ঢাকায় ‘র’-এর প্রধানের সফরের খবর, কে এই ‘স্পাই মাস্টার’

ভারতীয় স্পাই এজেন্সি র-এর (রিসার্চ অ্যান্ড অ্যানালিসিস উইং) প্রধান পরাগ জৈন এক সফরে ঢাকায় এসেছেন বলে খবর দিয়েছে বাংলাদেশের অনলাইন গণমাধ্যম বিডিনিউজ টোয়েন্টি ফোর ডট কমসহ ঢাকার বেশকিছু গণমাধ্যম।

রবিবার দুপুরবেলায় ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি ফ্লাইটে তিনজন সফরসঙ্গী নিয়ে তিনি ঢাকায় এসে নামেন। সফরসঙ্গীরা হলেন অশ্বীন মুকুন্দ কোটনিস, রাহুল নেগি এবং শৈবাল রায় চৌধুরী।

পরাগ জৈন এমন দিনে ঢাকায় এসেছেন, যার একদিন পর ঢাকায় ভারতের নয়া হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে প্রথমবারের মতো সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে গেছেন।

‘র’ প্রধানের সফরের খবরটি ঢাকার ভারতীয় দূতাবাস বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে ঢাকায় পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা আলাপকে এই সফরের খবর নিশ্চিত করেছেন।

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে লিখেছে, “বাংলাদেশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আমন্ত্রণে এই সফরে পরাগ জৈন চার সদস্যের একটি উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন।”

বিডিনিউজ এও লিখেছে, বাংলাদেশে আসার আগে পরাগ জৈন চীন সফর করে এসেছেন। 

কেন তিনি ঢাকায়?

জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক ইতিহাসের সবচাইতে তলানিতে এসে ঠেকে। দুই দেশের মধ্যে মুখ দেখাদেখি বন্ধ থাকবার অবস্থা তৈরি হয়। বন্ধ হয়ে যায় দুই দেশের নাগরিকদের মধ্যে স্বাভাবিক চলাচল, যা পুনরায় স্বাভাবিক হয় গত জুন মাসে নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী ঢাকায় আসার পর। 

একটা ধারণা ছিলো, বাংলাদেশে ভোটে নির্বাচিত সরকার আসার পর ভারত-বাংলাদেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার একটা চেষ্টা হবে। মনে করা হচ্ছিলো, দীনেশ ত্রিবেদী আসার পর ট্যুরিস্ট ভিসা চালু করাটা ছিলো সেই উদ্যোগের প্রথম ধাপ।

কিন্তু অস্বস্তি তৈরি হয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফরে ভারতে না গিয়ে মালয়েশিয়া হয়ে চীনে যাওয়ায়। তারপর ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে ভারতে যেতে তারেক রহমানের অনীহা বা ভারতের দ্বিপাক্ষিক সফরের আমন্ত্রণে সাড়া না দেওয়া অস্বস্তির পরিমাণ দিনকে দিন বাড়িয়ে দিচ্ছিলো।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাথে সাক্ষাত করেছেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদেী

সেই অস্বস্তি চূড়ান্ত আকার ধারণ করে গত ৫ই অগাস্ট ভারতের ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব আয়োজিত একটি সংবাদ সম্মেলনে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যুক্ত হয়ে সরাসরি বক্তব্য দেওয়ায়।

বাংলাদেশ আশা করেছিলো, ভারত এটা ঠেকাবে এবং বাংলাদেশ মনে করে ভারতের কতৃ‍পক্ষ না চাইলে শেখ হাসিনা দিল্লীতে বসে ওই অনুষ্ঠানে যোগ দিতে পারতো না।

এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশ করা একটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় - ওই বিজ্ঞপ্তিটির ভাষা ছিলো অত্যন্ত কড়া। কূটনৈতিক অঙ্গণে সাধারণত এমন কড়া আর খোলাখুলি ভাষায় বিবৃতি প্রকাশ করতে দেখা যায় না।

এমন তপ্ত সম্পর্কের পটভূমিতে ‘র’ প্রধানের ঢাকা সফর কি ভেতরে ভেতরে সম্পর্কের বরফ গলানোর চেষ্টার অংশ?

বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশের সাথে ভারতের চলমান সম্পর্কের যে ডাইমেনশন, তাতে এই সফরটি মোটেও অস্বাভাবিক নয়। বরঞ্চ এর অন্যরকম একটা মাত্রা আছে। বরঞ্চ দুই দেশের সামরিক সহযোগিতার ঘাটতি, কূটনৈতিক টানাপোড়েন এবং রাজনৈতিক উত্তাপের প্রেক্ষাপটে এমন একটি সফর বেশ গুরুত্ব বহন করে, বলছেন বিশ্লেষকরা।

ভারতের গুপ্তচর সংস্থার কোনো প্রধানের এর আগের কোন ঢাকা সফরের খবর প্রকাশ হতে শোনা যায়নি। যদিও হাসিনার শাসনামলে ভারতের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা প্রায়ই গোপন ও সংক্ষিপ্ত সফরে ঢাকায় আসতেন - এমন অভিযোগ জুলাই অভ্যুত্থান পরবর্তী সময়ে শোনা গেছে।

অভ্যুত্থান পরবর্তী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে এ ধরনের যোগাযোগ দুই দেশের মধ্যে একেবারেই বন্ধ ছিলো বলে ধারণা করা যায়।

তবে চলতি বছর ভোটে জিতে তারেক রহমান সরকার গঠনের পর বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই-এর প্রধান মেজর জেনারেল কায়সার রশীদ চৌধুরী গত পয়লা মার্চ তিন দিনের এক সফরে ভারত যান।

ভারতের গণমাধ্যমের খবর অনুযায়ী, ওই সফরে জেনারেল চৌধুরীর সঙ্গে ’র’ প্রধান পরাগ জৈনের বৈঠক হয়।

সেসময়ে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রনধির জয়সোয়াল সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে এই সফরের কথা স্বীকার করে বলেছিলেন, তিনি “সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সাথে আলাপ আলোচনা করেছেন”।

সেসময়ে ঢাকার পত্রিকা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড লিখেছিলো, দুই দেশের নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার করার জন্য ডিজিএফআই প্রধান ভারতে গিয়েছেন।

কিন্তু সেই সফরের প্রায় সাড়ে ৫ মাস পর ‘র’ প্রধান কেন ঢাকায় এলেন সেটা এখনো স্পষ্ট না। যদিও এই সফরের ব্যাপারে আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি কোনো দেশ।

স্পাইমাস্টার 

ভারতীয় গণমাধ্যমে পরাগ জৈনকে একজন ‘স্পাইমাস্টার’ হিসেবে বর্ণনা করে।

২০২৫ সালের মে মাসে পাকিস্তানশাসিত কাশ্মীরে ভারত ‘অপারেশন সিন্দুর’ নামে যে সেনা অভিযানটি চালিয়েছিলো সেটির ‘মাস্টারমাইন্ড’ ছিলেন এই পরাগ জৈন। ওই অভিযানের সাফল্যের পরই গত বছর জুন মাসে পরাগ জৈনকে ‘র’-এর ২৫তম প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ভারত।

পয়লা জুলাই ২০২৫ থেকে তার মেয়াদকাল শুরু হয়। তিনি এ পদে থাকবেন ২০২৭ সালের জুন মাস পর্যন্ত।

ভারতে ‘র’-এর প্রধানের পদটিকে ডাকা হয় ‘সেক্রেটারি’ নামে। পরাগ জৈন পাঞ্জাব ক্যাডারের ১৯৮৯ ব্যাচের একজন আইপিএস অফিসার। ভারতের গোয়েন্দাসমাজে তিনি ‘সুপার স্লুথ’ বা ‘মহা গোয়েন্দা’ নামে পরিচিত। সিনিয়র কর্মকর্তারা তাকে বর্ণনা করেন ‘সুশৃঙ্খল ও বিচক্ষণ’ হিসেবে। পুরো ক্যারিয়ারজুড়েই তিনি গুরুত্বপূর্ণ সব দায়িত্ব পালন করেছেন।

২০২১ সালে পরাগ জৈন ছিলেন পাঞ্জাব পুলিশের মহাপরিচালক (ডিজিপি)। ওই সময়ে পাঞ্জাবে সন্ত্রাসবাদের নানা ঘটনা আলোচনার জন্ম দিয়েছিল এবং এসব নিয়ন্ত্রণে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।

জম্মু ও কাশ্মিরে ভারত যখন ‘আর্টিকেল ৩৭০’ আরোপ করে সেই সময়ে এবং আরেক গুরুত্বপূর্ণ অভিযান ‘অপারেশন বালাকোট’-এও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা লেখে ভারতের পত্রপত্রিকা।

খালিস্তান আন্দোলনের ইকোসিস্টেমকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য তাকে একবার কানাডাতেও দায়িত্ব দিয়ে পাঠানো হয়েছিলো।

ভারতীয় গণমাধ্যম ফার্স্টপোস্ট এক নিবন্ধে লিখেছে, মালদ্বীপ ও বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহ সামাল দিতে ব্যর্থ হওয়া ২০২৪ সালের পরে বেশ সমালোচনার মুখে পড়েছিল ‘র’। সংস্থাটিকে ওই সমালোচনা সামলে ঘুরে দাঁড় করানোর চেষ্টার অংশ হিসেবেই ২০২৫ সালে পরাগ জৈনকে এটির প্রধান হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়।