ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ে একটি ছবি নিয়ে বিতর্ক। সেই ছবি বাদ দিতে ৩০ লাখের মতো বই ফিরিয়ে নিতে হবে, সংশোধন করে আবার পাঠাতে হবে। নিঃসন্দেহে কোটি কোটি টাকার ব্যাপার। প্রশ্নটা তাই শুধু ছবি ঠিক ছিল কি-না তা নয়। প্রশ্ন হলো, ছাপার আগে তা দেখা হলো না কেন আর এই বাড়তি খরচের দায় কার?
বিতর্কের কেন্দ্রে দাঁড়িপাল্লার ছবি। ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (আইসিটি) বইয়ে ‘প্রজ্ঞার’ প্রতীক হিসাবে এটি ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশের নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর নির্বাচনি প্রতীক হওয়াতে আপত্তি উঠে। এরপরই বইগুলো ফিরিয়ে নিয়ে সংশোধনের উদ্যোগ নেয় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)।
ষষ্ঠ শ্রেণির এই বইটির ৩৮ লাখ কপি ছাপানো হচ্ছিল, যার মধ্যে প্রায় ২০ লাখ বই জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়েছিল, বলে এনসিটিবি’র এক সদস্যকে উদ্ধৃত করে রবিবার দৈনিক ইত্তেফাকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তবে প্রেসমালিকদের ভাষ্যমতে, ছাপা-বাঁধাই ও সরবরাহের কাজ শেষ হওয়া বইয়ের সংখ্যা কমপক্ষে ৩০ লাখ।
ওই একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে প্রতিটি বইয়ের মুদ্রণব্যয় প্রায় ৫৭ টাকা। সেই হিসাবে ৩০ লাখ বইয়ের আনুমানিক খরচ ১৭ কোটি ১০ লাখ টাকা।
একই দিনে বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এনসিটিবি শনিবার এই বিষয়ে চিঠি দেওয়ার পর জেলা, উপজেলা ও থানা পর্যায়ের সকল শিক্ষা কর্মকর্তাকে বইগুলো সংগ্রহ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যেসব মুদ্রণপ্রতিষ্ঠান বই সরবরাহ করেছে, তাদেরও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে বলা হয়েছে।
যার মানে কাজটা শুধু আসলে একটা ছবি বদলানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ না। দেশজুড়ে বই সংগ্রহ করে সেগুলো ঠিক করে আবার সরবরাহ করতে হবে। এই সিদ্ধান্তের পর কতগুলো বই কীভাবে সংশোধন করা হবে, সেটি গুরত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। পুরো বই আবার ছাপতে হবে, নাকি শুধু ওই পৃষ্ঠা বদলালেই চলবে তার উপর খরচটা অনেকটাই নির্ভর করবে।
তাই এই ১৭ কোটি ১০ লাখ টাকার অঙ্কটা সম্ভাব্য অতিরিক্ত ব্যয় হিসাবেই দেখতে হবে এখন। চূড়ান্ত খরচ কত তা জানার জন্য এনসিটিবি’র হিসাবের প্রয়োজন হবে।
এই টাকায় কী করা যেত
ধরা যাক, দরিদ্র মেধাবী শিক্ষার্থীদের ১০ হাজার টাকা করে বৃত্তি দেওয়া হবে। সেই হিসাবে, এই টাকায় ১৭ হাজার ১০০ জন শিক্ষার্থীকে এক বছর বৃত্তি দেওয়া সম্ভব হতো। এই টাকা দিয়ে তাদের বই-খাতা, পোশাক, যাতায়াত কিংবা পড়াশোনার অন্যান্য খরচের চাপ কিছুটা কমানো যেত।
যদি তরুণদের দক্ষতা উন্নয়নের কথা ভাবা হয়, তাহলে জনপ্রতি ২৫ হাজার টাকা খরচ হবে ধরে নিলে এই টাকায় ৬ হাজার ৮৪০ জনকে প্রশিক্ষণের দেওয়ার মতো বাজেট পাওয়া যায়। যা দিয়ে চাকরি বা আয়ের সুযোগ তৈরি হতো, সহজ ভাষায় বললে কর্মসংস্থান তৈরি হতো। অবশ্য প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, প্রশিক্ষক, যন্ত্রপাতি ও বেতন-ভাতার খরচ ধরলে সুবিধাভোগীর সংখ্যা কিছুটা কমবে।
স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রে যদি ধরা হয়, তাহলে জনপ্রতি ৫০০ টাকা ব্যয়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরীক্ষা সম্ভব ধরে নিলে এই টাকায় ৩ লাখ ৪২ হাজার মানুষের পরীক্ষার ব্যবস্থা করা যেত। ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো সাধারণ স্বাস্থ্য ঝুঁকি শনাক্ত করার মতো উদ্যোগে এই টাকা ব্যবহার করা যেতো। এটি একটা সরল হিসাব। অবশ্যই স্বাস্থ্যকর্মী, সরঞ্জাম ইত্যাদি ধরলে ব্যয় বাড়বে অথবা সুবিধাভোগীদের সংখ্যা কমবে।
ষষ্ঠ শ্রেণির বইটি যেহেতু আইসিটি বিষয়ের, তাহলে স্কুলগুলোতে কম্পিউটার ল্যাব বানানোর বিষয়টা দেখা যেতে পারে। প্রতিটি ল্যাবের সরঞ্জামের জন্য কম-বেশি ৫ লাখ টাকা খরচ ধরলে, এই অর্থে ৩৪২টি স্কুলে ল্যাব স্থাপন করা যায়। সব স্কুলে হয়তো একই খরচে ল্যাব করা সম্ভব হতো না। তবে এই টাকা দিয়ে বহু শিক্ষার্থীর প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগ বাড়তো।
এসব হিসাব সম্ভাব্য বিকল্প ব্যবহারের উদাহরণ, কোনো সরকারি প্রকল্পের ব্যয় না। তবে হিসাবগুলো থেকে একটা বিষয় স্পষ্ট যে, একই পরিমাণ টাকা দিয়ে অনেক মানুষের প্রয়োজন মেটানো সম্ভব ছিল। এখন সেই টাকা খরচ হবে ছাপা হয়ে যাওয়া বইয়ের ভুল সংশোধনে।
ভুল ধরা পড়ল না কেন
দৈনিক প্রথম আলো প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ শিক্ষাবর্ষের ষষ্ঠ শ্রেণির আইসিটি বইয়ে প্রজ্ঞার প্রতীক হিসাবে দাঁড়িপাল্লার ছবি ছিল। ২০২৬ সালে তা বদলে মস্তিষ্কের ছবি দেওয়া হয়। কিন্তু ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের জন্য ছাপা বইতে তা আবার ফিরে আসে। এনসিটিবি’র ব্যাখ্যা, আগের নকশাটি “ভুলক্রমে” নতুন সংস্করণে যুক্ত হয়েছে।
এই ব্যাখ্যা মেনে নিলেও প্রশ্ন থেকে যায়। আগের ছবি বদলানোর পর নতুন সংস্করণ তৈরির সময় সেটি আবার যাচাই করা হলো না কেন? পান্ডুলিপি সম্পাদনা, নকশা অনুমোদন এবং ছাপার আগে চূড়ান্ত প্রুফ দেখার আগে একাধিক ধাপ থাকার কথা। এর কোন এক পর্যায়ে ভুলটা ধরা পড়ার সুযোগ ছিল। পুরো যাচাই প্রক্রিয়া কতটা কার্যকর এখন সেই প্রশ্ন উঠছে।
প্রশ্ন রয়েছে দরপত্র নিয়েও
পাঠ্যবই ছাপানোর কাজ নিয়ে এর আগেও অভিযোগ উঠেছে। ছয়ই অক্টোবর বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৭ শিক্ষাবর্ষের বিনামূল্যের পাঠ্যবই ছাপানোর দরপত্রে প্রাক্কলিত দর ফাঁস, ঠিকাদারদের মধ্যে সিন্ডিকেট এবং প্রায় ২৫২ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়ের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এনসিটিবি’তে অভিযান চালায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুদক প্রাথমিক প্রাক্কলন, দাপ্তরিক মূল্যতালিকা ও এনসিটিবি’র ৪২৩তম বোর্ডসভার কার্যবিবরণীসহ বিভিন্ন নথি সংগ্রহ করেছে। মুদ্রণশিল্পের ৭৫ জন মালিক প্রাক্কলিত দর বাড়ানোর আবেদন করেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। অভিযোগ ছিল, কিছু ঠিকাদার প্রাক্কলিত দর আগেই জেনে গিয়েছিলেন এবং পরে দর বাড়ানোর দাবি উঠে।
সরকারি অর্থ কোথায় এবং কেন খরচ হচ্ছে, তা জানার অধিকার জনগণের রয়েছে। আর যে অর্থ শিক্ষা খাতে বা শিক্ষার্থীদের জন্য বরাদ্দ, তার ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন আরও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এখানে শুধু টাকার বিষয়ই নয়, শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতার প্রশ্নও জড়িত।
১৭ কোটি টাকায় কতজন শিক্ষার্থী বৃত্তি পেতে পারতো, কতগুলো স্কুলে কম্পিউটার ল্যাব করা যেতো, সেই তুলনাটা করলে বোঝা যায় এই অর্থের বিকল্প ব্যবহার কতটা বিস্তৃত হতে পারে। কিন্তু আসল প্রশ্নটা খুবই সরল: এই বাড়তি খরচের প্রয়োজন কেন পড়ল আর এর দায় কার?