্দি থেকে স্বেচ্ছায় ‘লকডাউন’-এর মতো পার করে। দিনে কাজ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আর তাই নির্মাণশ্রমিক ও দিনমজুররা বাধ্য হয়েই প্রায় ৪০ শতাংশ কম মজুরিতে রাতে এলইডি ফ্লাডলাইটের আলোতে কাজ করছেন।
কাঁচাবাজারের বেচাকেনা ভোর ৬টার মধ্যেই শেষ করতে হচ্ছে, কারণ রোদে সবজি দ্রুত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইন
মে মাস থেকেই ফিলিপাইনের কৃষকরা প্রধান ফসল ধানের বীজ বুনতে পারছেন না। বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে ৬০ শতাংশ কমে গেছে। মাঠের পর মাঠ কৃষি জমি শুকিয়ে দেখা দিয়েছে বড় বড় ফাটল।
আর ইন্দোনেশিয়ার বোর্নিও এবং সুমাত্রা দ্বীপের বনাঞ্চল ও পিটল্যান্ডস শুষ্ক হয়ে জুনের শুরুতেই আগাম দাবানল শুরু হয়েছে। অথচ এ ঘটনা সাধারণত অগাস্টে হওয়ার কথা।
পেরু ও ইকুয়েডর
প্রশান্ত মহাসাগরের উপকূলে সমুদ্রের পানি অস্বাভাবিকভাবে গরম হয়ে উঠছে।
পেরুর অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য অংশ মৎসজীবীদের উপর দাঁড়িয়ে আছে। জেলের জালে অ্যানচোভি নামের মাছই বেশি। এখন দেশটির উপকূলে সেই মাছ আর পাওয়া যাচ্ছে না। ধস নেমেছে জেলে ও মৎসজীবীদের আয়ে। একই সাথে পেরু ও ইকুয়েডরের উপকূলীয় মরুভূমি অঞ্চলে অস্বাভাবিকভাবে মেঘ বিস্ফোরণে আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও বন্যা দেখা দিচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়া
ওশেনিয়া অঞ্চলের অস্ট্রেলিয়াতে এখন শীতকাল হওয়ার কথা। কিন্তু এল নিনোর প্রভাবে সেখানকার তাপমাত্রা এখন স্বাভাবিকের চেয়ে ৩ থেকে ৪ ডিগ্রি ওপরে। দেশটির আবহাওয়া ব্যুরো খরাজনিত কারণে এরইমধ্যে বড় ধরনের গবাদি পশুর খাদ্য সংকটের সতর্কতা জারি করেছে।
অতদূরে না গিয়ে আমাদের বাংলাদেশ ও ভারতের অবস্থাই দেখুন।
বাংলাদেশ ও ভারত
জুন মাস শুরু হয়ে গেছে। তারপরও যতটা বৃষ্টি হওয়ার কথা, সেটা হচ্ছে না। এখন চলছে তাপপ্রবাহ। এল নিনোর কারণে ভারত মহাসাগর থেকে আসা দক্ষিণ-পশ্চিম মৌসুমী বায়ু মূল ভূখণ্ডে প্রবেশ করতে বাধা পাচ্ছে। এতে বান্দার বুক চিরে বয়ে যাওয়া ‘কেইন নদী’ সহ ভারত ও বাংলাদেশের অনেক গ্রামীণ নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির স্তর শুকিয়ে তলানিতে ঠেকেছে।
এতো গেলো প্রত্যক্ষ প্রভাব। কিন্তু যুক্তরাজ্যে যে অস্বাভাবিক গরম পড়েছে কয়েকদিনে ধরে, সেটার পেছনেও এই প্রশান্ত মহাসাগরের প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র ‘এল নিনো’রই প্রভাব রয়েছে। যদিও যুক্তরাজ্যের অবস্থান প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতা থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে।
এল নিনো এমনই এক অবস্থা তৈরি করছে, যা পুরো পৃথিবীর আবহাওয়ার চক্রকে ওলটপালট ঘটিয়ে দেয়।
এর প্রভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় তীব্র খরা সৃষ্টি করে আর দক্ষিণ-পশ্চিম আমেরিকায় ঝরায় অতিবৃষ্টি। অথচ সাধারণত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলিয়া বৃষ্টিপ্রবণ আর দক্ষিণ-পশ্চিম আমেরিকা খরাপ্রবণ এলাকা। আর এল নিনো যা করে তার ঠিক উল্টোটা করে লা নিনা।
এল নিনো ও লা নিনা কী?
এল নিনো
প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি অস্বাভাবিকভাবে উষ্ণ হয়ে উঠার পরিস্থিতিকে বলে ‘এল নিনো’। সাধারণত পূর্ব ও মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরে এই উষ্ণতা দেখা যায়।
স্বাভাবিক অবস্থায় পূর্বদিকের বাতাস সাধারণত প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের উষ্ণ পৃষ্ঠের পানিকে দক্ষিণ আমেরিকা থেকে অস্ট্রেলিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার দিকে ঠেলে দেয়। ফলে গরম পানি গিয়ে পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরে জমা হয়। তখন পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরের নিচ থেকে শীতল পানি উপরের দিকে উঠতে থাকে। কিন্তু জীবাস্ম জ্বালানি পোড়ানো থেকে শুরু করে পরিবেশবিরোধী কাজকর্মের কারণে সৃষ্টি হয় গ্রিন হাউস গ্যাস। এর ফলে বায়ুমন্ডলে তাপ আটকে পড়ে। সেটা আবার সমুদ্র শোষণ করে নেয়। তখন পূর্ব থেকে পশ্চিমে বায়ুর যে স্বাভাবিক প্রবাহ সেটি দুর্বল হয়ে যায়। তখন পশ্চিম দিকের গরম পানি ছড়িয়ে পড়ে গোটা প্রশান্ত মহাসাগরে। পানির সেই উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে বায়ুমন্ডলেও। সেই অবস্থাই ‘এল নিনো’। এখন এই কারণেই অতিরিক্ত গরম পড়ছে। এল নিনো পরিস্থিতি সাধারণত এক বছর স্থায়ী হয়।
লা নিনা
প্রশান্ত মহাসাগরের পূর্ব থেকে পশ্চিম দিকে যে প্রবাহ সেটা যদি স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি শক্তিশালী হয়, তখন তাকে বলে ‘লা নিনা’। এতে পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় জলরাশি অত্যন্ত শীতল হয়ে যায়। এর প্রভাবে শীতল হয় পরিবেশও। এই পরিস্থিতি সাধারণত দুই থেকে সাত বছর স্থায়ী হয়। কিন্তু এখন জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে অহরহ ‘লা নিনা’ শেষ হয়ে যাচ্ছে। তৈরি হচ্ছে এল নিনো।
এখন কী হচ্ছে?
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট এর রিপোর্ট বলছে এখন মূলত প্রশান্ত মহাসাগরের একদম তলদেশ দিয়ে উষ্ণ পানির বিশাল বিশাল ঢেউ দ্রুতগতিতে ধেয়ে চলছে। এই পরিস্থিতিকে বিজ্ঞানীরা নাম দিয়েছেন 'কেলভিন ওয়েভ'।
মূলত এই ‘কেলভিন ওয়েভ’ পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরের উষ্ণতম পানিকে প্রায় ৯ হাজার মাইল দূরত্ব পাড়ি দিয়ে দক্ষিণ আমেরিকার উপকূলে ঠেলে নিয়ে যায়। এখন এই ঢেউটির তাপমাত্রা মাপা হয়েছে স্বাভাবিকের চেয়ে রেকর্ড ৭ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস (১৩ দশমিক ৫ ডিগ্রি ফারেনহাইট) বেশি।
মার্কিন আবহাওয়া গবেষণা সংস্থা ন্যাশনাল ওশানিক অ্যান্ড এটমোসফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ)’র বিজ্ঞানী মিশেল এল হিউরেক্স বলেছেন, বর্তমানের কেলভিন ওয়েভটি অত্যন্ত ভয়ংকর, এটা অনেকটা ১৯৯৭ সালের মারাত্মক সেই কেলভিন ওয়েভের সাথে পাল্লা দিচ্ছে। যা সুপার এল নিনোর আশঙ্কাকে প্রবল করে তুলছে। যার শুরু হয়েছিল গত ডিসেম্বরে। তখন একটি জোরালো পশ্চিমা বাতাস প্রথম জানান দিয়েছিল যে, ২০২৬ সালে বড় একটি এল নিনো তৈরি হতে যাচ্ছে।
নিকট অতীতে সুপার এল নিনো
১৮৫০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত সুপার এল নিনোর দেখা মিলেছে মাত্র ৬ বার। এর মধ্যে ১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনোয় বিশ্বের প্রায় ৯ হাজার ৬০০ কোটি ডলারের ক্ষতি হয়েছিল। তবে সবচেয়ে প্রাণঘাতী ছিল ১৮৭৭-৭৮ সালের এল নিনো। সেই এল নিনোয় প্রাণ গিয়েছিল লাখ লাখ মানুষের। চলতি বছর জুনের শুরুতেই জাতিসংঘ বলেছে, এল নিনোর একটি নতুন পর্যায় আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই শুরু হতে পারে। এ বছর বাকি সময়জুড়ে এল নিনো আরও শক্তিশালী হতে পারে। যার কারণে বৈশ্বিক আবহাওয়া পরিস্থিতি চরম মাত্রায় পরিবর্তন হবে।