হঠাৎই বক্তব্য থামিয়ে দিলেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। অনুবাদকের উদ্দেশ্যে জিজ্ঞেস করলেন, ‘উনি ঠিক আছেনতো?’
মাথা নাড়িয়ে উত্তর অবশ্য নিজেই দিয়েছিলেন চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং। আনন্দবাজারের খবর বলছে শনিবার ব্রিকস সম্মেলনের সূচনা বক্তব্যের সময় শি চিনপিংকে অস্বস্তিতে দেখে কথা থামিয়ে দেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী।
এর বেশি বিস্তারিত আর জানা যায়নি। অবশ্য শরীর যে খুব একটা ঠিকঠাক ছিলো না তা বোঝা গেছে নৈশভোজে চীনের প্রেসিডেন্টের অনুপস্থিতি দেখে। যদিও সম্মেলনে অংশ নিয়ে, দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করে কেন নৈশভোজে গেলেন না শি, তা নিয়ে চুলচেরা বিশ্লেষল চলছে সোশ্যাল মিডিয়ায়।
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে সদ্যসমাপ্ত দুই দিনের ১৮তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে একমঞ্চে হাজির হয়েছিলেন বিশ্বের অন্যতম প্রধান শক্তিধর রাষ্ট্রনেতারা।
বহুমেরুভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থার রূপরেখা, বৈশ্বিক বাণিজ্যে ডলারের একচেটিয়া আধিপত্য কমানো, গ্লোবাল সাউথের প্রতিনিধিত্ব, আন্তর্জাতিক আর্থিক কাঠামোর সংস্কার, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং চলমান বৈশ্বিক সংঘাত, এসবই ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
তবে ভারত মাণ্ডাপামে হওয়া এই সম্মেলনে একই টেবিলে বসেছিলো এমন কয়েকটি দেশ, যাদের মধ্যে ঘোর বিরোধ রয়েছে।
ভারত ও চীন চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে পশ্চিমের অবস্থান। ইরানের সাথে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধে। আবার সংযুক্ত আরব আমিরাত যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা অংশীদার।
তবে বিভাজন থাকা সত্ত্বেও সদস্য দেশগুলোর সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে ১৪০ অনুচ্ছেদের 'নয়াদিল্লি ঘোষণা ২০২৬'। ১২ই সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লির এই যৌথ ঘোষণা অনুযায়ী, সব বিষয়ে ঐকমত্য না থাকলেও কিছু বিষয়ে যৌথ অবস্থান তৈরির চেষ্টা করতে একমত দেশগুলো।
এবারের সম্মেলনে তাই শুধু ‘ব্রিকসের শক্তি বাড়ানো’ বা ‘পশ্চিমের বিরুদ্ধে নতুন জোট’, এই দুই সরল ব্যাখ্যায় আটকে রাখা যাবে না।
সম্মেলনের সূচনা অধিবেশনে বর্তমান চেয়ার ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বৈশ্বিক শাসনব্যবস্থাকে 'সুবিধাবাদীর পিরামিড' থেকে 'অংশীদারিত্বের প্ল্যাটফর্মে' রূপান্তরের আহ্বান জানিয়েছেন।
নয়াদিল্লি ঘোষণায় উল্লেখ করা হয়েছে যে, বর্তমান জাতিসংঘ কাঠামো বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির প্রয়োজন মেটাতে পারছে না।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী দুই সদস্য দেশ চীন ও রাশিয়া, পরিষদে ভারত ও ব্রাজিলের মতো উন্নয়নশীল দেশের সদস্যপদের জন্য ফের সমর্থন জানিয়েছেন।
এছাড়া আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের মতো ব্রেটন উডস প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার দাবি করা হয়েছে যৌথ ঘোষণায়।
পাঁচ থেকে এগারো
ব্রিকসের শুরু হয়েছিলো ব্রিক হিসাবে ২০০৯ সালে। ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত ও চীনকে নিয়ে। পরের বছর দক্ষিণ আফ্রিকা যোগ দিলে জোটটি ব্রিকস নামে পরিচিত হয়।
পরে ২০২৪ সালে ইজিপ্ট, ইথিওপিয়া, ইরান ও সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং ২০২৫ সালে ইন্দোনেশিয়া পূর্ণ সদস্য হয়।
ব্রিকস বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করে। বৈশ্বিক জিডিপির প্রায় ৪০ শতাংশ আর বৈশ্বিক অর্থনীতির চার ভাগের এক ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে ব্রিকস জোটের দেশগুলো।
এতে আছে বিশ্বের দুই বৃহত্তম জনসংখ্যার দেশ, জ্বালানি শক্তির বড় অংশ, আফ্রিকা ও ল্যাটিন আমেরিকার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি এবং ভারত মহাসাগর থেকে মধ্যপ্রাচ্য পর্যন্ত বিস্তৃত কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান।
চীন ব্রিকসকে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখতে চায়। রাশিয়া পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বাইরে বিকল্প অর্থনৈতিক পথ খুঁজছে।
ভারত চায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেও নিজের কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখতে। ইরানের কাছে ব্রিকস পশ্চিমা চাপের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পরিসর তৈরি করার সুযোগ।
আরব আমিরাতের মতো দেশগুলো পশ্চিমের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখেই চীন ও রাশিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক বাড়াতে চায়।
এবারের চেয়ার ভারত
নয়াদিল্লির কাছে এবারের সম্মেলন ছিলো একই সঙ্গে কূটনৈতিক সুযোগ এবং পরীক্ষা।
ভারত এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা চায় যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব থাকবে, কিন্তু চীন, ভারত ও অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের ভূমিকাও বাড়বে। তাই ব্রিকসকে ভারত পশ্চিমবিরোধী জোট হিসেবে দেখছে না। বরং হাল বিশ্বব্যবস্থা সংস্কারের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসাবে ব্যবহার করতে চাইছে।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী গ্লোবাল সাউথকে বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও কার্যকর ভূমিকায় দেখতে চান। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের সংস্কার, আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানে উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো এবং বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থাকে আরও প্রতিনিধিত্বশীল করার ওপর জোর দিচ্ছে ভারত।
এই অবস্থান ভারতের দীর্ঘদিনের ‘কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন’ নীতির সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ। ওয়াশিংটনের সঙ্গে প্রতিরক্ষা ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়ালেও নয়াদিল্লি মস্কোর সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেনি। চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ থাকলেও বাণিজ্য বন্ধ করেনি। ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক রেখেছে এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক শক্তিশালী করেছে।
ভারত বলছে আরেকটি শক্তিকেন্দ্র তৈরি নয়, বরং একাধিক শক্তিকেন্দ্রের সঙ্গে কাজ করার কূটনৈতিক সক্ষমতা বাড়ানোই তাদের লক্ষ্য।
মোদী-শি: প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যেও সমঝোতার চেষ্টা
এই সম্মেলনের সবচেয়ে বড় দ্বিপক্ষীয় ঘটনাগুলোর একটি ছিলো নরেন্দ্র মোদী ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিংয়ের বৈঠক।
২০২০ সালের সীমান্ত সংঘাতের পর ভারত-চীন সম্পর্কে যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, তা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। কিন্তু দুই দেশই মনে করছে, দীর্ঘমেয়াদি উত্তেজনা তাদের অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বার্থ নষ্ট করতে পারে।
বৈঠকের পর শি চিনপিং ভারত ও চীনকে প্রতিদ্বন্দ্বী নয়, অংশীদার হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন। মোদী বলেন, দুই দেশের মতপার্থক্য যেন বিরোধে পরিণত না হয় এবং সীমান্তে শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় থাকে।
যদিও একে ভারত-চীন সম্পর্কের মৌলিক পরিবর্তন বলা যায় না।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের হিসাব বলছে, ২০২৫ সালে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য প্রায় ১৫৫ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে।
এর মধ্যে চীন থেকে ভারতের আমদানির পরিমাণ ছিল প্রায় ১৩২ বিলিয়ন ডলার। অর্থনৈতিক সম্পর্ক গভীর হলেও বাণিজ্য ঘাটতি ভারতের জন্য উদ্বেগের।
সীমান্ত বিরোধ, প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা এবং এশিয়ায় কৌশলগত প্রভাব নিয়ে দুই দেশের প্রতিযোগিতাও শেষ হয়নি।
তাই মোদী-শি বৈঠককে ‘পুনর্মিলন’ বলার চেয়ে নিয়ন্ত্রিত প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রচেষ্টা বলাই যথার্থ। দুই দেশ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে, কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন সামরিক সংঘাত বা অর্থনৈতিক বিচ্ছিন্নতায় না গড়ায়, এই বোঝাপড়াই বৈঠকের গুরুত্ব পেয়েছে।
ডলার থাকছে, শক্তিশালী হচ্ছে ব্রিকসপে
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্রিকসকে নিয়ে বহুল চর্চিত জল্পনাটি হলো ডি-ডলারাইজেশন বা বিশ্ববাণিজ্যে ডলারের একচেটিয়া আধিপত্যের পতন।
অনেকেই ধারণা করেছিলেন এই সম্মেলন থেকে একটি অভিন্ন ‘ব্রিকস মুদ্রা’ চালুর ঘোষণা আসবে। তবে তা আসেনি।
পশ্চিমা আধিপত্যের বিকল্প কোনো একক ‘ব্রিকস মুদ্রা’ চালুর পথ এড়িয়ে সদস্য দেশগুলো নিজস্ব মুদ্রায় আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিষ্পত্তির ওপর জোর দিয়েছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ), বিশ্ব ব্যাংক ও জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে 'গ্লোবাল সাউথ'-এর অবস্থান শক্তিশালী করতে কাঠামোগত সংস্কারের দাবিও জানানো হয়েছে যৌথ ঘোষণায়।
ডলারের বিকল্প হিসেবে আন্তঃব্রিকস লেনদেনে স্থানীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানো এবং ‘ব্রিকস পে’ নামের স্বাধীন আর্থিক ব্যবস্থার আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়েছে।
চীনের কাছে ব্রিকসের গুরুত্ব শুধু রাজনৈতিক নয়। বেইজিং দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি আন্তর্জাতিক পরিবেশ চাইছে যেখানে বিশ্ব অর্থনীতি ও বৈশ্বিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে যুক্তরাষ্ট্রের একক প্রভাব কমবে।
শি চিনপিং নয়াদিল্লিতে বহুমেরুর বিশ্বব্যবস্থা, উন্নয়নশীল দেশগুলোর ভূমিকা এবং আন্তর্জাতিক শাসনব্যবস্থার সংস্কারের ওপর জোর দেন। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতে ব্রিকসের ভূমিকা রাখার কথাও বলেন।
চীনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজটি অবশ্য ঘোষণাপত্রের রাজনৈতিক ভাষার বাইরে।
ব্রিকসের সদস্য দেশগুলো এখন স্থানীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো, ক্রসবর্ডার লেনদেন সহজ করা এবং বিভিন্ন দেশের আর্থিক কাঠামোর মধ্যে সংযোগ তৈরির চেষ্টা করছে।
তবে একাধিকবার আলোচনা উঠলেও, ব্রিকস এখনও কোনো অভিন্ন মুদ্রা চালু করেনি।
ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুলার প্রতিনিধিত্বকারী দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী মাউরো ভিয়েরা স্পষ্ট করেই বলেছেন যে তারা ডলার ব্যবস্থা ধ্বংস করছেন না, বরং নিজেদের বাণিজ্যিক ঝুঁকি কমাতে নিজস্ব মুদ্রার ব্যবহার বাড়াচ্ছেন।
বৈশ্বিক অপরিশোধিত তেলের ৪৩ শতাংশ এবং প্রাকৃতিক গ্যাসের ৫০ শতাংশ নিয়ন্ত্রণকারী এই দেশগুলোর নিজেদের মধ্যে লেনদেনে প্রায় ৩৫ শতাংশ বর্তমানে স্থানীয় মুদ্রায় নিষ্পত্তি হচ্ছে।
বিকল্প পথের খোঁজে রাশিয়া
ইউক্রেন যুদ্ধের পর পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার কারণে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আর্থিক ব্যবস্থায় রাশিয়ার জন্য যে বাধা তৈরি হয়েছে, মস্কো তার বিকল্প খুঁজছে।
এই কারণে স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন, বিকল্প আর্থিক ব্যবস্থা এবং ব্রিকসের অর্থায়ন রাশিয়ার কাছে গুরুত্বপূর্ণ।
রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন এবারের সম্মেলনে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, অবকাঠামোতে সহযোগিতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন। মোদীর সঙ্গেও তার বৈঠকে বাণিজ্য, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও আন্তর্জাতিক সংঘাতের বিষয় উঠে আসে।
তবে ব্রিকস রাশিয়ার বিকল্প পথ তৈরিতে সাহায্য করলেও রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতি গ্রহণ করেনি।
ভারত যেমন রাশিয়ার কাছ থেকে জ্বালানি ও সামরিক সরঞ্জাম নেয়, তেমনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গেও সম্পর্ক বজায় রাখে। চীন রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ হলেও তার নিজস্ব অর্থনৈতিক হিসাব আছে। তাই ব্রিকস রাশিয়াকে কিছুটা সুরক্ষা দেয়, কিন্তু পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞা থেকে বাঁচিয়ে দিতে পারে না।
ইরান ও উপসাগরীয় অঞ্চল
এবারের সম্মেলনে ব্রিকসের রাজনৈতিক ঐক্যের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষা এসেছে মধ্যপ্রাচ্য পরিস্থিতি বিবেচনায়।
ইরান ব্রিকসের পূর্ণ সদস্য। অন্যদিকে সংযুক্ত আরব আমিরাতও একই সংগঠনের সদস্য এবং যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক অংশীদার।
চলমান ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল সংঘাতের প্রেক্ষাপটে দুই দেশের অবস্থান অনেক ক্ষেত্রেই পরস্পরবিরোধী।
সম্মেলনের আগে বার্তাসংস্থা রয়টার্স এক বিশ্লেষণে জানিয়েছিলো, ইরান-সংযুক্ত আরব আমিরাতের দ্বন্দ্ব ব্রিকসের যৌথ অবস্থান তৈরিকে কঠিন করে তুলেছে। এমনকি এই কারণে গত মে মাসে ব্রিকস পররাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকেও কোনো যৌথ বিবৃতি দেওয়া যায়নি।
তবু নয়াদিল্লিতে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র হয়েছে। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা কমানো, বেসামরিক মানুষের সুরক্ষা, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং কূটনৈতিক সমাধানের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এটি যুদ্ধ বন্ধের জন্য কূটনৈতিক সাফল্য নয় বটে, তবে এর রাজনৈতিক তাৎপর্য আছে। সংঘাতে থাকা সদস্যদের ভিন্ন অবস্থান সত্ত্বেও ব্রিকস এমন একটি ন্যূনতম ভাষা খুঁজে নিয়েছে, যার মাধ্যমে যৌথ অবস্থান প্রকাশ করতে পেরেছে।
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ খালেদ বিন মোহাম্মদ বিন জায়েদের দেখা হয়েছে এই বাস্তবতা মাথায় রেখেই।
হরমুজ সংকট নিয়ে ব্রিকস
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের অর্থনৈতিক প্রভাব বিশ্বজোড়া। এই অঞ্চলের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার।
বৈশ্বিক জ্বালানি চাহিদার ২৫ থেকে ২৭ শতাংশ পরিবহন হয় হরমুজ প্রণালি দিয়ে। এখানে সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় ব্রিকসের সদস্য ভারত ও চীনসহ এশিয়ার বড় অর্থনীতিগুলো সরাসরি চাপে পড়ছে।
সৌদি আরবের পূর্ব-পশ্চিম পাইপলাইনও এই সংকটের মধ্যে বাড়তি গুরুত্ব পেয়েছে, কারণ এটি হরমুজ এড়িয়ে তেল পরিবহনের একটি বিকল্প পথ।
ব্রিকস জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা করেছে, কিন্তু এর কোনো যৌথ সামরিক ব্যবস্থা নেই। কোনো সদস্যের ওপর হামলা হলে অন্য সদস্যকে সামরিকভাবে এগিয়ে যেতে হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতাও নেই।
তবে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে কার্যত কিছু করার না থাকলেও সব দেশই চেয়েছে এই অঞ্চল নিরাপদ থাকুক।
নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক
ব্রিকসের কার্যকর একটি অর্জন হলো জোটটির ব্যাংক এনডিবি বা নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক। ব্যাংকটির ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন বলছে, ওই বছর ১৯টি প্রকল্পে ৩ দশমিক ১৭১ বিলিয়ন ডলার অর্থায়ন অনুমোদন করা হয়েছে। ২০২৫ সালের শেষে ব্যাংকটির প্রকল্পভিত্তিক অনুমোদিত অর্থায়ন ছিল প্রায় ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন ডলার।
বিশ্বব্যাংক বা এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের তুলনায় এই পরিমাণ এখনো ছোট। তবে এটি অতিরিক্ত বহুপক্ষীয় অর্থায়নের পথ তৈরি করছে। স্থানীয় মুদ্রায় অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোরও চেষ্টা করছে ব্যাংকটি।
ব্রিকসের শক্তি, ব্রিকসের দুর্বলতা
ব্রিকসের শক্তি তার আকার। আবার দুর্বলতাও সেই আকার।
চীন চাইছে বহুমেরুভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা শক্তিশালী হোক। রাশিয়া চায় পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার প্রভাব কমাতে বিকল্প অর্থনৈতিক ব্যবস্থা। ভারত চায় কৌশলগত স্বাধীনতা। ইরান চায় পশ্চিমা চাপ মোকাবিলার শক্তি। সংযুক্ত আরব আমিরাত চায় পশ্চিমের নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক রেখে চীন ও রাশিয়ার সঙ্গেও সম্পর্ক রাখতে।
অর্থাৎ সব সদস্য পশ্চিমানেতৃত্বাধীন ব্যবস্থার কিছু না কিছু সীমাবদ্ধতা নিয়ে আপত্তি জানালেও, সবাই একই ধরনের বিকল্প চায় না।
তাই ব্রিকসের ঘোষণাপত্রে রাজনৈতিক ভাষা থাকলেও, নিরাপত্তা প্রশ্নে সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত কমই দেখা গেছে।
সামনে আসল পরীক্ষা
ব্রিকস বড় হয়েছে। এর অর্থনৈতিক ও জনমিতিক ওজন বেড়েছে। এনডিবি কাজ করছে। স্থানীয় মুদ্রায় লেনদেন বাড়ানোর চেষ্টা হচ্ছে।
তবে ব্রিকস কোনো অভিন্ন মুদ্রা চালু করেনি। ডলারকে সরিয়ে দেওয়ার মতো কোনো একক আর্থিক ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। যৌথ সামরিক ব্যবস্থা নেই। ইউক্রেন, মধ্যপ্রাচ্য কিংবা চীন-ভারত সম্পর্কের মতো বড় প্রশ্নে সদস্যদের অবস্থানও এক নয়।
তবে ব্রিকস এমন একটি জায়গায় পৌঁছেছে, যেখানে সদস্যরা পশ্চিমের বিকল্প কোনো একক ব্যবস্থা তৈরি করতে না পারলেও পশ্চিমের ওপর নির্ভরতার বিকল্প তৈরি করার চেষ্টা করছে।
আগামী পাঁচ থেকে দশ বছরে এই সংগঠনের সাফল্য ঘোষণাপত্রের শব্দচয়নে নয়, বরং মাপা হবে বাস্তবতায়।
স্থানীয় মুদ্রায় কতটা বাণিজ্য হচ্ছে, বিকল্প আর্থিক কাঠামো কতটা যুক্ত এসব আর্থিক প্রশ্ন। ভারত-চীন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া-ইউক্রেন দ্বন্দ্ব সামলে সদস্যরা কতটা একসঙ্গে কাজ করতে পারছে সেটি রাজনৈতিক প্রশ্ন।
নয়াদিল্লির সম্মেলন প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়নি। বরং এটি যে আগামী বিশ্ব বাস্তবতার একটি পরীক্ষা তা আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে।