বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ৩ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়া হবে বলে ঘোষণা দিয়েছে মিয়ানমার। তবে এ জন্য রাখাইনের ‘নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল’ হতে হবে বলে এক বিবৃতিতে জানিয়েছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পরিচয় নিশ্চিত হওয়া ‘বাস্তুচ্যুত ব্যক্তিদের’ মিয়ানমারের নাগরিক বলে স্বীকার করেছে দেশটি। তবে তাদের জাতিগত পরিচয় ‘রোহিঙ্গা’ উল্লেখ করা হয়নি ওই বিবৃতিতে।
মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দেওয়া পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩১এ জুলাই পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকার ৮ লাখ ২৮ হাজার ৮২৪ জন শরণার্থীর একটি তালিকা দিয়েছে।
সেখান থেকে ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫৪৫ জনের তথ্য যাচাই করা হয়েছে। মিয়ানমার জানিয়েছে, এদের মধ্যে ৩ লাখ ৮ হাজার ৭৯৭ জন রাখাইনের বাসিন্দা হিসেবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
তালিকার ৪ হাজার ২৪১ জনের সঙ্গে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের সম্পৃক্ততা পাওয়ার দাবি জানিয়েছে মিয়ানমার। আর ১ লাখ ১৩ হাজার ৫০৭ জনের তথ্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মিয়ানমার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে যে, রাখাইনে নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল হলে যাচাইকৃত সাবেক বাসিন্দাদের পর্যায়ক্রমে ফিরিয়ে নেওয়া হবে।
রাখাইন থেকে বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঘটনা ও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোকে ‘একপেশে’ ও ‘ভুল তথ্যের ওপর ভিত্তি করে তৈরি’ বলে প্রত্যাখ্যান করেছে দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এমনকি জাতিগত নিধন ও গণহত্যার অভিযোগও অস্বীকার করেছে তারা।
২০১৭ সালের অগাস্টে রাখাইনে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে ৭ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে বাধ্য হয়, যা আগে থেকেই বাংলাদেশে বসবাসরত আরও কয়েক লাখ রোহিঙ্গার সাথে যুক্ত হয়।
এই ঘটনাকে জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় 'জাতিগত নিধন' ও 'গণহত্যা' হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
মিয়ানমার দাবি করেছে, ২০১৬ ও ২০১৭ সালে ‘সন্ত্রাসী গোষ্ঠী’ আরসা পুলিশ ও সেনা চৌকির ওপর সমন্বিত হামলা চালালে সামরিক বাহিনী আত্মরক্ষার্থে অভিযান চালায়।
দেশটি বলছে, আরসার হামলার আগে রাখাইনের বুথিডং, মংডু এবং রাথেডং টাউনশিপে ৭ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ বসবাস করতো। সংঘাতের পর ২ লাখের বেশি মানুষ সেখানে থেকে যায়। ৫ লাখ ৪০ হাজারের বেশি মানুষ বাংলাদেশে পালিয়ে যায়।
এর ভিত্তিতে মিয়ানমারের দাবি, ১০ লাখেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হওয়ার যে তথ্য আন্তর্জাতিক মহলে প্রচার করা হয়, তা ঠিক নয়।
জাতিগত পরিচয় অস্বীকার
মিয়ানমার কখনোই রোহিঙ্গাদের দেশের ১৩৫টি বৈধ জাতিগত সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর অন্যতম হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না। এর পরিবর্তে তারা রোহিঙ্গাদের 'বাঙালি' বলে আখ্যায়িত করে।
এই বিবৃতিতেও মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ‘নৌকায় করে অন্য দেশে যাওয়া ব্যক্তি’ হিসাবে উল্লেখ করে। এমনকি তাদের জাতিগত পরিচয় ‘অস্তিত্বহীন’ বলে দাবি করে।
মিয়ানমার জানিয়েছে, প্রত্যাবাসন কেবল বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যকার একটি দ্বিপাক্ষিক বিষয়।
অতীতের প্রত্যাবাসন চেষ্টা
বাস্তুচ্যুতদের ফিরিয়ে নিতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে তিনটি দ্বিপাক্ষিক চুক্তি হয়েছিলো। ২০১৮ সালের জানুয়ারি ও নভেম্বর এবং ২০১৯ সালের অগাস্টে প্রত্যাবাসনের ব্যবস্থা করা হলেও, কোনো বাস্তুচ্যুত ব্যক্তি সেসময় মিয়ানমারে ফিরে যাননি।
মিয়ানমার সরকার ১৯৭৮ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত কয়েক লাখ মানুষকে সফলভাবে ফিরিয়ে নেওয়ার উদাহরণ টেনে বলেছে, তারা যাচাইকৃতদের ফিরিয়ে নিতে আন্তরিকভাবে কাজ করছে।
প্রত্যাবাসনের অংশ হিসেবে রাখাইনে ‘কাম-অ্যান্ড-সি’ (আসো এবং দেখো) এবং বাংলাদেশে ‘গো-অ্যান্ড-টক’ (যাও এবং কথা বলো) কর্মসূচিসহ বিভিন্ন পাইলট প্রকল্টেপর কথা উল্লেখ করেছে। প্রতিবেশী ও বন্ধুরাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে গঠনমূলক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে মিয়ানমার।
যা বলছে আন্তর্জাতিক সংস্থা
জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)-এর তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ১১ থেকে ১২ লাখ রোহিঙ্গা আছে।
যদিও স্থানীয় তথ্য বলছে, বাস্তবে এর সংখ্যা কয়েক লাখ বেশি। যাদের অধিকাংশই কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফের শরণার্থী শিবিরগুলোতে বসবাস করছে।
এই ক্যাম্পগুলোকে বিশ্বের সবচেয়ে বড় শরণার্থী বসতিগুলোর একটি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। নিবন্ধিত রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি। যাদের অর্ধেকই নারী ও শিশু।
ক্যাম্পগুলোর ওপর চাপ কমাতে প্রায় ৩৫ হাজার রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তর করা হয়েছে। ওই উদ্যোগ সমালোচিত হওয়ায় পরে আর কোনো রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে নেওয়া হয়নি।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ২০১৭ সালে সেনাবাহিনীর অভিযানের মুখে সাত লাখের বেশি রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। জাতিসংঘ ওই অভিযানে “জাতিগত নিধনের আলামত” ছিলো বলে উল্লেখ করেছিল।
রোহিঙ্গাদের নির্যাতন ও দেশত্যাগের ইতিহাস আরও পুরোনো। ১৯৭৮ সালে মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের সময় প্রথম বড় আকারে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। এরপর ১৯৯১–৯২ সালেও একই ধরনের সামরিক অভিযানের কারণে কয়েক লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পার হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।
প্রায় পাঁচ দশক ধরে এই সংকট ধীরে ধীরে তৈরি হয়েছে এবং ২০১৭ সালে তা চূড়ান্ত রূপ নেয়।